ইসলাম কী অমুসলিমদের সাথে বন্ধুত্ব করতে নিষেধ করে?

ইসলাম কী অমুসলিমদের সাথে বন্ধুত্ব করতে নিষেধ করে?

ইসলাম কী অমুসলিমদের সাথে বন্ধুত্ব করতে নিষেধ করে?

অনেক অমুসলিম দাবি করেন যে, ইসলাম অমুসলিমদের সাথে কোনো ধরনের বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক রাখতে সম্পূর্ণ নিষেধ করে, যা ইসলামকে সাম্প্রদায়িক বা অসহিষ্ণু ধর্ম হিসেবে চিত্রিত করে। কিন্তু পবিত্র কুরআনের আয়াতগুলো নিরপেক্ষভাবে পড়লে দেখা যায়, এ দাবি প্রায়শই ভুল ব্যাখ্যার উপর ভিত্তি করে। ইসলাম অমুসলিমদের সাথে সম্পর্কের একটি সুস্পষ্ট ও ভারসাম্যপূর্ণ মূলনীতি দিয়েছে, যা শান্তি, ন্যায় ও সদাচরণকে উৎসাহিত করে, কিন্তু শত্রুতা ও ধর্মীয় যুদ্ধের ক্ষেত্রে সতর্কতা অবলম্বন করতে বলে। অমুসলিমদের সাথে বন্ধুত্ব স্থাপনের মূলনীতি আল্লাহ তা;আলা পবিত্র কুরআনেই দিয়েছেন। আল্লাহ তা’আলা বলেন, 
দীনের ব্যাপারে যারা তোমাদের সাথে যুদ্ধ করেনি, আর তোমাদেরকে তোমাদের ঘর-বাড়ী থেকে বের ক’রে দেয়নি তাদের সঙ্গে সদয় ব্যবহার করতে আর ন্যায়নিষ্ঠ আচরণ করতে আল্লাহ নিষেধ করেন নি। আল্লাহ ন্যায়পরায়ণদেরকে ভালবাসেন। আল্লাহ তোমাদেরকে কেবল তাদের সঙ্গে বন্ধুত্ব করতে নিষেধ করেছেন যারা তোমাদের সঙ্গে দীনের ব্যাপারে যুদ্ধ করেছে, তোমাদেরকে তোমাদের ঘর-বাড়ী থেকে বের করে দিয়েছে আর তোমাদেরকে বের করে দেয়ার ব্যাপারে সাহায্য করেছে। যারা তাদের সঙ্গে বন্ধুত্ব করে তারাই যালিম। (( ১. (60:8) Al-Mumtahina | (৬০:৮) আল-মুমতাহিনা-অনুবাদ/তাফসীর  ২.    (60:9) Al-Mumtahina | (৬০:৯) আল-মুমতাহিনা-অনুবাদ/তাফসীর  ))
এ আয়াত দুটিতে পরিষ্কারভাবে বলা হয়েছে:
  • যারা মুসলিমদের বিরুদ্ধে ধর্মের কারণে যুদ্ধ করে না, বিতাড়িত করে না—তাদের সাথে সদয়তা এবং ন্যায়বিচার করতে কোনো নিষেধ নেই। আল্লাহ ন্যায়পরায়ণদের ভালোবাসেন।
  • নিষেধ শুধুমাত্র তাদের সাথে যারা মুসলিমদের বিরুদ্ধে শত্রুতা করে।
এটাই ইসলামের মূলনীতি: শান্তিপূর্ণ অমুসলিমদের সাথে ভালো ব্যবহার, সহযোগিতা ও বন্ধুত্ব জায়েজ; কিন্তু ধর্মীয় শত্রুতা পোষণকারীদের সাথে ঘনিষ্ঠতা নিষিদ্ধ।

আহলে কিতাবের সাথে শালীন আচরণের নির্দেশ

আল্লাহ তা’আলা আরো বলেন, 
আর তোমরা উত্তম পন্থা ছাড়া আহলে কিতাবদের সাথে বিতর্ক করো না। তবে তাদের মধ্যে ওরা ছাড়া, যারা যুলুম করেছে। আর তোমরা বল, ‘আমরা ঈমান এনেছি আমাদের প্রতি যা নাযিল করা হয়েছে এবং তোমাদের প্রতি যা নাযিল করা হয়েছে তার প্রতি এবং আমাদের ইলাহ ও তোমাদের ইলাহ তো একই। আর আমরা তাঁরই সমীপে আত্মসমর্পণকারী’। (( (29:46) Al-Ankabut | (২৯:৪৬) আল-আনকাবূত-অনুবাদ/তাফসীর ))
এ আয়াতে আহলে কিতাব (ইহুদি-খ্রিস্টান)দের সাথে মার্জিত, শালীন ও উত্তম উপায়ে আলোচনা করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। যদি অমুসলিম হওয়া মাত্র শত্রুতা করতে হতো, তাহলে এমন শালীন আচরণের নির্দেশের কোনো অর্থ থাকত না।

অমুসলিমদের বিবাহের অনুমতি

পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তা’আলা বলেন,
আজ তোমাদের জন্য বৈধ করা হল সব ভাল বস্তু এবং যাদেরকে কিতাব প্রদান করা হয়েছে, তাদের খাবার তোমাদের জন্য বৈধ এবং তোমাদের খাবার তাদের জন্য বৈধ। আর মুমিন সচ্চরিত্রা নারী এবং তোমাদের পূর্বে যাদেরকে কিতাব দেয়া হয়েছে, তাদের সচ্চরিত্রা নারীদের সাথে তোমাদের বিবাহ বৈধ। যখন তোমরা তাদেরকে মোহর দেবে, বিবাহকারী হিসেবে, প্রকাশ্য ব্যভিচারকারী বা গোপনপত্নী গ্রহণকারী হিসেবে নয়। আর যে ঈমানের সাথে কুফরী করবে, অবশ্যই তার আমল বরবাদ হবে এবং সে আখিরাতে ক্ষতিগ্রস্তদের অন্তর্ভুক্ত। (( (5:5) Al-Ma'ida | (৫:৫) আল-মায়েদা-অনুবাদ/তাফসীর ))
ইসলাম মুসলিম পুরুষদের জন্য আহলে কিতাবের সচ্চরিত্রা নারীদের বিবাহের অনুমতি দিয়েছে। এটি অমুসলিমদের সাথে সবচেয়ে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক (বিবাহ) অনুমোদন করে, যা সাধারণ বন্ধুত্বের চেয়েও গভীর। যদি ইসলাম অমুসলিমদের সাথে সব সম্পর্ক নিষিদ্ধ করত, তাহলে এ অনুমতি কখনোই আসত না। কাজেই, ইসলাম অমুসলিমদের সাথে বন্ধুত্ব নিষেধ করে না—বরং শান্তিপূর্ণ, ন্যায়পরায়ণ অমুসলিমদের সাথে ভালো ব্যবহার, সহযোগিতা ও বন্ধুত্বকে উৎসাহিত করে। নিষেধ শুধুমাত্র ধর্মীয় শত্রুতা পোষণকারীদের সাথে ঘনিষ্ঠ আনুগত্যের ক্ষেত্রে। এ নীতি যুগ যুগ ধরে মুসলিম সমাজে প্রতিফলিত হয়েছে—প্রতিবেশী, সহকর্মী, বন্ধু হিসেবে অমুসলিমদের সাথে মেলামেশা। অমুসলিমদের দাবি যে “ইসলাম অমুসলিমদের সাথে বন্ধুত্ব নিষেধ করে” তা ভুল ব্যাখ্যা বা আয়াতের অংশবিশেষ নিয়ে সাধারণীকরণের ফল।

যদি ইসলাম অমুসলিমদের সাথে বন্ধুত্ব করতে বলে তাহলে কুরআনের অনেক আয়াতে কেন বন্ধুত্ব করতে নিষেধ করা হয়েছে?

পবিত্র কুরআনের অনেক আয়াতে সরাসরি অমুসলিমদের সাথে বন্ধুত্ব করতে নিষেধ করা হয়েছে। সেই আয়াতগুলো ভুল ব্যাখ্যা করে অমুসলিমরা দাবি করেন ইসলাম অমুসলিমদের সাথে বন্ধুত্ব করতে নিষেধ করেন।

সূরা মায়েদা ৫১ নং আয়াত

অনেকে সূরা আল-মায়িদা (৫:৫১) আয়াতটিকে ভুলভাবে ব্যাখ্যা করে দাবি করেন যে, ইসলাম অমুসলিমদের (বিশেষ করে ইহুদি ও খ্রিস্টানদের) সাথে কোনো ধরনের বন্ধুত্ব নিষেধ করে। কিন্তু আয়াতটির প্রেক্ষাপট, শব্দের অর্থ এবং তাফসীরগুলো দেখলে বোঝা যায় যে, এটি সাধারণ বন্ধুত্ব নয়—বরং ঘনিষ্ঠ রাজনৈতিক আনুগত্য, অভিভাবকত্ব বা মিত্রতা (আরবিতে আওলিয়া ) নিষেধ করে, যা মুসলিমদের ক্ষতি করে বা ইসলামের স্বাতন্ত্র্য নষ্ট করে।

আল্লাহ তা'আলা পবিত্র কুরআনে বলেন,
হে মুমিনগণ, ইয়াহূদী ও নাসারাদেরকে তোমরা বন্ধুরূপে গ্রহণ করো না। তারা একে অপরের বন্ধু। আর তোমাদের মধ্যে যে তাদের সাথে বন্ধুত্ব করবে, সে নিশ্চয় তাদেরই একজন। নিশ্চয় আল্লাহ যালিম কওমকে হিদায়াত দেন না। (( (5:51) Al-Ma'ida | (৫:৫১) আল-মায়েদা-অনুবাদ/তাফসীর ))
এই আয়াতের ব্যাখ্যায় তাফসীরে মা'আরেফুল কুরআনে বলা হয়েছে,
মুসলমানরা অমুসলিমদের সাথে উদারতা, সহানুভূতি, শুভেচ্ছা, ন্যায়বিচার, অনুগ্রহ ও সদ্ব্যবহার করতে পারে এবং করাও উচিত। কারণ, ইসলামের শিক্ষা তা-ই। কিন্তু তাদের সাথে এমন ঘনিষ্ঠ বন্ধুত্ব ও মেলামেশা করার অনুমতি নেই, যার ফলে ইসলামের স্বাতন্ত্র্যের লক্ষণসমূহ মিশ্রিত হয়ে যায়। (( তাফসীরে মা'আরেফুল কুরআনে; খন্ড নংঃ ৩; পৃষ্টা নংঃ ১৪৬ ))
কাজেই এই আয়াত থেকে এটা প্রমাণিত হয়না যে অমুসলিমদের সাথে বন্ধুত্ব করা যাবেনা। বরং, বলা হচ্ছে এমন ঘনিষ্ঠ বন্ধুত্ব ও মেলামেশা করার অনুমতি নেই, যার ফলে ইসলামের স্বাতন্ত্র্যের লক্ষণসমূহ মিশ্রিত হয়ে যায়। অন্যান্য বিখ্যাত তাফসীরেও (যেমন ইবনে কাসীর, তাবারী, কুরতুবী) একই কথা: এটি আওলিয়া অর্থে ঘনিষ্ঠ আনুগত্য নিষেধ করে, যা ইসলামের বিরুদ্ধে যায় বা মুসলিমদের ক্ষতি করে। সাধারণ প্রতিবেশীত্ব, ব্যবসা, সহযোগিতা, ভালো ব্যবহার—এসব জায়েজ।

ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট (আসবাবুন নুযুল)

এ আয়াত মদীনায় অবতীর্ণ হয়েছে, যখন মুসলিম উম্মাহ নতুন করে গড়ে উঠছিল এবং মক্কার কাফিররা আক্রমণের পরিকল্পনা করছিল। মদীনার কিছু ইহুদি গোত্র (যেমন বনু কাইনুকা, বনু নাদীর) মুসলিমদের সাথে চুক্তি করেছিল, কিন্তু তারা গোপনে মক্কার সাথে যোগাযোগ করে মুসলিমদের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করছিল। কিছু মুনাফিক (যেমন আব্দুল্লাহ ইবনে উবাই) এবং কিছু মুসলিমও পুরনো গোত্রীয় সম্পর্কের কারণে তাদের সাথে ঘনিষ্ঠ মিত্রতা বজায় রাখতে চাইছিল, যা উম্মাহর জন্য বিপদজনক ছিল। আয়াতটি এই পরিস্থিতিতে নাযিল হয়েছে—মুসলিমদের সতর্ক করে যে, শত্রুতাপূর্ণ বা ইসলাম-বিরোধীদের সাথে এমন রাজনৈতিক/আনুগত্যের সম্পর্ক রাখা যাবে না, যা মুসলিমদের ক্ষতি করে।

তাফসিরে জালালাইনে উক্ত আয়াতের প্রেক্ষাপটে বর্ণণা করা হয়েছে, (( তাফসীরে জালালাইন; খন্ড নংঃ ২; পৃষ্ঠাঃ ১৪৯-১৫০ ))

অমুসলিমদের দাবি যে “ইসলাম অমুসলিমদের সাথে বন্ধুত্ব নিষেধ করে” তা ভুল ব্যাখ্যা। ৫:৫১ আয়াতটি শত্রুতাপূর্ণ বা ক্ষতিকর আনুগত্য নিষেধ করে, সাধারণ বন্ধুত্ব নয়। ইসলামের মূলনীতি হলো ন্যায়, শান্তি ও মানবিকতা—যা প্রতিবেশী, সহকর্মী, বন্ধু হিসেবে অমুসলিমদের সাথে মেলামেশাকে অনুমোদন করে, যতক্ষণ ঈমান ও ইসলামের স্বাতন্ত্র্য অটুট থাকে।

Leave a Comment