আগস্ট ৪ [ ৩৫ জুলাই ]: চট্টগ্রামের ছাত্র আন্দোলনের এক রক্তাক্ত অধ্যায়! চট্টগ্রাম যুদ্ধের শেষ দিন।
সাজ্জাতুল মাওলা শান্ত
05 Aug, 2025
177 বার পঠিত
আগস্ট ৪ [ ৩৫ জুলাই ]: চট্টগ্রামের ছাত্র আন্দোলনের এক রক্তাক্ত অধ্যায়! চট্টগ্রাম যুদ্ধের শেষ দিন।
৩ আগস্ট, রাত ১১:২০।
মহানগর সেক্রেটারি ভাইয়ের কাছ থেকে বার্তা এলো আগামীকাল পুরো মহানগর একসাথে ময়দানে নামবে। কেন্দ্রীয় সিদ্ধান্ত। বার্তাটি পেয়েই শুরু হলো যুদ্ধের মানসিক প্রস্তুতি। রাতে ঘুম নয়, মনে শুধু একটাই প্রস্তুতি কাল লড়াই।
অন্যদিকে, অনলাইনে ছাত্রলীগের হুমকি-ধামকিতে মুখর চারদিক। পরিষ্কার বার্তা ৪ আগস্ট, তারা সর্বোচ্চ শক্তি নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়বে ছাত্র-জনতার ওপর। হাসিনার কেনা প্রশাসন আর সন্ত্রাসী ছাত্রলীগ হবে আমাদের প্রতিপক্ষ।
৪ আগস্ট, সকাল ৮টা।
মহানগরের সর্বশেষ নির্দেশনা এলো, পূর্ণাঙ্গ নির্দেশনা এলো। জমায়েতের স্থান নিউ মার্কেট মোড়। শুরু হলো ইতিহাসের আরেক অধ্যায় লেখার প্রস্তুতি। তথ্য বিভাগের ভাইয়েরা সকাল থেকেই স্পটে ছিলো। বাকিরা স্পটে পৌঁছাবে সকাল ১০টার মধ্যে। আমাদের থানার দায়িত্ব পড়েছিলো সবচেয়ে ভয়ংকর স্থান সিটি কলেজের মোড়ে।
নিউমার্কেট মোড়ে প্রবেশ করার চারটি প্রধান প্রবেশপথ ছিল। এর মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ছিল সিটি কলেজের সামনে মোড়টি। এই প্রবেশমুখে আন্দোলনের সমন্বয়ক, ছাত্রদের নিরাপত্তা এবং সম্ভাব্য আক্রমণ প্রতিহত করার দায়িত্বে ছিলো শিবির মহানগরীর দক্ষিণের একাংশ।
চট্টগ্রামের প্রতিটি কর্মসূচির মতোই, এই দিনেও সাধারণ ছাত্রদের প্রতিরক্ষার ভার নিয়েছিলো শিবির। শুধু চট্টগ্রাম নয় এই আন্দোলনের প্রতিটি প্রান্তে, প্রতিটি জেলাতেই ছাত্রশিবির ছিলো নিরাপত্তার মেরুদণ্ড। শিবির যতটা লেয়ারে এই আন্দোলনে ভূমিকা রেখে তারমধ্যে অন্যতম এটি যে আন্দোলনের প্রবেশমুখগুলোতে তারা অবস্থান নিতো আর যে কোনো আক্রমণ আসলে সেটা প্রতিহত করতো।
নিউমার্কেট মোড়কে ঘিরে চারদিকেই অবস্থান নিয়েছিল চট্টগ্রাম মহানগর শিবিরের দায়িত্বশীল ও জনশক্তিরা। স্টেশনগেট দিক ও সিটি কলেজ মোড়ে ছিলো মহানগর দক্ষিণের ভাইয়েরা। তবে সবচেয়ে বেশি শঙ্কা ছিলো সিটি কলেজ মোড় নিয়ে। কারণ এটিই ছিল ছাত্রলীগের শক্ত ঘাঁটি। সকলেই জানত, হামলার সূচনা এখান থেকেই হবে। আর শেষ পর্যন্ত,তেমনটাই ঘটেছিল।
প্রত্যেক থানাকে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছিল লাঠি, স্টাম্প, পাইপ সঙ্গে নিয়ে আসতে হবে। ফজরের নামাজের পর থেকেই থানার ভাইদের সঙ্গে যোগাযোগ শুরু করি। আমি, Nur Nobi ভাই এবং আরও কয়েকজন মিলে বাজার থেকে স্টাম্প কিনতে যাই। কিন্তু এই স্টাম্পগুলো সংগ্রহ করে নিরাপদে নিয়ে যাওয়া ছিলো এক কঠিন চ্যালেঞ্জ। শেষমেশ, আমি এবং আরেকজন ভাই (নামটা এখন মনে পড়ছে না), প্রায় ২০টির বেশি স্টাম্প, লাঠি ও পাইপ কিনে একটি গাড়িতে উঠি।
নিউমার্কেটের পুরাতন স্টেশন অংশে পৌঁছাতেই দেখা গেল রাস্তা বন্ধ। ছাত্র-জনতার ঢলে সকাল ১০টার আগেই পুরো এলাকা ভরে গেছে। তাই আমরা পুরাতন স্টেশন থেকে হেঁটেই রওনা হই সিটি কলেজের মোড়ের দিকে যেখানে আমাদের দায়িত্ব ছিলো সবচাইতে গুরুত্বপূর্ণ ও ভয়ংকর মোড় রক্ষার। সেই মোড়ে ইতোমধ্যে মহানগরীর ভাইয়েরা অবস্থান নিয়েছে। সাথে সাধারণ ছাত্ররাও ছিলো। আর আমাদের বিপরীতে ছিল হাসিনার পোষা প্রশাসন আর সন্ত্রাসী ছাত্রলীগ। তাদের হাতে ছিলো বুলেট, টিয়ার গ্যাস, সাউন্ড গ্রেনেড, পুরো যুদ্ধাস্ত্র। আর আমাদের হাতে? শুধু কিছু ইট-পাটকেল আর লাঠি।
এই ছিল আমাদের প্রস্তুতি। তবে, আমাদের ছিলো এমন একটি শক্তি, যা তাদের ছিলো না, আল্লাহর সাহায্য। সেদিন আমরা শুধু লাঠি হাতে নামিনি; আমরা নেমেছিলাম ঈমান, সাহস আর তাওয়াক্কুল নিয়ে। সেই ঈমানই আমাদের সবচেয়ে বড় অস্ত্র ছিলো।
বেলা বাড়ছে…
আর তার সাথে সাথে জড়ো হচ্ছে বীর চট্টলার অগণিত ছাত্র-জনতা নিউ মার্কেট মোড়ে। বেলা ১১টা নাগাদ পুরো নিউ মার্কেট পরিণত হয় এক উত্তাল ছাত্র-জনতার মিলনমেলায়। যেন ফ্যাসিবাদমুক্ত বাংলাদেশের স্বপ্ন নিয়ে একঝাঁক সাহসী তরুণ জড়ো হয়েছে এখানে। স্লোগানে স্লোগানে গর্জে উঠছে পুরো নগরী।
এই তরুণদের চোখে-মুখে মৃত্যুভয় নেই, নেই কোনো দোদুল্যমানতা। তাদের সংকল্প একটাই, হয় ফ্যাসিবাদের পতন, নয়তো জীবন বিসর্জন। কারণ তারা জানে, আবু সাঈদ, ফয়সাল আহমেদ শান্তদের রক্ত বৃথা যেতে দেওয়া চলবে না। এ রক্তের প্রতিশোধ নিতে হবে, এ লড়াই থামানো যাবে না! প্রতিটি মিনিটে, প্রতিটি মুহূর্তে ছাত্র-জনতার ঢল নেমে আসছে নিউ মার্কেট মোড়ে।
ঘড়ির কাঁটা ১২:৩০ ছুঁই ছুঁই। ঠিক তখনই সিটি কলেজের পাশ থেকে ভেসে এলো হঠাৎ গুলির শব্দ! সিটি কলেজের ভেতর থেকে একে একে বের হয়ে আসতে লাগলো অস্ত্রধারী ছাত্রলীগের সন্ত্রাসী বাহিনী। কারো হাতে পিস্তল, কারো হাতে দেশীয় অস্ত্র। ছাত্র-জনতার ওপর বেপরোয়া গুলিবর্ষণ শুরু করে দিল।
কিন্তু এই ছাত্র-জনতা তো শাহাদাতের তামান্না নিয়েই নেমেছে রাজপথে। তারা গুলির সামনে পিছু হটার জন্য আসেনি। তারা জানে, বাঁচার চেয়ে মরার গৌরব বড়। তাই ইট-পাটকেল দিয়েই শুরু হলো প্রতিরোধ!
গর্জে উঠলো সাধারণ ছাত্রদের ইমানি সাহস। সন্ত্রাসী ছাত্রলীগের গুন্ডারা প্রথমেই পিছু হটতে শুরু করলো এই প্রতিরোধের মুখে। কিন্তু তাতেই বেড়ে গেল তাদের তাণ্ডবের মাত্রা। বেপরোয়া গুলি চালিয়ে তারা ছাত্র জনতাকে ছত্রভঙ্গ করার চেষ্টা করতে লাগলো। চোখের সামনেই একের পর এক ভাই গুলিবিদ্ধ হয়ে মাটিতে লুটিয়ে পড়ছে। চারদিকে রক্ত, আর্তনাদ, ধোঁয়ার কুন্ডলী কি বিভীষিকাময় সেই মুহূর্ত! হাসিনার পোষা প্রশাসন আর ছাত্রলীগের বর্বরতা সেদিন চট্টগ্রামের রাজপথকে পরিণত করেছিল একটি রণাঙ্গনে। ছত্রভঙ্গ হয়ে যায় আমরা।
তবে আবারো চত্বরে জড়ো হতে শুরু করি আমরা। আমাদের চোখে-মুখে শোক নয়, ছিলো প্রতিজ্ঞা, এই মোড় আমরা ছেড়ে দেব না। শুরু হয় আরও এক দফা প্রতিরোধ। ইট-পাটকেলের ঝড়ে আবারো নিউ মার্কেট মোড়ের নিয়ন্ত্রণ নেয় ছাত্ররা। ইটপাটকেলের আঘাতেই ছত্রভঙ্গ হতে শুরু করে লীগ কিন্তু বেশিক্ষণ নয়। ছাত্রলীগের সশস্ত্র বাহিনী এবার আরও শক্তি, আরও পরিকল্পনা নিয়ে ফিরে আসে। প্রায় প্রতিটি সন্ত্রাসীর হাতেই আগ্নেয়াস্ত্র। গর্জে ওঠে একের পর এক বুলেট! চারপাশ কেঁপে ওঠে বিস্ফোরণের শব্দে।
ঠিক সেই মুহূর্তে আমি দাঁড়িয়ে ছিলাম সিটি কলেজের সামনের মোড়ে। আমি যে-সব দৃশ্য দেখেছি, জীবনের শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত ভুলতে পারবো কিনা জানি না! সেই তরুণ ছাত্ররা, বুক উঁচিয়ে, নিশ্চিত মৃত্যুর মুখে, বুলেটের সামনে ঝাঁপিয়ে পড়ছিলো কোনো ভয় নেই, কোনো দ্বিধা নেই। মনে হচ্ছিল, যেন শহীদের কাফেলায় নাম লেখাতেই তারা এসেছে রাজপথে।কিন্তু আশ্চর্যের বিষয় তত গুলি, এত সন্ত্রাস, তবুও অনেকেই রয়ে গেল অক্ষত! এত কাছ থেকে গুলির বৃষ্টি, তবুও যেন একটা অদৃশ্য দেয়াল রক্ষা করছিল আমাদের।
আমার হৃদয় বলেছিল তখন এটাই আল্লাহর সাহায্য। এই প্রতিরোধ শুধু ইট-পাটকেলের ছিলো না, ছিলো ঈমান, সাহস, আর আল্লাহর রহমতের এক অদৃশ্য ছায়া।
একদিক থেকে ছাত্রলীগ একের পর এক গুলি ছুড়ে চলেছে। আর তার মুখোমুখি হয়ে, হাতে শুধু লাঠি আর ইট-পাটকেল নিয়ে, প্রতিরোধ গড়ে তুলেছে ছাত্র সমাজ। আমার পাশে তখন দাঁড়িয়ে ছিলেন শিবির ১১ নম্বর মধ্যম ওয়ার্ড এর ক্রীড়া সম্পাদক, Md. Siam ভাই। ক্লাস নাইনে পড়ে তখন।
আমি ভাইকে বললাম, “ভাই, আপনি তো ছোট, এত সামনে কেন? পেছনে যান, যে কোনো সময় গুলি লাগতে পারে।”
ভাইয়ের জবাবে ছিল,
“লড়াই করবো সামনে থেকেই। মরলে সামনে থেকেই মরবো।”
আমার মনে প্রশ্ন জাগে, এই বয়সেই এই চিন্তার উৎস কোথায়?
তখনই মনে পড়ে যায় আল মাহমুদের সেই কালজয়ী লাইনগুলো:
“আমরা তো শাহাদাতের জন্যই মায়ের উদর থেকে বেরিয়েছি। হয়ত এটাই শিবির, এই চিন্তার, এই আত্মদানের উৎসস্থল। যেখানে তৈরি হয় এমন বিপ্লবী, যারা হাসিমুখেই মৃত্যুকে আলিঙ্গন করতে জানে।
লড়াই চলছে।
আমার পাশে ছিলেন ১১ নম্বর মধ্যম শাখার শিবির সভাপতি Ishtiaque Mahmud ভাই। দুজনেই একের পর এক ইট-পাটকেল ছুড়ছিলাম। হঠাৎ একটি গুলি এসে সোজা ভাইয়ের কপালে আঘাত করে। তিনি কেঁপে উঠে আমাকে ডাক দিলেন “শান্ত ভাই!”
তাকিয়ে দেখি, ভাইয়ের কপাল বেয়ে রক্ত ঝরছে অবিরত। তৎক্ষণাৎ তাঁকে ধরে মেডিকেল টিমের কাছে নিয়ে যাই। ভাইকে কিছু ভাইয়ের হাতে তুলে দিয়ে আমি আবার ফিরে যাই সিটি কলেজের মোড়ে, সেই রণক্ষেত্রে।
সেখানে ইতোমধ্যেই মহানগরের একাধিক সম্পাদক ভাই, একাধিক ওয়ার্ড সভাপতি ভাই গুলিবিদ্ধ। সাধারণ কর্মী, সাথী, সদস্য ভাইরাও কেউ বাদ যাননি। চারদিকেই রক্ত, আর্তনাদ আর লড়াই। ঠিক তখনই হঠাৎ দেখা হয় আমার স্কুলজীবনের এক পুরোনো বন্ধু ইমন এর সঙ্গে। অনেক বছর পর দেখা। আমাকে বুকে জড়িয়ে ধরে বলল “আজ হয় বিজয় নিয়ে ফিরবো, না হয় শাহাদাত বরণ করবো।” সে কোনো রাজনৈতিক দলের সঙ্গে যুক্ত কিনা, আমি জানি না।
আমরা আবারও প্রতিরোধ শুরু করি ইট-পাটকেলের ঝড় ছুঁড়তে ছুঁড়তে সামনে এগোতে থাকি। অপরদিকে, ছাত্রলীগ একের পর এক গুলি ছুড়ছে নির্বিচারে। এখনো পর্যন্ত পুলিশের কোনো উপস্থিতি দেখা যায়নি।
এই দৃশ্যের রেশ কাটতে না কাটতেই আরও কয়েকজন ভাই এগিয়ে যাচ্ছে এক মধ্যবয়স্ক রক্তাক্ত মানুষকে বহন করে। বুলেট বিধ্বস্ত তাঁর শরীর, কিন্তু কারো কণ্ঠে নেই কান্না, নেই বিলাপ। এই দৃশ্য যেন লড়াইয়ের ইন্ধনই বাড়িয়ে দিল। তবুও থামেনি ছাত্র-জনতার লড়াই। আহতদের কয়েকজন ভাই মিলে দ্রুত নিয়ে যাচ্ছেন মেডিকেল টিমের কাছে, আর বাকিরা দাঁড়িয়ে আছে ব্যারিকেড হয়ে, ইট-পাটকেল হাতে প্রতিরোধে।
বেলা ১টার দিকে পরিস্থিতি নেয় ভিন্ন মোড়। যখন ছাত্রলীগ একা ছাত্রদের মোকাবিলা করে পিছু হটাতে পারছিল না, তখন পুলিশ এসে যোগ দেয় তাদের পাশে। শুরু হয় সম্মিলিত বর্বরতা! গুলির সঙ্গে যুক্ত হয় টিয়ার গ্যাস, সাউন্ড গ্রেনেড। ছাত্ররা যারা গুলির মধ্যেও দাঁড়িয়ে ছিল, টিয়ার গ্যাসের বিষাক্ত ধোঁয়ার সামনে টিকতে পারেনি।
চত্তরের চারটি দিকের একদিক থেকে ( সিটি কলেজের মোড় থেকে) চালানো হচ্ছিল সম্মিলিত হামলা, আর বাকি তিনদিক দিয়ে ছাত্র জনতা যে যার মতো অবস্থান ত্যাগ করছিল। কারও চোখে জল, কারও হাতে রক্ত, তবুও প্রত্যেকের অন্তরে ছিল একটাই প্রতিজ্ঞা এই লড়াই শেষ নয়। এই পথচলা থামবে না।
আমাদের আগেই জানিয়ে দেওয়া হয়েছিল প্রত্যেকের ব্যাগে যেন টুথপেস্ট থাকে। কারণ টিয়ার গ্যাস নিক্ষেপ হলে সেই টুথপেস্টই হবে টিকে থাকার একমাত্র সম্বল। প্রথম দিকে যখন গ্যাস ছোঁড়া হচ্ছিল, চোখমুখ জ্বললেও টুথপেস্টে টিকে থাকা যাচ্ছিলো। কিন্তু একের পর এক, নির্বিচারে গ্যাস নিক্ষেপে এক সময় সেই টুথপেস্টও আর কাজ করছিল না। নিঃশ্বাস নেওয়াটাই তখন যুদ্ধ।
আমি নিজ হাতে অনেক ভাইয়ের চোখে-মুখে টুথপেস্ট লাগিয়ে দিচ্ছিলাম।কেউ আগুন জ্বালানোর চেষ্টা করছিল, কারণ কেবল আগুনই পারে কিছুটা প্রতিরোধ গড়তে। তবুও কাজ হচ্ছিল না। শ্বাসরুদ্ধ সেই পরিবেশে আমরা আর টিকতে পারছিলাম না। বাধ্য হয়েই পিছু হটতে শুরু করলাম। শাহ আমানতের সামনে এসে দেখি সমন্বয়ক রাফি ভাই এখনো স্লোগান দিচ্ছেন। ততক্ষণে পুরো ময়দান প্রায় ফাঁকা মাত্র হাতে গোনা কিছু মানুষ দাঁড়িয়ে আছে। এদিকে সামনে থেকে পুলিশ আর ছাত্রলীগের মিছিলের মতো আগ্রাসন আসছে। রাফি ভাইকে দ্রুত সরিয়ে নেয় একটি টিম।
আমরা তখন বাম দিকের রাস্তায় গিয়ে আগুন জ্বালানোর চেষ্টা করি কিন্তু আগুন জ্বলে ওঠার আগেই পুলিশ একেবারে আমাদের গা ঘেঁষে চলে আসে। আগুন রেখে পালিয়ে যেতে হয়। অনেক ছাত্রজনতা আশ্রয় নিয়েছিল দোকানপাট, হকার মার্কেট, কিংবা বাসাবাড়ির ভেতর। কিন্তু আমরা এখনো রাজপথে ময়দানে, লড়াইয়ের জায়গাতেই।
পুলিশ আর ছাত্রলীগের মুখোমুখি হতে হতে আমরা পিছু হটে গিয়ে ওয়াসার মোড়ে পৌঁছাই। তখন শরীর আর চলছিল না। মনে হচ্ছিল এই বুঝি জীবনের অন্তিম মুহূর্ত।
আর কতদূর?
আর কতক্ষণ চলবে পায়ের চাকা?
আমরা তো মেশিন না!
পেছনে থেকে তখন সাঁজোয়া যান নিয়ে ধেয়ে আসছে পুলিশ, সাথে সন্ত্রাসী ছাত্রলীগ। আমরা আর দৌড়াতেও পারছিলাম না। ঠিক সেই মুহূর্তে সামনে দেখি সেনাবাহিনীর একটি দল। তারা আমাদের কাছে এগিয়ে আসে, আশ্রয় দেয়, নিরাপত্তা দেয়। মনে হচ্ছিল যদি সেদিন সেনাবাহিনী না থাকত, তাহলে সেই দিনটাই হয়তো হতো আমাদের জীবনের শেষ দিন। এই অভিজ্ঞতা শুধু একটি আন্দোলনের কাহিনি নয় এটা এক প্রজন্মের সহ্যশক্তি, আত্মত্যাগ আর ঈমানের গৌরবগাঁথা।
ওয়াসার মোড়ে সেনাবাহিনীর ভূমিকা ছিলো তারা পুলিশ আর সেনাবাহীকে সামনে আসতে বাধা দেয়। তারে আমরা প্রায় ৪০-৫০ জন ওয়াসার মোড়েই অবস্থান নেয়। পথে পথে শত শত ছাত্র জনতা এদিক সেদিক করে অবস্থান ত্যাগ করে। তাই মাত্র ৪০-৫০ জনের মতোই শুরুতে সেখানে ছিলো। আমার সাথে ছিলো মহানগর দক্ষিণের সদস্য ইস্তিয়াক মাহমুদ ভাই যিনি কিছুক্ষণ পূর্বের গুলিবিদ্ধ হয়েছিলো। আরো ছিলো, সদস্য Shafayat Imam Al Fahim ভাই, বাহ উদ্দীন সায়েদ ভাই, Mohammad Abu Jobayer Hossen ভাই, সাথী Mohammad Abu Bakar, নূর নবি ভাই সহ আরো অনেকে এই মুহূর্তে এতোদিন পর সবার কথা মনে আসছে না। Niaz Mahamud ভাই এর সাথেও সেখানে দেখা হয়।
সেখানে উপস্থিত সকলে প্রথমে ওয়াসার মোড়ে অবস্থান নেয়। স্লোগান দিতে থাকে। আমরা শিবিরের ভাইয়েরা পাশেই ডিভাইডারের উপর বসি। এরমধ্যে সেখানে লীগের কিছু লোক সাধারণ ছাত্র সেজে চলে আসে আমাদের আন্দোলনে। তারা ছাত্রদের বলে তারা যেন লালখান বাজারের দিকে চলে যায়। সেখানে অনেক ছাত্র ভাইয়েরা আছে। তবে এটা ছিলো পুরো মিথ্যা। লালখান বাজারের দিকে ছাত্রলীগ অস্ত্র সহ দাঁড়িয়ে ছিলো। আমরা মহানগীর বিভিন্ন দায়িত্বশীলদের সাথে যোগাযোগ করে জানতে পারি বিষয়টি। যেহেতু সাধারণ ছাত্রদের যোগাযোগের কোনো মাধ্যম ছিলো না তাই তারা ছাত্র বেশে আসা লীগের পোলাপানদের কথায় প্ররোচিত হয় স্থান ত্যাগ করে লালখান বাজার যেতে রাজি হয়। এই অবস্থা দেখে আমি দৌড়ে গিয়ে সবাইকে বললাম এখানে সেনাবাহিনী আছে। আমরা এখানে সেইফ। লালখানে লীগের অবস্থানের বিষয়টিও জানালাম। সবাই আমার সাথে সম্মতি প্রকাশ করলো এবং সেখানেই গোল হয়ে বসে স্লোগান দিতে থাকে।
ওয়াসার মোড়ে আমরা তখন সংখ্যায় খুবই অল্প। হঠাৎ করেই আশেপাশের অলিগলি থেকে একাধিকবার ছাত্রলীগ আক্রমণের চেষ্টা করে। এই এলাকাতেই ছাত্রলীগের এক বড় নেতার বাসা সেখান থেকেও হামলার চেষ্টা করা হয়। এই উত্তেজনাকর মুহূর্তে আমরা দ্রুত দুটি দল গঠন করি। একটি জিইসি মোড়ের দিকে, আরেকটি লালখান বাজারের দিকে যায় ব্র্যাকেটের দায়িত্ব পালন করবে। মাঝখানে কিছু ভাই ও বোনেরা ওয়াসার মোড়েই অবস্থান নিবে। সেখানেও ছাত্রজনতার গর্জন যেন কাঁপিয়ে দিচ্ছিল চট্টগ্রামের আকাশ বাতাস।
এর মধ্যে বিভিন্ন এলাকা থেকে নতুন করে বহু ছাত্রছাত্রী এসে হাজির হন সেখানে। লালখান বাজার থেকে শাইখ হারুন ইজহার এর মাদ্রাসার অনেক ছাত্ররা আমাদের সাথে যুক্ত হয়। তারা বেশকিছু হেন্ড মাইক দিয়ে আমাদের হেল্প করেছিলো।
ভিড়টা আবারও ঘন হতে থাকে। সেই সময় ওয়াসার মোড়ে উপস্থিত হন চট্টগ্রামের সহ-সমন্বয়ক মাসফিক ভাই। ঠিক তখনই খবর আসে নিউমার্কেট এলাকার দোকান ও হকার মার্কেটে আশ্রয় নেওয়া ভাই-বোনদের উপর ছাত্রলীগ নির্মম হামলা শুরু করেছে। আর টাইগার পাস মোড়েও একই ধরনের আক্রমণের খবর আসে। মাসফিক ভাই ও উপস্থিত কয়েকজন ভাইয়ের সাথে আমরা পরামর্শ করি টাইগার পাসের দিকে বা নিউমার্কেটের দিকে মুভ করবো কি না?
সব দিক বিবেচনা করে সিদ্ধান্ত হয় আমরা এখানেই, ওয়াসার মোড়েই, অবস্থান বজায় রাখবো। কারণ এখান থেকে বিচ্ছিন্ন হলে এই জায়গাটিও শত্রুর হাতে চলে যেতে পারে। ওয়াসার মোড় তখন শুধু একটি অবস্থানের নাম নয়, সেটা হয়ে উঠেছিল ছাত্র-জনতার পুনরুজ্জীবনের প্রতীক। একটি ধ্বংসস্তূপের মাঝখানে দাঁড়িয়ে থাকা অদম্য একটি পতাকা।
দুপুর গড়িয়ে বিকেল নামতে শুরু করল। আমরা পাশের এক মসজিদে পালাক্রমে নামাজ শেষ করলাম। বিকেল বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে চিন্তা বাড়তে লাগল, এখান থেকে কীভাবে নিরাপদে বের হওয়া যাবে? কারণ চারদিকেই ছিলো ছাত্রলীগের কড়া ঘেরা। অবস্থা এমন, সিদ্ধান্ত নিতে পারছিলাম না কোথায় যাব। আমি মাসফিক ভাইসহ কয়েকজন সেনাবাহিনীর কাছে গেলাম, তাদের অনুরোধ করলাম আমাদের নিরাপদ এক্সিটের ব্যবস্থা করে দিতে। সেনাবাহিনী জানাল, এমইএস কলেজের সামনে দিয়ে এক্সিট করলেই হবে। কিন্তু এমইএস কলেজও ছাত্রলীগের আঁতুড়ঘর, যেমনটা সিটি কলেজ ছিল। তাই আমরা তাদের প্রস্তাবে রাজি হলাম না।
একই সময়ে মহানগরের ভাইদের সঙ্গে যোগাযোগ শুরু করলাম।
সবার মধ্যে ভীতি বিরাজ করছিল কারণ সন্ধ্যা আসছে, আর সন্ধ্যায় হামলার তীব্রতা আরও বাড়ার আশঙ্কা ছিল। সন্ধ্যার আগেই নিউ মার্কেট ও টাইগার পাসে থাকা ভাইরা ওয়াসার মোড়ে এসে পৌঁছালো। তারা যখন মিছিল নিয়ে আমাদের দিকে এগিয়ে আসতে থাকলো আর সবাই যখন একত্রিত হলাম, তখন এমন আমেজ ছিল মনে হচ্ছিল আজ ঈদ উদ্যাপন করছি, যেন হারিয়ে যাওয়া রক্তের বন্ধুত্ব আর সম্পর্ক আবার ফিরে পেয়েছি।
পরে জানলাম, যখন ছাত্রলীগ নিউ মার্কেটের ভাইদের ওপর আক্রমণ চালায়, সেনাবাহিনী সেখানেও তাদের রক্ষা করেছিলো। সেই সহযোগিতায় আমরা সবাই একত্রিত হয়ে ওয়াসার মোড়ে মিলিত হয়েছি।
সেদিনের রক্তক্ষয়ী যুদ্ধে আমরা বিচ্ছিন্ন হলেও, আবারো এক হয়ে উঠলাম ওয়াসার মোড়ে। ওয়াসা থেকে মিছিল নিয়ে আমরা যাত্রা শুরু করলাম ষোলশহরের দিকে। সেখানে সেদিনের কর্মসূচি শেষে।
ষোলশহর থেকে আমরা কয়েকজন হেঁটে একটু দূরে সরলাম। কারণ সেদিন ফ্রন্টলাইনে থাকার কারণে, আর আমাদের সঙ্গে সহ-সমন্বয়ক মাসফিক ভাই থাকার কারণে দ্রুত সেইফ এক্সিট নেওয়ার প্রয়োজন ছিল। তাই আমরা মিছিল থেকে সরে এসে সিএনজিতে উঠলাম।
এভাবেই চট্টগ্রামের শেষ মহাযুদ্ধের পরিসমাপ্তি ঘটে। সেদিনের সেই সংগ্রাম শুধু একটি আন্দোলনের গল্প নয়, এক প্রজন্মের সাহস, আত্মত্যাগ এবং অদম্য ইমানের সাক্ষী হয়ে রইল।