ইসলামী রাষ্ট্রে অমুসলিমদের অধিকার: শরীয়াহর আলোকে একটি বিশ্লেষণ
ইনসাইট জোন
25 Apr, 2026
221 বার পঠিত
ইসলামী রাষ্ট্রে অমুসলিমদের অধিকার
ইসলামী রাষ্ট্রে যে অমুসলিমরা বসবাস করে তাদের আহলে জিম্মা বা জিম্মি বলা হয়। জিম্মা শব্দের অর্থ অঙ্গীকার, নিরাপত্তা ও দায়িত্ব। এই নামকরণের রহস্য হলো, আল্লাহ, রাসুল (সাঃ) ও মুসলিম জামায়াতের সঙ্গে তাদের চুক্তি রয়েছে। আর সেই চুক্তির ভিত্তিতে তারা ইসলামী রাষ্ট্রে নিরাপদে ও শান্তিতে বসবাস করতে পারবে। সুতরাং, জিম্মিকে ফকিহদের পরিভাষায় ‘ইসলামী রাষ্ট্রের অধিবাসী’ এবং অধুনিক পরিভাষায় ‘ইসলামী রাষ্ট্রের নাগরিক’ বলা হয়। (( মুসলিম দেশে অমুসলিম অধিকার; ড. ইউসূফ আল কারজাভী; পৃষ্টা নং,২২ ))
অমুসলিমদের ক্ষেত্রে ইসলামের মৌলিক দৃষ্টিভঙ্গি হলো বিশেষ কিছু ক্ষেত্র ছাড়া বাকি সবকিছুতে তারা মুসলমানদের মতোই।
নিরাপত্তার অধিকার
ইসলামী সমাজ ও রাষ্ট্র তাদের (অমুসলিম সংখ্যালঘুদের) নিরাপত্তা সুনিশ্চিত করবে। এ নিরাপত্তার আওতায় অভ্যন্তরীণ শোষণ, জুলুম, নির্যাতন, উত্ত্যক্তকরণ ও বৈষম্য থেকে বাঁচানোর পাশাপাশি অন্তভূক্ত থাকবে বহিঃশত্রুর আক্রমণ থেকে সুরক্ষার বিষয়টিও। (( মুসলিম দেশে অমুসলিম অধিকার; ড. ইউসূফ আল কারজাভী; পৃষ্টা নং, ২২ ))
বহিঃশত্রুর আক্রমণ থেকে সুরক্ষা
মুসলিম দেশে যদি কোনো বহিঃশত্রু আক্রমণ করে তাহলে মুসলিম নাগরিকদের সাথে অমুসলিম নাগরিকদেরও সুরক্ষা দিতে হবে।
হাম্বলি মাজহাবের প্রামাণ্য গ্রন্থ মাতালিবু উলিন নুহা তে উল্লেখ রয়েছে,
রাষ্ট্র প্রধানের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব হলো অমুসলিম নাগরিকদের সুরক্ষা দেওয়া। তাদের উত্ত্যক্তকারীদের প্রতিহত করা ও বন্দিদের মুক্তি দেওয়া।…মুসলমানদের রক্ষার জন্য যে ব্যবস্থা গ্রহণ কর্তব্য, অমুসলিমদের রক্ষার জন্যও তা গ্রহণ করা আবশ্যক। (( মুসলিম দেশে অমুসলিম অধিকার; ড. ইউসূফ আল কারজাভী; পৃষ্টা নং, ২৪ ))
ইমাম কুরাফি আল মালেকি তার রচিত আল ফুরুক গ্রন্থে ইমাম ইবনে হাজম আজ জাহেরি রচিত মারাতিবুল ইজমা থেকে একটা উক্তি উদ্বৃত করে বলেন,
আমাদের জিম্মায় থাকা অমুসলিম নাগরিকের বিরুদ্ধে কেউ যুদ্ধে লিপ্ত হলে, পূর্ণ সামরিক শক্তি ব্যবহার করে আমরণ যুদ্ধ করে হলেও জিম্মিদের সুরক্ষা দেওয়া আমাদের কর্তব্য। আর এটি করা হবে আল্লাহ ও তাঁর রাসুলের অঙ্গীকার অক্ষুণ্ন রাখার জন্য। যদি তাদের শত্রুদের হাতে ছেড়ে দেওয়া হয় তবে তা হবে বিশ্বাসঘাতকতা ও জিম্মি চুক্তির সুস্পষ্ট লঙ্গন।
এই বিষয়ে তিনি পুরো মুসলিম মিল্লাতের ইজমার কথাও উল্লেখ করেন। (( মুসলিম দেশে অমুসলিম অধিকার; ড. ইউসূফ আল কারজাভী; পৃষ্টা নং, ২৪ ))
তাতারিরা যখন সিরিয়া দখল করে নিল যুদ্ধবন্দিদের মুক্তির ব্যাপারে আলোচনা করার জন্য ইবনে তাইমিয়া তাতার সম্রাট কাজানের দরবারে উপস্থিত হন। তাতারি নেতা মুসলিম বন্দিদের মুক্তি দিতে সম্মত হলেও অমুসলিমদের মুক্তি দিতে অস্বীকার করেন।
শাইখ ইবনে তাইমিয়া প্রত্যুত্তরে দৃঢ়তার সঙ্গে বলেন, ইহুদি-খ্রিষ্টানসহ সব বন্দিকে মুক্তি দিতে হবে। স্বধর্মী-বিধর্মী কাউকেই আমরা বন্দি হিসেবে রেখে যেতে পারিনা। শাইখের এমন অবিচল অবস্থান ও দৃঢ়তা দেখে সম্রাট কাজান সবাইকে মুক্তি দিতে বাধ্য হন। (( মুসলিম দেশে অমুসলিম অধিকার; ড. ইউসূফ আল কারজাভী; পৃষ্টা নং, ২৪ ))
অভ্যন্তরীণ নিপীড়ন থেকে নিরাপত্তা।
রাসুল (সাঃ) বলেন,
সুনান আবু দাউদ ( তাহকিককৃত )
পরিচ্ছেদঃ ৩৩. যিম্মীদের ব্যবসায়ের লাভ থেকে এক-দশমাংশ (‘উশর) আদায় সম্পর্কে
৩০৫২। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সাহাবীদের কিছু সন্তান তাদের পিতা সূত্রে বর্ণনা করেন যে, যারা ছিলেন পরস্পর ঘনিষ্ঠ। তিনি বলেনঃ সাবধান! যে ব্যক্তি চুক্তিবদ্ধ সম্প্রদায়ের কোনো ব্যক্তির উপর যুলম করবে বা তার প্রাপ্য কম দিবে কিংবা তাকে তার সামর্থের বাইরে কিছু করতে বাধ্য করবে অথবা তার সন্তুষ্টিমূলক সম্মতি ছাড়া তার কাছ থেকে কিছু গ্রহণ করবে, কিয়ামতের দিন আমি তার বিপক্ষে বাদী হবো।
হাদিসের মানঃ সহীহ (( সুনান আবূ দাউদ (তাহকিককৃত) | হাদিস: ৩০৫২ | Sunan Abu Dawood, Hadith No. 3052 ))
হযরত উমর (রাঃ)-এর কাছে দূরদূরান্ত থেকে কোনো প্রতিনিধি এলে প্রথমে কোনো মুসলমান তাদের কষ্ট দিচ্ছে কি-না, এ ভয়ে তিনি সর্বদা শঙ্কিত থাকতেন। (( মুসলিম দেশে অমুসলিম অধিকার; ড. ইউসূফ আল কারজাভী; পৃষ্টা নং, ২৫ ))
দেহ ও রক্তের নিরাপত্তা
এই বিষয়ে বিস্তারিত পড়ুনঃ ইসলামী রাষ্ট্রে কোনো মুসলিম কাফের হত্যা করলে তার শাস্তির বিধান - ইনসাইট জোন
দরিদ্র, বৃদ্ধ ও দূর্বলদের তত্ত্বাবধান
মুসলিম রাষ্ট্রে বসবাসকারী বয়স্ক, দরিদ্র ও দূর্বল লোকদের জীবিকা নির্বাহের দায়িত্ব ইসলামী রাষ্ট্রের উপর।
ইরাকের অন্তর্গত হিরা অঞ্চলের খ্রিষ্টান অধিবাসীদের সঙ্গে ছিল মুসলিমদের জিম্মা চুক্তি। খালিদ বিন ওয়ালিদ (রাঃ) লিখেছেন,
যে বৃদ্ধ অক্ষম হয়ে পড়েছে কিংবা প্রাকৃতিক দুর্যোগে হয়েছে বিপদ্গ্রস্ত অথবা আগে ধনী ছিল, কিন্তু সময়ের আবর্তনে দরিদ্র হয়ে পড়েছে আর স্বধর্মীরা তার প্রতি প্রসারিত করেছে দান-দক্ষিণার হাত, তাহলেও তার ওপর থেকে জিজিয়া মওকুফ করে দেওয়া হবে। আর যদি তারা সহযোগিতার হাত গুটিয়ে নেয়, তাহলে রাষ্ট্রীয় কোষাগার থেকেই তার ভরণপোষণ ব্যবস্থা করা হবে। (( ফাতওয়া শামি, খন্ড; ০৩, পৃষ্ঠাঃ ৩৪৪-৩৪৬ ( মুসলিম দেশে অমুসলিম অধিকার; ড. ইউসূফ আল কারজাভী; পৃষ্টা নং, ২৫) ))
এই চুক্তিটি ছিলো আবু বকর (রাঃ) এর যুগে। গণ্যমান্য অনেক সাহাবীর উপস্থিতিতে খালিদ (রাঃ) তা লিখে আবু বকর (রাঃ) এর নিকট পাঠান। আর আবু বকর (রাঃ)-ও তা প্রত্যাখ্যান করেননি। এ ধরণের মৌন সমর্থন ইজমার নামান্তর।
উমর ইবনুল খাত্তাব (রাঃ) একবার জনৈক ইহুদিকে ভিক্ষাবৃত্তি করতে দেখলেন। তিনি এর কারণ জিজ্ঞেস করে বুঝতে পারলেন, বার্ধক্য ও অভাব তাকে এ কাজে বাধ্য করেছে। তিনি তাকে সরাসরি বায়তুলমালের কোষাধ্যক্ষের কাছে নিয়ে এলেন। নির্দেশ দিলেন, সে ও তার মতো যারা আছে তাদের ঝণ পরিশোধ করে দাও। আর তাদের ভরণপোষণেরও ব্যবস্থা করো। তিনি আরো বলেন,
যৌবনকালে তাদের থেকে জিজিয়া নেব, আর বৃদ্ধাবস্থায় তাদের অপমানের দিকে ঠেলে দেবো তা কখনো ইনসাইফ হতে পারে না। (( আল খারাজ, ইমাম আবু ইউসূফ (রহ); পৃষ্ঠাঃ ১২৬ ( মুসলিম দেশে অমুসলিম অধিকার; ড. ইউসূফ আল কারজাভী; পৃষ্টা নং, ৩২) ))
দামেশক থেকে ‘জাবিয়া’ যাত্রাকালে উমর ইবনুল খাত্তাব (রাঃ) পথমধ্যে একদল পঙ্গু খ্রিষ্ঠানকে দেখতে পান। তিনি তাৎক্ষণিক নির্দেশ দেন, যেন তাদের জাকাতের অর্থ থেকে সহযোগিতা প্রদান করা হয় এবং খরপোশের জন্য নির্ধারিত ভাতা চালু করা হয়। (( ফুতুহুল বুলদান, বালজুরি, পৃষ্ঠাঃ ১৭৭ ( মুসলিম দেশে অমুসলিম অধিকার; ড. ইউসূফ আল কারজাভী; পৃষ্টা নং, ৩২) ))
ইমাম নববি (রহ) আল মিনহজ গ্রন্থে উল্লেখ করেন,
বায়তুলমাল ও জাকাতের অর্থে মুসলমানদের দারিদ্র্য বিমোচন না হলে বিত্তবানদের এগিয়ে আসা ফরজে কেফায়া। (( মুসলিম দেশে অমুসলিম অধিকার; ড. ইউসূফ আল কারজাভী; পৃষ্টা নং, ৩২ ))