কোয়ান্টাম ফিল্ডে কি কার্য-কারণ নীতি অকার্যকর? কোয়ান্টাম ফিল্ডে কার্য-কারণ নীতি এবং কালাম কসমোলজিক্যাল আর্গুমেন্ট।
কালাম কসমোলজিক্যাল আর্গুমেন্টের একটি মৌলিক প্রস্তাবনা হলো “মহাবিশ্বের একটি সূচনা বা শুরু রয়েছে।” আর যেহেতু যার সূচনা আছে তার একটি কারণও রয়েছে, তাই মহাবিশ্বেরও একটি কারণ থাকা আবশ্যক। কারণের এই নীতিকে কার্য-কারণ নীতি বলে। আমরা আমাদের চারপাশে যে-সব জিনিস দেখি যেমন, চেয়ার, টেবিল, গাছপালা, ঘরবাড়ি ইত্যাদি। এগুলো কোনো কিছুই চিরকাল অস্তিত্বে ছিল না। বরং একটা সময়ে অনস্তিত্ব থেকে অস্তিত্বে এসেছে। এবং কোনো কারণ ছাড়াই এগুলো এমনি এমনি বা শূণ্য থেকে অস্তিত্বে চলে এসেছে এমন দাবিও যৌক্তিক নয়। তাই অবশ্যই অস্তিত্বের জন্য কোনো কারণ প্রয়োজন।
এই কারণের ব্যাখ্যা শেষ পর্যন্ত একজন স্রষ্টার অস্তিত্বের দিকেই নির্দেশ করে। স্বাভাবিকভাবেই, এই যুক্তি নাস্তিক্যবাদের পরিপন্থী হওয়ায় তা খণ্ডন করতে গিয়ে নাস্তিক চিন্তাবিদরা প্রায়ই দাবি করেন কোয়ান্টাম ফিল্ডে কার্য-কারণ নীতি কার্যকর নয়। তাদের মতে, এখানে কোনো প্রভাব ঘটার জন্য কারণের প্রয়োজন হয় না। সুতরাং কালামের প্রথম প্রস্তাবনা “যা কিছু অস্তিত্বে আসে তার একটি কারণ থাকে” সত্য নয়, আর প্রস্তাবনা সত্য না হলে পুরো যুক্তিটিই ভেঙে যায়। কিন্তু প্রশ্ন হলো এ দাবিটি কি সত্যিই সঠিক?
কার্য-কারণ কী?
শুরুতেই আমরা জেনে নিই, কার্য-কারণ নীতি আসলে কী। কার্য-কারণ নীতি বলে—একটি ঘটনার ফলাফল তার পূর্ববর্তী কারণের উপর নির্ভরশীল, এবং কোনো ফলাফল পূর্ববর্তী কারণ ছাড়া ঘটে না।
যেমন, আপনি যদি একটি বল ছুঁড়েন, তবে বলের গতিবেগ ও অবস্থান সম্পূর্ণভাবে নির্ভর করে আপনার ছোড়ার ক্রিয়ার উপর। বল নিজে থেকে হঠাৎ অন্যদিকে যাবে না। এখানে কার্যকারণ সুস্পষ্ট।
কারণ → ফলাফল।
কোয়ান্টম ফিল্ড কী?
কোয়ান্টাম ফিল্ড থিওরি (Quantum Field Theory, QFT) বলছে, আমাদের চারপাশের সব কণা ( যেমন ইলেকট্রন, ফোটন, কুয়ার্ক ) কোনো স্থির “বিন্দু” নয়, বরং একটি ফিল্ডের কম্পন বা উত্তেজনার আকারে বিদ্যমান। অর্থাৎ, কণা নিজেই মূলত ফিল্ডের একটি manifestation, field‑এর কম্পনই কণার আকার ধারণ করে। সহজভাবে ধরতে গেলে, এটি সমুদ্রের জল ও ঢেউয়ের মতো। সমুদ্রের জল হলো field, আর ঢেউ হলো field‑এর উত্তেজনা। QFT‑তে কণাও ঠিক ঢেউয়ের মতো field‑এর একটি উত্তেজনা। আরেকটি উদাহরণ হলো পিয়ানো। প্রতিটি key হলো field‑এর একটি বিন্দু। কোনো key চাপলে শব্দের কম্পন আসে; সেই শব্দ হলো কণা। অর্থাৎ field‑এর উত্তেজনা → particle। সংক্ষেপে বলা যায়, কোয়ান্টাম ফিল্ড হলো “এক ধরনের প্রাথমিক বাস্তবতা যা পুরো স্পেস জুড়ে ছড়ানো আছে, আর কণা হলো সেই ফিল্ডের স্থানীয় কম্পন বা উত্তেজনা।” QFT এই ধারণার মাধ্যমে কণার জন্ম, ধ্বংস, এবং একে অপরের সঙ্গে ক্রিয়ার ব্যাখ্যা করে, এবং দেখায় যে প্রকৃতির মৌলিক কণা ও শক্তি ফিল্ডের বিভিন্ন মাত্রায় সংঘটিত হয়।কোয়ান্টাম ভ্যাকুয়াম: শূন্য নয়, এক ভৌত বাস্তবতা
প্রথমত, কোয়ান্টাম ফিল্ড বা ভ্যাকুয়াম কোনো প্রকৃত শূন্যতা নয়। বরং এটি একটি ভৌত অবস্থা, যেখানে পদার্থবিজ্ঞানের নিয়ম কার্যকর।
কোয়ান্টাম ভ্যাকুয়াম হলো ক্ষণস্থায়ী শক্তির অবস্থা, যেখান থেকে কণা–প্রতিকণা জোড়া গঠিত হয় এবং মুহূর্ত পরেই আবার শক্তিতে বিলীন হয়ে যায়।
অতএব, এটি কোনো “অস্তিত্বহীন” শূন্যতা নয়, বরং একটি বাস্তব ভৌত ক্ষেত্র। দার্শনিক উইলিয়াম লেন ক্রেইগ তার The Kalām Cosmological Argument: Scientific Evidence for the Beginning of the Universe গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন;
একটি ভ্যাকুয়ামকে সাধারণত খালি স্থান বলে মনে করা হয়, কিন্তু আধুনিক কণা পদার্থবিদ্যা অনুসারে ভ্যাকুয়াম হল একটি ভৌত বস্তু, যা শক্তির ঘনত্ব এবং চাপ দিয়ে সমৃদ্ধ। (( William Lane Craig Paul Copan; The Kalām Cosmological Argument; Scientific Evidence for the Beginning of the Universe; Page: 151 ))কোয়ান্টাম ভ্যাকুয়াম বা শূন্যতা কোনো প্রকৃত অর্থে শূন্য স্থান নয়। সেখানে পদার্থের নিয়ম চলে। কোয়ান্টাম শূন্যতা হচ্ছে ক্ষণস্থায়ী শক্তির অবস্থা। আর সেই শক্তি থেকেই প্রতিনিয়ত জোড়ায় জোড়ায় তৈরি হয় কণা ও প্রতিকণা। যারা পুনরায় ধ্বংস হয়ে আবার শক্তিতে পরিণত হয়ে যায়। সুতরাং, কোয়ান্টাম ভ্যাকুয়াম বা শূন্যতা মানে ভৌত কিছু। (( Physics - The Force of Empty Space ))
কার্যকারণ ও কোয়ান্টাম থিওরি
আমেরিকান ফিজিক্যাল সোসাইটির Physical Review A জার্নালে প্রকাশিত গবেষণায় দেখা যায়; কোয়ান্টাম থিওরিকে কেবল পদার্থবিজ্ঞানের নিয়ম দিয়েই নয়, বরং তথ্যের নীতি দিয়েও ব্যাখ্যা করা সম্ভব। যদি আমরা কিছু সাধারণ নীতি মেনে চলি—
-
ভবিষ্যৎ সর্বদা অতীতের উপর নির্ভরশীল (কার্যকারণ),
-
দুটি ভিন্ন জিনিসকে আলাদা হিসেবে ধরা যাবে (perfect distinguishability),
-
তথ্য সর্বনিম্ন জায়গায় রাখা সম্ভব হবে কিন্তু হারাবে না (ideal compression),
-
আলাদা সিস্টেম কাছ থেকে মেপেও পার্থক্য করা যাবে (local distinguishability),
-
একটি সিস্টেমকে অন্যটির সাথে যুক্ত করলে অবশিষ্টাংশ স্বচ্ছ থাকবে (pure conditioning)
তাহলেই আমরা তথ্য-ব্যবস্থার সাধারণ নিয়ম পাই। আর এর সাথে যদি purification principle যুক্ত করা হয়—অর্থাৎ অসম্পূর্ণ তথ্য আসলে বৃহত্তর পূর্ণাঙ্গ তথ্যের অংশ—তাহলেই এই নিয়মগুলো থেকে সরাসরি কোয়ান্টাম মেকানিক্স বের হয়ে আসে। (( Informational derivation of quantum theory - Astrophysics Data System ))
এতে স্পষ্ট হয়, কোয়ান্টাম থিওরিতেও কার্যকারণ একটি মৌলিক শর্ত হিসেবে রয়ে গেছে।