মুসলিমরা তওবা করলে কি সব অপরাধই ক্ষমা হয়ে যায়?

মুসলিমরা তওবা করলে কি সব অপরাধই ক্ষমা হয়ে যায়?

মুসলিমরা তওবা করলে কি সব অপরাধই ক্ষমা হয়ে যায়?

ইসলামের বিরুদ্ধে একটি বহুল প্রচলিত অভিযোগ হলো "মুসলিমরা যত অন্যায়-অপরাধই করুক না কেন, মৃত্যুর আগে শুধু তওবা করলেই আল্লাহ সব ক্ষমা করে দেন। তাহলে মুসলিমরা অপরাধ করেও শাস্তি থেকে রেহাই পেয়ে যায়। এটি কি মুসলিমদের প্রতি পক্ষপাতিত্ব নয়?"

এই প্রশ্নের উত্তর দিতে হলে প্রথমে ইসলামে আল্লাহর হক (Rights of Allah) এবং বান্দার হক (Rights of People) এই দুই ধরনের অধিকারের পার্থক্য বুঝতে হবে।

কুরআনে আল্লাহ কেন বলেন "সমস্ত গুনাহ ক্ষমা করবেন? 

অমুসলিম সমালোচকরা সাধারণত নিম্নোক্ত আয়াতগুলো উল্লেখ করেন।

নিশ্চয় আল্লাহ তাঁর সাথে শরীক করা ক্ষমা করবেন না। এটা ছাড়া অন্য সব যাকে ইচ্ছে মাফ করবেন এবং যে আল্লাহর সাথে শরীক করল, সে এক মহা অপবাদ আরোপ করল। (( সূরা আন-নিসা (An-Nisa) আয়াত ৪৮ - বাংলা অনুবাদ, তাফসীর ও তাজউইদ )) 

আরও বলেন,

বল, ‘হে আমার বান্দাগণ, যারা নিজদের উপর বাড়াবাড়ি করেছ তোমরা আল্লাহর রহমত থেকে নিরাশ হয়ো না। অবশ্যই আল্লাহ সকল পাপ ক্ষমা করে দেবেন। নিশ্চয় তিনি ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু’। (( সূরা আয-যুমার (Az-Zumar) আয়াত ৫৩ - বাংলা অনুবাদ, তাফসীর ও তাজউইদ )) 

এবং,

তবে যে তাওবা করে, ঈমান আনে এবং সৎকর্ম করে। পরিণামে আল্লাহ তাদের পাপগুলোকে পূণ্য দ্বারা পরিবর্তন করে দেবেন। আল্লাহ অতীব ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু। (( সূরা আল-ফুরকান (Al-Furqan) আয়াত ৭০ - বাংলা অনুবাদ, তাফসীর ও তাজউইদ ))

তাহলে কি সত্যিই যে কোনো অপরাধ করলেই তওবার মাধ্যমে সব শেষ? এর উত্তর হলো, না।

ইসলামে দুই ধরনের হক

ইসলামী শরীয়তে গুনাহ মূলত দুই ধরনের অধিকারের সাথে সম্পর্কিত।

১. আল্লাহর হক (حقوق الله)। যেসব গুনাহ সরাসরি আল্লাহর সাথে সম্পর্কিত।

যেমন,

  • নামাজ ত্যাগ করা

  • রোযা না রাখা

  • মদ পান

  • শিরক

  • অন্যান্য ইবাদতসংক্রান্ত অবাধ্যতা

এসব ক্ষেত্রে যদি ব্যক্তি আন্তরিকভাবে তওবা করে, অনুতপ্ত হয় এবং পুনরায় সেই পাপে না ফেরার দৃঢ় সংকল্প করে, তাহলে আল্লাহ চাইলে তাকে ক্ষমা করে দিতে পারেন।

২. বান্দার হক (حقوق العباد)। যেসব অপরাধ অন্য মানুষের অধিকার নষ্ট করে।

যেমন, 

  • হত্যা

  • চুরি

  • ডাকাতি

  • প্রতারণা

  • মারধর

  • অর্থ আত্মসাৎ

  • মানুষের সম্মান নষ্ট করা

এসব ক্ষেত্রে শুধু "আল্লাহ, আমাকে ক্ষমা করুন" বললেই বিষয় শেষ হয়ে যায় না। এখানে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের অধিকারও ফিরিয়ে দিতে হবে।

শুধু তওবা করলেই কি বান্দার হক মাফ হয়?

উত্তরঃ না।

রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন,

পরিচ্ছেদঃ ৩২. ঋণ ছাড়া শহীদদের সকল গুনাহ মাফ

৪৭৩০। যাকারিয়া ইবনু ইয়াহইয়া ইবনু সালিহ মিসরী (রহঃ) ... আবদুল্লাহ ইবনু আমর ইবনু আস (রাঃ) থেকে বর্ণিত যে, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেনঃ ঋণ ছাড়া শহীদের সকল গুনাহই মাফ করে দেওয়া হবে।

হাদিসের মানঃ সহীহ। (( সহীহ মুসলিম (ইসলামিক ফাউন্ডেশন) | হাদিস: ৪৭৩০ | Sahih Muslim (Islamic foundation), Hadith No. 4730  )) 

ইমাম নববী (রহিমাহুল্লাহ) বলেন,

ঋণ বলে এখানে বান্দার সকল প্রকারের অধিকারের ব্যাপারে সতর্ক করা হয়েছে। (( নববী, শরহ মুসলিম ১৩/২৯, হা/১৮৮৫-এর ব্যাখ্যা দ্রঃ ))

অর্থাৎ একজন শহীদ যিনি ইসলামে সর্বোচ্চ মর্যাদাপ্রাপ্তদের একজন তার ক্ষেত্রেও মানুষের অধিকার স্বয়ংক্রিয়ভাবে মাফ হয় না।

কিয়ামতের দিন নেকি দিয়ে ক্ষতিপূরণ

হাদিসে এসেছে,

পরিচ্ছেদঃ ১৫. যুল্‌ম হারাম

৬৪৭৩-(৫৯/২৫৮১) কুতাইবাহ ইবনু সাঈদ ও ’আলী ইবনু হুজর (রহঃ) ..... আবু হুরাইরাহ (রাযিঃ) থেকে বর্ণিত। রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেনঃ তোমরা কি বলতে পার, অভাবী লোক কে? তারা বললেন, আমাদের মাঝে যার দিরহাম (টাকা কড়ি) ও ধন-সম্পদ নেই সে তো অভাবী লোক। তখন তিনি বললেন, আমার উম্মাতের মধ্যে সে প্রকৃত অভাবী লোক, যে ব্যক্তি কিয়ামতের দিন সালাত, সাওম ও যাকাত নিয়ে আসবে; অথচ সে এ অবস্থায় আসবে যে, সে কাউকে গালি দিয়েছে, কাউকে অপবাদ দিয়েছে, অমুকের সম্পদ ভোগ করেছে, অমুককে হত্যা করেছে ও আরেকজনকে প্রহার করেছে। এরপর সে ব্যক্তিকে তার নেক ’আমল থেকে দেয়া হবে, অমুককে নেক আমল থেকে দেয়া হবে। এরপর যদি পাওনাদারের হাক তার নেক ’আমল থেকে পূরণ করা না যায় সে ঋণের পরিবর্তে তাদের পাপের একাংশ তার প্রতি নিক্ষেপ করা হবে। এরপর তাকে জাহান্নামে নিক্ষেপ করা হবে। (ইসলামিক ফাউন্ডেশন ৬৩৪৩, ইসলামিক সেন্টার ৬৩৯৩)

হাদিসের নামঃ সহীহ। (( সহীহ মুসলিম (হাদীস একাডেমী) | হাদিস: ৬৪৭৩ [২৫৮১] | Sahih Muslim (Hadith Academy), Hadith No. 6473 [2581] )) 

এই হাদীস স্পষ্টভাবে প্রমাণ করে কেবল মুসলিম হওয়া বা তওবা করার দাবি করাই যথেষ্ট নয়; মানুষের অধিকার নষ্ট করলে তার কঠিন হিসাব হবে।

ইমাম ইবনু তাইমিয়্যাহ (রহিমাহুল্লাহ) বলেন,

মাযলূমের হক কেবলমাত্র তওবা দ্বারা পূরণ হয় না।... বরং তওবা তখনই পূর্ণতা পাবে, যখন সে যুলুমের প্রতিদান মাযলূমকে বুঝিয়ে দিবে। যদি সে দুনিয়াতে তা পূরণ না করে, তবে আখেরাতে তাকে তা পূরণ করতে হবে …(( মাজমূ‘ ফাতাওয়া ১৮/১৮৭-১৮৯ ))

ইমাম কুরতুবী (রহিমাহুল্লাহ) বলেন,

বান্দার সাথে যুলম সংশ্লিষ্ট কোনো পাপ হলে তার প্রাপ্য ব্যক্তিকে না ফিরিয়ে দেওয়া পর্যন্ত তওবা সঠিক হবে না। (( আল-জামিউ লি আহকামিল কুরআন, ১৮/১৯৯ )) 

তাহলে কুরআনের "সমস্ত গুনাহ ক্ষমা" কথার অর্থ কী?

এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় বুঝতে হবে। কুরআনে যখন বলা হয়েছে "আল্লাহ সমস্ত গুনাহ ক্ষমা করেন", তখন এর অর্থ এই নয় যে মানুষের অধিকার নষ্ট করলেও কোনো জবাবদিহি থাকবে না। বরং এর অর্থ হলো আল্লাহ তাঁর নিজের অধিকারের ব্যাপারে ক্ষমাশীল। কিন্তু অন্য মানুষের অধিকার তিনি তাদের অনুমতি ছাড়া বাতিল করেন না।কারণ ইসলামে ন্যায়বিচার (Justice) আল্লাহর অন্যতম মৌলিক গুণ। যে ব্যক্তির অধিকার লঙ্ঘিত হয়েছে, তার অধিকার আদায় না করে আল্লাহ তাকে বঞ্চিত করেন না।

মুসলিমের দোষ গোপন রাখার হাদীসের প্রকৃত অর্থ

অনেকে নিম্নোক্ত হাদীসটি দেখিয়ে দাবি করেন, ইসলাম নাকি মুসলিম অপরাধীদের অপরাধ গোপন রাখতে বলে।

পরিচ্ছেদঃ ৩. মুসলিমের দোষ-ত্রুটি গোপন রাখা

১৪২৬। সালিম (রহঃ) হতে তার বাবার সূত্রে বর্ণিত আছে, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ প্রত্যেক মুসলিম একজন অন্যজনের ভাই। সে তার উপর কোনরকম যুলুম-অত্যাচার করতে পারে না এবং শত্রুর কাছেও তাকে সমর্পণ করতে পারে না বা তাকে অসহায়ভাবে ছেড়ে দিতে পারে না। কোন লোক তার ভাইয়ের প্রয়োজন মিটানোর কাজে যে পর্যন্ত লেগে থাকে, আল্লাহ তা’আল্লাও তার প্রয়োজন মিটিয়ে দেন। কোন মুসলিম ব্যক্তির কোন অসুবিধা যে লোক অপসারণ করে দেয়, আল্লাহ তা’আলা কিয়ামত দিবসে তার অসুবিধাগুলোর মধ্য হতে একটি অসুবিধা দূর করে দিবেন। কোন মুসলিম ব্যক্তির দোষ-ত্রুটি যে লোক গোপন করে রাখে আল্লাহ তা’আলা কিয়ামত দিবসে তার দোষ-ত্রুটি গোপন করে রাখবেন।

সহীহ, সহীহাহ (৫০৪), নাসা-ঈ। (( সুনান আত তিরমিজী (তাহকীককৃত) | হাদিস: ১৪২৬ | Sunan at-Tirmidhi, Hadith No. 1426 )) 

কিন্তু এই হাদীসের অর্থ কখনোই অপরাধীকে আইনগত শাস্তি থেকে বাঁচানো নয়।

আলেমগণ ব্যাখ্যা করেছেন, এখানে উদ্দেশ্য হলো এমন ব্যক্তির ব্যক্তিগত গোপন পাপ বা ভুল, যা জনসমক্ষে প্রকাশ করলে অকারণে তার সম্মানহানি হবে এবং যা সমাজের জন্য চলমান ক্ষতির কারণ নয়। অন্যদিকে কেউ যদি হত্যা, ধর্ষণ, চুরি, ডাকাতি, দুর্নীতি বা অন্যের অধিকার লঙ্ঘনের মতো অপরাধ করে, তাহলে ইসলামে তা গোপন করা বৈধ নয়। বরং ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করা ইসলামের নির্দেশ। অতএব এই হাদীসকে অপরাধীদের রক্ষা করার দলিল হিসেবে ব্যবহার করা সম্পূর্ণ ভুল ব্যাখ্যা।

আলোচ্য হাদিসের ব্যাখ্যায় কাযি ইয়ায(র.) উল্লেখ করেছেন—

فِي هٰذَا فَضْلُ مُعَاوَنَةِ الْمُسْلِمِ لِلْمُسْلِمِ فِي كُلِّ خَيْرٍ، وَفِعْلُهِ الْمَعْرُوفَ إِلَيْهِ، وَسَتْرُهُ عَلَيْهِ. وَهٰذَا السَّتْرُ فِي غَيْرِ الْمُسْتَهْتِرِينَ، وَأَمَّا الْمُنْكَشِفُونَ الْمُسْتَهْتِرُونَ الَّذِينَ يُقَدَّمُ إِلَيْهِمْ فِي السَّتْرِ وَسُتِرُوا غَيْرَ مَرَّةٍ فَلَمْ يَرْعَوْا وَتَمَادَوْا، فَكَشْفُ أَمْرِهِمْ وَقَمْعُ شَرِّهِمْ مِمَّا يَجِبُ؛ لِأَنَّ كَثْرَةَ السَّتْرِ عَلَيْهِمْ مِنَ الْمُهَادَنَةِ عَلَى مَعَاصِي اللَّهِ تَعَالَى وَمُصَانَعَةِ أَهْلِهَا. وَهٰذَا ـ أَيْضًا ـ فِي سَتْرِ مَعْصِيَةٍ [انْقَضَتْ وَفَاتَتْ]، وَأَمَّا إِذَا عُرِفَ انْفِرَادُ رَجُلٍ بِعَمَلِ مَعْصِيَةٍ وَاجْتِمَاعُهُمْ لِذٰلِكَ فَلَيْسَ السَّتْرُ هٰهُنَا السُّكُوتَ عَلَى ذٰلِكَ وَتَرْكَهُمْ إِيَّاهَا، بَلْ يَتَعَيَّنُ عَلَى مَنْ عَرَفَ ذٰلِكَ إِذَا أَمْكَنَهُ بِتَغْيِيرِهِمْ عَنْ ذٰلِكَ كُلِّ حَالٍ وَتَغْيِيرِهِ، وَإِنْ لَمْ يَتَّفِقْ ذٰلِكَ إِلَّا بِكَشْفِهِ لِمَنْ يُعِينُهُ أَوْ لِلسُّلْطَانِ. وَأَمَّا إِيصَاءُ حَالِ مَنْ يُضْطَرُّ إِلَى كَشْفِ حَالِهِ مِنَ الشُّهُودِ وَالْأُمَنَاءِ وَالْمُحَدِّثِينَ، فَبَيَانُ حَالِهِمْ لِمَنْ يَقْبَلُ مِنْهُ ذٰلِكَ وَيَنْتَفِعُ بِهِ مِمَّا يَجِبُ عَلَى أَهْلِهِ. فَأَمَّا فِي الشَّاهِدِ فَعِنْدَ طَلَبِ ذٰلِكَ مِنْهُ لِتَجْرِيحِهِ، أَوْ إِذَا رَأَى حُكْمًا يُقْطَعُ بِشَهَادَتِهِ وَقَدْ عَلِمَ مِنْهُ مَا يُسْقِطُهَا، فَيَجِبُ رَفْعُهَا. وَأَمَّا فِي أَصْحَابِ الْحَدِيثِ وَحَمَلَةِ الْعِلْمِ الْمُقَلَّدِينَ فِيهِ، فَيَجِبُ كَشْفُ أَحْوَالِهِمُ السَّيِّئَةِ لِمَنْ عَرَفَهَا مِمَّنْ يُقَلِّدُ فِي ذٰلِكَ، وَيَلْتَفِتُ إِلَى قَوْلِهِ؛ لِئَلَّا يُغْتَرَّ بِهِمْ وَيُقَلَّدَ فِي دِينِ اللَّهِ مَنْ لَا يَجِبُ. عَلَى هٰذَا اجْتَمَعَ رَأْيُ الْأَئِمَّةِ قَدِيمًا وَحَدِيثًا، وَلَيْسَ السَّتْرُ هُنَا بِمُرَغَّبٍ فِيهِ وَلَا مُبَاحٍ. وَفِيهِ أَنَّ الْمُجَازَاةَ فِي الْآخِرَةِ قَدْ تَكُونُ مِنْ جِنْسِ الْعَمَلِ فِي الدُّنْيَا مِنْ خَيْرٍ أَوْ شَرٍّ. وَلَيْسَ فِي الْحَدِيثِ مَا يَدُلُّ عَلَى الْإِثْمِ فِي كَشْفِهِ وَرَفْعِهِ إِلَى السُّلْطَانِ، وَإِنَّمَا فِيهِ التَّرْغِيبُ عَلَى سَتْرِهِ. وَلَا خِلَافَ أَنَّ رَفْعَهُ لَهُ وَكَشْفَهُ مَعْصِيَةَ اللَّهِ مُبَاحٌ لَهُ غَيْرُ مَكْرُوهٍ وَلَا مَمْنُوعٍ، إِنْ كَانَتْ لَهُ نِيَّةٌ مِنْ أَجْلِ عِصْيَانِهِ لِلَّهِ، وَلَمْ يَقْصِدْ كَشْفَ سِتْرِهِ وَالِانْتِقَامَ مِنْهُ مُجَرَّدًا، فَهٰذَا يَكُونُ لَهُ.

অর্থঃ “এই হাদিসে একজন মুসলিমের সকল কল্যাণকর কাজে অন্য মুসলিমের সাহায্য করা, তার প্রতি সদাচরণ করা এবং তার দোষ ঢেকে রাখার ফযিলত বর্ণিত হয়েছে। তবে এই দোষ গোপন রাখা কেবল তাদের জন্য যারা অভ্যস্ত পাপাচারী বা বেপরোয়া নয়। কিন্তু যারা প্রকাশ্যে পাপাচার করে এবং বেপরোয়া, যাদেরকে ইতিপূর্বে বারবার সংশোধনের সুযোগ দেওয়া হয়েছে এবং দোষ গোপন রাখা হয়েছে কিন্তু তারা তা মানেনি বরং সীমালঙ্ঘন করে চলেছে - তাদের স্বরূপ উন্মোচন করা এবং তাদের অনিষ্ট দমন করা ওয়াজিব বা আবশ্যক।

কারণ তাদের অপরাধ ঢেকে রাখা মানে আল্লাহর অবাধ্যতায় আপস করা এবং পাপাচারীদের প্রশ্রয় দেওয়া। আবার এই দোষ গোপন রাখা সেই পাপের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য যা অতীতে ঘটে গেছে এবং শেষ হয়ে গেছে। কিন্তু যদি জানা যায় যে কোনো ব্যক্তি একাকী কোনো পাপে লিপ্ত বা একদল মানুষ পাপ করার জন্য সমবেত হয়েছে, তবে সেখানে চুপ থাকা বা তাদের ছেড়ে দেওয়া 'দোষ গোপন রাখা'র অন্তর্ভুক্ত নয়। বরং যে ব্যক্তি তা জানবে, তার ওপর আবশ্যক হলো সম্ভব হলে যেকোনো উপায়ে তাদের সেই কাজ থেকে বিরত রাখা এবং সংশোধণ করা। আর যদি তা সম্ভব না হয়, তবে তাকে এমন কারো কাছে বিষয়টি জানাতে হবে, যে তাকে সাহায্য করতে পারে, অথবা কর্তৃপক্ষকে জানাতে হবে।

সাক্ষী, আমানতদার এবং হাদিস বর্ণনাকারীদের ক্ষেত্রে যদি তাদের স্বরূপ উন্মোচন করার প্রয়োজন পড়ে, তবে যারা তাদের থেকে বর্ণনা গ্রহণ করেন বা উপকৃত হন, তাদের কাছে সত্য তুলে ধরা সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের ওপর ওয়াজিব। সাক্ষীর ক্ষেত্রেঃ যখন তার সাক্ষ্যের বিশ্বস্ততা যাচাইয়ের প্রয়োজন হয় অথবা যখন দেখা যায় যে তার সাক্ষ্যের ভিত্তিতে কোনো রায় দেওয়া হচ্ছে অথচ সাক্ষী নিজেই অযোগ্য বা মিথ্যাবাদী, তখন তা প্রকাশ করা ওয়াজিব।

হাদিস বর্ণনাকারী ও আলেমদের ক্ষেত্রেঃ যাদেরকে মানুষ অনুসরণ করে, তাদের মধ্যকার কোনো মন্দ দিক যদি কারো জানা থাকে তবে যারা তাদের অনুসরণ করেন তাদের কাছে তা প্রকাশ করা ওয়াজিব। যাতে করে মানুষ প্রতারিত না হয় এবং দ্বীনের বিষয়ে অযোগ্য ব্যক্তির অনুসরণ না করে। এ বিষয়ে পূর্ববর্তী ও পরবর্তী সকল ইমাম একমত হয়েছেন।

এখানে দোষ গোপন রাখা পছন্দনীয় তো নয়ই, বরং জায়েজও নয়। এই হাদিস থেকে আরও জানা যায় যে, আখিরাতের প্রতিদান বা শাস্তি দুনিয়ার আমলের অনুরূপ হয়ে থাকে, সেটা ভালো বা মন্দ যাই হোক। হাদিসে অপরাধীর স্বরূপ উন্মোচন করা বা প্রশাসনের কাছে পৌঁছে দেওয়াকে পাপ বলা হয়নি, বরং গোপন রাখার ফযিলত বা উৎসাহ দেওয়া হয়েছে। এতে কোনো দ্বিমত নেই যে, আল্লাহর অবাধ্যতা বা পাপের বিষয় প্রশাসনের কাছে তুলে ধরা বৈধ, মাকরূহ বা নিষিদ্ধ নয়; যদি উদ্দেশ্য হয় আল্লাহর অবাধ্যতা রোধ করা এবং ব্যক্তিগত প্রতিহিংসা বা কেবল কাউকে অপদস্থ করা উদ্দেশ্য না হয়।” (( ইকমালুল মু'লিমি বি ফাওয়াইদি মুসলিম - কাযি ইয়ায, খণ্ড ৮, পৃষ্ঠা ৪৯ ج8 - ص49 - كتاب إكمال المعلم بفوائد مسلم - باب تحريم الظلم - المكتبة الشاملة )) অনুবাদঃ মুশফিকুর রহমান মিনার।

ইসলাম অনুযায়ী জুলুমকে সমর্থন নয়, বরং প্রতিহত করতে হবে

হাদিসে এসেছে,

পরিচ্ছেদঃ ৮৯/৮. যখন কোন লোক তার সঙ্গীর ব্যাপারে নিহত হওয়া বা তদ্রূপ কিছুর আশঙ্কা করে তখন (তার কল্যাণে) কসম করা যে, সে তার ভাই।

৬৯৫২. আনাস (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ তোমার ভাইকে সাহায্য কর। সে জালিম হোক অথবা মজলুম হোক। এক লোক বলল, হে আল্লাহর রাসূল! মজলুম হলে তাকে সাহায্য করব তা তো বুঝলাম। কিন্তু জালিম হলে তাকে কিভাবে সাহায্য করব? তিনি বললেনঃ তাকে অত্যাচার থেকে বিরত রাখবে। আর এটাই হল তার সাহায্য। [২৪৪৩] (আধুনিক প্রকাশনী- ৬৪৬৯, ইসলামিক ফাউন্ডেশন- ৬৪৮২)

হাদিসের মানঃ সহীহ। (( সহীহ বুখারী (তাওহীদ পাবঃ) | হাদিস: ৬৯৫২ | Sahih al-Bukhari, Hadith No. 6952 ))

অর্থাৎ ইসলাম জালিমকে তার জুলুমে সহযোগিতা করতে বলে না। বরং তাকে অন্যায় থেকে ফিরিয়ে আনাকেই প্রকৃত সাহায্য হিসেবে ঘোষণা করেছে। কারণ জুলুম চালিয়ে যেতে দেওয়া জালিমেরও ক্ষতি এবং মজলুমেরও ক্ষতি।

হাদিসে আরো এসেছে,

পরিচ্ছেদঃ ২০. মন্দ কাজ থেকে নিষেধ করা ঈমানের অঙ্গ। ঈমান হ্রাস ও বৃদ্ধি হয়। ভাল কাজের আদেশ করা ও মন্দ কাজের নিষেধ করা ওয়াজিব।

৮১-(৭৮/৪৯) আবূ বকর ইবনু আবূ শাইবাহ্ (রহঃ) ..... তারিক ইবনু শিহাব (আবূ বকর ইবনু আবী শাইবার হাদীসে) বলেনঃ মারওয়ান ঈদের দিন সালাতের পূর্বে খুতবাহ দেয়ার (বিদ’আতী) প্রথা প্রচলন করে। এ সময় এক ব্যক্তি দাঁড়িয়ে বললো, খুতবার আগে সালাত" (সম্পন্ন করুন)। মারওয়ান বললেন, এখন থেকে সে নিয়ম পরিত্যাগ করা হল। সাথে সাথে আবূ সাঈদ আল খুদরী (রাযিঃ) ওঠে বললেন, ঐ ব্যক্তি তার কর্তব্য পালন করেছে। আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কে বলতে শুনেছি, তোমাদের কেউ গৰ্হিত কাজ হতে দেখলে সে যেন স্বহস্তে (শক্তি প্রয়োগে) পরিবর্তন করে দেয়, যদি তার সে ক্ষমতা না থাকে, তবে মুখ (বাক্য) দ্বারা এর পরিবর্তন করবে। আর যদি সে সাধ্যও না থাকে, তখন অন্তর দ্বারা করবে, তবে এটা ঈমানের দুর্বলতম পরিচায়ক। (ইসলামিক ফাউন্ডেশনঃ ৮৩, ইসলামিক সেন্টারঃ ৮৫)

হাদিসের মানঃ সহীহ। (( সহীহ মুসলিম (হাদীস একাডেমী) | হাদিস: ৮১ [৪৯] | Sahih Muslim (Hadith Academy), Hadith No. 81 [49] )) 

এই হাদীস ইসলামের একটি মৌলিক নীতি প্রতিষ্ঠা করে। সমাজে অন্যায়কে প্রশ্রয় দেওয়া, নীরবে মেনে নেওয়া বা অপরাধীকে নিরাপদ আশ্রয় দেওয়া একজন মুসলিমের কাজ নয়। বরং সামর্থ্য অনুযায়ী অন্যায় প্রতিরোধ করা ঈমানের দাবি।

তাই যে হাদীসে মুসলিমের দোষ গোপন রাখার কথা বলা হয়েছে, সেটিকে এই হাদীসগুলোর আলোকে বুঝতে হবে। এর অর্থ কখনোই এই নয় যে হত্যা, ধর্ষণ, চুরি, দুর্নীতি, প্রতারণা কিংবা মানুষের অধিকার লঙ্ঘনের মতো অপরাধ গোপন করে অপরাধীকে রক্ষা করতে হবে। বরং এসব ক্ষেত্রে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করা, জালিমকে তার জুলুম থেকে বিরত রাখা এবং মজলুমের অধিকার ফিরিয়ে দেওয়াই ইসলামের নির্দেশ।

অতএব কোনো ব্যক্তি যদি সমাজে প্রকাশ্যে অন্যায় করে, মানুষের অধিকার লঙ্ঘন করে কিংবা তার অপরাধের ফলে অন্যদের ক্ষতি হতে থাকে, তাহলে তার অপরাধ গোপন রাখা ইসলামের শিক্ষা নয়। বরং পরিস্থিতি অনুযায়ী তাকে বাধা দেওয়া, আইন ও ন্যায়বিচারের আওতায় আনা এবং মানুষের অধিকার রক্ষা করাই ইসলামের প্রকৃত শিক্ষা।

তাহলে কি এখানে কুরআনের মধ্যে পরস্পরবিরোধিতা রয়েছে?

কিছু সমালোচক দাবি করেন, কুরআনে এক জায়গায় বলা হয়েছে, "আল্লাহ সমস্ত গুনাহ ক্ষমা করেন" (সূরা যুমার ৩৯:৫৩), আবার অন্যদিকে হাদীস ও ইসলামি আকীদায় বলা হয়, বান্দার হক শুধু তওবা করলেই ক্ষমা হয় না; ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তির অধিকার ফিরিয়ে দিতে হবে অথবা তার ক্ষমা লাভ করতে হবে। তাদের প্রশ্ন হলো, তাহলে কি এটি পরস্পরবিরোধী বক্তব্য নয়?

এই প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার আগে আমাদের বুঝতে হবে, কোনো দুটি বক্তব্যকে কখন "কন্ট্রাডিকশন" বা প্রকৃত পরস্পরবিরোধিতা বলা হয়।

যুক্তিবিদ্যায় দুটি বক্তব্য তখনই পরস্পরবিরোধী হয়, যখন একই বিষয় সম্পর্কে, একই ব্যক্তি বা বস্তুকে নিয়ে, একই অর্থে, একই সময়ে, একই প্রেক্ষাপটে একটি বক্তব্য কোনো বিষয়কে সত্য বলে এবং অপর বক্তব্য ঠিক সেই একই বিষয়কে একই শর্তে মিথ্যা বলে। অর্থাৎ একটি বক্তব্য সত্য হলে অন্যটি অবশ্যই মিথ্যা হতে হবে এবং উভয়টি একসাথে সত্য হওয়া অসম্ভব হতে হবে। কিন্তু যদি বক্তব্য দুটির বিষয়, প্রেক্ষাপট, শর্ত বা ক্ষেত্র ভিন্ন হয়, তাহলে সেটি কন্ট্রাডিকশন নয়; বরং ভিন্ন পরিস্থিতির জন্য ভিন্ন বিধান।

একটি সহজ উদাহরণ ধরা যাক। একজন শিক্ষক বললেন, "আমি পরীক্ষায় সবাইকে পাস করিয়ে দেব।" পরে তিনি আবার বললেন, "যারা নকল করবে তাদের পাস করানো হবে না।" এখানে কোনো পরস্পরবিরোধিতা নেই। কারণ প্রথম বক্তব্যটি সাধারণ নিয়ম, আর দ্বিতীয় বক্তব্যটি একটি নির্দিষ্ট ব্যতিক্রম বা শর্ত স্পষ্ট করছে। দুটি বক্তব্য একে অপরকে বাতিল করছে না; বরং একে অপরকে ব্যাখ্যা করছে।

ঠিক একইভাবে কুরআনের আয়াতগুলোও পড়তে হবে।

যখন আল্লাহ বলেন, 

"আল্লাহ সমস্ত গুনাহ ক্ষমা করেন।" (( সূরা যুমার ৩৯:৫৩ ))

তখন তিনি তওবার দরজা যে উন্মুক্ত, সেই সুসংবাদ দিচ্ছেন। কিন্তু এর অর্থ এই নয় যে মানুষের অধিকার নষ্ট করেও কোনো জবাবদিহি থাকবে না।

অন্যদিকে রাসূলুল্লাহ ﷺ যখন বলেন যে, কিয়ামতের দিন জুলুমকারী ব্যক্তির নেকি মাযলুমদের মধ্যে বণ্টন করা হবে, অথবা আলেমগণ যখন বলেন বান্দার হক আদায় না করলে তওবা পূর্ণ হয় না, তখন তারা সম্পূর্ণ ভিন্ন একটি বিষয় ব্যাখ্যা করছেন। এখানে আলোচ্য বিষয় হলো মানুষের অধিকার, যা ইসলামে অত্যন্ত মর্যাদাপূর্ণ।

অর্থাৎ প্রথম বক্তব্য আল্লাহর নিজের অধিকারের ব্যাপারে তাঁর ক্ষমাশীলতার কথা বলছে, আর দ্বিতীয় বক্তব্য মানুষের অধিকারের ন্যায়বিচারের কথা বলছে। বিষয় দুটি এক নয়। তাই একটিকে অন্যটির বিরোধী মনে করা যুক্তিগতভাবেই ভুল।

বরং উভয় বক্তব্য একত্রে ইসলামের একটি পূর্ণাঙ্গ ন্যায়বিচারের নীতি প্রতিষ্ঠা করে। একদিকে আল্লাহ বান্দাকে তাঁর কাছে ফিরে আসার সুযোগ দেন, অন্যদিকে তিনি মাযলুমের অধিকারও সংরক্ষণ করেন। ফলে ইসলাম একই সঙ্গে রহমত ও ন্যায়বিচার উভয়কেই প্রতিষ্ঠা করেছে।

অতএব, "আল্লাহ সমস্ত গুনাহ ক্ষমা করেন" এবং "বান্দার হক আদায় না হলে শুধু তওবা যথেষ্ট নয়" এই দুটি বক্তব্যের মধ্যে কোনো পরস্পরবিরোধিতা নেই। কারণ এগুলো একই বিষয়, একই দিক এবং একই শর্ত নিয়ে কথা বলছে না। বরং একটি আল্লাহর ক্ষমার ব্যাপারে, আর অন্যটি মানুষের অধিকারের ন্যায়বিচারের ব্যাপারে। তাই যুক্তি ও ভাষাতত্ত্বের মৌলিক নীতিতেই এগুলোকে কন্ট্রাডিকশন বলা যায় না।

অতএব, "মুসলিমরা তওবা করলেই সব অপরাধ মাফ হয়ে যায়" কিংবা "ইসলাম মুসলিম অপরাধীদের রক্ষা করে" এ ধরনের অভিযোগ ইসলামের আংশিক বক্তব্যকে সম্পূর্ণ প্রেক্ষাপট থেকে বিচ্ছিন্ন করে উপস্থাপনের ফল। কুরআন ও সুন্নাহকে সমন্বিতভাবে অধ্যয়ন করলে স্পষ্ট হয় যে, ইসলাম একদিকে মানুষকে তওবার মাধ্যমে আল্লাহর রহমতের আশা করতে শেখায়, অন্যদিকে মানুষের অধিকার রক্ষা ও ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার ব্যাপারেও অত্যন্ত কঠোর।

ইসলামে আল্লাহর হক এবং বান্দার হকের মধ্যে সুস্পষ্ট পার্থক্য রয়েছে। আল্লাহ তাঁর নিজের অধিকারের ক্ষেত্রে যাকে ইচ্ছা ক্ষমা করতে পারেন, কিন্তু মানুষের অধিকার ক্ষুণ্ন হলে সেই অধিকার যথাযথভাবে আদায় না করে বা ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তির ক্ষমা লাভ না করে কেবল তওবা যথেষ্ট নয়। তাই একজন মুসলিমের প্রকৃত তওবা শুধু মুখের ক্ষমা প্রার্থনা নয়; বরং নিজের ভুল স্বীকার করা, অন্যায় থেকে ফিরে আসা, ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তির অধিকার ফিরিয়ে দেওয়া এবং ভবিষ্যতে একই অন্যায় থেকে বিরত থাকার দৃঢ় অঙ্গীকার।

একইভাবে, ইসলামে মুসলিমের দোষ গোপন রাখার শিক্ষা কখনোই অপরাধীকে আইনের ঊর্ধ্বে স্থান দেওয়ার শিক্ষা নয়। ব্যক্তিগত গোপন পাপ ও সমাজের জন্য ক্ষতিকর অপরাধ এক বিষয় নয়। যে ব্যক্তি মানুষের জানমাল, সম্মান ও অধিকার ক্ষুণ্ন করে, তাকে অন্যায় থেকে বিরত রাখা, ন্যায়বিচারের আওতায় আনা এবং মজলুমের অধিকার প্রতিষ্ঠা করা ইসলামেরই নির্দেশ। রাসূলুল্লাহ ﷺ জালিমকে জুলুম থেকে বিরত রাখাকে তার প্রকৃত সাহায্য বলেছেন এবং অন্যায় প্রতিরোধ করাকে ঈমানের অপরিহার্য দাবি হিসেবে শিক্ষা দিয়েছেন।

এছাড়াও "আল্লাহ সমস্ত গুনাহ ক্ষমা করেন" এবং "বান্দার হক আদায় না হলে শুধু তওবা যথেষ্ট নয়" এই দুটি বক্তব্যের মধ্যে কোনো পরস্পরবিরোধিতা নেই। কারণ উভয় বক্তব্য একই বিষয়, একই প্রেক্ষাপট এবং একই অধিকারের ব্যাপারে নয়। একটি আল্লাহর অসীম দয়া ও ক্ষমার ঘোষণা, অন্যটি ন্যায়বিচার এবং মানুষের অধিকার সংরক্ষণের নীতি। তাই কুরআন ও হাদীস পরস্পরের বিরোধিতা করে না; বরং একে অপরকে ব্যাখ্যা ও পরিপূর্ণ করে।

সুতরাং, ইসলামে তওবা কোনো অপরাধীর জন্য শাস্তি এড়ানোর সহজ উপায় নয়। বরং এটি আত্মশুদ্ধি, অন্যায়ের সংশোধন, মানুষের অধিকার ফিরিয়ে দেওয়া এবং আল্লাহর দিকে আন্তরিকভাবে ফিরে আসার একটি পূর্ণাঙ্গ প্রক্রিয়া। এ কারণেই ইসলাম একই সঙ্গে রহমত, ন্যায়বিচার এবং জবাবদিহিতার এক অনন্য ভারসাম্য প্রতিষ্ঠা করেছে।

Leave a Comment