হামাসঃ গাজার বুক থেকে উঠে আসা প্রতিরোধ আন্দোলন
বিশ্বের মানচিত্রে ফিলিস্তিন একটি ক্ষুদ্র ভূখণ্ড হলেও, এই ভূমিকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা সংঘাত ও প্রতিরোধের ইতিহাস বিশ্বরাজনীতিতে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ স্থান দখল করে আছে। দশকের পর দশক ধরে দখলদারিত্ব, বাস্তুচ্যুতি আর রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষের মধ্যে ফিলিস্তিনি জনগণ তাদের অস্তিত্ব ও অধিকার রক্ষার জন্য লড়াই করে আসছে। এই দীর্ঘ সংগ্রামের পথ ধরেই জন্ম নিয়েছে বিভিন্ন প্রতিরোধ আন্দোলন — যার মধ্যে সবচেয়ে আলোচিত ও বিতর্কিত নামটি হলো হামাস। ১৯৮৭ সালে প্রথম ইন্তিফাদার উত্তাল পরিবেশে গাজা উপত্যকায় জন্ম নেওয়া এই সংগঠনটি আজ শুধু ফিলিস্তিনের রাজনীতির কেন্দ্রেই নয়, বরং সমগ্র মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনীতিতে একটি নির্ণায়ক শক্তি হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। কেউ তাদের দেখেন স্বাধীনতার যোদ্ধা হিসেবে, কেউবা তাদের আখ্যায়িত করেন সন্ত্রাসী সংগঠন হিসেবে — এই বিতর্ক আজও চলমান। হামাসকে সঠিকভাবে বোঝার জন্য প্রয়োজন তাদের প্রতিষ্ঠার ইতিহাস, আদর্শিক ভিত্তি, কর্মকৌশল এবং সাংগঠনিক কাঠামো সম্পর্কে নিরপেক্ষ ও তথ্যভিত্তিক ধারণা। এই লেখাটি সেই উদ্দেশ্যেই রচিত — যেখানে হামাসের উৎপত্তি থেকে শুরু করে তাদের নীতি, সনদ ও কর্মপন্থার একটি বস্তুনিষ্ঠ চিত্র তুলে ধরার চেষ্টা করা হয়েছে।হামাস প্রতিষ্ঠার তারিখ ও জায়গা
১৯৮৭ সালের ৮ ডিসেম্বর ফিলিস্তিনে একটি সড়ক দূর্ঘটনা হয়। ইজরাইলে দিনভড় পরিশ্রম করে একদল ফিলিস্তিনি শ্রমিক সন্ধায় নিজেদের বাড়ি ফিরছিলেন। হঠাৎ একটি ইজরাইলি সেনাবাহিনীর ট্রাক পেছন থেকে তাদের থেতলে দিয়ে যান। তিনজন ফিলিস্তিনি ঘটনাস্থলেই মারা যায় এবং বহু শ্রমিক আহত হয়। মূলত এই দূর্ঘটনা ছিলো ইজরাইলী বাহিনীর ফিলিস্তিনে নতুন সংকট সৃষ্টিকরার এক নীলনকশা বাস্তবায়নের শুরু। শুধু এটাই নয়, এরপরেও আরো এমন অনেক ঘটনাই ঘটেছে। ৯ ডিসেম্বরের সেই দূর্ঘটনাকে কেন্দ্র করে ফিলিস্তিনে পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়। হাজারো ফিলিস্তিন নাগরিক একটি দূর্ঘটনাকে কেন্দ্র করে রাজপথে নেমে আসেন। সে আন্দোলনে ইজরাইলি বাহিনি শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভকারীদের উপর গুলি বর্ষণ করেন। ৯ ডিসেম্বরের সেই ঘটনার পর রাতেই ইখয়ানুল মুসলিমিনের শীর্ষ ৭ নেতা গাজায় জরুরি বৈঠক করেন। এই শীর্ষ ৭ নেতা ছিলেন, শেখ আহমাদ ইয়াসিন, ড. আব্দুল আজিজ রান্তিসি, সালাহ শিহাদাহ, আব্দুল ফাত্তাহ দুখান, মুহাম্মদ শামআহ, ইবরাহিম আল ইয়াজুরি ও ইসা নাসর। এর আগের দিক সকালে তারা গাজা উপত্যকায় ইখওয়ান নিয়ন্ত্রিত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ‘ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়’র ছাত্রদের ধর্মঘটের নির্দেশনা দিয়েছিল। ৯ডিসেম্বর রাতে সেই বৈঠকে ইখওয়ানের ৯নেতা ফিলিস্তিনের ইখওয়ান শাখাকে ‘প্রতিরোধ আন্দোলন’ পরিণত করার ঐতিহাসিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন। তারা নতুন এই প্রতিরোধ আন্দোলনটির নাম দেন ;হারকাতুল মুকাওয়ামাতিল ইসলামিয়াহ’। আর ইংরেজিতে ‘দ্যা ইসলামীক রেসিসট্যান্স মুভমেন্ট’ তথা হামাস নামে। তাই আনুষ্ঠানিকভাবে এই দিনকেই হামাসের ‘প্রতিষ্ঠা দিবাস’ বলা হয়। (( হামাস; আলী আহমেদ মাবরুর; পৃষ্ঠাঃ ১৩-১৪ )) কাজেই হামাস ১৯৮৭ সালের ডিসেম্বর মাসে ফিলিস্তিনের গাজা উপত্যকায় প্রতিষ্ঠিত হয়। প্রথম ইন্তিফাদা (ফিলিস্তিনি গণজাগরণ) শুরুর পর আধ্যাত্মিক নেতা শেখ আহমাদ ইয়াসিন এটি প্রতিষ্ঠা করেন । সংগঠনটি মিশরের মুসলিম ব্রাদারহুডের একটি শাখা হিসেবে গাজায় তাদের কার্যক্রম শুরু করে।হামাস কোন দেশের সংগঠন?
হামাস হলো ফিলিস্তিনের একটি ইসলামি প্রতিরোধ আন্দোলন এবং রাজনৈতিক সংগঠন, যা মূলত গাজা উপত্যকা থেকে তাদের কার্যক্রম পরিচালনা করে। ১৯৮৭ সালে প্রতিষ্ঠিত এই সংগঠনটি ফিলিস্তিনের গাজা উপত্যকার ডি-ফ্যাক্টো (de facto) বা কার্যত শাসক। হামাসের সামরিক শাখার নাম আল-কাসসাম ব্রিগেড।হামাস এর সদর দপ্তর
হামাসের প্রধান প্রশাসনিক ও রাজনৈতিক সদর দপ্তর ঐতিহাসিকভাবে ফিলিস্তিনের গাজা সিটিতে অবস্থিত, যা ২০০৭ সাল থেকে তাদের নিয়ন্ত্রণে। তবে, এর রাজনৈতিক নেতৃত্বের একটি বড় অংশ কাতার, তুরস্কসহ বিভিন্ন আরব দেশে অবস্থান করে। ২০২৩ সালের যুদ্ধের পর গাজার প্রশাসনিক ভবনগুলো ইসরায়েলি বাহিনীর দখলে যাওয়ার দাবি করা হয়েছে। সংগঠনটি ২০১২ সাল থেকে সিরিয়ার দামেস্ক থেকে তাদের রাজনৈতিক সদর দপ্তর কাতারের দোহায় স্থানান্তর করেছিল, তবে বর্তমান যুদ্ধের পরিস্থিতিতে এর কার্যকারিতা ও অবস্থান পরিবর্তনশীল।হামাসের কর্মকৌশল
শেখ আহমেদ ইয়াসিন বলেন,আমি পুরোবিশ্বকে একটা কথা জোর গলায় জানিয়ে দিতে চাই। ইহুদিরাষ্ট্র হওয়ায় আমরা ইজরাইলিদের সাথে যুদ্ধ করছি - ব্যপারটি এমন নয়। আমরা তাদের সাথে যুদ্ধ করছি কেননা, ওরা আমাদের ওপর আক্রমণ চালিয়েছে। আমাদের হত্যা করেছে, মাটি দখল এবং ঘরবাড়ি কেড়ে নিয়েছে। এখন আমরা শুধু আমাদের হারানো অধিকারটুকুই ফেরত চাই, আর কিছুই নয়। আর এই অধিকার ফিরে পেতেই আমরা এখনও যুদ্ধ করে যাচ্ছি। (( হামাস; আলী আহমেদ মাবরুর; পৃষ্ঠাঃ ৯৪ ))হামাসের কর্মকৌশল মূলত চারটি মূলনীতির উপর প্রতিষ্ঠিত। যেমন;
- ১. আমাদের জন্মভূমিটি অন্যায়ভাবে দখলদাররা কবজা করেছে, কিন্তু আমরা এই মাটির এক ইঞ্চিও ছাড়া দেবো না।
- ২. আমাদের শত্রু অথা ইহুদিদের পক্ষে ক্ষমতাধরদের প্রত্যক্ষ মদদ রয়েছে, যা এই মুক্তিসংগ্রামে খুবই স্পষ্ট। এই অন্যায্য সহযোগিতা ক্ষমতার ভারসাম্যহীনতা সৃষ্টি করেছে।
- ৩. আমাদের শত্রুরা যেভাবে রণসজ্জায় সজ্জিত, আমরা সেভাবে অস্ত্রের প্রয়োগে বিশ্বাস করি না। তবে আমাদের বুকে আছে দৃঢ় বিশ্বাস, যা আমাদের অভ্যন্তরে একধরণের সংকল্প তৈরি করে। আর তা হলো লক্ষ্য পূরণ না হওয়া পর্যন্ত আমরা পরাজয় স্বীকার করব না এবং নিজেদের অবস্থান থেকে পিছু হটব না। আর এই বিশ্বাস আমাদের ধর্ম, যা জন্মভূমির প্রয়জনে জীবন উৎসর্গ করার সাহস যোগায়।
- ৪. গোটা আরব ও মুসলিম উম্মাহ প্রকৃতার্থে দুর্বল, ক্ষীণকায় ও বিভক্ত। তাই তারা ফিলিস্তিনি জনগণের পাশে এক হয়ে দাঁড়াতে পারছে না। অন্যদিকে আন্তর্জাতিক সম্প্রাদয়ও ফিলিস্তিনি জনগণের আবেগ-অনুভূতির প্রতি শত্রুভাবাপন্ন। তারা ইহুদিদের নগ্নভাবে সমর্থন ও সাহায্য করেই যাচ্ছে। এর পরিপ্রেক্ষিতে হামাসের কার্যক্রমের দুটি লক্ষ্য রয়েছে-
- ১. দখলদারদের প্রতিরোধ এবং ইহুদিদের আগ্রাসনকে মোকাবিল করা।
- ২. ফিলিস্তিনি জনগণের মধ্যে সংহতি রক্ষা এবং সব ধরণের অভ্যন্তরীণ বিভাজন থেকে ফিলিস্তিনের মানুষকে হেফাজত করা। কেননা, বিভক্তি-বিভাজন সব সময়ই প্রতিরোধ আন্দোলনকে দুর্বল করে। (( হামাস; আলী আহমেদ মাবরুর; পৃষ্ঠাঃ ৯৫ ))
২০১৭ সালের ১ মে কাতারের দোহায় এক সংবাদ সম্মেলনে হামাসের তৎকালীন রাজনৈতিক প্রধান খালেদ মাশাল নতুন এই সনদটি জনসমক্ষে তুলে ধরেন। এর কিছুদিন পরেই ইসমাইল হানিয়া তার স্থলে নেতৃত্বের দায়িত্ব গ্রহণ করেন।
খালেদ মাশাল তার বক্তব্যে বলেন, হামাস চরমপন্থা ও অতিরিক্ত নমনীয়তার মাঝখানে একটি ভারসাম্যপূর্ণ পথে চলে। ১৯৮৮ সালের পুরনো সনদটি যেখানে ধর্মীয় আবেগ ও অবাস্তব আদর্শে ভরপুর ছিল, সেখানে নতুন দলিলটি লেখা হয়েছে অনেক সহজ ও বাস্তবমুখী রাজনৈতিক ভাষায়। একটি প্রস্তাবনাসহ মোট ৪২টি অনুচ্ছেদে আরব-ইসরায়েল সংঘাতের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে সংগঠনের দৃষ্টিভঙ্গি স্পষ্ট করা হয়েছে।
পুরনো সনদে সংঘাতকে ধর্মীয় দৃষ্টিকোণ থেকে উপস্থাপন করা হলেও, নতুন দলিলে স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে এই লড়াই ইহুদি ধর্মের বিরুদ্ধে নয়, বরং জায়নবাদী রাজনৈতিক প্রকল্পের বিরুদ্ধে। তবে পুরনো সনদ আনুষ্ঠানিকভাবে বাতিল ঘোষণা করা হয়নি। হামাস নেতারা বলেছেন, পুরনো সনদটি সংগঠনের ইতিহাসের একটি অধ্যায় হয়ে থাকবে। মাশালের ভাষ্য অনুযায়ী, সংগঠনটি কোনো অনড় মতাদর্শিক দল নয় এবং সময়ের সাথে তাদের চিন্তাভাবনা পরিবর্তিত হয়েছে।