সৃষ্টিকর্তার অস্তিত্ব নিয়ে কালাম কসমোলজিক্যাল আর্গুমেন্ট ; মহাবিশ্ব সৃষ্টির রহস্য, প্রকৃতি বনাম আল্লাহ! 

সৃষ্টিকর্তার অস্তিত্ব নিয়ে কালাম কসমোলজিক্যাল আর্গুমেন্ট ; মহাবিশ্ব সৃষ্টির রহস্য, প্রকৃতি বনাম আল্লাহ! 

সৃষ্টিকর্তার অস্তিত্ব নিয়ে কালাম কসমোলজিক্যাল আর্গুমেন্ট ; মহাবিশ্ব সৃষ্টির রহস্য ,প্রকৃতি বনাম আল্লাহ! 

মানুষের জীবন এবং চিন্তনের ইতিহাস মূলত একটি অন্তহীন অনুসন্ধানের গল্প। সভ্যতার ক্রমবিকাশের প্রাক্কালে মানুষ প্রকৃতির রহস্যময় অন্ধকারে অজানার সন্ধানে ছুটেছে। আদিম গুহাবাসী থেকে শুরু করে আধুনিক বৈজ্ঞানিক মানুষ, প্রতিটি যুগে মানুষের কৌতূহল তাকে নতুন জ্ঞানের সন্ধানে উদ্বুদ্ধ করেছে। এই অনুসন্ধান ছিল কখনও অস্তিত্বের রহস্য উন্মোচনের চেষ্টা, কখনও বা স্রষ্টাকে বোঝার আকুলতা। বিভিন্ন সংস্কৃতি ও সভ্যতার চিন্তাবিদরা এ বিষয়ে নানামুখী দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে কাজ করেছেন। দর্শন, বিজ্ঞান, ধর্ম প্রতিটি ক্ষেত্রেই মানুষের এই অজানার অনুসন্ধান দৃশ্যমান । তবে এ জিজ্ঞাসার মূল বিষয় দুটি: আমরা কারা এবং কেন এখানে? এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গিয়ে মানুষ বারবার স্রষ্টার অস্তিত্ব এবং তাঁর প্রকৃতি নিয়ে ভাবতে শুরু করেছে ।

স্রষ্টার ধারণা কেবল ধর্মীয় বিশ্বাসের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; এটি দার্শনিক তর্ক-বিতর্ক, বিজ্ঞানসম্মত ব্যাখ্যা এবং সাহিত্যিক রচনায়ও প্রবলভাবে প্রতিফলিত হয়েছে। স্রষ্টার অস্তিত্বের প্রশ্ন শুধু তাত্ত্বিক জিজ্ঞাসা নয়, এটি মানুষের নৈতিকতা, জীবনধারা, এবং বিশ্বের প্রতি দৃষ্টিভঙ্গিকে গভীরভাবে প্রভাবিত করে। তাই মানুষ জানতে চাই, এই মহাবিশ্বের জন্ম কোথা থেকে? এর উৎপত্তির পেছনে কি কোনো পরিপূর্ণ বুদ্ধিমান সত্তার কার্যকলাপ রয়েছে? সৃষ্টিকর্তার অস্তিত্ব কি কেবল ধারণা, নাকি তা বাস্তব? দুনিয়ার এই জীবন কি সবকিছু, নাকি মৃত্যুর পরেও আরেক জীবনের অস্তিত্ব আছে? মৃত্যু কি পরিসমাপ্তি, নাকি তার ওপারেও কোনো অসীম যাত্রার শুরু? মানব মনের এই চিরন্তন প্রশ্নগুলো যুগে যুগে কৌতূহল আর অনুসন্ধানের জন্ম দিয়েছে।

এই প্রশ্নগুলোর উত্তরের খোঁজে গড়ে উঠেছে নানা মতবাদ, বিশ্বাস এবং তত্ত্ব। এর মধ্যে অন্যতম দুটি ধারণা হলো সৃষ্টিকর্তার অস্তিত্বের পক্ষে এবং বিপক্ষে। সৃষ্টিকর্তার অস্তিত্ব নিয়ে মানব ইতিহাস জুড়ে বিতর্ক চলে আসছে, এবং এর পরিসমাপ্তি হয়তো কখনোই ঘটবে না। আস্তিক ও নাস্তিক উভয় পক্ষই তাদের অবস্থান সমর্থন করার জন্য যুক্তি, তথ্য, এবং প্রমাণ হাজির করেছে। তারা যুক্তি দিয়েছেন মহাবিশ্বের জটিলতা ও সৌন্দর্য কি কেবল দৈবক্রমে তৈরি, নাকি এর পেছনে রয়েছে একটি সুশৃঙ্খল সত্তার নিপুণ সৃজনশীলতা? এই আলোচনায় আমি সৃষ্টিকর্তার অস্তিত্বের পক্ষে একটি গুরুত্বপূর্ণ এবং বহুল আলোচিত যুক্তি তুলে ধরব যা 'কালাম কসমোলজিক্যাল আর্গুমেন্ট' নামে পরিচিত। এটি মহাবিশ্বের সূচনাকে কেন্দ্র করে সৃষ্টিকর্তার ধারণাকে প্রতিষ্ঠা করার চেষ্টা করে। মানব মনের মৌলিক প্রশ্নসমূহের রহস্য উন্মোচনের এই আলোচনায় আমরা যুক্তি ও দর্শনের আলোকে সৃষ্টিকর্তার ধারণাকে পর্যালোচনা করব, যা কেবল বুদ্ধিবৃত্তিক তর্ক নয় বরং চিরন্তন মানবিক অনুসন্ধানের এক অনন্য অংশ।

কালাম কসমোলজিক্যাল আর্গুমেন্ট

কালাম কসমোলজিক্যাল আর্গুমেন্ট (KCA) বর্তমানে ন্যাচারাল থিওলজিতে ব্যাপকভাবে আলোচিত একটি বিষয়। জগৎ বিখ্যাত মুসলিম দার্শনিক ইমাম আল-গাজালি ছাড়াও অনেক দার্শনিকগণ কালাম কসমোলজিক্যাল আর্গুমেন্টের পক্ষে কথা বলেছে। তাদের মধ্যে অন্যতম হচ্ছে, প্লেটো, এরিস্টটল, রেনে ডেকার্ট, ইবনে সিনা, সেন্ট এন্সেলম, সেন্ট থমাস একুইনাস, স্পিনোজা, লাইবনিজ সহ আরো অনেকে। মুসলিম দার্শনিক ইমাম আল-গাজালি কসমোজিক্যাল আর্গুমেন্টকে আধুনিক রূপে (The Kalam Cosmological Argument) সহজভাবেই উপস্থাপন করেছেন। গাজ্জালীর যুক্তি অনুযায়ী, অস্তিত্বের জন্য যা কিছুর শুরু আছে তার অস্তিত্বের জন্য কারণ (Cause) আছে। আমাদের এই মহাবিশ্বের অস্তিত্বের জন্য শুরু রয়েছে তাই মহাবিশ্বের অস্তিত্বের জন্য কারণ (Cause) রয়েছে। অর্থাৎ, অনস্তিত্ব থেকে অস্তিত্বে আসতে হলে তার পিছনে আবশ্যই একটা কারণ থাকতে হবে। সৃষ্ট হওয়া সবকিছুর যদি কারণ থাকে তাহলে কারণেরও কারণ আছে। তবে এই কার্য থেকে কারণ সম্পর্ক হিসেব করতে করতে আমাদের চিন্তাধারা ক্রমান্বয়ে পিছনের দিকে যেতে পারেনা। কেননা তখন “অনবস্থা দোষ”( infinite regress) দেখা দিবে। যদি “অনবস্থা দোষ”( infinite regress) দেখা যায় তাহলে কখনোই বর্তমানে আসা সম্ভব না। প্রেমিস আকারে; কালাম কসমোলজিক্যাল আর্গুমেন্ট প্রেমিসঃ  

P1: Whatever begins to exist has a cause. ( যা কিছুর অস্তিত্বের শুরু আছে তার একটি কারণ আছে।)

P2: The universe began to exist. ( মহাবিশ্বের অস্তিত্ব শুরু হয়েছিল )

C: Therefore, the universe has a cause. ( এতএব, মহাবিশ্বের একটি কারণ আছে )

আমেরিকান বিখ্যাত দার্শনিক উইলিয়াম লেন ক্রেগ প্রথমে ইমাম আল-গাজালির এই সূত্র গ্রহণ করলেও পরবর্তীতে ইমাম আল-গাজালির সূত্রের প্রথম প্রেমিসে পরিবর্তন এনে নতুন মডেলে প্রকাশ করেছেন। ক্রেগের প্রকাশিত মডেলের প্রথম প্রেমিস,

  • If the universe began to exist, the universe has a cause of its beginning.

কালাম কসমোলজির আর্গুমেন্ট সত্য হবে যদি প্রেমিস ১ এবং প্রেমিস ২ সত্য হয় এবং উপসংহার যদি প্রেমিসগুলো যৌক্তিকভাবে অনুসরণ করে। নিন্মে কালাম কসমোলজিক্যাল আর্গুমেন্টের প্রেমিসগুলোর স্বপক্ষে বৈজ্ঞানিক প্রমাণ এবং Deductive (অবরোহী) আর্গুমেন্ট দেওয়া হলো। কালাম কসলোমজিক্যাল আর্গুমেন্টের প্রথম প্রেমিস,

  • P1: Whatever begins to exist has a cause of its beginning. (অস্তিত্বের জন্য যা কিছুর শুর আছে তার শুরুর কারণ আছে।) 

P1 হচ্ছে ‘Principle of sufficient reason’ এর সংস্করণ। এটি দার্শনিক লাইবনিজ তার কসমোলজিক্যাল আর্গুমেন্টের ক্ষেত্রে ব্যবহার করেছিলো। এটি সজ্ঞাতভাবে সুস্পষ্ট যে অস্তিত্বের জন্য যা কিছুর শুরু আছে তার কারণ আছে। আমরা আমাদের চারপাশে যে-সব জিনিস দেখি যেমন, চেয়ার, টেবিল, গাছপালা, ঘরবাড়ি ইত্যাদি। এগুলো কোনো কিছুই চিরকাল অস্তিত্বে ছিল না। বরং, একটা সময়ে অনস্তিত্ব থেকে অস্তিত্বে এসেছে। এবং কোনো কারণ ছাড়াই এগুলো এমনি এমনি অস্তিত্বে চলে এসেছে এমন দাবিও যৌক্তিক নয়। তাহলে অবশ্যই অস্তিত্বের জন্য কোনো কারণ প্রয়োজন।

P1 ইন্ডাক্টিভ মেথড দিয়েও প্রমাণ করা যায়। মানব জাতির ইতিহাসে আমরা অসংখ্য জিনিসের সম্মুখীন হয়েছি। তবে আমরা কখনোই এমন কোন জিনিসের সম্মুখীন হয়নি যা কোনও কারণ ছাড়াই এমনি এমনি অস্তিত্বে এসেছে। এই পর্যবেক্ষণ থেকে আমরা ইন্ডাক্টিভ মেথডের মাধ্যমে সিদ্ধান্ত নিতে পারি যে, অস্তিত্বের জন্য যা কিছুর শুরু আছে তার শুরুর কারণ আছে। ধরুন, আপনি আপনার বন্ধুকে জিজ্ঞেস করলেন আপনার ডিপার্টমেন্টের ক্লাসরুম গুলো কে তৈরি করেছে? জবাবে আপনার বন্ধু বললো, এগুলো কেউ তৈরি করেনি, এমনি এমনি অস্তিত্বে চলে এসেছে। এমন উত্তর শুনে নিশ্চয় তাকে হেমায়েতপুর পাঠানোর ব্যবস্থা করবেন। কারণ এটা সম্ভব নয় যে কোনো কিছু এমনি এমনি অনস্তিত্ব থেকে অস্তিত্বে চলে এসেছে। বরং অস্তিত্বের জন্য সবকিছুর একটা কারণ (Cause) থাকা অনিবার্য। সুতরাং, আমরা বলতে পারি যে, কোনো কিছু এমনি এমনি অনস্তিত্ব থেকে অস্তিত্বে আসতে পারেনা।

কোনো কিছুই শূন্য থেকেও অস্তিত্বে আসতে পারে না। প্রচলিত অর্থে শূন্য বলতে বোঝায় যাবতীয় সবকিছুর অনুপস্থিতি। অর্থাৎ, পদার্থ, শক্তি, সম্ভাব্য সকল বিষয়ের অনুপস্থিতি। অথবা শূন্য মানে কোনো কারণজনিত পরিবেশের অনুপস্থিতিকেও বোঝায়। কোনো কিছুই এমনি এমনি অনস্তিত্ব থেকে অস্তিত্বে আসতে পারে না। কেননা অস্তিত্বহীন কিছু থেকে কিভাবে একটা কিছু অস্তিত্বে আসতে পারে!?  শূন্য থেকে কিছুই আসেনা। ০+০+০+=০ই হবে! কখনো ৩ হবেনা।

একটি দৃশ্যপট কল্পনা করুন। ইউনিভার্সিটিতে আপনার কোন এক বন্ধু আপনাকে বললো আমাদের ডিপার্টমেন্টের ক্লাসরুম গুলো শূন্য থেকে এমনি এমনি অস্তিত্বে চলে এসেছে। আপনার বন্ধুর এই দাবিটি নিছক বিনোদনের খোরাক যোগাবে। সুতরাং, ‘অস্তিত্বের জন্য যা কিছুর শুর আছে তার শুরুর কারণ আছে’ এই যুক্তিটি একটি বৈধ যুক্তি বলে বিবেচিত হবে।

নাস্তিকরা দাবি করতে পারে কোয়ান্টাম ভ্যাকুয়াম বা শূন্যতায় কোনো কণিকা শূন্য থেকে অস্তিত্বশীল হতে পারে। কিন্তু কোয়ান্টাম ভ্যাকুয়াম বা শূন্যতা কোনো খালি জায়গা নয়। সেখানে পদার্থের নিয়ম চলে। কোয়ান্টাম শূন্যতা হচ্ছে ক্ষণস্থায়ী শক্তির অবস্থা। আর সেই শক্তি থেকেই প্রতিনিয়ত জোড়ায় জোড়ায় তৈরি হয় কণা ও প্রতিকণা। যারা পুনরায় ধ্বংস হয়ে আবার শক্তিতে পরিণত হয়ে যায়। সুতরাং কোয়ান্টাম ভ্যাকুয়াম বা শূন্যতা মানে ভৌত কিছু। (( Physics – The Force of Empty Space (aps.org) ))

প্রথম প্রিমাইসকে (P1)কে আরও দার্শনিকভাবে প্রতিষ্ঠা করার জন্য আমরা Reductio ad Absurdum (পরোক্ষ প্রমাণ) পদ্ধতি ব্যবহার করব। এই পদ্ধতিতে আমরা সাময়িকভাবে ধরে নিই যে, কোনো কিছু কারণ ছাড়াই অস্তিত্বে আসতে পারে। এরপর সেই অনুমান থেকে কী ফলাফল আসে তা বিশ্লেষণ করি। যদি দেখা যায় যে, সেই অনুমানটি পরস্পরবিরোধী বা অযৌক্তিক সিদ্ধান্তে পৌঁছে দেয়, তাহলে মূল অনুমানটি বাতিল হয়ে যায়।

Deductive argument-1 ( Philosophical )

P1. 1.1: ধরা যাক, কোনো একটি বস্তু কোনো কারণ ছাড়াই অস্তিত্বে এসেছে।

P1. 1. 2: যদি কোনো বস্তু কোনো কারণ ছাড়াই অস্তিত্বে আসে, তাহলে হয় সেটি নিজেই নিজেকে অস্তিত্বে এনেছে, অথবা সেটি সম্পূর্ণ শূন্য থেকে অস্তিত্বে এসেছে।

P1. 1.3: কোনো বস্তু নিজেই নিজেকে অস্তিত্বে আনতে পারে না এবং সম্পূর্ণ শূন্য থেকেও কোনো কিছু অস্তিত্বে আসতে পারে না।

P1. C1: অতএব, কোনো বস্তু কারণ ছাড়াই অস্তিত্বে আসতে পারে না।

P1. C2: সুতরাং, অস্তিত্বের জন্য যা কিছুর শুরু আছে, তার অস্তিত্বের সূচনার একটি কারণ রয়েছে।

ব্যাখ্যাঃ

P1. 1.1: ধরা যাক, কোনো একটি বস্তু কোনো কারণ ছাড়াই অস্তিত্বে এসেছে।

এটি আমাদের প্রকৃত অবস্থান নয়; বরং তর্কের খাতিরে সাময়িকভাবে গ্রহণ করা একটি অনুমান (assumption)। Reductio ad Absurdum পদ্ধতির মূল উদ্দেশ্যই হলো প্রতিপক্ষের অবস্থানকে সাময়িকভাবে সত্য ধরে নিয়ে দেখানো যে, তা শেষ পর্যন্ত অযৌক্তিক বা স্ববিরোধী সিদ্ধান্তে পৌঁছে দেয়। যদি তাই হয়, তাহলে সেই অনুমানটি প্রত্যাখ্যান করতে হয়।

P1. 1.2: যদি কোনো বস্তু কোনো কারণ ছাড়াই অস্তিত্বে আসে, তাহলে হয় সেটি নিজেই নিজেকে অস্তিত্বে এনেছে, অথবা সেটি সম্পূর্ণ শূন্য থেকে অস্তিত্বে এসেছে।

কোনো কিছুর অস্তিত্বের সূচনার ক্ষেত্রে যৌক্তিকভাবে তিনটি সম্ভাবনা কল্পনা করা যায়। (১) সেটি নিজেই নিজেকে অস্তিত্বে এনেছে, (২) সেটি সম্পূর্ণ শূন্য থেকে এসেছে, অথবা (৩) সেটি কোনো বহিঃস্থ কারণের মাধ্যমে অস্তিত্বে এসেছে। কিন্তু যেহেতু আমরা এই যুক্তিতে শুরুতেই ধরে নিয়েছি যে, কোনো বহিঃস্থ কারণ নেই, তাই তৃতীয় সম্ভাবনাটি শুরুতেই বাদ পড়ে যায়। ফলে কেবল দুটি সম্ভাবনাই অবশিষ্ট থাকে। (১) স্ব-সৃষ্টি (self-creation). (২) শূন্য থেকে সৃষ্টি (creation from nothing)।

P1. 1.3: কোনো বস্তু নিজেই নিজেকে অস্তিত্বে আনতে পারে না এবং সম্পূর্ণ শূন্য থেকেও কোনো কিছু অস্তিত্বে আসতে পারে না।

প্রথমত, কোনো বস্তু যদি নিজেই নিজেকে সৃষ্টি করে, তাহলে তাকে নিজের অস্তিত্বের পূর্বেই অস্তিত্বশীল হতে হবে, যাতে সে নিজেকে সৃষ্টি করতে পারে। আবার, কোনো কিছুর অস্তিত্বে আসার জন্য তাকে অস্তিত্বে আসার পূর্বে অনস্তিত্বে থাকতে হয়। ফলে দেখা যায়, যদি কোনো বস্তু নিজেই নিজেকে অস্তিত্বে নিয়ে আসে, তাহলে সেটি একই সঙ্গে অস্তিত্বে আছে এবং অস্তিত্বে নেই। কিন্তু একই সঙ্গে কোনো বস্তু অস্তিত্বশীল এবং অনস্তিত্বশীল হতে পারে না। এটি একটি স্পষ্ট স্ববিরোধিতা (contradiction)। তাই self-creation যৌক্তিকভাবে অসম্ভব।

দ্বিতীয়ত, সম্পূর্ণ শূন্য (philosophical nothing) বলতে বোঝায় এমন একটি অবস্থা যেখানে কোনো পদার্থ, শক্তি, স্থান, কাল, ভৌত ক্ষেত্র, প্রাকৃতিক নিয়ম কিংবা কোনো কার্যকারণ ক্ষমতা কিছুই নেই। এমন অবস্থার কোনো causal power নেই। তাই শূন্য থেকে কোনো কিছুর অস্তিত্বে আসারও কোনো যৌক্তিক ভিত্তি নেই। কারণ যেখানে কিছুই নেই, সেখানে কোনো কিছু উৎপন্ন করার ক্ষমতাও নেই। তাই "শূন্য থেকে কিছু আসে" এই ধারণাটিও অযৌক্তিক।

P1.1. Conclusion: অতএব, কোনো বস্তু কারণ ছাড়াই অস্তিত্বে আসতে পারে না।

আমরা দেখলাম, যদি বলা হয় কোনো কিছু কারণ ছাড়া এসেছে, তাহলে সেটাকে দুইভাবে ব্যাখ্যা করতে হয়। হয় সেটা নিজেই নিজেকে তৈরি করেছে, নয়তো একেবারে শূন্য থেকে এসেছে। কিন্তু এই দুইটাই সম্ভব নয়। তাই শুরুতে যে ধারণা নেওয়া হয়েছিল"কোনো কিছু কারণ ছাড়া এসেছে" তা ঠিক নয়। সুতরাং, যেকোনো কিছুর যদি শুরু থাকে, তাহলে তার শুরু হওয়ার পেছনে অবশ্যই একটি কারণ থাকে।

  • P2: The universe began to exist. ( মহাবিশ্বের অস্তিত্বের জন্য শুরু আছে )

P2 অনুযায়ী অস্তিত্বের জন্য মহাবিশ্বের শুরু আছে। অধিকাংশ নাস্তিক P2 কে প্রত্যাখ্যান করার চেষ্টা করে। কারণ তারা মনে করে মহাবিশ্ব অসীম। তবে তাদের এ ধারণাটি সঠিক নয়। অস্তিত্বের জন্য মহাবিশ্বের একটা শুরু রয়েছে এমন দাবির স্বপক্ষে বৈজ্ঞানিক এবং দার্শনিক উভয় প্রকার যুক্তি নিম্নে উপস্থাপন করা হলো;

Scientific Proof: The Cosmological Evidence

মহাবিশ্বের একটি সূচনা ছিল কি না, এই প্রশ্নটি শুধু দর্শনের নয়, বরং আধুনিক কসমোলজিরও অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ গবেষণার বিষয়। গত কয়েক দশকে পর্যবেক্ষণমূলক জ্যোতির্বিজ্ঞান এবং তাত্ত্বিক পদার্থবিজ্ঞানে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতির ফলে মহাবিশ্বের উৎপত্তি সম্পর্কে আমাদের ধারণা আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় অনেক বেশি সুস্পষ্ট হয়েছে। বিভিন্ন পর্যবেক্ষণ, পরীক্ষালব্ধ তথ্য এবং গাণিতিক মডেল একত্রে ইঙ্গিত করে যে মহাবিশ্ব অনন্তকাল ধরে বিদ্যমান নয়, বরং এর একটি নির্দিষ্ট সূচনা রয়েছে।

কালাম কসমোলজিক্যাল আর্গুমেন্টের দ্বিতীয় প্রিমাইস হলো, মহাবিশ্বের অস্তিত্বের একটি সূচনা রয়েছে। বিজ্ঞান কোনো অতিপ্রাকৃত কারণকে সরাসরি প্রমাণ বা অপ্রমাণ করার চেষ্টা করে না। তবে আধুনিক কসমোলজির বিভিন্ন আবিষ্কার এবং তাত্ত্বিক ফলাফল এই প্রিমাইসের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ একটি চিত্র উপস্থাপন করে। বিগ ব্যাং তত্ত্ব, থার্মোডাইনামিক্সের দ্বিতীয় সূত্র, ইনফ্লেশনারি কসমোলজি, BGV theorem এবং Alexander Vilenkin সহ অন্যান্য কসমোলজিস্টদের গবেষণা অতীতের দিকে মহাবিশ্বের অসীম অস্তিত্বের ধারণাকে গুরুতর চ্যালেঞ্জের মুখে দাঁড় করিয়েছে। নিচে এসব বৈজ্ঞানিক প্রমাণ পর্যায়ক্রমে আলোচনা করা হবে।

বিগ ব্যাং তত্ত্ব

পৃথিবীর সবচেয়ে রহস্যময় প্রশ্নগুলোর মধ্যে অন্যতম একটি প্রশ্ন ‘কীভাবে সৃষ্টি হয়েছে এই মহাবিশ্ব’? অগণিত গ্যালাক্সি, ব্লাকহোল, নক্ষত্র, গ্রহ এ-সব কিছু আমাদের এতোটাই বিমোহিত করে তোলে যে আমরা নিজেদের অজান্তে হলেও নিজেদের প্রশ্ন করি, কিভাবে সৃষ্টি হয়েছে এই বিশাল মহাবিশ্ব?  মহাবিশ্বের উৎপত্তি নিয়ে একটি তত্ত্ব হচ্ছে ‘বিগ ব্যাং’ তত্ত্ব। বিগ ব্যাং তত্ত্ব বা বিগ ব্যাং থিওরি হলো মহাবিশ্বের উৎপত্তি সম্পর্কে একটি বৈজ্ঞানিক তত্ত্ব। এই তত্ত্ব অনুসারে আজ থেকে ১৩.৮ বিলিয়ন বছর পূর্বে মহাবিশ্বের বর্তমান ও অতীত সকল স্থান-কাল-শক্তি-পদার্থ-পদার্থের নিয়ম সবকিছুই একই সময়ে মহাবিস্ফোরণের মাধ্যমে একটি বিন্দু থেকে সৃষ্টি হয়েছে। এই সময়ে সমস্থ পদার্থ অসীম ঘনত্ব এবং তীব্র তাপ সহ একটি বিন্দুর মধ্যে সংকুচিত ছিলো যাকে সিঙ্গুলারিটি বলা হয়। পরবর্তিতে একটি মহাবিস্ফোরণের মাধ্যমে প্রসারিত হতে শুরু করে। এবং এভাবেই মহাবিশ্বের শুরু হয়েছে।

বর্তমান পদার্থবিজ্ঞান অনুযায়ী সময়ের নিখুঁত শুরুর পর্যায় হলো প্ল্যাংক যুগ। প্ল্যাঙ্ক যুগ বলতে বিগ ব্যাং এর পর 0 থেকে 10-43 সেকেন্ড সময়কে বুঝানো হয়। মহাবিশ্ব সৃষ্টির ১০−৪৩ সেকেন্ড পর পদার্থবিজ্ঞানের সূত্রগুলোর কার্যকারিতা লাভ করে। মহাবিশ্বের ইতিহাসের ন্যূনতম বোধগম্য অংশও এটি। এই মুহুর্তে কী ঘটছে তা ব্যাখ্যা করার জন্য কোনও তত্ত্ব বিজ্ঞানীদের কাছে নেই। সাধারণ আপেক্ষিকতা অনুযায়ী এই সময়ের আগে একটি মহাকর্ষীয় এককতা প্রস্তাব করে (যদিও এটি কোয়ান্টাম প্রভাবের কারণে ভেঙে যেতে পারে), এবং এটি অনুমান করা হয় যে চারটি মৌলিক শক্তি (ইলেক্ট্রোম্যাগনেটিজম, দুর্বল পারমাণবিক বল, শক্তিশালী পারমাণবিক বল এবং মাধ্যাকর্ষণ) সব একই শক্তি, এবং সম্ভবত একটি মৌলিক শক্তিতে একীভূত। (( Big Bang Timeline- The Big Bang and the Big Crunch - The Physics of the Universe )) গ্র্যান্ড ইউনিফিকেশন এপোক, 10-43 সেকেন্ড থেকে 10-36 সেকেন্ডে মাধ্যাকর্ষণ শক্তি অন্যান্য মৌলিক শক্তি (যা একীভূত ছিলো) থেকে আলাদা হয়ে যায় এবং প্রথম দিকের প্রাথমিক কণা (এবং প্রতিকণা) তৈরি হতে শুরু করে। (( Big Bang Timeline- The Big Bang and the Big Crunch - The Physics of the Universe )) প্ল্যাংকের সময়ের প্রায় ১০−৩৫ সেকেন্ড পর থেকে মূলত মহাবিশ্বের সম্প্রসারণ শুরু হয়। পদার্থ বিজ্ঞানের নিয়ম অনুসারে, যদি আমরা মহাবিস্ফোরণের এক সেকেন্ড পর মহাবিশ্বের দিকে তাকাই তাহলে আমরা ইলেকট্রন, প্রো টন, নিউট্রন এবং এন্টি ইলেকট্রন (পজিট্রন) এর সমুদ্র দেখতে পাবো যা ১০ বিলিয়ন ডিগ্রি (K) উত্তপ্ত। তারপর ধীরে ধীরে মহাবিশ্ব শীতল হয়, নিউট্রনগুলো প্রোটন এবং ইলেকট্রনগুলো ক্ষয়প্রাপ্ত হয়ে প্রোটনের সাথে মিলিত হয়ে ডিউটেরিয়াম তৈরি করে। (( The Big Bang | Science Mission Directorate (nasa.gov) )) 10-36 সেকেন্ড থেকে 10-32 সেকেন্ড এর সময়কে মুদ্রাস্ফীতি যুগ বলা হয়। কারণ এই সময়ে শক্তিশালী পারমাণবিক শক্তির পৃথকীকরণের ফলে, মহাবিশ্ব একটি অত্যন্ত দ্রুত সূচকীয় প্রসারণের মধ্য দিয়ে যায়, যা মহাজাগতিক স্ফীতি নামে পরিচিত। (( The Big Bang | Science Mission Directorate (nasa.gov) )) এভাবে বিভিন্ন পর্যায়কাল অতিক্রম করেই আমরা বর্তমান মহাবিশ্ব পেয়েছি। মহাবিশ্বের সস্প্রসারণ নীতি অনুযায়ী এটি অসীম নয়। বরং, এটি স্থানিক এবং অস্থায়ীভাবে সীমীত। (( Yujin Nagasawa (2011), The Existence of God: A philosophical Introduction. Page:103 ))

১৯২৭ সালে বিখ্যাত পদার্থবিদ ও খ্রিস্টান ধর্ম যাজক জর্জ লেমেটার  প্রস্তাব করে যে, মহাবিশ্বের সম্প্রাসারণ একটি আদি অবস্থা থেকে শুরু হয়েছিল। সেই আদি অবস্থা ছিলো একটি আদি পরমাণু বা Primeval atom. লেমেটার বলেন, যেহেতু নক্ষত্রগুলো একে অন্যের থেকে দূরে সরে যাচ্ছে, তাই অতীতের দিকে ফিরে গেলে দেখা যাবে একপর্যায়ে মহাবিশ্বের সমস্ত পদার্থ একত্রে ঘনীভূত অবস্থায় বিরাজমান ছিল। সুতরাং, মহাবিশ্ব সবসময় অস্তিত্বশীল ছিলো না। বরং একটা নির্দিষ্ট সময়ে অস্তিত্বে এসেছে মহাবিস্ফোরণের মাধ্যমে। লেমেটারের ব্যাখ্যা বিজ্ঞানমহলে তখন খুব একটা গ্রহণযোগ্যতা পায়নি। বিজ্ঞানীরা দাবী করেন যে, লেমেটার ধর্মীয় কারণের এমন ব্যখ্যা প্রধান করেছে। কেননা, লেমেটারের ব্যাখ্যা অনুযায়ী মহাবিশ্ব অস্তিত্বের জন্য একটা শুরু আছে। এবং অস্তিত্বে আসার জন্য যা যা কিছুর শুরু থাকে তা তা অস্তিত্বে আসার জন্য অবশ্যই একটা কারণ থাকাটা অনিবার্য। যা-কিনা সৃষ্টিকর্তার দিকেই ইঙ্গিত বহন করে। কারণ সিঙ্গুলারিটির আগে যেহেতু স্থান-কাল-পদার্থ-এনার্জি কিছুই ছিলোনা তাই যে Cause বা কারণ মহাবিশ্বকে অস্তিত্বে এনেছে তা হবে বস্তুজগতের বাহিরের অতিপ্রাকৃতিক কোনো বুদ্ধিমান সত্তা। মহাবিস্ফোরণের পরেই স্থান-কাল-পদার্থ-সূত্রের উদ্ভভ হয়েছে। (( Yujin Nagasawa (2011), The Existence of God: A philosophical Introduction. Page:128-149 )) সে-কারণে নাস্তিক পদার্থবিদগণ প্রবলভাবে এই তত্ত্বের বিরোধিতা করেন এবং বিকল্প হিসেবে Steady State Theory (অটল মহাবিশ্ব মডেল) দাঁড় করিয়েছিলো।

তাদের প্রস্তাবিত বক্তব্য অনুযায়ী মহাবিশ্বের কোনো শুরুও নেই, শেষও নেই। প্রায়ই সকল বিজ্ঞানী এই তত্ত্বের একমত ছিল। পরবর্তীতে হাবল টেলিস্কোফে পাওয়া মহাবিশ্বের সম্প্রসারণ, ব্যাকগ্রাউন্ড রেডিয়েশন, ইত্যাদি আবিষ্কার হলে কসমোলজির ধারণায় প্যারাডাইম শিফট নিয়ে আসে। তা হলো এই মহাবিশ্বের সূচনা রয়েছে। বিজ্ঞানী আইন্সটাইনও মহাবিশ্ব প্রসারণের ব্যাপারটি প্রথমে মানতে চাননি। কিন্তু প্রসারণের পক্ষে পর্যবেক্ষণ প্রমাণ পাওয়ার পর তিন বলেছিলেন এটি ছিল তার জীবনের সবচেয়ে বড় ভুল সিদ্ধান্ত। (( ডা.রাফান আহমেদ; হোমো স্যাপিয়েন্স; পৃঃ ২৫ )) ফ্রেড হয়েল বিবিসি রেডিওর এক অনুষ্ঠানে তাচ্ছিল্য করে এই তত্ত্বের নাম দিয়েছিলো ‘বিগ ব্যাং’। কারণ, সৃষ্টির শুরুতে এমন কোনো বিন্দু থাকলে মহাবিশ্বের শুরু কীভাবে সৃষ্টি হয়েছে তার নির্ধারণের ভার ধর্ম আর স্রষ্টার হাতে চলে যাবে। (( স্টিফেন হকিং, মাই ব্রিফ হিস্ট্রিঃ আত্মস্মৃতি (বঙ্গানুবাদ, ঢাকাঃ প্রথম প্রকাশন ২০১৯) পৃঃ৮০ )) পরবর্তীতে বিজ্ঞানী এডুইল হাবল সর্ব প্রথম লেমেটারের দাবির পক্ষে পর্যবেক্ষণমূলক প্রমাণ নিয়ে আসে। তিনি ‘রেড লাইট শিফট’ ও ‘ডপলার ইফেক্ট’ এর মাধ্যমে আবিষ্কার করেন যে, দূরবর্তী ছায়াপথ সমূহের বেগ সামগ্রিক  পর্যালোচনা করলে দেখা যায় এরা পরস্পর দূরে সরে যাচ্ছে। অর্থাৎ,মহাবিশ্ব ক্রমশই সম্প্রাসারণ হচ্ছে। বিগ ব্যাং থিওরি অনুযায়ী সমগ্র মহাবিশ্ব একটি সুপ্রাচীন তত্ত্ব বা আদি পরমাণু থেকে উৎপত্তি লাভ করেছে এবং ক্রমাগত সম্প্রসারণ হচ্ছে।

CMBR: Cosmic microwave background radiation

১৯৬৫ সালে দুই বিজ্ঞানী আর্নো পেনজিয়াস (Arno Penzias) ও রবার্ট উইলসন (Robert Wilson) একটি অদ্ভুত রেডিও সিগন্যাল শনাক্ত করেন। তারা দেখতে পান, যে দিকেই রেডিও অ্যান্টেনা ঘোরানো হোক না কেন, সব দিক থেকে একই মাত্রার দুর্বল মাইক্রোওয়েভ বিকিরণ আসছে (CMB/CMBR )। প্রথমে তারা ভাবলেন, এটি হয়তো অ্যান্টেনার গোলযোগ বা কোনো পার্থিব উৎসের কারণে হচ্ছে। কিন্তু দীর্ঘ গবেষণার পর তারা বুঝতে পারেন যে এটি মহাবিশ্বের আদিম বিকিরণ, যা বিগ ব্যাংয়ের সময় থেকে এসেছে! এই বিকিরণটি আজও মাইক্রোওয়েভ রেঞ্জে বিদ্যমান এবং এটি মহাবিশ্বের চারদিকে সমানভাবে বিস্তৃত। এর গড় তাপমাত্রা এখন ২.৭৩ কেলভিন (-২৭০.৪২°C), যা মহাবিশ্বের সম্প্রসারণের কারণে ধীরে ধীরে ঠান্ডা হয়ে গেছে। এটি সেই সময়ের অবশিষ্ট তাপমাত্রার নিদর্শন, যখন মহাবিশ্ব প্রাথমিকভাবে প্রচণ্ড উত্তপ্ত ছিল এবং ধীরে ধীরে ঠাণ্ডা হতে শুরু করে। এই বিকিরণ প্রমাণ করে যে মহাবিশ্ব একসময় খুব ঘন ও উত্তপ্ত ছিল, যা বিগ ব্যাংয়ের ভবিষ্যদ্বাণীর সাথে মিলে যায়। বিগ ব্যাং তত্ত্ব অনুসারে, প্রায় ১৩.৮ বিলিয়ন বছর আগে মহাবিশ্ব ছিল একটি অত্যন্ত উত্তপ্ত, ঘন ও প্লাজমা অবস্থায়। সেই সময় মহাবিশ্ব এতটাই গরম ছিল যে ইলেকট্রন ও প্রোটন একত্রিত হয়ে পরমাণু তৈরি করতে পারেনি।

  • মহাবিশ্ব ছিল আয়নিত প্লাজমা (ionized plasma), যেখানে ফোটন (আলোর কণা) ইলেকট্রন ও প্রোটনের সঙ্গে ক্রমাগত সংঘর্ষে লিপ্ত থাকত।
  • ফলে, সেই সময় মহাবিশ্ব অস্বচ্ছ (opaque) বা অস্বচ্ছ ছিল, কারণ ফোটনগুলো কোনো নির্দিষ্ট দিকে যেতে পারত না।

যখন মহাবিশ্বের বয়স ছিল প্রায় ৩৮০,০০০ বছর, তখন মহাবিশ্বের তাপমাত্রা প্রায় ৩০০০ কেলভিন হয়ে গিয়েছিল। এতে প্রোটন ও ইলেকট্রন একত্রিত হয়ে হাইড্রোজেন পরমাণু গঠন করে। এই পর্যায়কে "রিকম্বিনেশন (Recombination)" বলা হয়। যেহেতু পরমাণু ফোটনের সঙ্গে সহজে বিক্রিয়া করে না, তাই এই সময় ফোটনগুলো প্রথমবারের মতো মুক্তভাবে মহাবিশ্বে ছড়িয়ে পড়তে শুরু করে। এই ফোটনগুলোর ছড়িয়ে পড়ার ঘটনাকে "ডিকাপলিং (Decoupling)" বলা হয়। এই সময়ের মুক্ত হয়ে যাওয়া ফোটনগুলোরই বর্তমান রূপ মহাজাগতিক পটভূমি বিকিরণ (CMB), যা আজও আমরা মহাবিশ্বে দেখতে পাই।  এই সময়ের মুক্ত হয়ে যাওয়া ফোটনগুলোরই বর্তমান রূপ মহাজাগতিক পটভূমি বিকিরণ (CMB), যা আজও আমরা মহাবিশ্বে দেখতে পাই। CMB কেন গুরুত্বপূর্ণ? CMB সরাসরি বিগ ব্যাংয়ের প্রমাণ। এটি হল সেই আলো যা প্রায় ১৩.৮ বিলিয়ন বছর ধরে আমাদের কাছে পৌঁছাচ্ছে, যা প্রমাণ করে যে মহাবিশ্ব একসময় অত্যন্ত উত্তপ্ত ও ঘন ছিল।

  • যদি বিগ ব্যাং না ঘটত, তবে আমরা এই ব্যাকগ্রাউন্ড বিকিরণটি দেখতে পেতাম না।
  • মহাবিশ্ব যদি চিরকাল অপরিবর্তনশীল থাকত বা মহাবিশ্ব যদি চিরস্থায়ী (Steady State Theory) হতো, তাহলে CMB থাকা সম্ভব ছিল না।

কেন চিরস্থায়ী মহাবিশ্বে CMB থাকা সম্ভব ছিল না? চিরস্থায়ী মহাবিশ্ব তত্ত্ব (Steady State Theory) অনুসারে, মহাবিশ্ব চিরকাল একই রকম ছিল এবং থাকবে। এই মডেল অনুযায়ী:

  1. মহাবিশ্বের কোনো নির্দিষ্ট শুরু নেই, বরং এটি চিরন্তন এবং একই রকম ঘনত্ব বজায় রেখে প্রসারিত হচ্ছে।
  2. মহাবিশ্ব সম্প্রসারিত হলেও নতুন পদার্থ ক্রমাগত সৃষ্টি হচ্ছে, যাতে গ্যালাক্সির গড় ঘনত্ব পরিবর্তন না হয়।
  3. ফলে, মহাবিশ্ব সব সময় একই রকম দেখতে থাকবে এবং এর কোনো আদিম অবস্থা ছিল না।

CMB এর অস্তিত্ব এই তত্ত্বকে বাতিল করে দেয় কারণ চিরস্থায়ী মহাবিশ্ব তত্ত্বের পূর্বাভাস অনুসারে, যদি মহাবিশ্ব চিরকাল একই রকম থাকত, তাহলে:

  1. মহাবিশ্ব কখনো এত গরম ও ঘন ছিল না, যাতে সেই সময়ের বিকিরণ এখন পর্যন্ত টিকে থাকবে।
  2. প্রাথমিক মহাবিশ্বে কোনো একরূপ গরম অবস্থা থাকত না, যেখানে ফোটন ও পদার্থ একত্রে ছিল এবং পরে সেই ফোটনগুলো পুরো মহাবিশ্বে ছড়িয়ে পড়ত।
  3. যদি মহাবিশ্ব চিরকাল একই রকম থাকত, তাহলে চারদিকে থেকে আসা বিকিরণের একই তাপমাত্রা থাকা সম্ভব হতো না। বিজ্ঞানীরা দেখেছেন যে, মহাবিশ্বের যেকোনো দিকে তাকালেই CMB এর তাপমাত্রা প্রায় ২.৭৩ কেলভিন। (( Cosmic microwave background - Wikipedia ))

তাপমাত্রার এমন একরূপতা (isotropy) তৈরি হওয়ার জন্য প্রয়োজন ছিল একটি নির্দিষ্ট সময়কাল, যখন মহাবিশ্ব গরম ও ঘন ছিল এবং সেই সময় ফোটনগুলো একে অপরের সঙ্গে বারবার সংঘর্ষ করেছিল। কিন্তু Steady State Theory তে এমন কোনো "গরম" বা "প্রাথমিক অবস্থা" ছিল না, যেখানে বিকিরণ সারা মহাবিশ্বে সমানভাবে ছড়িয়ে পড়তে পারত। ফলে, আমরা যদি সত্যিই চিরস্থায়ী মহাবিশ্বে বাস করতাম, তাহলে CMB-এর মতো সমানভাবে বিতরণ করা বিকিরণ থাকত না কিন্তু বাস্তবে আমরা দেখছি যে CMB এর তাপমাত্রা প্রায় সব জায়গায় একরকম, যা প্রমাণ করে যে একসময় মহাবিশ্ব গরম ও ঘন ছিল এবং পরে এটি সম্প্রসারিত হয়েছে। কিন্তু CMB আবিষ্কার দেখায় যে, একসময় মহাবিশ্ব অত্যন্ত উত্তপ্ত ও ঘন ছিল, এবং সেই সময়ের বিকিরণ এখন পর্যন্ত টিকে আছে।

  • যদি মহাবিশ্বের কোনো সূচনা না থাকত, তাহলে আমরা সারা মহাবিশ্বে সমানভাবে ছড়িয়ে থাকা একটি নির্দিষ্ট বিকিরণ (CMB) দেখতে পেতাম না।
  • চিরস্থায়ী মহাবিশ্ব তত্ত্বে এই ধরনের বিকিরণের কোনো ব্যাখ্যা নেই, কারণ এটি ধরে নেয় যে মহাবিশ্ব কখনোই এত গরম ছিল না।

CMB বিশ্লেষণ করে বিজ্ঞানীরা নিশ্চিত হয়েছেন যে মহাবিশ্বের একটি নির্দিষ্ট সূচনা ছিল এবং সেটি ছিল বিগ ব্যাং। হাবল প্রসারণ (Hubble’s Expansion) এবং মহাবিশ্বের সূচনা ১৯২৯ সালে আমেরিকান জ্যোতির্বিজ্ঞানী এডউইন হাবল (Edwin Hubble) মহাবিশ্বের প্রসারণের প্রথম প্রত্যক্ষ প্রমাণ আবিষ্কার করেন। তিনি বিশ্লেষণ করে দেখেন যে, দূরবর্তী গ্যালাক্সিগুলো আমাদের কাছ থেকে দূরে সরে যাচ্ছে এবং এই সরে যাওয়ার হার গ্যালাক্সির দূরত্বের সাথে সরাসরি সমানুপাতিক। এই আবিষ্কারটি মূলত "রেডশিফট (Redshift)" নামে পরিচিত এক জ্যোতির্বৈজ্ঞানিক ঘটনাকে ভিত্তি করে গঠিত। রেডশিফট এবং ডপলার এফেক্ট হাবল তার গবেষণায় দেখেন যে, দূরবর্তী গ্যালাক্সির আলো লাল দিকে (red end of the spectrum) সরছে। এর অর্থ, গ্যালাক্সিগুলো দূরে সরে যাচ্ছে। এই ঘটনা ব্যাখ্যা করতে বিজ্ঞানীরা ডপলার এফেক্ট (Doppler Effect) ব্যবহার করেন। ডপলার এফেক্ট কী? উৎস এবং পর্যবেক্ষকের মধ্যকার আপেক্ষিক গতির কারণে কোন তরঙ্গ-সংকেতের কম্পাঙ্ক পরিবর্তিত হয়ে যাওয়ার ঘটনাকে ডপলার ক্রিয়া (Doppler Effect) বলা হয়। যখন কোনো তরঙ্গ উৎস আমাদের থেকে দূরে সরে যায়, তখন তার তরঙ্গদৈর্ঘ্য দীর্ঘতর হয়। ফলে, শব্দের ক্ষেত্রে এটি কম কম্পাঙ্কের হয়ে পড়ে এবং আলো হলে এটি লাল বর্ণের দিকে সরে যায়।

  • ট্রেন যখন আমাদের দিকে আসে, তখন এর হুইসেলের শব্দ উচ্চতর হয় (কম্পাঙ্ক বেশি)
  • ট্রেন যখন দূরে চলে যায়, তখন হুইসেলের শব্দ নিচু শোনায় (কম্পাঙ্ক কম)
  • আপনি ওয়াইফাই রাউটারের যত কাছে থাকবেন তত বেশি ফ্রিকোয়েন্সি গ্রহণ করতে পারবেন।
  • অ্যাম্বুলেন্স রাস্তায় হর্ন বাজিয়ে আপনার যতই কাছে আসবে ততই কম্পাঙ্ক বেশি হবে।

অর্থাৎ, উৎস কাছে আসলে কম্পাঙ্ক বাড়ে। এবং উৎস দূরে গেলে কম্পাঙ্ক কমে। ডপলার ইফেক্ট অনুযায়ী উৎস যখন শ্রোতা থেকে দূরে সরে যাবে তা রক্তিম আলো অপসারণ করবে আর যখন শ্রোতার দিকে চলে আসবে তখন নীল আলো অপসারণ করবে। হাবল টেলিস্কোপের মাধ্যমে গ্যালাক্সিগুলোর বর্ণ পরীক্ষা করতে গিয়ে লক্ষ্য করেন, গ্যালাক্সিগুলো নীল আলো অপসারণ না করে লাল আলো অপসারণ করছে। যা রেড শিফট এর মাধ্যমেও তিনি ব্যাখ্যা করেছেন। অর্থাৎ, গ্যালাক্সিগুলো আমাদের থেকে দূরে সরে যাচ্ছে। Red light Shift (রেড লাইট শিফট )

রেডশিফট (Redshift) হলো এমন একটি মহাকাশীয় ঘটনা, যেখানে কোনো আলোক উৎস (যেমন গ্যালাক্সি বা নক্ষত্র) আমাদের থেকে দূরে সরে গেলে তার আলো দীর্ঘতর তরঙ্গদৈর্ঘ্যে (লাল রঙের দিকে) স্থানান্তরিত হয়। যখন কোনো বস্তু আমাদের থেকে দূরে সরে যায় তখন বস্তুর আলোকে রেড শিফট বলা হয়। সূর্যের বর্ণালিতে দৃশ্যমান আলোর পরিসীমা রয়েছে। সেখানে লাল আলোর তরঙ্গ দৈর্ঘ্য ৭০০ ন্যানো মিটার। এবং নীল আলোর তরঙ্গ দৈর্ঘ্য ৪০০ ন্যানো মিটার। লাল আলোর তরঙ্গ দৈর্ঘ্য বেশি হওয়ার কারণে আমরা বুঝতে পারি যে, যদি কোনো বস্তু থেকে লাল আলো বিকিরিত হলে সেই বস্তুটি আমাদের থেকে দূরে সরে যাচ্ছে। অর্থাৎ, কোনো গ্যলাক্সি যদি আমাদের কাছে আসতে থাকে তা হলে তা-থেকে নিঃসৃত আলোর তরঙ্গ দৈর্ঘ্য ছোট হবে। যার ফলে গ্যালাক্সি যদি আমাদের কাছে আসতে থাকে তাহলে তা থেকে নীল আলোর দেখা মিলবে। একে বলে ব্লু-শিফট।

অন্যদিকে, কোনো গ্যালাক্সি যদি আমাদের থেকে দূরে সরে যেতে থাকে তা-থেকে নিঃসৃত আলোর তরঙ্গ দৈর্ঘ্য বড় হতে থাকবে। যার ফলে, গ্যালাক্সি যদি আমাদের থেকে দূরে সরে যেতে থাকে তাহলে তা থেকে লাল আলোর দেখা মিলবে। যাকে বলে রেড-শিফট। হাবল আবিষ্কার করেন যে, যে গ্যালাক্সির দূরত্ব যত বেশি সে গ্যালাক্সি তত বেশি বেগে একে অপর থেকে দূরে সরে যাচ্ছে। যার ফলে লাল আলো নিঃসৃত হয়। যদিও হাবলের আগেই জর্জ লেমেটার এই সূত্রের চক এঁকেছিলো। (( Helge Kragh (1996), Cosmology and Controversy (Princeton University Press) Page;30 ))

সুতরাং, বিগ ব্যাং তত্ত্ব অনুযায়ী, মহাবিশ্ব ক্রমাগত সম্প্রসারিত হচ্ছে। যখন কোনো গ্যালাক্সি দূরে সরে যায়, তখন এর নির্গত আলোর তরঙ্গদৈর্ঘ্য দীর্ঘ হয় এবং এটি স্পেকট্রামের লাল অংশে সরে যায়। এর অর্থ, দূরের গ্যালাক্সিগুলোর আলো যতই দূরে যাবে, তত বেশি রেডশিফট হবে। এটি হাবল আইনের মূল ভিত্তি, যা প্রমাণ করে যে মহাবিশ্বের একটি শুরু ছিল এবং এটি ক্রমাগত প্রসারিত হচ্ছে।

দ্বিতীয় থার্মোডাইনামিক্স সূত্র এবং মহাবিশ্বের সূচনা

থার্মোডাইনামিক্সের দ্বিতীয় সূত্র (Second Law of Thermodynamics) মহাবিশ্বের শুরু থাকার পক্ষে একটি শক্তিশালী বৈজ্ঞানিক প্রমাণ। এই সূত্রটি বলে:

  • এন্ট্রপি (Entropy) সর্বদা বৃদ্ধি পায় → অর্থাৎ, কোনো সিস্টেম সময়ের সাথে আরো বিশৃঙ্খল ও এলোমেলো হয়ে যায়।
  • সামগ্রিক শক্তি অপরিবর্তিত থাকে, কিন্তু ব্যবহারযোগ্য শক্তি কমে → একসময় এমন পরিস্থিতি আসবে যখন কোনো কাজ সম্পাদনের জন্য পর্যাপ্ত শক্তি অবশিষ্ট থাকবে না।

এন্ট্রপি কী এবং এটি কীভাবে কাজ করে? এন্ট্রপি বলতে বোঝানো হয় বিশৃঙ্খলার পরিমাণ বা ব্যবহারযোগ্য শক্তি কমার হার।

  • একটি বরফখণ্ড গলে পানিতে পরিণত হলে, এর অণুগুলো বেশি বিশৃঙ্খলভাবে ছড়িয়ে পড়ে → এন্ট্রপি বৃদ্ধি পায়।
  • একটি গরম কফির কাপ ঠাণ্ডা হয়ে যায় → কারণ তাপ শক্তি এলোমেলোভাবে চারপাশে ছড়িয়ে পড়ে, ফলে বিশৃঙ্খলা বাড়ে।

এখন, মহাবিশ্বের ক্ষেত্রেও ঠিক একই নিয়ম প্রযোজ্য। সময়ের সাথে এটি আরও বিশৃঙ্খল ও এলোমেলো হচ্ছে। তাই যদি মহাবিশ্ব চিরকাল ধরে বিদ্যমান থাকতো, তাহলে— এন্ট্রপি সর্বদা বাড়তো (কারণ এটি পরিবর্তনশীল নয়), মহাবিশ্বের সব শক্তি এলোমেলোভাবে ছড়িয়ে পড়তো। তারকা, গ্যালাক্সি ও সৌরজগত থাকতো না, বরং সবকিছু "Heat Death"-এ পরিণত হতো। কিন্তু বাস্তবে আমরা এখনো শক্তি প্রবাহ দেখতে পাই তারকা, গ্যালাক্সি ও সৌরজগত দেখতে পাই। এর মানে, মহাবিশ্ব অনন্ত পুরাতন নয়, বরং এর একটি নির্দিষ্ট শুরু ছিল।

Alexander Vilenkin এর টানেলিং (Tunneling) ওয়েভ ফাংশন

Alexander Vilenkin তার 'Quantum cosmology and the initial state of the Universe' শিরোনামে প্রকাশিত গবেষণা পত্রে উল্লেখ করেন, মহাবিশ্বের সূচনা নিয়ে  দুটি ভিন্ন কসমোলজিক্যাল মডেল—টানেলিং (Tunneling) ও হার্টল-হকিং (Hartle-Hawking) ওয়েভ ফাংশন—তুলনা করে এর মাধ্যমে মহাবিশ্বের শুরু এবং শেষ সম্পর্কে একটি সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর চেষ্টা করছে। মহাবিশ্বের সূচনা নিয়ে দুটি জনপ্রিয় কোয়ান্টাম ওয়েভ ফাংশন মডেল আছে:

  1. টানেলিং ওয়েভ ফাংশন (PT):
    • এটি বলে যে মহাবিশ্ব উচ্চ শক্তির স্তর থেকে শুরু হয়েছে।
    • এই মডেল থেকে ইনফ্লেশন (inflation) স্বাভাবিকভাবে পাওয়া যায়, যা মহাবিশ্বের দ্রুত সম্প্রসারণ ব্যাখ্যা করে।
  2. হার্টল-হকিং ওয়েভ ফাংশন (PH):
    • এটি বলে যে মহাবিশ্ব শূন্য শক্তি অবস্থা (V(Φ) = 0) থেকে উৎপন্ন হয়েছে।
    • এই মডেলে ইনফ্লেশন আসবে কিনা তা নিশ্চিত না, কারণ এটি অনেক বেশি ঘনত্বের অবস্থার ওপর নির্ভরশীল।

টানেলিং মডেল (PT) অনুযায়ী, মহাবিশ্বের শুরুতে ইনফ্লেশন হওয়ার সম্ভাবনা বেশি। আর হার্টল-হকিং মডেল (PH) অনুযায়ী, মহাবিশ্ব শূন্য শক্তির স্তর থেকে এসেছে, তাই ইনফ্লেশন স্বাভাবিকভাবে আসবে না। ভিলেনকিন বলেন, Hartle-Hawking মডেল ইনফ্লেশনের জন্য উপযুক্ত নয়। কারণ, Hartle-Hawking মডেলে মহাবিশ্বের তরঙ্গ ফাংশন বলছে যে, সবচেয়ে সম্ভাব্য মহাবিশ্ব হবে একটি ছোট ও সংকুচিত মহাবিশ্ব, যা ইনফ্লেশন শুরু করার উপযুক্ত নয়। কিন্তু Vilenkin-এর "Tunneling" মডেলে, ইনফ্লেশন স্বাভাবিকভাবেই শুরু হয়, কারণ এতে মহাবিশ্বের সম্ভাব্য প্রাথমিক অবস্থা এমনভাবে নির্ধারিত হয় যাতে এটি ইনফ্লেশন উপযোগী থাকে। এই গবেষণায় বলা হয়েছে যে আমাদের মহাবিশ্ব পুরো de Sitter স্পেস থেকে আসেনি, বরং এটি সেই পরিবেশ থেকে "নিউক্লিয়েট" হয়েছে বা সেই কাঠামো থেকে এটি গঠিত হয়েছে।। De Sitter স্পেসটাইম হল এমন একটি মডেল যেখানে মহাবিশ্ব সংকুচিত হতে পারে এবং আবার প্রসারিত হতে পারে। কিন্তু গবেষণায় দেখানো হয়েছে যে আমাদের মহাবিশ্ব সংকুচিত হয়নি, বরং এটি শুধুমাত্র সম্প্রসারণ ধাপে শুরু হয়েছে। এর মানে, মহাবিশ্বের একটি নির্দিষ্ট সূচনা ছিল এবং এটি চিরন্তনভাবে পেছনে যেতে পারে না। (( Quantum cosmology and the initial state of the Universe | Phys. Rev. D ))

২০২২ সালে ভিলেনকিন "Quantum Cosmology and the Beginning of the Universe" শিরোনামে Quantum Gravity Society-জার্নালে প্রকাশ করেন। এখানে তিনি Eternal Inflation ও BGV Theorem এবং Inflation-এর শুরু নিয়ে আলোচনা করেন। Cosmic inflation হলো মহাবিশ্বের একদম শুরুতে ঘটে যাওয়া এক অত্যন্ত দ্রুত সম্প্রসারণের (expansion) পর্যায়। এটি Big Bang এর কিছু গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নের সমাধান দেয়, যেমন—কেন মহাবিশ্ব এত সমসত্ব (homogeneous) এবং isotropic? কেন মহাবিশ্বের বিভিন্ন অংশের তাপমাত্রা প্রায় সমান? Eternal inflation ধারণাটি বলে যে, যখন মহাবিশ্ব প্রসারিত হতে থাকে, তখন নির্দিষ্ট কিছু অঞ্চলে inflation থেমে যায় এবং তারা "bubble universe" তৈরি করে। কিন্তু চারপাশের স্থানকাল (spacetime) এখনও প্রসারিত হতে থাকে। এই কারণে, মহাবিশ্বের কিছু অংশে নতুন নতুন bubble universe তৈরি হতে থাকে এবং এই প্রক্রিয়া অনন্তকাল ধরে চলতে পারে। আমাদের মহাবিশ্বও একটি এমন bubble universe হতে পারে।

BGV (Borde-Guth-Vilenkin) theorem বলে যে, যদি মহাবিশ্ব গড়ে (on average) সম্প্রসারিত হয়ে থাকে, তাহলে তার অতীতে যাওয়ার সময় geodesics (অর্থাৎ কণার চলার পথ) অনন্তকাল ধরে টিকে থাকতে পারে না। যদি মহাবিশ্ব সর্বদা গড়পড়তা সম্প্রসারিত হয়ে থাকে, তাহলে আমরা সময়কে পেছনে নিয়ে গেলে একটি নির্দিষ্ট বিন্দুতে পৌঁছাব, যেখানে সময় এবং স্থান একরকম বাধাপ্রাপ্ত হবে। অর্থাৎ, এই theorem অনুযায়ী, মহাবিশ্বের সম্প্রসারণের (expansion) একটি শুরু থাকতে হবে। Geodesic হলো মহাবিশ্বের মধ্য দিয়ে মুক্তভাবে চলমান কণার পথ, যা মহাকর্ষ দ্বারা নির্ধারিত হয় (অর্থাৎ, এটি সাধারণ আপেক্ষিকতার কাঠামোয় সরাসরি কণার গতিপথ)। যদি আমরা অতীতে ফিরে যাই এবং দেখি যে এই গতি পথগুলি অসম্পূর্ণ (incomplete), তার মানে হলো—কোনো না কোনো বিন্দুতে মহাবিশ্বের শুরু হয়েছে এবং সেখানে "সময়"ও শুরু হয়েছে। সহজ ভাষায়, আপনি অতীতে অনন্তকাল ধরে যেতে পারবেন না, কারণ কোনো এক বিন্দুতে মহাবিশ্বের একটি সূচনা রয়েছে। BGV Theorem-এর ফলাফল

  • Inflation চিরন্তনভাবে ভবিষ্যতের দিকে চলতে পারে (eternal to the future), কিন্তু এটি অতীতে অনন্তকাল ধরে থাকতে পারে না।
  • মহাবিশ্বের সম্প্রসারণ যদি গড়ে (on average) চলমান থাকে, তবে এটিকে অতীতে অনন্তকাল ধরে টেনে নেওয়া যাবে না; তার একটি শুরু থাকতে হবে।
  • অর্থাৎ, মহাবিশ্বের inflationary phase-এরও একটি সূচনা রয়েছে, এবং এটি শূন্য থেকে আসেনি।

এই কারণেই অনেক বিজ্ঞানী মনে করেন যে মহাবিশ্বের শুরুর জন্য একটি কারণ থাকা দরকার, এবং এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ দার্শনিক ও বৈজ্ঞানিক প্রশ্ন তৈরি করে। (( alex-vilenken-2022.pdf ))

Audrey Mithani, Alexander Vilenkin; Did the universe have a beginning?

এ বিষয়ে উল্লেখযোগ্য একটি গবেষণাপত্র হলো "Did the Universe Have a Beginning?"। এই গবেষণাপত্রে অড্রে মিথানি এবং আলেকজান্ডার ভিলেনকিন শুরুহীন মহাবিশ্বের সম্ভাব্য কয়েকটি মডেল বিশ্লেষণ করেছেন। তারা লিখেছেন:

We discuss three candidate scenarios which seem to allow the possibility that the universe could have existed forever with no initial singularity: eternal inflation, cyclic evolution, and the emergent universe. The first two of these scenarios are geodesically incomplete to the past, and thus cannot describe a universe without a beginning. The third, although it is stable with respect to classical perturbations, can collapse quantum mechanically, and therefore cannot have an eternal past. (( [1204.4658] Did the universe have a beginning? ))

অর্থাৎ, গবেষকরা স্পষ্টভাবে দেখিয়েছেন যে eternal inflation এবং cyclic evolution মডেল দুটি “geodesically incomplete to the past”, অর্থাৎ এগুলো অতীতের দিকে অসীমভাবে প্রসারিত হতে পারে না এবং তাই শুরুহীন মহাবিশ্বকে ব্যাখ্যা করতে ব্যর্থ। আর emergent universe মডেলটি ধ্রুপদীভাবে স্থিতিশীল হলেও “can collapse quantum mechanically”, ফলে এটিও চিরন্তন অতীতবিশিষ্ট হতে পারে না। তাই তাদের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, এই তিনটি মডেলের কোনোটিই এমন একটি মহাবিশ্বকে সমর্থন করে না যার কোনো শুরু নেই।

অড্রে মিথানি এবং আলেকজান্ডার ভিলেনকিন তিনটি সম্ভাব্য ধারণা আলোচনা করেছেন, যা মনে করা হয় যে মহাবিশ্ব চিরকাল থাকতে পারে এবং তার কোনো শুরু নেই। এই তিনটি ধারণা হলো:

  1. Eternal Inflation (চিরস্থায়ী মুদ্রাস্ফীতি)
  2. Cyclic Evolution (চক্রাকার বিবর্তন)
  3. Emergent Universe (উদ্ভূত মহাবিশ্ব)

তবে লেখকেরা দেখিয়েছেন যে এই তিনটি মডেলের প্রতিটিই কোনো না কোনোভাবে ব্যর্থ হয়, এবং তাই এগুলো মহাবিশ্বের চিরন্তন অস্তিত্ব নিশ্চিত করতে পারে না। Eternal Inflation (চিরস্থায়ী মুদ্রাস্ফীতি) এই মডেল অনুযায়ী, মহাবিশ্ব চিরকাল একটি মুদ্রাস্ফীতির (inflation) স্তরে থেকে নতুন নতুন অঞ্চল তৈরি করে, যেগুলো স্বতন্ত্র মহাবিশ্বে পরিণত হয়। কিন্তু লেখকেরা দেখিয়েছেন যে এই মডেল geodesically incomplete, অর্থাৎ এটি সময়ের অতীতে সীমাহীনভাবে প্রসারিত হতে পারে না। অন্য কথায়, এই মডেলও শেষ পর্যন্ত একটি সূচনা বিন্দুর প্রয়োজন করে। Cyclic Evolution (চক্রাকার বিবর্তন) এই ধারণা অনুসারে, মহাবিশ্ব বারবার সংকুচিত (contract) হয়ে আবার বিস্তৃত (expand) হতে পারে। এই চক্র চিরকাল চলতে পারে বলেই মনে করা হয়। তবে গবেষকরা দেখিয়েছেন যে, এই মডেলে Hav > 0 (গড় সম্প্রসারণ হার ধনাত্মক), যা নির্দেশ করে যে এটি past-geodesically incomplete, অর্থাৎ অতীতের দিকে এটি অনির্দিষ্টভাবে চলতে পারে না, এবং তাই এরও একটি সূচনা থাকতে হবে। Emergent Universe (উদ্ভূত মহাবিশ্ব) এই মডেলে বলা হয় যে মহাবিশ্ব একটি স্থিতিশীল অবস্থা থেকে শুরু হয়েছে এবং পরে এটি সম্প্রসারিত হয়েছে। কিন্তু লেখকেরা দেখিয়েছেন যে, কোয়ান্টাম পর্যায়ে এই মডেল collapse হয়ে যায়, যার ফলে এটি চিরস্থায়ী থাকতে পারে না।(( [PDF] Did the Universe have a beginning? | Semantic Scholar ))

Deductive argument-2 ( Philosophical )

প্রকৃত অসীমের অসম্ভবতার ( প্রকৃত অসীম বাস্তবে এক্সিস্ট করে না ) উপর ভিত্তি করে এই আর্গুমেন্টটি গড়ে উঠেছে। প্রেমিস আকারে,

P2. 1.1: An actual infinite cannot exist. (প্রকৃত অসীম বাস্তবে থাকতে পারে না।)

P2. 1.2: An infinite temporal regress of events is an actual infinite. (কোনো ঘটনার জন্য অসীম টেম্পোরাল রিগ্রেস হলে তা প্রকৃত অসীমকে প্রতিনিধিত্ব করে)

P2. 1.3: Therefore, an infinite temporal regress cannot exist. (সুতরাং, অসীম টেম্পোরাল রিগ্রেস থাকতে পারে না।)

P2. 1.4: Therefore, The Univers began to exist. (সুতরাং মহাবিশ্বের অস্তিত্বের জন্য শুরু রয়েছে)

ব্যাখ্যা;

  • P2. 1.1: An actual infinite cannot exist. (প্রকৃত অসীম বাস্তবে থাকতে পারে না।)

এই প্রেমিস অনুযায়ী প্রকৃত অসীম বাস্তবে থাকতে পারে না। অসীম বলতে, সীমাহীন, অন্তহীন বা যে কোনো সংখ্যার চেয়ে বড় কিছুকে বুঝায়। ফিলোসফিতে দুই ধরণের অসীম পাওয়া যায়। ১. সম্ভাব্য অসীম (Potential Infinity). ২. প্রকৃত অসীম (Actual Infinity). সম্ভাব্য অসীম সম্ভাব্য অসীম (Potential Infinity) বলতে বুঝায়, যা শেষ না করেই চলতে থাকে। অর্থাৎ, ভবিষ্যৎ এর দিকে চলতেই থাকবেই। কখনোই শেষ হবেনা।

উদাহরণস্বরূপ, ভবিষ্যতে অসীম সংখ্যক দিন রয়েছে। কিন্তু অসীম যদি নাই থাকে তাহলে আমরা কেন বলি অসীম সংখ্যক দিন? কারণ, আমরা চাইলে একটা দিনের পর আরেকটা দিন যোগ করতে পারি। এভাবে হয়ত এক হাজার, দুই হাজার বা লক্ষ-কোটি দিন পর্যন্ত যোগ করতে পারবো। কিন্তু একটা পর্যায়ে গিয়ে আমরা আর গণনা করতে পারবো না বিধায় বলি অসীম সংখ্যক দিন। কিন্তু তা আসলে প্রকৃত অসীম না। আমরা গণনা করতে শেষ করতে পারবো না বিধায় বলি অসীম।

প্রকৃত অসীম প্রকৃত অসীম (Actual Infinity) বা প্রকৃত অসীম বলতে বুঝায়, যার শুরু কি-বা শেষ নেই। মনে করুন আপনার কাছে অসীম সংখ্যক বল রয়েছে। এটার মানে এই না যে আপনার কাছে অনেক অনেক বল আছে, বরং আপনার কাছে অসীম বল রয়েছে। কোনো ধরনের অসীম বাস্তবে থাকতে পারে না। প্রমাণ হিসেবে এখানে আমরা ল-অফ ভায়োলেশন যুক্তি ব্যবহার করতে পারি। ইনফিনিটি বা প্রকৃত অসীম ল-অফ ভায়োলেশন ধারণ করে এটা প্রমাণ করার জন্য আমরা Hilbert’s Infinite Grand Hotel Paradox কে ব্যবহার করতে পারি।

Hilbert's infinite grand hotel paradox

আপনাকে যদি প্রশ্ন করা হয়, ১ থেকে ৫ এর মধ্যে কয়টি সংখ্যা রয়েছে? সাবলীল ভাবেই আপনি উত্তর দিবেন ৫টি। কিন্তু যদি বলি আপনার উত্তর ভুল, তখন আপনার প্রতিক্রিয়া কেমন হবে? আসলেই আপনার উত্তর পুরোপুরি সঠিক নয়। কারণ সংখ্যা রেখার দিকে তাকালে দেখবেন এই ১ থেকে ৫ এর মাঝে আরো অগণিত সংখ্যা রয়েছে, যা আপনি গুণে শেষ করতে পারবেন না। এই অসীমত্বকে কাজে লাগিয়ে জার্মান গণিতবিদ ডেভিড হিলবার্ট একটি প্যারাডক্স তৈরি করেন যা, Hilbert’s Infinite Grand Hotel Paradox নামে পরিচিত।

গিনেস ওয়ার্ল্ড রেকর্ড ২০০৮ এর তথ্যমতে, কক্ষের উপর ভিত্তি করে পৃথিবীর সবচেয়ে বড় হোটেল হলো মালয়েশিয়ার ‘ফার্স্ট ওয়ার্ল্ড হোটেল’। মালয়েশিয়ার লাস ভেগাস নামে পরিচিত এই হোটেলটির কক্ষ সংখ্যা ৬,১১৮টি। ধরুন, হোটেলের প্রতিটি কক্ষে ১জন করে গেস্ট থাকতে পারে। এর মানে যদি হোটেলের ৬,১১৮টি কক্ষ গেস্ট দ্বারা পূর্ণ থাকে, তাহলে হোটেলে ম্যানেজার চাইলে নতুন কোনো গেস্টকে চেক ইন করতে পারবেনা; যদিনা কোনো গেস্ট চেক আউট করে ৬,১১৭ বা তার চেয়ে কম হয়। কিন্তু হিলবার্ট হোটেল পুরোপুরি আলাদা। এটি মালয়েশিয়ার ফার্স্ট ওয়ার্ল্ড হোটেল বা মালয়েশিয়ার লাস ভেগাস নামে পরিচিত হোটেলটির চাইতে অসীমভাবে বড়। বিষয়টি এমন নয় যে এটি অনেক অনেক বড় অথবা এখানে ১হাজার, ১মিলিয়ন, ১ট্রিলিয়ন রুম রয়েছে। বরং এটি অসীমভাবে বড় এবং এখানে অসীম সংখ্যক রুম রয়েছে।

একদিন হোটেলে নতুন একজন গেস্ট এসে হোটেল ম্যানেজারকে বললো তার একটা রুমের প্রয়োজন। এমতো অবস্থায় আপনি হলে কি করতেন? নিশ্চয় নতুন আসা গেস্টকে হোটেলে রুম খালি নেই বলে বিদায় করে দিতেন! কিন্তু হিলবার্ট হোটেলের ম্যানেজার ছিল একজন গণিতবিদ। তিনি চিন্তা করলেন, রুম-১ এর গেস্টকে রুম-২এ শিফট করলে, রুম-২এর গেস্টকে রুম-৩এ শিফট করলে, এভাবে nতম রুমের গেস্টকে n+1তম রুমে শিফট করলে এবং এই প্রক্রিয়া অসীম সংখ্যকবার চলতে থাকলে একটি রুম ফাঁকা হয়ে যাবে। কারণ হিলবার্ট হোটেলের রুম সংখ্যা যেহেতু অসীম সেহেতু গেস্টদের এই মুভমেন্টও অসীম সংখ্যকবার চলতে থাকবে। এভাবে হোটেল ম্যানেজার নতুন আসা গেস্টকে চেক-ইন করিয়ে নিলেন। নতুন গেস্ট চেক-ইন করার আগেও হোটেলের গেস্ট সংখ্যা ছিল অসীম। বর্তমানেও হোটেলের গেস্ট সংখ্যা হচ্ছে অসীম। কারণ, অসীমের সাথে অসীম যোগ করলেই ফলাফল অসীমই হবে।

পরদিন সকালে হোটেলে অসীম সংখ্যক অতিথি নিয়ে একটি বাস আসলো। এবং অসীম সংখ্যক অতিথির জন্যও অসীম সংখ্যক রুমের প্রয়োজন। হোটেল ম্যানেজার যেহেতু একজন তুখোড় গণিতবিদ, তাকে তো অতিথিদের জায়গা করে দিতেই হবে। তিনি চিন্তা করলেন যেকোনো সংখ্যাকে ২ দিয়ে গুণ করা হলে সবসময়ই জোড় সংখ্যা পাওয়া যাবে। তাহলে nকে যদি ২দিয়ে গুণ করা হয় তাহলে ফলাফল হবে 2n, তাহলে প্রতিটা রুমের পর্যটক তাদের রুমের সাথে ২গুণ করে যে সংখ্যাটি পাওয়া যাবে সেই রুমে শিফট করলে অসীম সংখ্যক রুম ফাঁকা হয়ে যাবে। তাই হোটেল ম্যানেজের ১নং রুমে থাকা অতিথিকে রুম-২এ, ২নং রুমে থাকা অতিথিকে রুম-৪এ, ৩নং রুমে থাকা অতিথিকে রুম-৬এ, এভাবে nতম রুমের অতিথিকে 2nতম রুমে যাওয়ার নির্দেশ দিলেন। ফলে হোটেলে অসীম সংখ্যক রুম ফাঁকা হয়ে গেল। কারণ, হোটেলে রুম সংখ্যা যেহেতু অসীম, তাই হোটেলের জোড় সংখ্যক রুমও অসীম এবং বিজোড় সংখ্যক রুমও অসীম। এভাবে হোটেল ম্যানেজার নতুন আসা অসীম সংখ্যক অতিথিকে হোটেলের খালি হওয়া বিজোড় সংখ্যার রুমগুলোতে যেতে বলেন। ব্যাস, ঝামেলা শেষ!

কিন্তু এবার পরের দিন সকালে অসীম সংখ্যক বাস এবং অসীম সংখ্যক বাসের প্রত্যেকটিতে অসীম সংখ্যক যাত্রী রয়েছে। হোটেল ম্যানেজার দুশ্চিন্তায় পরে গেলেন! কীভাবে এতো অতিথিকে হোটেলে রুমের ব্যবস্থা করে দিবেন! এমন সময় হোটেল ম্যানেজারের চোখ পরলো তার টেবিলে রাখা গণিতবিদ ইউক্লিডের ছবির দিকে। ইউক্লিড প্রমাণ করেছিলেন যে, মৌলিক সংখ্যার (যে সংখ্যাকে কেবল ১ ও সেই সংখ্যা দিয়ে ভাগ করা যায় তাকে মৌলিক সংখ্যা বলে। যেমন, ১, ৩, ৫, ৭, ১১, ১৩…. অসীম সেট। তাই হোটেল ম্যানেজার চিন্তা করলেন যদি, প্রথমে অসীম সংখ্যক রুম ফাঁকা করা যায়, তাহলে সেখানে একটা বাসের অসীম সংখ্যক অতিথিকে জায়গা করে দেওয়া যাবে। এরপর আরেকবার অসীম সংখ্যক রুম ফাঁকা করে সেখানে আরেকটি বাসের অসীম সংখ্যক অতিথিদের জায়গা দেওয়া যাবে। এবং এভাবে অসীম সংখ্যকবার করে গেলে তাহলে অসীম সংখক বাসের অসীম সংখ্যক যাত্রীকে হোটেলে জায়গা করে দেওয়া যাবে। এবং এই কাজটা অসীম সংখ্যকবার করতে হবে।

তাই হোটেল ম্যানেজার বর্তমানে হোটেলে থাকা সব অতিথিদের প্রথম মৌলিক সংখ্যা ২এর ঘাত অনুযায়ী শিফট হওয়ার জন্য নির্দেশ দিলেন। অর্থাৎ, ২নং রুমের অতিথিকে 2^2=4 নং রুমে যাওয়ার নির্দেশ দিলেন। ৩নং রুমের অতিথিকে 2^3=8 নং রুমে যাওয়ার নির্দেশ দিলেন। ৪নং রুমের অতিথিকে 2^4=16 নং রুমে যাওয়ার নির্দেশ দিলেন। সুতরাং nতম রুমের অতিথি যাবেন 2^nতম রুমে। এভাবে হোটেলে অসীম সংখ্যক রুম ফাঁকা হয়ে গেল। সুতরাং, হোটেলে অবস্থানরত সব অতিথি চলে যাবে প্রথম মৌলিক বা প্রাইম নাম্বার ২এর ঘাত অনুযায়ী রুমে। তাহলে নতুন করে আসা অসীম সংখ্যক বাসের অসীম অতিথিরা কোথায় যাবে? প্রথম বাসের অতিথিদের বললেন দ্বিতীয় মৌলিক পূর্ণ সংখ্যা ৩এর ঘাত অনুযায়ী রুমে যাবে। অর্থাৎ, বাসের প্রথম সিটের অতিথি যাবে 3^1=3 নং রুমে। দ্বিতীয় সিটের অতিথি যাবে 3^2=9 নং রুমে। তৃতীয় সিটের অতিথি যাবে 3^3=27 নং রুমে। চতুর্থ সিটের অতিথি যাবে 3^4=81 নং রুমে। nতম রুমের অতিথি যাবে 3^nতম রুমে। এভাবে তিনের ঘাত আমরা অসীম সংখ্যকবার করতে পারবো। একইভাবে, ২য় বাসের অতিথিদের ৫এর ঘাত অনুযায়ী হোটেল রুমে যাওয়ার নির্দেশ দিলেন। ৩য় বাসের অতিথিদের ৭এর ঘাত, ৪র্থ বাসের অতিথিদের ১১এর ঘাত ৫নং বাসের অতিথিদের ১৩এর ঘাত অনুযায়ী হোটেল রুমে যাওয়ার নির্দেশ দিলেন……..। এভাবেই হোটেল ম্যানেজার অসীম সংখ্যক বাসের অসীম সংখ্যক অতিথিদের হোটেলে জায়গা করে দিলেন। যদিও এই অসীম সংখ্যক অতিথিকে হোটেলে জায়গা করে দেওয়ার আগেই হোটেলের অতিথি সংখ্যা ছিল অসীম।

এবার প্রথম সিচুয়েশনটি কল্পনা করুন। হোটেল ম্যানেজার অসীম সংখ্যক রুম পূর্ণ হোটেলে একজন নতুন অতিথিকে জায়গা করে দিয়েছিলো। যদি সেখান থেকে অসীম সংখ্যক অতিথিকে বিয়োগ করা হয় তাহলে ফলাফল হবে ১জন। ধরুন, অসীম সংখ্যক অতিথি হচ্ছে x। এখন নতুন ১জন অতিথি আসার পরে হোটেলের বর্তমান অতিথি সংখ্যাও অসীম। তাহলে এখন অসীম সমানও ধরুন X। তাহলে এখন যদি x থেকে x বিয়োগ করেন তাহলে ফলাফল হবে x-x= 1.

এবার দ্বিতীয় সিচুয়েশনটি কল্পনা করুন, হোটেল ম্যানেরজার অসীম বিজোড় সংখ্যক রুম ফাঁকা করে অসীম সংখ্যক অতিথিকে জায়গা করে দিয়েছিল। তার মানে তখনো হোটেলে অসীম জোড় সংখ্যক অতিথি ছিল। যদি হোটেল থেকে জোড় সংখ্যক অতিথি চেকআউট করে তাহলে কি হবে? ধরুন জোড় সংখ্যক অসীম = x এবং বিজোড় সংখ্যক অসীম = x. তাহলে, x-x=x. কারণ জোড় সংখ্যক অসীম থেকে বিজোড় সংখ্যক অসীম বাদ দেওয়ার পরেও জোড় সংখ্যক অসীম থেকেই যাচ্ছে। যদিও অসীম সংখ্যক অতিথি চেকআউট করেছে।

এবার তৃতীয় সিচুয়েশনটি কল্পনা করুন। মৌলিক সংখ্যা আছে যেহেতু অসীম সেহেতু হোটেলটি পূর্ণ অবস্থায় হোটেল ম্যানেজার অসীম সংখ্যক নতুন গেস্টকে হোটেলে জায়গা করে দিয়েছেন। সুতরাং আবারো অসীম থেকে অসীম বিয়োগ করলে ফলাফল হবে অসীম। x-x=x. এই অ্যানালজিতে দেখা যাচ্ছে যে, Identical Quantity - Identical Quantity = Different Result! কারণ, আপনি যদি দুই থেকে দুই বিয়োগ করেন তাহলে প্রতিবারই ফলাফল আসবে শূন্য। কখনোই ফলাফল শূন্য ছাড়া অন্য কিছু হবেনা। কিন্তু অসীমের ক্ষেত্রে আমরা দেখতে পাচ্ছি অসীম থেকে বিয়োগ করলে একেকবার একেক ফল আসে। অর্থাৎ, এটা সাংঘর্ষিকতা তৈরি করে এবং মেটাফিজিক্যালি নেসেসারি ট্রুথ কে ভায়োলেট করে। অসীম হোটেল পূর্ণ থাকার পরেও হোটেলে নতুন মানুষকে জায়গায় করে দেওয়া যাচ্ছে, যা পুরোপুরিই অযৌক্তিক। কেননা রুম আগে থেকেই পূর্ণ ছিল। অর্থাৎ একই সাথে একই সময়ে খালি আবার পূর্ণ যা যুক্তি বিদ্যার মৌলক নিয়মের বিরোধী। আবার আইডেন্টিক্যাল কোয়ান্টিটি বাদ দিলে আমরা ভিন্নভিন্ন ফলাফল পাচ্ছি যা সাংঘর্ষিকতা তৈরি করে।

সুতরাং, যা কিছু মেটাফিজিক্যালি নেসেসারি ট্রুথকে ভায়োলেশন করে তার অস্তিত্ব থাকা সম্ভব নয়। অসীম মেটাফিজিক্যাল নেসেসিটিকে (metaphysical necessity) ভায়োলেশন করে, তাই অসীম অস্তিত্বে থাকতে পারে না। হিলবার্ট হোটেলের এই অযৌক্তিকতা আমাদের এটাই দেখায় যে অসীম কেবল মাত্র গাণিতিক ধারণা এবং এটাকে আমরা বাস্তবজীবনে উপলব্ধি করতে পারি না। অতএব, এই পর্যবেক্ষণ থেকে এই উপসংহারে পৌঁছাতে পারি যে, ডিডাক্টিভ আর্গুমেন্টের ক্ষেত্রে আমাদের প্রথম প্রেমিস (প্রকৃত অসীম বাস্তবে থাকতে পারে না) সত্য। সুতরাং আমরা এখন এই আর্গুমেন্টে উপনীত হতে পারি যে, A- যা কিছু মেটাফিজিক্যাল নেসেসারি ট্রুথ ধারণ করে তা অস্তিত্বে থাকতে পারেনা। B- ইনফিনিটি বা প্রকৃত অসীম ল-অফ ভায়োলেশন ধারণ করে। C- সুতরাং, বাস্তবে ইনফিনিটি থাকতে পারেনা।

  • P2. 1.2: An infinite temporal regress of events is an actual infinite. (কোনো ঘটনার জন্য অসীম টেম্পোরাল রিগ্রেস হলে তা প্রকৃত অসীমকে প্রতিনিধিত্ব করে)

এই প্রেমিস অনুযায়ী, কোনো ঘটনার পেছনে যদি অসীম টেম্পোরাল রিগ্রেস ঘটে তাহলে তা প্রকৃত অসীম। উদাহরণ, আপনার হাতে থাকা একটি মোবাইল ফোনের কথাই চিন্তা করুন। এই মোবাইলটি অসীম কাল থেকে আপনার হাতে ছিল না। বরং আপনার হাতে আসার জন্য কোনো কারণ বা ঘটনা রয়েছে এবং সেই ঘটনার পেছনেও আরো কারণ বা ঘটনা ছিল এবং তা অসীম পর্যন্ত। তাই তা প্রকৃত অসীমকে প্রতিনিধিত্ব করে। যদি আমাদের এই মহাবিশ্ব অসীম হয়, তাহলে অসীম টেম্পোরাল ঘটনা প্রকৃত অসীমকে প্রতিনিধিত্ব করে। কারণ এর পেছনে অসীম সংখ্যক ঘটনা ঘটেছে। এর মানে এই যে, মহাবিশ্বের পেছনের এই অসীম সংখ্যক ঘটনা প্রকৃত অসীমকে অনুসরণ করে।

  • P2. 1.3: Therefore, an infinite temporal regress cannot exist. (সুতরাং, অসীম টেম্পোরাল রিগ্রেস থাকতে পারেনা। 

P2. 1.1 (An actual infinite cannot exist) থেকে আমরা এই সিদ্ধান্তে উপনীত হয়েছি যে, “প্রকৃত অসীম বাস্তবে থাকতে পারেনা।” এবং প্রেমিস P2. 1.2 থেকে আমরা এই সিদ্ধান্তে উপনীত হয়েছি যে, ‘কোন ঘটনার জন্য অসীম টেম্পোরাল রিগ্রেস হলে তা প্রকৃত অসীমকে প্রতিনিধিত্ব করে”। যেহেতু প্রকৃত অসীম বাস্তবে থাকতে পারেনা সেহেতু কোন ঘটনার জন্য অসীম টেম্পোরাল রিগ্রেস ঘটলে সেটাও অসীমকে প্রতিনিধিত্ব করে এবং তা বাস্তবে থাকতে পারে না। তাই P2. 1.3 সত্য হতে বাধ্য। সুতরাং, আমরা বলতে পারি যে, ‘অসীম টেম্পোরাল রিগ্রেস থাকতে পারে না’।

  • P2. 1.4: Therefore, The Univers began to exist. (সুতরাং মহাবিশ্বের অস্তিত্বের জন্য শুরু রয়েছে) 

যেহেতু, P2. 1.1 অনুযায়ী ‘প্রকৃত অসীম বাস্তবে থাকতে পারে না’। P2. 1.2 অনুযায়ী ‘কোনো ঘটনার জন্য অসীম টেম্পোরাল রিগ্রেস হলে তা প্রকৃত অসীমকে প্রতিনিধিত্ব করে’। P2.3 অনুযায়ী ‘অসীম টেম্পোরাল রিগ্রেস থাকতে পারেনা’। এই প্রেমিস গুলো থেকে আমরা যে সিদ্ধান্তে উপনীত হতে পারি, ‘প্রকৃত অসীম বাস্তবে থাকতে পারেনা’, ‘অতীত ঘটনা অসীম হতে পারেনা’, এবং ‘অসীম টেম্পোরাল রিগ্রেস প্রকৃত অসীমকে প্রতিনিধিত্ব করে বলে অসীম টেম্পোরাল রিগ্রেস থাকতে পারে না’, তাই মহাবিশ্বের অস্তিত্বের জন্য অবশ্যই শুরু রয়েছে। অন্যথায়, বর্তমান সময়ে আসা সম্ভবই হতো না।

Diductive Argument-3

এই আর্গুমেন্টে আমরা প্রমাণ করবো অতীতে ঘটে যাওয়া ঘটনার (কার্যকারণ) ধারাবাহিকতা অসীম হতে পারেনা। যুক্তিটির গঠন নিন্মরুপ;

P2. 2.1: A collection formed by successive addition cannot be actually infinite. (ধারাবাহিক সংযোজন দ্বারা গঠিত একটি সংগ্রহ আসলে হতে পারে না অসীম)

P2. 2.2: The temporal series of past events is a collection formed by Successive addition. (অতীতের ঘটনাগুলির সাময়িক সিরিজের দ্বারা গঠিত একটি সংগ্রহ ধারাবাহিক সংযোজন)

P2. 2.3: Therefore, the temporal series of past events cannot be actually infinite. (অতএব, অতীত ঘটনার সাময়িক সিরিজ আসলে অসীম হতে পারে না)

P2. 2.4: Therefore, the universe began to exist. (অতএব, মহাবিশ্বের অস্তিত্ব শুরু হয়েছিল)

ব্যাখ্যা;

  • P2. 2.1: A collection formed by successive addition cannot be actually infinite. (ধারাবাহিক সংযোজন দ্বারা গঠিত একটি সংগ্রহ আসলে হতে পারে না অসীম)

একটি দৃশ্যপট কল্পনা করুন যে, আপনার কাছে একটি ব্যাগ যেখানে অসীম সংখ্যক মার্বেল রাখা আছে। আপনার বন্ধু সীমান্ত অসীম অতীত কাল থেকে মার্বেলগুলো গুণতে শুরু করেছে এবং ঘণ্টাখানেক পরে সে বললো আমি অসীম সংখ্যক মার্বেল গুণে শেষ করতে পেরেছি! কিন্তু এমনটা কি আদৌ সম্ভব? এখানে অসীম বলতে বুঝানো হচ্ছে শুরুহীন এবং শেষহীন। যদি সে অসীম অতীত থেকে মার্বেল গণনা করা শুরু করে তাহলে কেন একটা নির্দিষ্ট সময়ে এসে সে বললো গণনা শেষ করেছি! যেখানে অসীম মানে যার শুরু নেই, শেষ নেই!? যদি অসীমের শেষ না থাকে তাহলে কীভাবে সীমান্ত অসীম অতীত সময় থেকে অসীম সংখ্যক মার্বেল গণণা করে শেষ করতে পারলো? এটা কিছুতেই সম্ভব না। একের পর এক সসীম বস্তু যোগ করে আমরা কখনোই অসীম তৈরি করতে পারি না। এই উদাহরণের অযৌক্তিকতা আমাদের দেখায় যে ধারাবাহিক সংযোজন দ্বারা গঠিত একটি সংগ্রহ আসলে অসীম হতে পারে না; একের পর এক বা ধারাবাহিকভাবে মার্বেল যোগ বা সংযোজন করে আমরা আসলে অসীম সিরিজ পেতে পারি না।

  • P2. 2.2: The temporal series of past events is a collection formed by Successive addition. (অতীতের ঘটনাগুলির সাময়িক সিরিজের দ্বারা গঠিত একটি সংগ্রহ ধারাবাহিক সংযোজন)

P2. 2.2: অনুযায়ী অতীতের ঘটনাগুলির সাময়িক সিরিজটি ধারাবাহিক সংযোজন দ্বারা গঠিত একটি সংগ্রহ। অর্থাৎ, আমরা যদি অতীত কাল থেকে শুরু করে একের পর এক মার্বেল যোগ করে একটি সংগ্রহ তৈরি করে তাহলে তা একটি ধারাবাহিক সংযোজন।

  • P2. 2.3: Therefore, the temporal series of past events cannot be actually infinite. (অতএব, অতীত ঘটনার সাময়িক সিরিজ আসলে অসীম হতে পারে না)

যেহেতু, ধারাবাহিক সংযোজন দ্বারা গঠিত একটি সংগ্রহ আসলে অসীম হতে পারেনা এবং অতীতের ঘটনাগুলোর সাময়িক সিরিজের দ্বারা গঠিত সংগ্রহ বা যে কোন কিছু ধারাবাহিক সংযোজন তাই অতীতের ঘটনার সাময়িক সিরিজ অসীম নয়। অর্থাৎ, প্রকৃত অসীম অস্তিত্বে থাকলেও অতীতের ঘটনার সাময়িক সিরিজ অসীম হতে পারেনা। সহজ করে বললে, অসীম অতীত সময়ে অসীম মার্বেল একটা নির্দিষ্ট সময়ে গণনা শেষ করা যাবেনা। কারণ অসীম সংখ্যক মার্বেল গুণতে সময় লাগবে অসীম এবং অসীম সময় কখনোই শেষ হবেনা। তাই অসীম সময় শেষ করে কখনো একটা নির্দিষ্ট সময়ে পৌঁছানো সম্ভব না।

  • P2. 2.4: Therefore, the universe began to exist. (অতএব, মহাবিশ্বের অস্তিত্ব শুরু হয়েছিল)

আমাদের মহাবিশ্ব যদি অসীম ঘটনার সিরিজের দ্বারা গঠিত কোন ধারাবাহিক সংযোজন হতো তাহলে আমরা বর্তমানে আসতে পারতাম না। অর্থাৎ, আমাদের মহাবিশ্ব অসীম অতীত থেকে একটার পর একটা অসীম কার্যকারণ সম্বন্ধের পর অস্তিত্বে আসতো তাহলে বর্তমানে আসা সম্ভব হতো না। কারণ অসীম কার্যকারণ শেষ হতে সময় লাগতো অসীম। আর অসীম সময় পার করতে সময়ও লাগতো অসীম। যেহেতু অসীম সময় শেষ করা সম্ভব না সেহেতু অতীতে অসীম কার্য-কারণ ঘটার পরে মহাবিশ্ব অস্তিত্বে আসতে পারতো না। সুতরাং, মহাবিশ্বের শুরু থাকা অনিবার্য।

বিখ্যাত পদার্থ বিজ্ঞানী স্টেফেন হকিং তার ওয়েবসাইটে লিখেছেন,

সমস্ত প্রমাণ ইঙ্গিত করে যে, মহাবিশ্ব চিরকালের জন্য বিদ্যমান ছিল না, এটি প্রায় ১৫ বিলিয়ন বছর আগে শুরু হয়েছিল। এটি সম্ভবত আধুনিক কসমোলজির সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য আবিষ্কার। ……..'এই বক্তৃতার উপসংহার হল মহাবিশ্ব চিরকালের জন্য বিদ্যমান ছিল না। বরং, প্রায় ১৫ বিলিয়ন বছর আগে মহাবিস্ফোরণে মহাবিশ্ব এবং সময়ের শুরু হয়েছিল। (( Stephen Hawking Estate )) 

বৈজ্ঞানিক প্রমাণঃ প্রকৃত অসীম অস্তিত্বে থাকার পক্ষে আমরা উপরে একটি ধারণাগত প্রমাণ উপস্থাপন করেছিলাম ডিডাক্টিভ আর্গুমেন্টের মাধ্যমে। তবে এখন আমরা অভিজ্ঞতামূলক পর্যবেক্ষণের উত্তর ভিত্তি করে যুক্তি প্রয়োগ করবো। বিগ ব্যাং বা মহাবিস্ফোরণ তত্ত্ব অনুযায়ী, আমাদের এই মহাবিশ্ব প্রায় ১৩.৮ বিলিয়ন বছর পূর্বে অনস্তিত্ব থেকে অস্তিত্বে এসেছে। এই তত্ত্ব অনুসারে আজ থেকে ১৩.৮ বিলিয়ন বছর পূর্বে মহাবিশ্বের বর্তমান ও অতীত সকল স্থান-কাল-শক্তি-পদার্থ-পদার্থের নিয়ম সবকিছুই একই সময়ে সম্প্রসারণের মাধ্যমে একটি বিন্দু থেকে সৃষ্টি হয়েছে। অর্থাৎ, মহাবিশ্বের শুরু আছে। বিগ ব্যাং তত্ত্ব P2 (অস্তিত্বের জন্য মহাবিশ্বের শুরু আছে) এর জন্য মহাজাগতিক ভিত্তি প্রদান করে বা এটি P2 কে সমর্থন করে। বৈজ্ঞানিক তত্ত্বগুলো যেহেতু পর্যবেক্ষণের উপর নির্ভর করে তাই তাই আমরা ভবিষ্যতের অভিজ্ঞতামূলক পর্যবেক্ষণ বা তাত্ত্বিক পদার্থবিজ্ঞান বিগ ব্যাং থিওরিকে ভুল প্রমাণ করতে পারবে না এমন নিশ্চয়তা দিতে পারি না। তবে এই মুহূর্তে বিগ ব্যাং তত্ত্বের বিকল্প কোন তত্ত্ব আমাদের কাছে নেই। বর্তমানে এটি মহাবিশ্বের উৎপত্তির সবচেয়ে সফল এবং সর্বাধিক গৃহীত তত্ত্ব। সুতরাং, কসমোলজি আমাদের P2 এর জন্য শক্তিশালী বৈজ্ঞানিক সমর্থন প্রদান করে। বিগ ব্যাং তত্ত্ব সম্পর্কে আরো বিস্তারিত পড়ুন বিগ ব্যাং তত্ত্ব কি? বিগ ব্যাং কাকে বলে? - ইনসাইট জোন 

  • P3: Therefore, the universe has a cause of its beginning. (অতএব, মহাবিশ্বের শুরুর জন্য একটি কারণ রয়েছ।)

যেহেতু আমরা P1 & P2 সত্য প্রমাণ করেছি তাই ডিডাক্টিভ আর্গুমেন্টের ক্ষেত্রে আমাদের কনক্লুশন P3 সত্য হতে বাধ্য। সুতরাং, “মহাবিশ্বের শুরুর জন্য একটি কারণ (স্রষ্টা) রয়েছে” এটা সত্য। উপরে আমরা প্রমাণ করেছি, মহাবিশ্বের অস্তিত্বের জন্য শুরু আছে। আরো প্রমাণ করেছি যা কিছুর অস্তিত্বের জন্য শুরু আছে তার অস্তিত্বের জন্য কারণ আছে। এখন প্রশ্ন আসতে পারে মহাবিশ্বের অস্তিত্বের পেছনে কারণ থাকলে তা স্রষ্টার সাথে প্রাসঙ্গিক কীভাবে? প্রথমত, কারণটিকে অবশ্যই স্ব-নির্ভর বা স্বাধীন হতে হবে। অন্যথায় অসীম রিগ্রেসে পতিত হবে। যেহেতু অসীম বাস্তবে অস্তিত্বশীল না সেহেতু কার্যকারণ সম্বন্ধ অসীম হতে পারেনা। তাই শুরুতে এমন একটি কারণ থাকা যা কারণহীন কারণ, স্ব-নির্ভর, অনন্তকাল থেকে বিদ্যমান।

দ্বিতীয়ত, কারণহীন কারণটি হবে বুদ্ধিমান, সর্বশক্তিমান, সর্বজ্ঞ, ইত্যাদি।  আদি কারণের এই বৈশিষ্ট্য গুলো আস্তিকদের স্রষ্টার সাথেই সামঞ্জস্যপূর্ণ। সুতরাং, আদি কারণ বা কারণহীন কারণ, স্ব-নির্ভর, অনন্তকাল থেকেই অস্তিত্বশীল সেই কারণ অবশ্যই স্রষ্টা।

অধ্যাপক অ্যান্থনি ফ্লিউয়ের দেয়ার ইজ গড বইতের পরিশিষ্টে অধ্যাপক আব্রাহাম ভার্গেস জোরালোভাবে বলেছেন,

আস্তিক-নাস্তিক একটি বিষয়ে একমত হতে পারে; যদি কোনো কিছুর অস্তিত্ব থাকে, তা হলে এর আগে অবশ্যই এমন কিছু থাকতে হবে যা সব সময় অস্তিত্বশীল। চিরকালীন অস্তিত্ববান এই সত্তা কিভাবে এসেছে? এর উত্তর হলো, এটা কোনোভাবেই আসেনি। এটা সবসময় অস্তিত্ববান। এখন পছন্দ আপনার, হয় সৃষ্টিকর্তা নয় মহাজগৎ। কিছু একটা সব সময় ছিলো। (( ফ্লিউ দেয়ার আ গডঃ হাউ দা ওয়ার্ল্ড’স মস্ট নটসিয়াস এথিস্ট চেইনজড হিজ মাইন্ড। নিউ ইয়র্ক; হার্পারওয়ান। ২০০৭, পৃষ্ঠা ১৬৫ ))

কালাম কসমোলজিক্যাল আর্গুমেন্ট নিয়ে আপত্তি ও তার জবাব

নাস্তিকরা বিভিন্ন উপায়ে কালাম কসমোলজিক্যাল আর্গুমেন্টের উপর আপত্তি আরোপ করে। P1 ‘অস্তিত্বের জন্য যা কিছুর শুরু আছে তার কারণ আছে’ বা PSR’কে নাস্তিকরা অস্বীকার করে কালাম কসমোলজিক্যাল আর্গুমেন্টের উপর প্রথম আপত্তি করে থাকে। যদিও আমরা দাবি করি PSR স্বজ্ঞাতভাবে (intuitively), স্বতঃস্ফূর্তভাবে (self-evidently) বা সহজাতভাবে প্রমাণিত। তবে নাস্তিকরা দাবি করেন, কোয়ান্টাম ফিল্ডে কোন পার্টিকেল (কণা) কারণ ছাড়া অস্তিত্বে আসতে পারে। কারণ কোয়ান্টাম ফিল্ডে কোন কণিকা বা পার্টিকেল কারণ ছাড়া অস্তিত্বে আসা যৌক্তিকভাবে অসম্ভব নয় যেমনটা অসম্ভব একজন মানুষ একই সাথে বিবাহিত আবার অবিবাহিত। যেহেতু, কোয়ান্টাম ফিল্ডে কারণ ছাড়া পার্টিকেল অস্তিত্বে আসাতে পারে সেহেতু P1 সঠিক নয়। এছাড়াও কোয়ান্টাম মেকানিক্স অনুযায়ী, সাবএটমিক পর্যায়ে যে কোন কিছু কোন কারণ ছাড়াই অস্তিত্বে আসতে পারে। সুতরাং, P1 কোনোভাবেই সঠিক নয়।

P1 নিয়ে আপত্তির জবাব

দার্শনিক উইলিয়াম লেন ক্রেইগ নাস্তিকদের এই অভিযোগের জবাবে বলেন, P1 এমন কিছু নয় যে যার জন্য প্রমাণের প্রমাণের প্রয়োজন আছে কারণ এটি স্বতঃস্ফূর্তভাবে (self-evidently) প্রমাণিত। (( Yujin Nagasawa (2011), The Existence of God: A philosophical Introduction. Page:139 )) ‘নাস্তিকতা কি সহজাত এই লিখাতে য়ে আমরা কিছু বিষয়ে আলোচনা করেছিলাম তার অন্যতম একটি বিষয় ছিল যে জগতকে আমরা বাস্তব মনে করে দিন নিপাত করি সেই জগৎ কি আসলেই বাস্তব নাকি নিছক বিভ্রম? আমাদের যৌক্তিক অনুষদগুলো কি আমাদের সুনিশ্চিত জ্ঞান প্রদান করতে সক্ষম? এই জগৎ বাস্তব কি-না তা আমরা প্রমাণ করতে পারি না তবে আমরা বাস্তব বলে মনে করি। কারণ এটাই আমাদের প্রকৃতি। সহজাতভাবে বা স্বতঃস্ফূর্তভাবে আমরা জানতে পারি যে এই জগৎ বাস্তব। তবে এই জগৎ নিছক বিভ্রম হওয়াতে কোন ধরনের যৌক্তিক অসম্ভাব্যতা নেই। অর্থাৎ, যৌক্তিকভাবে এটা সম্ভব যে এই জগৎ নিছক বিভ্রম হতেই পারে। একইভাবে, যৌক্তিকভাবে এটাও সম্ভব যে আমাদের যৌক্তিক অনুষদগুলো আমাদের সুনিশ্চিত জ্ঞান প্রদান করতে সক্ষম নয়।

যুক্তিবিদ্যা কি এই লিখাতে আমরা দেখিয়েছি যে যুক্তিবিদ্যার মৌলিক নিয়মের সাথে যদি কোন কিছু সাংঘর্ষিক না হয় তবে তার অস্তিত্ব থাকা সম্ভব। এই জীবন নিছক বিভ্রম হওয়াটা, আমাদের যৌক্তিক অনুষদগুলো আমাদের সুনিশ্চিত জ্ঞান প্রদানে ব্যর্থ, এই ব্যাপারগুলো যুক্তিবিদ্যার মৌলিক নিয়মের সাথে সাংঘর্ষিকতা তৈরি করে না যেমনটা তৈরি করে একজন লোক একই সাথে বিবাহিত আবার অবিবাহিত, একটা বৃত্তের চারটি কোণ থাকার মতো ব্যাপার গুলিতে। তাহলে আমাদের চারপাশের সব কিছু বিভ্রম হওয়াটা যেহেতু যৌক্তিকভাবে সম্ভব, আমাদের যৌক্তিক অনুষদ গুলো আমাদের সুনিশ্চিত জ্ঞান প্রদান করতে অক্ষম হওয়াটা যৌক্তিকভাবে সম্ভব বলে কি আমরা এটা মনে করি যে, আমাদের চারপাশের সবকিছুই আসলেই বিভ্রম? এবং আমাদের যৌক্তিক অনুষদ আসলে সুনিশ্চিত জ্ঞান প্রদান করতে পারে না? আমরা কি এমন কিছু মনে করি যে, আমরা কেবল দূরের কোন অজানা গ্রহের পাত্রের মধ্যে ভেসে বেড়ানো নিছক এক মস্তিষ্ক, আর তাতে কলকাঠি নাড়িয়ে আমাদের হৃদয়ে অনুভূতির সৃষ্টি করেছে কোন এলিয়েন? অবশ্যই আমরা এমনটা মনে করিনা। বরং, এই জগৎ বাস্তবে অস্তিত্বশীল তা নিশ্চিতভাবে প্রমাণ করতে না পারলেও এই জীবন বাস্তবে অস্তিত্বশীল এমন বিশ্বাস এবং আমাদের যৌক্তিক অনুষদগুলো আমাদের সুনিশ্চিত জ্ঞান প্রদান করতে পারে, এই বিশ্বাসও মানবমনের স্বজ্ঞাত বা স্বতঃসিদ্ধ বিশ্বাস।

স্বতঃসিদ্ধ মানে, যা কিছু নিজেই নিজের প্রমাণ, স্বতঃস্ফূর্তভাবে যা সত্য। এ ধরনের বিশ্বাসের জন্য আমরা কোনো যুক্তি, প্রমাণ, খুঁজি না। কোনো প্রকার প্রমাণ ছাড়াই আমরা এগুলো বিশ্বাস করি। দর্শনের ভাষায় এ ধরনের বিশ্বাসগুলোকে Self-evident truth বলে। এটা স্বতঃস্ফূর্তভাবে সত্য যে আমাদের যৌক্তিক অনুষদগুলো আমাদের সুনিশ্চিত জ্ঞান প্রদান করতে পারে এবং আমরা একটি দূরের কোন অজানা গ্রহের পাত্রের মধ্যে ভেসে বেড়ানো নিছক এক মস্তিষ্ক নয়।

একইভাবে কালাম কসমোলজিক্যাল আর্গুমেন্টের P1 (অস্তিত্বের জন্য যা কিছুর শুরু আছে তার কারণ আছে/ PSR) স্বতঃস্ফূর্তভাবে সত্য। যেহেতু যৌক্তিকভাবে সম্ভব যে একটি কণা কারণ ছাড়াই অস্তিত্বে আসতে পারে, ঠিক একইভাবে যৌক্তিকভাবে এটাও সম্ভব যে আমাদের যৌক্তিক অনুষদ আমাদের সুনিশ্চিত জ্ঞান প্রদান করতে পারেনা এবং আমরা একটা পরাবাস্তব জগৎ বা বিভ্রমে আছি। কিন্তু আমাদের যৌক্তিক অনুষদ সুনিশ্চিত জ্ঞান প্রদান করতে পারে এবং এই জগৎ নিছক বিভ্রম নয়, তা স্বতঃস্ফূর্তভাবে সত্য হওয়ার কারণে আমরা যৌক্তিকভাবে সম্ভব হলেও এমন বিশ্বাস লালন করি না যে আমাদের যৌক্তিক অনুষদ সত্য বা সুনিশ্চিত জ্ঞান জানাতে সক্ষম নয় এবং আমাদের এই জগত নিছক বিভ্রম। একইভাবে, এটাও স্বতঃস্ফূর্তভাবে সত্য যে অস্তিত্বের জন্য যা কিছুর শুরু আছে তার কারণ আছে (P1)।

সুতরাং, নিছক যৌক্তিক সম্ভাবনার অজুহাত দেখিয়ে একথা দাবি করা যায় না যে, বাস্তব জগতে কোন কারণ ছাড়াই কোন জিনিস অস্তিত্বে আসতে পারে। তাই কোন কারণ ছাড়াই কণিকা অস্তিত্বে আসতে এমনটা মনে করাটাই বরং অযৌক্তিক। দার্শনিক ডেবিট হিউম ১৭৫৪ সালে লিখিত এক চিঠিতে লিখেন,

তবে আমাকে আপনার উদ্দেশ্যে বলতে দিন যে আমি কখনই এতটা অযৌক্তিক প্রস্তাব দৃঢ় করিনি যে কারণ ছাড়াই কিছু হতে পারে। (( Yujin Nagasawa (2011), The Existence of God: A philosophical Introduction. Page:140 ))

প্রেমিস-১ নিয়ে আরো একটি অভিযোগ হলো কোয়ান্টাম মেকানিক্স অনুযায়ী, সাব অ্যাটমিক পর্যায়ে যে কোন কিছু কোন কারণ ছাড়াই অস্তিত্বে আসতে পারে। এই ধারণাটি মূলত কোয়ান্টাম মেকানিক্সের তথাকথিত কোপেনহেগেন ব্যাখ্যা থেকে উদ্ভূত হয়েছে। বিজ্ঞানীদের মতে কোয়ান্টাম মেকানিক্সের ব্যাখ্যাগুলো অনিশ্চয়তাবাদী (indeterministic)। তাত্ত্বিক পদার্থবিদ রিচার্ড ফাইনম্যান এর মতে,

আমি মনে করি আমি নিরাপদে বলতে পারি যে কেউ সত্যিই কোয়ান্টাম মেকানিক্স বোঝে না। (( Opinion | Even Physicists Don’t Understand Quantum Mechanics - The New York Times (nytimes.com) ))

দার্শনিক উইলিয়াম লেন ক্রেইগ এর মতে,

কোপেনহেগেনের ব্যাখ্যা সঠিক হলেও, এটি অনুসরণ করে না যে কোন কিছুই শূন্য থেকে অস্তিত্বে আসতে পারে। কোয়ান্টাম ভ্যাকুয়াম পরম শূন্যতা নয় বরং ‘অস্থির শক্তির একটি সমুদ্র, হিংসাত্মক কার্যকলাপের একটি ক্ষেত্র যার একটি সমৃদ্ধ শারীরিক গঠন রয়েছে এবং শারীরিক আইন দ্বারা বর্ণনা করা যেতে পারে। ((Yujin Nagasawa (2011), The Existence of God: A philosophical Introduction. Page:140 ))

ক্রেইগ তার লিখিত ‘The Kalam Cosmological Argument; Scientific Evidence for the Beginning of the Universe’ বইতে উল্লেখ করেন,

একটি ভ্যাকুয়ামকে সাধারণত খালি স্থান বলে মনে করা হয়, কিন্তু আধুনিক কণা পদার্থবিদ্যা অনুসারে ভ্যাকুয়াম হল একটি ভৌত বস্তু, যা শক্তির ঘনত্ব এবং চাপ দিয়ে সমৃদ্ধ। (( William Lane Craig Paul Copan; The Kalām Cosmological Argument; Scientific Evidence for the Beginning of the Universe; Page: 151 ))

কোয়ান্টাম ভ্যাকুয়াম বা শূন্যতা কোনো প্রকৃত অর্থে শূন্য স্থান নয়। সেখানে পদার্থের নিয়ম চলে। কোয়ান্টাম শূন্যতা হচ্ছে ক্ষণস্থায়ী শক্তির অবস্থা। আর সেই শক্তি থেকেই প্রতিনিয়ত জোড়ায় জোড়ায় তৈরি হয় কণা ও প্রতিকণা। যারা পুনরায় ধ্বংস হয়ে আবার শক্তিতে পরিণত হয়ে যায়। সুতরাং, কোয়ান্টাম ভ্যাকুয়াম বা শূন্যতা মানে ভৌত কিছু। (( Physics - The Force of Empty Space (aps.org) )) উইকিপিডায়ার তথ্য অনুযায়ী, ভ্যাকুয়াম স্টেট বা কোয়ান্টাম ভ্যাকুয়াম যাকে বলা হয় তার বর্তমান সময়ের উপলব্ধি অনুসারে, এটি ‘কোনোভাবেই একটি সাধারণ খালি স্থান’ নয়। কোয়ান্টাম মেকানিক্সের মতে, ভ্যাকুয়াম অবস্থা সত্যিকার অর্থে খালি নয় বরং এতে ক্ষণস্থায়ী ইলেক্ট্রোম্যাগনেটিক তরঙ্গ এবং কণা রয়েছে যা কোয়ান্টাম ক্ষেত্রের মধ্যে আসে এবং বিলীন হয়ে যায়। ((Quantum vacuum state - Wikipedia)) কোয়ান্টাম পদার্থ বিজ্ঞান অনুযায়ী, একজন ব্যক্তি পদার্থের মৌলিক এককগুলির বৈশিষ্ট্যগুলি জানতে পারেনা।

উদাহরণস্বরূপ, কেউ একই সময়ে একটি কণার অবস্থান এবং গতিবেগ পুরোপুরি জানতে পারে না। এই অনিশ্চয়তার একটি উদ্ভট পরিণতি হল যে একটি ভ্যাকুয়াম কখনই সম্পূর্ণ খালি থাকে না, বরং এর পরিবর্তে তথাকথিত ‘ভার্চুয়াল কণা’ দ্বারা গুঞ্জন হয় যা ক্রমাগত অস্তিত্বের মধ্যে এবং বাইরে চলে যায়। (( Something from Nothing? A Vacuum Can Yield Flashes of Light - Scientific American ))

হাইজেনবার্গের অনিশ্চয়তার নীতির মাধ্যমেও আমরা জানতে পারি যে, একটি বস্তুর অবস্থান এবং বেগ উভয়ই সঠিকভাবে পরিমাপ করা যায় না, একই সময়ে, এমনকি তত্ত্বেও। (( Uncertainty principle | Definition & Equation | Britannica)) সুতরাং, কোয়ান্টাম ভ্যাকুয়াম কোন খালি স্থান নয়, সেখানে শূন্য থেকে কোন কিছু অস্তিত্বে আসতে পারেনা। তাই কোয়ান্টাম ম্যাকানিক্স অনুযায়ী ‘সাব অ্যাটমিক পর্যায়ে যে কোন কিছু কোন কারণ ছাড়াই অস্তিত্বে আসতে পারে’ এই দাবিটি মোটেও সঠিক নয়। ‘নির্ভরশীলতার যুক্তি’ অর্ধ্যায়ের ‘Pricniple of Sufficient Reason (PSR)’ অংশেও এই বিষয় নিয়ে আলোচনা করা হয়েছে যে, কোয়ান্টাম ফ্লাকচুয়েশনে ভার্চুয়াল পার্টিকেল কোনো কারণ ছাড়াই অস্তিত্বে চলে আসতে পারে না।

P2 নিয়ে আপত্তির জবাব

কালাম কসমোলজিক্যাল আর্গুমেন্টের P2 অনুযায়ী ‘The universe began to exist.’ (মহাবিশ্বের অস্তিত্বের জন্য শুরু আছে)। এর স্বপক্ষে আমরা নিম্নে দেওয়া উপ যুক্তিটি (Sub Argument) ব্যবহার করেছি। এই উপ যুক্তিটি মূলত বাস্তব অসীমের অসম্ভবতার উপর ভিত্তি করে দেওয়া হয়েছে।

  • 1.1 An actual infinite cannot exist. (প্রকৃত অসীম বাস্তবে থাকতে পারেনা।)
  • 1.2 An infinite temporal regress of events is an actual infinite. (কোনো ঘটনার জন্য অসীম টেম্পোরাল রিগ্রেস হলে তা প্রকৃত অসীমকে প্রতিনিধিত্ব করে)
  • 1.3 Therefore, an infinite temporal regress cannot exist. (সুতরাং, অসীম টেম্পোরাল রিগ্রেস থাকতে পারে না।)
  • 1.4 Therefore, the Univers began to exist. (সুতরাং, মহাবিশ্বের অস্তিত্বের জন্য শুরু রয়েছে)

নাস্তিকরা উপ যুক্তির P2. 1.1 প্রত্যাখ্যান করেন। P2. 1.1 অনুযায়ী বাস্তবে প্রকৃত অসীম থাকতে পারেনা। কিন্তু তাদের মতে প্রকৃত অসীম থাকতে পারে কারণ অসীম একটি সুসংগত ধারণা। একটি চারকোনা বিশিষ্ট ত্রিভুজ, বিবাহিত ব্যাচেলর এর ধারণাগুলো স্ববিরোধী বা যৌক্তিকভাবে অসম্ভব। তাই এগুলোর অস্তিত্ব থাকা সম্ভব নয়। অন্যদিকে, একটা গোলাপি রং এর হাতি, কোন প্রকার প্রযুক্তি ছাড়াই আকাশে উড়তে পারা মানুষের অস্তিত্ব থাকাটা যৌক্তিকভাবে সম্ভব। নাস্তিকদের মতে, কান্টরের সেট তত্ত্ব অনুযায়ী প্রকৃত অসীমকে সংজ্ঞায়িত করা যায়। যেহেতু প্রকৃত অসীমের ধারণাটি সুসংগত এবং যৌক্তিকভাবেও অসম্ভব কিছু না তাই বাস্তবে প্রকৃত অসীম থাকতে পারে। সুতরাং, P2. 1.1 ‘প্রকৃত অসীম বাস্তবে থাকতে পারে না’ সঠিক নয়।

P1 নিয়ে আপত্তির জগতে ইতোমধ্যেই আমরা প্রমাণ করেছি যে যৌক্তিকভাবে কোন কিছুর সম্ভব হলেই তার অস্তিত্ব থাকবে এমন নয়। কান্টরের সেট তত্ত্ব দিয়ে অসীমকে সুসংগতভাবে ব্যাখ্যা করা সম্ভব এবং অসীমের অস্তিত্ব যৌক্তিকভাবেও সম্ভব হলেও অনটোলজিক্যালি বা আধিভৌতিকভাবে (metaphysically) বাস্তব অসীমের অস্তিত্ব সম্ভব নয়। সুতরাং, অসীমের ধারণাটি সুসংগত তার মানে এই নয় যে বাস্তবে প্রকৃত অসীম থাকতে পারে। কান্টরের সেট থিওরির ভিত্তি হলো ম্যাথমেটিক্স বা গাণিতিক নাম্বার। ম্যাথমেটিক্স হলো বিমূর্ত সত্তা (Abstract Entity). বিমূর্ত সত্তা বলতে বুঝানো হয় যা কিছু কেবল ধারণাতে অস্তিত্বশীল। অন্যদিকে যা কিছু ফিজিক্যালি অস্তিত্বশীল তাদেরকে বলা হয় কংক্রিট সত্তা (Concrete Entity). বিমূর্ত সত্তাগুলোর Causal Power বা কোন কিছু তৈরি করার ক্ষমতা নেই। তাই অসীমের অস্তিত্ব গাণিতিক জগতে থাকা সম্ভব হলেও কংক্রিট ওয়ার্ল্ডে (আমাদের এই ফিজিক্যাল জগতে) থাকা সম্ভব নয়। সেক্ষেত্রে আমরা যদি আমাদের এই কংক্রিট ওয়ার্ল্ডে সেট থিওরি প্রয়োগ করি তাহলে মেটাফিজিক্যাল কন্ট্রাডিকশন বা মেটাফিজিক্যাল নেসেসারি ট্রুথকে ভায়োলেট করবে।

যেমন, আপনি আপনার স্ত্রীকে নিয়ে হানিমুনে যাবেন। এখানে যৌক্তিকভাবে কোন সাংঘর্ষিকতা না থাকলেও এই কংক্রিট জগতে স্ত্রীর সাথে হানিমুন করতে হলে আপনাকে বিবাহিত হতে হবে। অন্যথায়, আপনি হানিমুন করতে পারবেন না। তার মানে শুধু মাত্র যৌক্তিক অসম্ভাব্যতা না থাকলেই যে কোন কিছু ঘটবে বা অস্তিত্বে থাকতে হবে বিষয়টি এমন নয়। এছাড়াও, গাণিতিকভাবে এটাও সম্ভব যে -২জন লোক আমার বাসায় এসেছে। কিন্তু বাস্তব জগতে -২ জন কখনো কারো বাসায় আসতে পারেবেনা। কারণ -২ জন লোক মেটাফিজিক্যাল নেসেসারি ট্রুথকে ভায়োলেট করে। তাই গাণিতিকভাবে অসীমকে সুসঙ্গতভাবে সংজ্ঞায়িত করা গেলেও, অসীমের ধারণা আমাদের এই কংক্রিট ওয়ার্ল্ডে মেটাফিজিক্যাল নেসেসারি ট্রুথকে ভায়োলেট করে। সুতরাং, এই জগতে অসীমের অস্তিত্ব থাকা সম্ভব নয়।

সৃষ্টিকর্তা কি ইচ্ছা শক্তিহীন জড় পদার্থ নাকি বুদ্ধিমান সত্তা?

ইতিমধ্যে আমরা কালাম কসমোলজিক্যাল আর্গুমেন্টে প্রমাণ করেছি যে মহাবিশ্ব অস্তিত্বে আসার জন্য একজন সৃষ্টিকর্তা বা এমন একটি কারণের প্রয়োজন যা অনাদিকাল ধরে অস্তিত্বশীল ছিলো । কিন্তু অনেকেই প্রশ্ন করতে পারে, সেই কারণ বা সৃষ্টিকর্তা ইচ্ছাশক্তিহীন জড় পদার্থ নাকি বুদ্ধিমান সত্তা? অথবা অনেকেই দাবী করেই বসতে পারে যে সেই সৃষ্টিকর্তা কোনো বুদ্ধিমান সত্তা নয় বরং তা হচ্ছে বস্তু! বেশ কিছু কারণে অসৃষ্ট এই স্রষ্টার ইচ্ছাশক্তি থাকা লাগবে বা তিনি বুদ্ধিমান সত্তা হতে হবে। প্রথমত, সেই অসৃষ্ট স্রষ্টা চেয়েছেন যে মহাবিশ্ব অস্তিত্বে আসুক। তিনি না চাইলে এটি কোনোভাবেই অস্তিত্বে আসতে পারতোনা। কারণ এই মহাবিশ্বের এমন অনেক সত্তা বিরাজমান যাদের ইচ্ছা এবং ইচ্ছাশক্তি রয়েছে। তাই এদের সৃষ্টিকর্তারও ইচ্ছাশক্তি থাকা আবশ্যক। কেননা, একটা বুদ্ধিহীন সত্তা কখনোই বুদ্ধিমান সত্তা তৌরি করতে পারবেনা।

দ্বিতীয়ত, (এই অংশটুকু লিখতে সহযোগিতা করেছেন মিছবাউল হক) মহাবিশ্বের সৃষ্টিকর্তা কি ইচ্ছাশক্তিহীন জড় পদার্থ নাকি বুদ্ধিমান সত্তা এটি বুঝার জন্য ফিলোসফার উইলিয়াম লেইন ক্রেইগ একটি সুন্দর আর্গুমেন্ট ব্যাবহার করে থাকেন। ব্যাপারটা বুঝতে গেলে আমাদের প্রথমে জানতে হবে, “কিভাবে একটা পার্মানেন্ট (এটারনাল) কজ  বা কারণ (গড) থেকে আমারা টেম্পোরাল ইফেক্ট (ইউনিভার্স) পেতে পারি?” সাধারনভাবে চিন্তা করলে আমরা দেখতে পাবো, একটি ইচ্ছাশক্তিহীন, বিবেকবুদ্ধি বিবর্জিত অপরনির্ভরশীল কার্যকারণ কখনোই তার ইফেক্ট ছাড়া অস্তিত্বে থাকে না। একটা উদাহরন দিলে বুঝতে সুবিধা হবে।

ধরুন, একটা ফাঁকা ঘরে কিছু বল রাখা আছে , কিন্তু, সেখানে কোন অভিকর্ষ বল বা গ্রাভিটি নেই। ফলশ্রুতিতে বলগুলো শূন্যে ভাসতে থাকবে। কিন্তু, এখন কোন প্রক্রিয়ায় যদি ঘরটিতে অভিকর্ষ বল ফিরে আসে, তৎক্ষণাৎ বলগুলো মাটিতে পড়ে যাবে। অর্থাৎ বুঝা গেল, এখানে বলগুলোর মাটিতে পড়ার কারন অভিকর্ষ বল যখনই ঘরটাতে অস্তিত্বসম্পন্ন  হবে তখনই তার ইফেক্ট বা প্রভাব বিস্তার করা শুরু করবে। অর্থাৎ বলগুলোকে মাটিতে ফেলে দিবে।

আরও একটি উদাহরন দেওয়া যায়, যেমনঃ আমরা জানি, পানি বরফ হওয়া বা জমার কারন 0 ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রা। এখন কোথাও যদি ০ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রা সৃষ্টি হয় তবেই, সেখানে থাকা যেকোনো পানি তৎক্ষণাৎ জমাট হতে শুরু করবে, এক সেকেন্ড আগেও নয়, এক সেকেন্ড পরেও নয়। এখন কোন জায়গার তাপমাত্রা যদি ইনফিনিট সময় থেকে ০ ডিগ্রি সেলসিয়াস থাকে তবে সেখানে থাকা পানি একটি সসীম সময় আগে জমাট বাধা শুরু হওয়া অসম্ভব। এটা “principle of sufficient reason” বা সংক্ষেপে (PSR) ভঙ্গ করে। তাই সেখানে পানিও ইনফিনিট সময় ধরে বরফ থাকবে।

উপরিউক্ত উদাহরণ থেকে আমরা বুঝতে পারলাম, ইচ্ছাশক্তিহীন, বুদ্ধিহীন কোন কার্যকারণ এবং তার ইফেক্ট বা প্রভাব একই সাথে অস্তিত্বশীল হয়। এবং একটির অস্তিত্ব থাকলে অপরটির অস্তিত্ব থাকেই। কিন্তু কোন ইচ্ছাশক্তিসম্পন্ন কোনো সত্তা চাইলেই কোন পূর্বকার্যকারণ সাপেক্ষ ছাড়াই নতুন কোন ইফেক্ট বা প্রভাব বা ঘটনা ঘটাতে সক্ষম। যেমনঃ ধরুন এমন একজন ব্যক্তি যিনি অসীম সময় ধরে বসে আছেন, তিনি তার ইচ্ছা সাপেক্ষে একটি সসীম সময় আগে উঠে দাড়াতে পারেন। অর্থাৎ, তার উঠে দাঁড়ানোর মাধ্যমে একটি টেম্পোরাল ইফেক্ট সৃষ্টি হয়। ফিলসফির ভাষায় এরকম ঘটনাকে এজেন্ট কজেশনও বলা হয়ে থাকে।

আমরা আগেই জেনেছি ইউনিভার্সের কারণ বা সৃষ্টিকর্তাকে অবশ্যই এটারনাল বা চিরন্তন হতে হবে। সুতরাং সৃষ্টিকর্তা যদি ইচ্ছাশক্তিহীন বা বুদ্ধিহীন হয় তাহলে ইউনিভার্সকেও হতে হবে চিরন্তন বা অসীম। কারণ, ইচ্ছাশক্তিহীন বা বুদ্ধিহীন কোনো কিছু তার কজ এন্ড ইফেক্ট একই সময়ে অস্তিত্বশীল হয়। যার উদাহারণ আমরা উপরে দেখেছি যে, কোনো স্থানে যখনই ০ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রা থাকবে তখনই সেই স্থানে থাকা পানি বরফে পরিণত হবে। অথবা যখনই ফাঁকা ঘরে অভিকর্ষ বলের উপস্থিতি হবে তখনই বল মাটিতে পরে যাবে। কিন্ত আমরা ইতিমধ্যেই প্রমাণ করেছি যে মহাবিশ্ব অসীম বা চিরন্তন নয়। তাই এই মহাবিশ্বের সত্তাকে অবশ্যই ইচ্ছাশক্তিসম্পূর্ণ বা বুদ্ধিমান সত্তা হতে হবে। আবার আমারা উপরের আলোচনা থেকে এটাও বুঝতে পারলাম, কোন চিরন্তন ইচ্ছাশক্তিহীন, বুদ্ধিহীন কজ বা কারন তার ইফেক্ট বা প্রভাব ছাড়া অস্তিত্বশীল থাকে না। তাই এই সিদ্ধান্তে উপনীত হওয়া যায় যে, ইউনিভার্সের কজ বা সোজা বাংলায় সৃষ্টিকর্তা অবশ্যই একজন ইচ্ছাশক্তিসম্পন্ন এজেন্ট বা বুদ্ধিমান সত্তা। (( Blackwell companion to Natural theology by W.L Craig & J.P Moreland  (page 193,194)))

Leave a Comment