ইবনে হাজার আসকালানী (রহ) কি বলেছেন উম্মে হানী (রাঃ) এর ঘরে রাসুল (সাঃ) রাতে ঘুমিয়ে ছিলেন?
Foto Fig
06 Jan, 2026
334 বার পঠিত
ইবনে হাজার আসকালানী (রহ) কি বলেছেন উম্মে হানী (রাঃ) এর ঘরে রাসুল (সাঃ) রাতে ঘুমিয়ে ছিলেন?
মেরাজের রাতে রাসূলুল্লাহ ﷺ উম্মে হানী রাদিয়াল্লাহু আনহার ঘরে অবস্থান করেছিলেন এ মর্মে যে দাবি বঙ্গীয় নাস্তিক মহল করে থাকে, তা ইতিপূর্বে একাধিকবার তাহকিক ও উসূলুল হাদীসের মানদণ্ডে অগ্রহণযোগ্য প্রমাণিত হয়েছে। অর্থাৎ, এই দাবির পক্ষে তারা যে মূল ভিত্তি দাঁড় করাতে চায়, তা প্রামাণ্যতার মানদণ্ডে ব্যর্থ হয়েছে। কিন্তু দুঃখজনক বাস্তবতা হলো যখন কোনো দাবি দলীলগতভাবে ভেঙে পড়ে, তখন তারা ইনসাফের পথ পরিত্যাগ করে অসৎ কৌশল অবলম্বন করে। এরই অংশ হিসেবে তারা কখনো আলেমদের বক্তব্য বিকৃতভাবে উপস্থাপন করে, কখনো উসূলুল হাদীসের স্বীকৃত নীতিমালার বিরুদ্ধে গিয়ে আবেগতাড়িত ও অশালীন মন্তব্য করতে থাকে যেমন; বঙ্গীয় নাস্তিকদের একটি পরিচিত কৌশল হলো “অমুক আলেম বলেছেন, অমুক কিতাবে এসেছে, অমুকে এমন মত দিয়েছেন। যদি গ্রন্থাগার বর্ণনা সহিহ না মনে করতেন তাহলে কি আনতেন "এই ধরনের অস্পষ্ট ও ইসলামী মৌলিক নীতির পরিপন্থী দাবির মাধ্যমে সাধারণ পাঠককে বিভ্রান্ত করে।
আজকের আলোচনার বিষয় হলো তাদের ব্লগে উত্থাপিত একটি নির্দিষ্ট দাবি। দাবিটি সংক্ষেপে এই যে: “ইবনে হাজার আসকালানী (রহ.) নাকি বলেছেন মেরাজের রাতে রাসূলুল্লাহ ﷺ উম্মে হানী রাদিয়াল্লাহু আনহার ঘরে ছিলেন।”
এই দাবির পক্ষে তারা ইমাম ইবনে হাজার আসকালানী (রহ.)-এর ‘ফাতহুল বারী’ থেকে একটি উদ্ধৃতি পেশ করে থাকে।
"قوله في الحطيم وربما قال في الحجر هو شك من قتادة كما بينه أحمد عن عفان عن همام ولفظه بينا أنا نائم في الحطيم وربما قال قتادة في الحجر والمراد بالحطيم هنا الحجر... لكن المراد هنا بيان البقعة التي وقع ذلك فيها ومعلوم أنها لم تتعدد لأن القصة متحدة لاتحاد مخرجها وقد تقدم في أول بدء الخلق بلفظ بينا أنا عند البيت وهو أعم ووقع في رواية الزهري عن أنس عن أبي ذر فرج سقف بيتي وأنا بمكة وفي رواية الواقدي بأسانيده أنه أسري به من شعب أبي طالب وفي حديث أم هانئ عند الطبراني أنه بات في بيتها قال ففقدته من الليل فقال إن جبريل أتاني والجمع بين هذه الأقوال أنه نام في بيت أم هانئ وبيتها عند شعب أبي طالب ففرج سقف بيته وأضاف البيت إليه لكونه كان يسكنه فنزل منه الملك فأخرجه من البيت إلى المسجد فكان به مضطجعا وبه أثر النعاس ثم أخرجه الملك إلى باب المسجد فأركبه البراق وقد وقع في مرسل الحسن عند بن إسحاق أن جبريل أتاه فأخرجه إلى المسجد فأركبه البراق وهو يؤيد هذا الجمع¹
তাঁর কথা "হাতিম" এ’ এবং কখনো তিনি বলেছেন "হিজর"এ এটি মূলত কাতাদাহ-এর পক্ষ থেকে এটি সংশয়, যা আহমদ,আফফান থেকে এবং তিনি হাম্মাম থেকে বর্ণনা করে স্পষ্ট করেছেন। এর শব্দগুলো হলো: ‘যখন আমি হাতিম-এ ঘুমানো ছিলাম’ এবং কাতাদাহ কখনো বলতেন ‘হিজর-এ’। এখানে হাতিম বলতে মূলত হিজর কেই বোঝানো হয়েছে... তবে এখানে উদ্দেশ্য হলো সেই স্থানটি স্পষ্ট করা যেখানে ঘটনাটি ঘটেছিল। আর এটি জানা কথা যে ঘটনাটি একাধিকবার ঘটেনি, কারণ এর উৎস এক হওয়ায় ঘটনাটিও অভিন্ন। ইতিপূর্বে ‘বাদ’ খালক’-এর শুরুতে এটি ‘যখন আমি "বাইত"এর নিকট ছিলাম’ শব্দে বর্ণিত হয়েছে, যা অধিক ব্যাপক।
যুহরী এর বর্ণনায় আনাস থেকে এবং তিনি আবু যর থেকে বর্ণিত হয়েছে: ‘আমার ঘরের ছাদ উন্মোচন করা হলো যখন আমি মক্কা-তে ছিলাম’। ওয়াকিদি-এর বর্ণনায় তাঁর সনদসহ উল্লেখ আছে যে, তাঁকে শিয়েবে আবি তালেব থেকে মেরাজে-তে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল। তাবারানী তে বর্ণিত উম্মে হানী এর হাদীসে এ আছে যে, তিনি তাঁর ঘরে রাত কাটিয়েছিলেন; তিনি (উম্মে হানি) বললেন: ‘আমি তাঁকে রাতে খুঁজে পাচ্ছিলাম না,’ তখন তিনি বললেন: ‘নিশ্চয়ই জিব্রাইল আমার নিকট এসেছিলেন।’
হাফেজ ইবনে হাজার বলেন, এই বক্তব্যগুলোর মধ্যে সমন্বয় হলো এই যে তিনি উম্মে হানীর এর ঘরে ঘুমানো ছিলেন এবং তাঁর ঘরটি ছিল শিয়েবে আবি তালেবের নিকট। এরপর তাঁর ঘরের ছাদ উন্মোচন করা হলো আর ঘরটিকে তাঁর দিকে সম্পৃক্ত করা হয়েছে কারণ তিনি সেখানে অবস্থান করছিলেন ফলে সেখান থেকে ফেরেস্তা অবতরণ করলেন এবং তাঁকে ঘর থেকে বের করে মসজিদে নিয়ে গেলেন। সেখানে তিনি তন্দ্রাচ্ছন্ন অবস্থায় শুয়ে ছিলেন। এরপর ফেরেস্তা তাঁকে মসজিদের দরজার নিকট নিয়ে গেলেন এবং তাঁকে বুরাক এ আরোহণ করালেন।ইবনে ইসহাক এর বর্ণনায় হাসান আল বাসরি এর মুরসাল রেওয়ায়াতটি একে সমর্থন করে, যেখানে বলা হয়েছে যে জিব্রাইল তাঁর নিকট এসে তাঁকে মসজিদে এ নিয়ে যান এবং বুরাকে এ আরোহণ করান। এটিই এই সমন্বয়কে সমর্থন করে। (( ফাতহুল বারী দারুল মা‘রিফা প্রকাশনীতে মুদ্রিত ৭ম খণ্ডের ২০৪ পৃষ্ঠায় বর্ণিত "বাবুল মি‘রাজ" অধ্যায় দেখুন>ص204 - كتاب فتح الباري بشرح البخاري ط السلفية - باب المعراج - المكتبة الشاملة ))
এই কওল দেখিয়ে নাস্তিকরা প্রমাণ করতে চায়;
"দেখেন এত বড় একজন মুহাদ্দিস বলছেন মেরাজের রাতে রাসুল উম্মে হানীর ঘরে ছিলেন এমনকি হাদিসগুলির বাহ্যিক্য পরস্পর বিরোধিতার সমন্বয়ও তিনি করে দেন"
জবাবঃ
প্রথমত বুঝতে হবে ইবনে হাজার (রহ) উদ্দেশ্য কি ছিল এখানে, ইবনে হাজার (রহ.) কি এখানে নিজের গ্রহণযোগ্য মত (তারজিহ) পেশ করেছেন, না কি কেবল বিভিন্ন বর্ণনার সমন্বয়ের সম্ভাবনা উল্লেখ করেছেন? তিনি কি এই বক্তব্যকে সহীহ দলীলের উপর প্রতিষ্ঠিত বলেছেন, নাকি কেবল একটি ব্যাখ্যামূলক প্রয়াস হিসেবে উল্লেখ করেছেন? একই ইবনে হাজার (রহ.) কি অন্যত্র এই দাবির বিপরীত বক্তব্য বা সমালোচনা করছেন?
দ্বিতীয়ত তিনি হাদিসগুলোকে উল্লেখ্য করে হাদীসের উপর কোনো মন্তব্য না করেই হাদিসগুলোকে সমন্বয় করার চেষ্টা করেছেন এতে কি প্রমানিত হয় হাদিসগুলি সহিহ? ফাতহুল বারীতে ইবনে হাজার (রহ) যদি কোনো হাদীস উল্লেখ্য করে সম্পর্কে সেটা সম্পর্কে সুকুত কিংবা চুপ থাকেন তাহলে সেটা হুজ্জাহ বা প্রমাণ হিসেবে গ্রহণযোগ্য? এই বিষয়গুলি নিয়ে সুবিখ্যাত আলেমদের থেকে মন্তব্যে পাওয়া যায় যা আপনাদের সামনে ধাপে ধাপে তুলে ধরছি।
এ ব্যাপারে প্রসিদ্ধ মুহাদ্দিছ হাফেজ জুবাইর আলী জাই (রহ) বলেন,
প্রকৃতপক্ষে 'ফাতহুল বারীতে হাফিয ইবনে হাজারের 'সুকৃত' অর্থাৎ (চুপ থাকা বা হাদিসটি সম্পর্কে মন্তব্য না করা)হাদীসটি সহীহ বা হাসান হওয়ার দলীল না। কেননা, হাফিয ইবনে হাজার আসক্বালানি যেসব হাদীস সম্পর্কে 'ফাতহুল বারী'-তে চুপ থেকেছেন তাতে যঈফ, যঈফুন জিদ্দান বরং মাওযু' বর্ণনাও রয়েছে। আলী জাই (রহ) বলেন, এখানে উদাহরণ হিসেবে এমন চারটি মাওযু' (জাল হাদীসের) বর্ণনা পেশ করছি যেগুলোর ব্যাপারে হাফিয ইবনে হাজার চুপ থেকেছেন।
১ম উদাহরণ: হাফিয ইবনে হাজার বলেছেন:
وفيه حديث الطبراني وأبي الشيخ عن أنس رعفه :
يعق عنه من الإبل والبقر والغنم
"আর এই অনুচ্ছেদে তাবারানী ও আবৃশ শাইখ সাহাবী আনাস থেকে মারফু' হাদীস এনেছেন তার (নবজাতকের) পক্ষ থেকে উট, গাভি ও বকরি দ্বারা আক্বিক্বা করতে হবে।
এই বর্ণনাটি মু'জামুল কাবীর লিত-তাবারানীতে (১/৮৪ হা/২১৭) মুসআদাহ বিন ইয়াসি'র সনদে বর্ণিত হয়েছে। (( মুʿজামুল কাবীর, ইমাম আত-তাবারানী ১/৮৪, হাদীস নং: ২১৭ ))
এই রাবী মুসআদাহ বিন ইয়াসি'র সম্পর্কে ইমাম আবূ হাতিম রাযী (রহ) বলেছেন:
هو ذاهب منكر الحديث لا يشتغل به ، يكذب على جعفر بن محمد عندي والله أعلم
"পূর্বে বর্ণিত হয়েছে, সে মুনকারুল হাদীস। তার হাদীসের ব্যাপারে মনোযোগ দেয়া যাবে না।আমার নিকট সে জা'ফার বিন মুহাম্মাদের উপর মিথ্যারোপ করত। আল্লাহই সর্বজ্ঞ।
(( আবূ হাতিম আর-রাযী, রিজাল সংক্রান্ত উক্তি (মুসআদাহ বিন ইয়াসিʿ সম্পর্কে)هو ذاهب منكر
الحديث لا يشتغل به ، يكذب على جعفر بن محمد عندي والله أعلم ))
২য় উদাহরণ: হাফিয ইবনে হাজার এতে বলেছেন:
وقد أخرج أبو داود من حديث أبي العشراء عن أبيه أن النبي ﷺ سئل عن العتيرة فحسنها
"আবূ দাউদ আবুল উশরাহ 'আন আবীহি সনদে বর্ণনা করেছেন, নবী -কে আতিরাহ (জাহেলি যামাতে মা'বুদের নামে যবাহ করা পশু) সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হলে, তিনি তাকে উত্তম গণ্য তথা পছন্দ করেছেন।" (( ফাতহুল বারী ৯/৯৮ হা/৫৪৭৪ এর আলোচনা ))
এই বর্ণনাটি ইমাম আবু দাউদের প্রসিদ্ধ কিতাব 'সুনানে আবূ দাউদে' নেই। বরং অন্য কিতাব এই সনদে বর্ণিত হয়েছে। عبد الرحمن بن قيس عن حماد بن سلمة عن أبي العشراء الدري عن أبيه ((
সুনানে আবূ দাউদ ব্যতীত অন্য কিতাবে বর্ণিত সনদ:
عبد الرحمن بن قيس عن حماد بن سلمة عن أبي العشراء الدري عن أبيه
))
এর বর্ণনাকারী আব্দুর রহমান বিন কায়েস )الضبي البصري ( মিথ্যুক। তার সম্পর্কে ইমাম আবূ যুরআহ বলেছেন:
وكان كاذباً "সে মিথ্যুক।"
(( কিতাবুল জারাহ ওয়াত তা'দীল ৫/২৮৭) ))
স্বয়ং হাফেজ ইবনে হাজার নিজেই তার সম্পর্কে বলছেন
متروك كذبه أبو زرعه وغيره
সে মাতরুক রাবী, আবূ যুরআহ ও অন্যান্যরা তাকে কাযযাব(মিথ্যাবাদী) বলেছেন।' (( তাক্বরীবুত তাহযীব: ৩৯৮৯ ))
৩য় উদাহরণ: হাফিয ইবনে হাজার এর লিখেছেন:
وروي البيهقي أن يهوديا سمع النبي يقرأ سورة يوسف فجاء ومعه نفر من اليهود فأسلموا كلهم
"বায়হাক্বী বর্ণনা করেছেন, এক ইয়াহুদী নবী-কে সুরা ইউসুফ পড়তে শুনলেন। অতঃপর সে নিজের সাথে অন্য ইয়াহুদীদের নিয়ে আসলো, ফলে সবাই মুসলিম হয়ে গেলো
এই বর্ণনাটি
محمد بن مروان السدي الصغير عن الكلبي عن أبي صالح عن ابن عباس সনদে বর্ণিত হয়েছে।এর রাবি মুহাম্মাদ বিন মারওয়ান সুদ্দি কাযযাব।
(( দালায়িলুন নবুওয়াত লিল বায়হাক্বীতে' (৬/২৭৬)-এ )) (( বিস্তারিত: মাসিক আল-হাদীস সংখ্যা: ২৪, পৃঃ ৫০-৫২। ))
ইবনে নুমায়র বলেছেন সে কাযযাব। (( আয-যুআফাউল কাবীর লিল উকায়লী ৪/১৩৬-এর সনদ হাসান, অন্য সংস্করণ: ৪/১২৮৯-৯০ )) উক্ত সুদ্দি সগিরের উস্তাদ মুহাম্মাদ বিন সায়েব আল-কালবি কাযযাব ছিলেন। (( বিস্তারিত: মাসিক আল-হাদীস সংখ্যা: ২৪, পৃঃ ৫৩-৫৪) ))
সুলায়মান আত-তায়মি বলেছেন: কুফাতে দুইজন কাযযাব ছিলো। তাদের মধ্যে কালবি একজন। (( কিতাবুল জারাহ ওয়াত তা'দীল ৭/২৭০, সনদ সহীহ] ))
স্বয়ং হাফেজ ইবনে হাজার উল্লেখ্য করেছেন,
المفسر منهم بالكذب ورى بالرفض
তাদের মধ্যে কেউ কেউ স্পষ্টভাবে মিথ্যাবাদী হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে, আর কেউ কেউ ‘রাফিদি’ বলে অভিযুক্ত হয়েছে। ((
ফাতহুল বারী-তে উদ্ধৃত ইবনে হাজারের সামষ্টিক মন্তব্য:
المفسر منهم بالكذب ورمى بالرفض))
হাকিম নিশাপুরী কালবি সম্পর্কে বলেছেন:
أحاديثه عن أبي صالح موضوع "আবু সালেহ থেকে তার হাদীস মাওযু'।”
(( আল-মাদখাল ইলাস সহীহ পৃঃ ১৯৫ নং: ১৩১ ))
৪র্থ উদাহরণ: হাফিয ইবনে হাজার বলেছেন,
ومن حديث بريدة رفعه:
اللهم اجعل صلواتك ورحمتك وبركاتك على محمد وعلى آل محمد
كما جعلتها على إبراهيم وعلى آل إبراهيم
“এই বর্ণনাটি বুরাইদাহ (রা.) থেকে মারফূ‘ হিসেবে বর্ণিত হয়েছে। এর মূল উৎস মুসনাদে আহমাদে পাওয়া যায়।” (( মুসনাদে আহমাদ — ৫/৩৫৩ ))
মুসনাদে আহমাদ (৫/৩৫৩) প্রভৃতিতে বর্ণনাটির সনদে আবূ দাউদ নাফে' বিন হারিস আল-আ'মা রয়েছে। (( আনিসুস সারি ১/৮৩৮ ))
আবূ দাউদ আল-আ'মা সম্পর্কে সমসাময়িক ইমাম ক্বাতাদাহ বিন দাআমাহ বলেন: সে কাযযাব। (( আল-কামিল লি ইবনে আদী ৭/২৫২৩-২৪, সনদ সহীহ, অন্য সংস্করণ ৮/৩২৮))
হাকিম নিশাপুরী (রহ) বলেন,
"সে বুরায়দাহ আসলামি ও আনাস বিন মালিক থেকে মাওযু' হাদীস বর্ণনা করতো।" (( আল-মাদখাল ইলাস সহীহ পৃ: ২১৮ নং: ২১০ ))
স্বয়ং হাফেজ ইবনে হাজার বলেন,
সে মাতরুক, আর ইবনে মুঈন তাকে কাযযাব বলেছেন। (( তাকরিবুত তাহজীব ৭১৮১ নং রাবি ))
আলি ঝাই (রহ) বলেন,উক্ত চারটি উদাহরণ থেকে প্রমাণিত হয় ফাতহুল বারী'-তে হাফিয ইবনে হাজার-এর কোনো হাদীস সম্পর্কে সুকৃত (চুপ থাকা) সহীহ বা হাসান হওয়ার দলীল নয়। বরং আলিমদের উচিৎ মূল কিতাবের দিকে ফিরে গিয়ে, সংশ্লিষ্ট বর্ণনাটির তাহক্বীক্ব করা। অতঃপর সহীহ বা হাসান হলে, সেটাকে হুজ্জাত হিসেবে পেশ করবে।যদি সেটা সম্ভব না হয়, তবে একক সুকুতের ভিত্তিতে দলীল গণ্য করবে না। বরং সম্পূর্ণভাবে তাহক্বীক্বে ব্যস্ত থাকবে। (( শাইখ যুবায়ের আলী ঝাই (রহ), ফাতওয়া ইলমিয়্যাহ মা'রুফ তাওযিল আহকাম (লাহোর মাকতাবাহ ইসলামিয়াহ, মার্চ ২০১০) ২/পৃ: ৩০৫-৩০৯। ))
অতএব আমরা বিভিন্ন দলিল প্রমাণের মাধ্যমে এই সিদ্ধান্তে উপনীত হলাম যে, হাফেজ ইবনে হাজার আসকালানী (রহ) তার সুবিখ্যাত কিতাব ফাতহুল বারীতে কোনো হাদীস উল্লেখ্য করে যদি হাদীস সম্পর্কে কোনো রায় না দেন তারমানে এটা কখনই প্রমাণ হয়না যে হাদিসটি মাকবুল বা গ্রহনযোগ্য এমনটাও হতে পারে হাদিসটি যঈফ, যঈফে জিদ্দান এমনকি মাওদু/বানোয়াটও হতে পারে। তাহলে আমাদের করণীয় কি? মুহাদ্দিস জুবাইর আলী জাই (রহ) যেটা বলেছেন সেটাই আমাদের করণীয় অর্থাৎ মূলনীতির দিকে ফিরে গিয়ে দেখতে হবে হাফেজ ইবনে হাজার আসকালানী (রহ) যেই সূত্রের উদ্ধতি দিয়ে হাদিসগুলি সমন্বয় করার সময় বলেছেন “রাসুল উম্মে হানীর ঘরে রাতে শুয়েছিলেন” উক্ত সূত্র আদৌ মুহাদ্দিসদের মূলনীতি অনুযায়ী গ্রহনযোগ্য কিনা?
হাফেজ ইবনে হাজার আসকালানী (রহ) সুবিখ্যাত কিতাব ফাতহুল বারির তাখরিজ গ্রন্থ “আনীসুস সারী ফি তাখরীজ ও তাহকীকুল আহাদীস আল্লাতী যাকারাহাল হাফিয ইবনু হাজার আল-আসকালানী ফি ফাতহুল বারী” লেখক নাবীল ইবন মানসুর ইবন ইয়াকূব আল-বাসারা যিনি ২০ বছর গবেষণা করে ইবনে হাজার আসকালানীর কিতাবের তাখরীজ এবং তাহকিক করেছেন তিনি তার কিতাবের ভূমিকায় বলেন,
শুরুতে পরিকল্পনাটি ছিল হাফিজ ইবনে হাজার তাঁর “ফাতহুল বারী” গ্রন্থে যেসব হাদীস উল্লেখ করেছেন তা সংগ্রহ করা এবং সেই হাদীসগুলোর ওপর তাঁর মন্তব্যগুলো লিপিবদ্ধ করা। এরপর হাদীসগুলোকে বর্ণানুক্রমিক (alphabetical) সাজিয়ে একটি বই আকারে প্রকাশ করা। এর কারণ হলো, হাফিজ ইবনে হাজার ছিলেন হাদীস শাস্ত্রের অন্যতম শ্রেষ্ঠ হাফিজ এবং হাদীস বিশারদ ইমামদের মধ্যে অন্যতম প্রধান, হাদীসের জারাহ-তাদিল বিচারে যাঁদের বক্তব্য নির্ভরযোগ্য দলিল হিসেবে গ্রহণ করা হয়।
রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর হাদীস নিয়ে যাঁরা কাজ করেন, সহীহ ও যঈফ হাদীসের মধ্যে পার্থক্য করেন এবং রাবীদের নির্ভরযোগ্যতা ও জারহ ও তা’দীল নিয়ে আলোচনা করেন, তাঁদের জন্য হাফিজ ইবনে হাজার (রহ.)-এর মন্তব্য জানা অত্যন্ত জরুরি যা আমারও কাম্য ছিল।
আমি পুরো বইটি পড়ার পর হাদীসগুলো সংগ্রহ করে কার্ডে লিখে ফেলি। কাজ শেষ হওয়ার পর কার্ডগুলোকে বর্ণানুক্রমিকভাবে সাজাই এবং কাগজে নকল করার পর সেগুলো মুদ্রণের জন্য প্রস্তুত হয়। কিন্তু যখন আমি হাদীসগুলোর দিকে তাকালাম, দেখলাম হাফিজ ইবনে হাজার এগুলোর মধ্যে যেগুলোকে কবুল (গ্রহণযোগ্য) বা রদ (বর্জনীয়) বলে রায় দিয়েছেন, তা ফাতহুল বারীর মোট হাদীসের তুলনায় খুবই নগণ্য। অনেক হাদীস তিনি কেবল উল্লেখ করেছেন কিন্তু কোনো মন্তব্য করেননি, আবার অনেক হাদীসের শুধু উৎস (তাখরীজ) উল্লেখ করেছেন কিন্তু সেগুলো গ্রহণ বা বর্জনের ব্যাপারে কোনো সিদ্ধান্ত দেননি।
তখন আমার মনে হলো এই হাদীসগুলোর ওপর একটি বিস্তারিত ও দীর্ঘ তাহকীক করা প্রয়োজন। আমি কাজ শুরু করি কিন্তু তখন বুঝতে পারিনি যে এই কাজটি করতে আমার প্রায় বিশ বছর সময় লেগে যাবে। আমি একাই এই কাজ করেছি রাত-দিন এক করে পরিশ্রম করেছি, যদিও অন্যান্য ব্যস্ততার কারণে মাঝেমধ্যে বিরতি নিতে হয়েছে।
এই উদ্ধৃতি দেয়ার কারণ হলো এই কিতাবে ইবনে হাজার আসকালানী (রহ) যেই যেই হাদীস সম্পর্কে নীরব ছিলেন কিংবা কোনো হাদীস উল্লেখ্য করে সেটা সম্পর্কে কোনো মন্তব্য করেননি সেটা নিয়ে কিতাবের লেখক বিস্তারিত তাহক্বীক উল্লেখ্য করে দিয়েছেন এমনকি উম্মে হানী রা: ঘর থেকে মেরাজ হওয়া সংক্রান্ত সকল বর্ণনাগুলিরও আসুন আমরা দেখি।
আল-হাফিজ (ইবনে হাজার) বলেন: উম্মে হানির বর্ণনায় আত-তাবারানিতে উল্লেখ আছে যে, তিনি (রাসূলুল্লাহ ﷺ) তাঁর ঘরে শুয়েছিল। তিনি (উম্মে হানি) বলেন: "আমি রাতে তাঁকে খুঁজে পাচ্ছিলাম না।" তখন তিনি (রাসূলুল্লাহ ﷺ) বললেন: "নিশ্চয়ই জিবরাঈল (আ.) আমার নিকট এসেছিলেন..."
কিতাবের লেখক বলেন, এটি চার হাদীস পূর্বে বর্ণিত হয়েছে। (( কিতাব আনিসুস সারী তাখরিজে ফাতহুল বারী ১০/৯৬৩ ))
আসুন এবার দেখি ৪টি হাদীস পূর্বে নাবিল আল বাসারা (হাফি) কি উল্লেখ্য করেছেন,
الثاني: يرويه عبد الأعلي بن أبي المساور الزهري عن عكرمة عن أم هانىء قالت: بات رسول الله - صلى الله عليه وسلم - ليلة أسري به في بيتي، ففقدته من الليل فامتنع مني النوم مخافة أن يكون عرض له بعض قريش، فقال رسول الله - صلى الله عليه وسلم: "إن جبريل أتاني فأخذ بيدي فأخرجني فإذا على البيت دابة دون البغل وفوق الحمار فحملني عليها، ثم انطلق حتى انتهى بي إلى بيت المقدس فأراني إبراهيم يشبه خلقه خلقي ويشبه خلقي خلقه، وأراني موسى آدم طويلاً سبط الشعر شبهته برجال أزد شنوءة، وأراني عيسى ابن مريم ربعة أبيض يضرب إلى الحمرة شبهته بعروة بن مسعود الثقفي، وأراني الدجال ممسوح العين اليمنى شبهته بقطن بن عبد العزى وأنا أريد أن أخرج إلى قريش فأخبرهم بما رأيت فأخذت بثوبه فقلت: أني أذكرك الله، إنك تأتي قوماً يكذبونك وينكرون مقالتك، فأخاف أن يسطوا بك، قالت: فضرب ثوبه من يدي، ثم خرج إليهم فأتاهم وهم جلوس، فأخبرهم ما أخبرني، فقام جبير بن مطعم فقال: يا محمد لو كنت شاباً كما كنت ما تكلمت به وأنت بين ظهرانينا، فقال رجل من القوم: يا محمد هل مررت بإبل لنا في مكان كذا وكذا؟ قال: "نعم والله وجدتهم قد أضلوا بعيراً لهم، فهم في طلبه فقال: هل مررت بإبل لبني فلان؟ قال: "نعم في مكان كذا وكذا ، قد انكسرت لهم ناقة حمراء فوجدتهم وعندهم قصعة من ماء فشربت ما فيها، قالوا: فأخبرنا عدتها وما فيها من الرعاة، قال: "قد كنت عن عدتها مشغولاً فقام فأتي بالإبل فعدها وعلم ما فيها من الرعاة، ثم أتى قريشاً فقال: سألتموني عن إبل بني فلان فهي كذا وكذا، وفيها من الرعاة فلان وفلان، وسألتموني عن إبل بني فلان فهي كذا وكذا، وفيها من الرعاة ابن أبي قحافة وفلان وفلان، وهي مصبحتكم بالغداة على الثنية" قال: فغدوا إلى الثنية ينظرون أصدقهم ما قال، فاستقبلوا الإبل، فسألوا: هل ضل لكم بعير؟ قالوا: نعم. فسألوا الآخر: هل انكسرت لكم ناقة حمراء؟ قالوا: نعم، قالوا: فهل كانت عندكم قصعة؟ قال أبو بكر: أنا والله وضعتها، فما شربها أحد ولا هر اقوه في الأرض، وصدقه أبو بكر وآمن به فسمي يومئذ الصديق.
আব্দুল আলা বিন আবি আল-মুসাওয়ির আল-জুহরি, ইকরিমা থেকে এবং তিনি উম্মে হানি থেকে বর্ণনা করেন। উম্মে হানি বলেন:
যে রাতে রাসূলুল্লাহ ﷺ-কে মি’রাজে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল, সেই রাতে তিনি আমার ঘরে অবস্থান করছিলেন। রাতে আমি তাঁকে খুঁজে না পেয়ে চিন্তিত হয়ে পড়লাম এবং এই ভয়ে আমার ঘুম আসছিল না যে, কুরাইশদের কেউ হয়তো তাঁর কোনো ক্ষতি করেছে। এরপর রাসূলুল্লাহ ﷺ (ফিরে এসে) বললেন:
"জিবরাঈল আমার কাছে এলেন, আমার হাত ধরলেন এবং আমাকে বাইরে নিয়ে গেলেন……হাদীসের বাকি অংশ
এরপর কিতাবের মুহাকিক্ক বলেন
أخرجه الطبراني في "الكبير" (٢٤/ ٤٣٢ - ٤٣٤)
قال الهيثمي: وفيه عبد الأعلي بن أبي المساور متروك كذاب" المجمع ١/ ٧٦
এটি ইমাম তাবারানি তাঁর "আল-মু'জাম আল-কাবীর" গ্রন্থে বর্ণনা করেছেন (২৪/ ৪৩২ - ৪৩৪)।
আল-হাইসামি বলেন: "এর বর্ণনাকারীদের মধ্যে আব্দুল আলা বিন আবি আল-মুসাওয়ির রয়েছে; সে একজন ‘মাতরুক’ (পরিত্যক্ত বা অগ্রহণযোগ্য) বর্ণনাকারী এবং চরম মিথ্যাবাদী।" (( মাজমাউয যাওয়াইদ (১/৭৬)। ))
আব্দুল আলা বিন আবি আল-মুসাওয়িরের ব্যাপারে বিস্তারিত জারাহ নিচে উল্লেখ করা হলো:
محمد بن إسماعيل البخاري:
منكر الحديث
ابن حجر العسقلاني:
متروك، كذبه ابن معين، وذكره في المطالب العالية، واه
الذهبي:
ضعفوه
يحيى بن معين:
في رواية العباس بن محمد: ليس بشئ، ومرة: ليس بثقة، ومرة: أرجو أن يكون صالحا، وفي رواية ابن محرز، قال: ليس بشيء يروي عنه أبو النضر، ومرة، قال: كذاب 0 قد تخلى الله منه، لا يسأل عن مثل هذا
أبو داود السجستاني:
ليس بشيء
أبو زرعة الرازي:
ضعيف جدا
أبو نعيم الأصبهاني:
ضعيف جدا، ليس بشيء
أحمد بن شعيب النسائي:
متروك الحديث، ومرة: ليس بثقة ولا مأمون
الدارقطني:
ضعيف، ومرة ذكره في السنن متروك
زكريا بن يحيى الساجي:
منكر الحديث
علي بن المديني:
ضعيف، ضعيف، ليس بشئ
محمد بن عبد الله بن نمير:
متروك الحديث
محمد بن عمار الموصلي:
ضعيف ليس بحجة
محمد بن عمران المرزباني:
ادعى رؤية الشعبي وأبي بردة
مصنفوا تحرير تقريب التهذيب:
متروك، وقوله كذبه ابن معين فيه نظر، فهو في رواية واحدة، ولم ترد في غيرها من الروايات، ولا نعلم أحدا كذبه
أبو أحمد الحاكم:
ليس بالقوي عندهم
أبو أحمد بن عدي الجرجاني:
أورد له أحاديث وقال: له أحاديث سوى ما ذكرت وعامة أحاديثه مما لا يتابعه عليه الثقات
أبو بكر البيهقي:
ضعيف في الحديث
أبو حاتم الرازي:
ضعيف الحديث، شبه المتروك
أبو حاتم بن حبان البستي:
ممن يروي عن الأثبات مالا يشبه حديث الثقات حتى إذا سمعها المبتدي في هذه الصناعة علم أنها معمولة
রেফারেন্স এর জন্য দেখুন (( https://islamicurdubooks.com/hadith/rawy-details.php... ))
অতএব আমরা বুঝলাম ইবনে হাজার আসকালানী (রহ) যেই হাদীসের উপর ভিত্তি করে সমন্বয় করার চেষ্টা করলেন এটা আদৌ সহিহ নয়, বরং এটা খুবই দূর্বল এমনকি জাল বললেও ভুল হবে না।
দ্বিতীয় যেই মুরসাল হাদীসটির উদ্ধৃতি ইবনে হাজার আসকালানী (রহ) দিয়েছেন অর্থাৎ হাসান বসরী থেকে যে বর্ণনার দিকে ইঙ্গিত করেছেন, তা অত্যন্ত দুর্বল (যয়িফ জিদ্দান)। এছাড়া এটি আসলে তাঁর নির্দেশিত বিষয়টিকে প্রমাণ করতে সহায়তা করে না। বর্ণনাটি নিম্নরূপ: আমর ইবনে উবায়েদ থেকে বর্ণিত, তিনি হাসান ইবনুল হাসান থেকে বর্ণনা করেন, তিনি বলেন: রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বলেছেন: "আমি যখন 'হিজর'-এ ঘুমানো ছিলাম, তখন জিবরাঈল আমার কাছে এলেন এবং তাঁর পা দিয়ে আমাকে মৃদু ধাক্কা দিলেন। আমি উঠে বসলাম কিন্তু কিছু দেখতে পেলাম না, তাই আবার বিছানায় ফিরে গেলাম। তিনি দ্বিতীয়বার এলেন এবং তাঁর পা দিয়ে ধাক্কা দিলেন; আমি উঠে বসলাম কিন্তু কিছু দেখলাম না, আবারও বিছানায় ফিরে গেলাম। তিনি তৃতীয়বার এসে তাঁর পা দিয়ে ধাক্কা দিলেন; আমি উঠে বসলাম এবং তিনি আমার বাহু ধরলেন। আমি তাঁর সাথে দাঁড়ালাম এবং তিনি আমাকে মসজিদের দরজার কাছে নিয়ে গেলেন। সেখানে গাধা ও খচ্চরের মাঝামাঝি আকৃতির একটি সাদা রঙের পশু ছিল, যার দুই উরুতে দুটি ডানা ছিল যা তার পা দুটিকে চালিত করছিল। এটি তার দৃষ্টির শেষ সীমানায় পা ফেলছিল। তিনি আমাকে তাতে আরোহণ করালেন এবং আমার সাথে চলতে লাগলেন... আমি তাঁর দৃষ্টির আড়ালে যাচ্ছিলাম না এবং তিনিও আমার থেকে আড়ালে যাচ্ছিলেন না।" (এটি আবু জাফর তাবারী তাঁর তাফসিরে বর্ণনা করেছেন)।
এই হাদিসটি অত্যন্ত দুর্বল। এর সনদে 'আমর ইবনে উবায়েদ' রয়েছে, যে হাদিসের ক্ষেত্রে পরিত্যক্ত (মাতরুক)। তদুপরি, হাসান বসরী এবং নবীজির (সা.) মাঝে সনদে বিচ্ছিন্নতা (ইনকিতা) রয়েছে। অর্থাৎ বুঝাই যাচ্ছে ইবনে হাজার হাদীসের মাঝে সমন্বয় করতে গিয়ে তাহকিকে খেয়াল করেননি আর এটি অস্বাভাবিক নয়।
ইবনে হাজার আসকালানী (রহ) থেকে কি এই মত পাওয়া যায় যেখানে তিনি বলেছেন মেরাজ উম্মে হানীর ঘরে নয় বরং রাসূলের ঘর থেকেই হয়েছিল?
মজার ব্যাপার হলো ইবনে হাজার (রহ) থেকেই এই মত পাওয়া যায় যে, রাসুল সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়াসাল্লাম মেরাজের রাতে নিজ ঘরেই শুয়ে ছিলেন উম্মে হানীর ঘরে নয়।
হাফেজ ইবনে হাজার তাঁর 'আল-ইসাবাহ' গ্রন্থে (৮/৩৩২) বলেছেন: '
الحافظ ابن حجر في "الإصابة" (8/332) :" وهذا أصحّ من رواية الكلبيّ ، فإنّ في روايته من المنكر: أنه صلّى العشاء الآخرة والصبح معهم ، وإنما فرضت الصّلاة ليلة المعراج ، وكذا نومه الليلة في بيت أم هانئ ، وإنما نام في المسجد " انتهى.
আর এই (বর্ণনাটি) কালবির বর্ণনার তুলনায় অধিকতর সঠিক (যদিও দুর্বল)। কারণ তার বর্ণনায় কিছু আপত্তিকর (মুনকার) বিষয় রয়েছে: যেমন দাবি করা হয়েছে তিনি (নবী ﷺ) তাদের সাথে এশা ও ফজরের নামাজ আদায় করেছিলেন, অথচ নামাজ কেবল মেরাজের রাতেই ফরজ করা হয়েছিল। অনুরূপভাবে (তার কালবীর বর্ণনায়) ওই রাতে তাঁর উম্মে হানির ঘরে ঘুমানোর বিষয়টিও (আপত্তিকর), কারণ প্রকৃতপক্ষে তিনি মসজিদেই ঘুমিয়েছিলেন।
ইবনে হাজার (রহ) যেই বর্ণনার কথা বলছেন উক্ত বর্ণনা হলো;
এই বর্ণনাটি আবু ইয়া'লা তাঁর 'মুজাম' গ্রন্থে মুহাম্মদ ইবনে ইসমাইল আল-ওয়াসাওয়াসি-র সূত্রে উল্লেখ করেছেন। তিনি (ওয়াসাওয়াসি) বলেন: আমাদের নিকট দমরাহ বিন রাবিয়াহ হাদিস বর্ণনা করেছেন ইয়াহইয়া বিন আবি আমর আস-সাইবানি থেকে, তিনি উম্মে হানির মুক্তদাস আবু সালিহ থেকে, আর তিনি উম্মে হানি (রা.) থেকে বর্ণনা করেন। উম্মে হানি বলেন:
'রাসূলুল্লাহ ﷺ ভোরের অন্ধকার থাকা কালীন সময়ে আমার কাছে আসলেন যখন আমি আমার বিছানায় ছিলাম। তিনি বললেন: "আমি অনুভব করলাম যে আজ রাতে যখন আমি মসজিদুল হারামে ঘুমিয়েছিলাম এরপর জিবরাঈল (আ.) আমার কাছে আসলেন এবং আমাকে মসজিদের দরজার দিকে নিয়ে গেলেন..."' এরপর তিনি (রাবি) হাদিসের বাকি অংশ বর্ণনা করেন।
বিখ্যাত ফতোয়ার ওয়েবসাইট IslamQA তে এই হাদীসের তাহকিক উল্লেখ করা হয়েছে যা নিম্নে দেয়া হলো:
وإسنادها ضعيف أيضا ، فيه أبو صالح مولى أم هانئ ، ومحمد بن إسماعيل الوساوسي ، وكلاهما ضعيف
এই হাদিসের সনদটিও দুর্বল; কারণ এতে উম্মে হানির মুক্তদাস আবু সালিহ এবং মুহাম্মদ ইবনে ইসমাইল আল-ওয়াসাওয়াসি রয়েছেন, আর তারা উভয়েই দুর্বল বর্ণনাকারী। (( কিতাব আনিসুস সারী তাখরিজে ফাতহুল বারী ১০/৯৫৮,৯৫৯ ))
আর ইবনে হাজারের বক্তব্য
“আর এই (বর্ণনাটি) কালবির বর্ণনার তুলনায় অধিকতর সঠিক”
এর দ্বারা এমনটা মনে করার কোনই কারণ নেই যে উক্ত বর্ণনা সহিহ এর অর্থ "অধিকতর সঠিক" মানে হলো দুটি দুর্বল বর্ণনার মধ্যে যেটিতে ভুলের পরিমাণ কম।
উদাহরণস্বরূপ:
ক-এর বর্ণনা: ৫টি মারাত্মক ভুল আছে।
খ-এর বর্ণনা: ২টি ছোট ভুল আছে। এখানে 'খ'-এর বর্ণনাটি 'ক'-এর চেয়ে "অধিকতর বিশুদ্ধ" বলা হবে, কিন্তু তার মানে এই নয় যে 'খ'-এর বর্ণনাটি শতভাগ সঠিক বা সহিহ। এটি কেবল তুলনামূলক বিচার।
উপরিউক্ত আলোচনার প্রেক্ষিতে এটি সুস্পষ্ট যে, মেরাজের রাতে রাসূলুল্লাহ ﷺ উম্মে হানী (রা.)-এর ঘরে ছিলেন বলে যে দাবি করা হয়, তা মূলত মুহাদ্দিসগণের নিকট অগ্রহণযোগ্য ও যঈফ বর্ণনার ওপর নির্ভরশীল। যদি ধরেও নেয়া হয় হাফেজ ইবনে হাজার (রহ.) 'ফাতহুল বারী'-তে বিভিন্ন বর্ণনার মধ্যে 'সমন্বয়' (Tatbiq) করতে গিয়ে উম্মে হানির ঘরের কথা উল্লেখ করেছেন তাহলেও কোনো সমস্যা নেই কারণ তিনি নিজেই যখন বুঝতে পেরেছেন বর্ণনাটি গ্রহণযোগ্য নয় তখন তিনি নিজেই তাঁর 'আল-ইসাবাহ' গ্রন্থে সেই বর্ণনাকে 'মুনকার' বা আপত্তিকর বলে প্রত্যাখ্যান করেছেন।
অতএব, নাস্তিক বা সংশয়বাদীরা যখন ইবনে হাজারের একটি ব্যাখ্যামূলক বক্তব্যকে (যা তিনি হাদীসের সমন্বয় করতে গিয়ে বলেছিলেন) তাঁর চূড়ান্ত ফয়সালা হিসেবে চালিয়ে দিতে চায়, তখন তারা মূলত কিছু তথ্য গোপন করে সামগ্রিক বিষয়টি উপস্থাপন করে না। কোনো আলেম যখন একাধিক বর্ণনাকে মেলাতে চেষ্টা করেন, তার অর্থ এই নয় যে তিনি সবগুলো বর্ণনাকে 'সহিহ' বলছেন। বরং সহিহ বুখারী ও মুসলিমের অকাট্য বর্ণনা অনুযায়ী নবীজি ﷺ সেই রাতে মসজিদুল হারামের 'হাতীমে' বা 'হিজর'-এ শুয়েছিলেন এটাই চূড়ান্ত সত্য। তথাকথিত বুদ্ধিবৃত্তিক আলোচনার নামে জাল বা পরিত্যক্ত রাবিদের বর্ণনা দিয়ে ইসলামের স্বীকৃত বিষয়কে প্রশ্নবিদ্ধ করার অপচেষ্টা কেবল অজ্ঞতা ও বিদ্বেষেরই বহিঃপ্রকাশ।