সাহাবীরা কী মুহাম্মদ (সাঃ) এর বিরুদ্ধে কাপড় চুরির অভিযোগ তুলেছিলেন?
নাস্তিকদের বিভিন্ন ভিডিও ও ব্লগে এমন একটি অভিযোগ পাওয়া যায় যে, নবী মুহাম্মদ ﷺ এর সাহাবিরা নাকি সন্দেহ করেছিলেন, তিনি চাদর চুরি করেছেন কিনা! অথচ ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়, মক্কার কাফেররাই তাঁকে
‘আল-আমিন’ অর্থাৎ, বিশ্বস্ত উপাধিতে ভূষিত করেছিল। নাস্তিকরা তাই প্রশ্ন তোলে, যদি নবী ﷺ স্বয়ং তাঁর শত্রুদের কাছেও ‘বিশ্বস্ত’ হিসেবে স্বীকৃত হয়ে থাকেন, তবে সাহাবিদের পক্ষ থেকে আদৌ এমন সন্দেহের উদ্রেক সম্ভব কি? আসুন আমরা নাস্তিকদের অভিযোগটির আদ্যোপান্ত জেনে নিই।
আসুন আমরা দাবির মুল উল্লেখিত প্রমাণ গুলি যাচাই বাছাই করে হাকীকত কি এটা জানার চেষ্টা করি!
আর কোন নবীর জন্য উচিত নয় যে, সে খিয়ানত করবে। আর যে খিয়ানত করবে, কিয়ামতের দিনে উপস্থিত হবে তা নিয়ে যা সে খিয়ানত করেছে। অতঃপর প্রত্যেক ব্যক্তিকে পুরোপুরি দেয়া হবে যা সে উপার্জন করেছে এবং তাদেরকে যুলম করা হবে না। (( (3:161) Al-i-Imran | (৩:১৬১) আলে-ইমরান-অনুবাদ/তাফসীর ))
আয়াতের শানে নুযুল হিসেবে ইবনে আব্বাস রা: থেকে একটি বর্ণনা পেশ করা হয়েছে বর্ণনাটা হলো:
حَدَّثَنَا قُتَيْبَةُ بْنُ سَعِيدٍ، حَدَّثَنَا عَبْدُ الْوَاحِدِ بْنُ زِيَادٍ، حَدَّثَنَا خُصَيْفٌ، حَدَّثَنَا مِقْسَمٌ، مَوْلَى ابْنِ عَبَّاسٍ قَالَ قَالَ ابْنُ عَبَّاسٍ رضى الله عنهما نَزَلَتْ هَذِهِ الآيَةُ { وَمَا كَانَ لِنَبِيٍّ أَنْ يَغُلَّ } فِي قَطِيفَةٍ حَمْرَاءَ فُقِدَتْ يَوْمَ بَدْرٍ فَقَالَ بَعْضُ النَّاسِ لَعَلَّ رَسُولَ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم أَخَذَهَا فَأَنْزَلَ اللَّهُ عَزَّ وَجَلَّ { وَمَا كَانَ لِنَبِيٍّ أَنْ يَغُلَّ } إِلَى آخِرِ الآيَةِ . قَالَ أَبُو دَاوُدَ يَغُلَّ مَفْتُوحَةُ الْيَاءِ .
ইবনু আব্বাস (রাঃ) সূত্রে বর্ণিত। তিনি বলেন, ‘‘আর নবীর জন্য শোভনীয় নয় যে, তিনি খিয়ানাত করবেন।’’ এই আয়াত বদরের যুদ্ধের সময় অবতীর্ণ হয়েছে, বদরের যুদ্ধের সময় একটা লাল চাঁদর হারিয়ে গেলে কতিপয় লোক বলাবলি করলো, সম্ভবত রাসূলুল্লাহ ﷺ তা নিয়েছেন। তখন আল্লাহ এ আয়াত অবতীর্ণ করলেনঃ ‘‘আর নবীর জন্য শোভনীয় নয় যে, তিনি খিয়ানাত করবেন। অথচ যে ব্যক্তি খিয়ানাত করবে সে খিয়ানাতকৃত বস্তুসহ কিয়ামতের দিন উপস্থিত হবে। অতঃপর প্রত্যেকেই তার কৃতকর্মের পূর্ণ বিনিময় পাবে এবং তাদের প্রতি বিন্দুমাত্র যুলুম করা হবে না।’’ (সূরা আল-ইমরানঃ ১৬১)। ইমাম আবূ দাঊদ (রহঃ) বলেন, ‘ইয়াগুলু’ শব্দের ইয়া-তে যবর হবে।
হাদীসটি তিরমিজিতেও এসেছে,
حَدَّثَنَا قُتَيْبَةُ، حَدَّثَنَا عَبْدُ الْوَاحِدِ بْنُ زِيَادٍ، عَنْ خُصَيْفٍ، حَدَّثَنَا مِقْسَمٌ، قَالَ قَالَ ابْنُ عَبَّاسٍ نَزَلَتْ هَذِهِ الآيَةُ : ( وَمَا كَانَ لِنَبِيٍّ أَنْ يَغُلَّ ) فِي قَطِيفَةٍ حَمْرَاءَ افْتُقِدَتْ يَوْمَ بَدْرٍ . فَقَالَ بَعْضُ النَّاسِ لَعَلَّ رَسُولَ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم أَخَذَهَا فَأَنْزَلَ اللَّهُ كَانَ لِنَبِيٍّ أَنْ يَغُلَّ ) إِلَى آخِرِ الآيَةِ . قَالَ أَبُو عِيسَى هَذَا حَدِيثٌ حَسَنٌ غَرِيبٌ وَقَدْ رَوَى عَبْدُ السَّلاَمِ بْنُ حَرْبٍ عَنْ خُصَيْفٍ نَحْوَ هَذَا وَرَوَى بَعْضُهُمْ هَذَا الْحَدِيثَ عَنْ خُصَيْفٍ عَنْ مِقْسَمٍ وَلَمْ يَذْكُرْ فِيهِ عَنِ ابْنِ عَبَّاسٍ .
ইবনু আব্বাস (রাযিঃ) বলেন, “অন্যায়ভাবে কোন বস্তু আত্মসাৎ করা কোন নবীর কাজ হতে পারে না”— (সূরা আ-লি ইমরান ১৬১) আয়াত বাদর যুদ্ধকালে হারিয়ে যাওয়া একটি লাল চাদর প্রসঙ্গে অবতীর্ণ হয়েছে। কেউ কেউ বলল যে, হয়ত তা রাসূলুল্লাহ ﷺ নিয়েছেন। এ প্রসঙ্গেই বারকাতময় আল্লাহ তা’আলা অবতীর্ণ করেনঃ “খিয়ানাত (আত্মসাৎ) করা কোন নবীর কাজ হতে পারে না। আর যে ব্যক্তি খিয়ানাত করবে, কিয়ামতের দিন সে তার খিয়ানাতসহ হাযির হবে। তারপর প্রত্যেক ব্যক্তিই তার কৃতকর্মের পুরাপুরি প্রতিফল লাভ করবে। কারো প্রতি যুলুম করা হবে না”— (সূরা আ-লে ইমরান ১৬১)।
আলবানি সহীহঃ সহীহাহ (২৭৮৮)। আবূ ঈসা বলেন, এ হাদীসটি হাসান গারীব। আবদুস সালাম ইবনু হারব (রহঃ) খুসাইফির সূত্রে একই রকম বর্ণনা করেছেন। কেউ কেউ খুসাইফ হতে, তিনি মিকসাম হতে এই সূত্রে এ হাদীস রিওয়ায়াত করেছেন, কিন্তু তাতে ইবনু আব্বাস (রাযিঃ)-এর উল্লেখ করেননি।
এই হল অভিযোগটির পক্ষে তাদের দলিল।
হাদিসের উসুল সম্পর্কে জ্ঞানের ঘাটতি।
এখানে সর্বপ্রথম ইসলাম বিদ্বেষীদের এটা জানা জরুরী যে, ইসলাম সম্পর্কে কোনো অভিযোগ করার আগে যেই বিষয়ে অভিযোগ করা হচ্ছে সেটা পরিপূর্ণ ভাবে আয়ত্তে রাখা এবং উক্ত বিষয় সম্পর্কে যেই পরিমাণে জ্ঞান রাখা দরকার সেই পরিমাণে জ্ঞান রাখা অত্যান্ত গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু দুঃখজনক বিষয় হলো বঙ্গীয় নাস্তিকদের হালত এই ব্যাপারে অনেক বেশি শোচনীয়, এর কারণ হলো তাদের অজ্ঞতা এবং তারই উপর ভিত্তি করে নেয়া সিদ্ধান্ত যেটা মূলত অন্ধবিশ্বাস। তারা নিজেরাই তাদের অজ্ঞতার স্বীকৃত দেয় এবং বলে যে আমরা তো “আরবী পারি না” তাই বাংলায় যেই তথ্য পাই সেটার ভিত্তিতেই সিদ্ধান্ত নেই, অথচ এটা যে কতবড় মারাত্মক একটা ধোঁকা এবং বিভ্রান্তি একটা হাদীসের ছাত্র মাত্রই জানেন।
একটা হাদিস থেকে কোনো সিদ্ধান্ত নেয়ার ক্ষেত্রে কিছু শর্ত পূরণ করা ওয়াজিব এবং এই শর্ত গুলি পূরণ না করলে সিদ্ধান্তে বিকৃতি এবং ভুল হওয়ার সম্ভাবনা অনেক বেশি হয় এবং এক্ষেত্রে তাই হয়েছে নাস্তিকদের ক্ষেত্রেও। আসুন আগে আমরা দেখি কোনো হাদীস থেকে কোনো বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিতে হলে কি কি শর্তপূরণ করা ওয়াজিব বা আবশ্যক।
“আল-দাওয়াবিত আল-মনহাজিয়্যাহ লিল-ইস্তেদলাল বিল-আহাদীথ আন-নাবাবিয়্যাহ” উক্ত কিতাবে ড. হাসান সালেম আল-দুসি (হাফী) বলেছেন, হাদীস থেকে সিদ্ধান্ত নেয়ার আগে গবেষক কিংবা তলেবে ইলমদের কিছু শর্ত পূরণ করা আবশ্যক কিংবা ওয়াজিব। ড. হাসান সালেম আল-দুসি (হাফী) বলেন,
ولهذه الأهمية للأحاديث النبوية، فإن فهمها واستنباط الأحكام منها يقتضي أن يكون وفق ضوابط منهجية تجنب الباحثين والدارسين الزلل في الفهم والاستنباط وترشدهم إلى سبيل السداد، سواء أكان الحديث فيما يتعلق بالفقه، أم فيما يتعلق بالدعوة، أو التربية أو الصحة، أو البيئة، أو الاقتصاد، أو غير ذلك.
وهذا يعني أنه لا بد من الإدراك والوعي لهذه الضوابط اللازمة لتفسير الأحاديث النبوية، وفهمها فهماً صحيحاً عند الاستدلال بها، وتنزيلها منزلة الواقع والتطبيق.
وقد تم حصرها في ستة ضوابط.
এগুলো (হাদীস) বুঝা ও সেগুলো থেকে শরিয়তের বিধান নির্ণয় করতে হলে কিছু নির্দিষ্ট পদ্ধতিগত নীতিমালা অনুসরণ করা ওয়াজিব, যাতে গবেষক ও তলেবে ইলম ভুল ব্যাখ্যা বা সিদ্ধান্ত থেকে রক্ষা পান এবং এটি গবেষক ও তলেবে ইলমদের সঠিক সিদ্ধান্তের দিকে পরিচালিত করে। সে হাদীস ফিকহ, দাওয়াহ, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, পরিবেশ, অর্থনীতি বা অন্য যে কোনো বিষয়ে হোক না কেন। এর অর্থ হল, গবেষকের ওপর আবশ্যক যে তিনি এই মৌলিক নীতিগুলো চিনে রাখবেন এবং হাদীস ব্যাখ্যা করার সময়, কিংবা যখন এগুলোকে বাস্তব জীবনে প্রয়োগযোগ্য দলিল হিসেবে ব্যবহার করবেন, তখন তিনি যেন এ বিষয়ে পূর্ণ অন্তর্দৃষ্টি ও সচেতনতার সঙ্গে কাজ করেন।
এই পদ্ধতিগত নীতিমালাগুলো ছয়টি মূল দিকের মধ্যে সংক্ষেপ করা যায়ঃ
১. প্রথম নীতি:ফিল-ইস্তিসাকি মিন সুথূতিল হাদীসি ওয়া সিহ্হাতিহি
অর্থাৎ হাদীসের সত্যতা ও প্রমাণিকতা যাচাই করা হাদিসটা আসলেই সহিহ কিনা!
২. দ্বিতীয় নীতি: আরদিল হাদীসি ‘আলা নুসুসিল কুরআনিয়্যতি ওয়ান-নাবাওয়িয়্যাতিল উখরা
অর্থাৎ হাদীসকে অন্যান্য কুরআনের নস ও নববী হাদীসের সাথে তুলনা করা।
৩. তৃতীয় নীতি: ফি ফাহমিল হাদীসি অনুযা আসালিবিল লুগাতিল আরাবিয়্যাহ ওয়া তুরুকিহা আদ-দিলালিয়্যাহ
অর্থাৎ আরবি ভাষার রীতি ও অর্থবোধক ধারা অনুসারে হাদীসের অর্থ নির্ণয় করা।
৪. চতুর্থ নীতি: ফি ফাহমিল হাদীসি ফি দওই সাবাবি উরুদিহি
অর্থাৎ “হাদীস বোঝার সময় তা যে কারণে বা উদ্দেশ্যে প্রেরণ করা হয়েছে, সেই প্রেক্ষাপটে বোঝা।
৫. পঞ্চম নীতি:ফি ফাহমিল হাদীসি ফি দওই সিয়াকিহি ওয়া মুলাব্বিসাতিহিল মাকানিয়্যাহ ওয়াজ্-জামানিয়্যাহ
অর্থাৎ হাদীস বোঝার সময় তা তার প্রেক্ষাপট এবং স্থান ও সময়ের সাথে সম্পর্কিত আনুষঙ্গিক বিষয় অনুযায়ী বোঝা।
৬. ষষ্ঠ নীতি: ইসলামী শরিয়তের উদ্দেশ্য (مقاصد الشريعة)-এর আলোকে হাদীসকে বোঝা।
এর সব গুলি মূলনীতি নিয়ে তিনি সংক্ষিপ্ত আলোচনা করেছেন এর মধ্যে থেকে আমরা শুধু দুটি শর্ত নিয়ে আলোচনা করব যেটা আমাদের এই লেখার সাথে প্রাসঙ্গিক।
পাঠক এবার লক্ষ্য করুন আপনি যদি তাদের যেই আর্টিকেল কিংবা বক্তব্য দেখেন তাহলে দেখবেন তারা যখন হাদীস থেকে কোনো সিদ্ধান্ত দিবে দেখবেন বেশির ভাগ সময় এই ৬ টা শর্তের একাধিক শর্ত সেখানে অনুপস্থিত এবং বেশির ভাগ সময়ই দুই থেকে ছয় নং মূলনীতি গুলি লঙ্ঘন হয় অনেক সময় সবগুলিই।
দুইটি মূলনীতি এবং নাস্তিকদের অজ্ঞতা
আপনারা প্রথম মূলনীতির দিকে লক্ষ্য করলে দেখবেন সেখানে আলোচনা করা হয়েছে যে, হাদীসের সত্যতা ও প্রমাণিকতা যাচাই করা হাদিসটা আসলেই সহিহ কিনা। এই বিষয়টা গুরুত্বপূর্ণ কারণ যেটা দিয়ে প্রমাণ দেয়া হবে কিংবা হচ্ছে সেটার যদি কোনো মূল্যই ইসলামে না থাকে তাহলে সেটার উপর প্রশ্নবিদ্ধ করে কিংবা সেটার উপর ভিত্তি করে সিদ্বান্ত নিলে আদৌ গ্রহনযোগ্য হবে না। নাস্তিকদের এ ক্ষেত্রে প্রাতিষ্ঠানিক জ্ঞান তো দূরের কথা আগেই বলেছি তারা নিজেরাই বলেছে তাদের “আরবী ভাষা জানা নাই” যার কারণে উসুলে হাদীস তো দূর হাদীসের তাহকিকের ক্ষেত্রে তারা নির্ভর করে বাংলায় অনুবাদ হওয়া কিছু হাদীস গ্রন্থের উপর। এ ক্ষেত্রে বাংলায় যেহেতু শুধুমাত্র আলবানি (রহ) তাহকিকি কাজ পাওয়া যায় তাই তারা চোখ বন্ধ করে আলবানি (রহ) উপর ভরসা করে হাদীসের সত্যতার উপর নির্ভর করে, কিন্তু আলবানি (রহ) কি হাদীসের তাহকীকের ক্ষেত্রে চূড়ান্ত মানদণ্ড হতে পারে!? এটা নিয়ে আমরা একটু সামনেই আলোচনা করব তার আগে আমরা আরেকটা আরেকটা উসুল নিয়ে আলোচনা করি আসুন।
হাদীস থেকে সিদ্ধান্ত নেয়ার আরেকটা যেই মূলনীতি শাইখ (হাফী) বলেছেন সেটা হলো, হাদীসটিকে অন্যান্য নববি হাদীস এবং কুরআনের নসের সাথে তুলনা করে সিদ্ধান্ত নেয়া এ ক্ষেত্রে এটা নিয়ে তিনি বিস্তারিত আলোচনা করেছেন এবং দেখিয়েছেন কেন একটা হাদিস পড়ে সেখান থেকে সিদ্ধান্ত নিলে ভুলের সম্ভবনা অনেক বেশি থাকে।
তিনি বলেন,
ثانياً: عرض الحديث على الأحاديث الأخرى في موضوعه
দ্বিতীয়ত: একই বিষয়ের অন্যান্য হাদিসের আলোকে হাদিসটি পরীক্ষা করা।
হাদিস বুঝতে এবং তা থেকে বিধান/সিদ্ধান্ত বের করতে হলে, সংশ্লিষ্ট অন্যান্য হাদিসের সাথে মিলিয়ে দেখতে হবে। এক্ষেত্রে একটি নির্দিষ্ট বিষয়ের উপর বর্ণিত সবগুলো সহিহ হাদিস একসাথে সংগ্রহ করতে হবে। এভাবে হাদিস সংগ্রহ করলে, আমরা উক্ত হাদীসে থাকা ইল্লত চিহ্নিত করতে পারব যা একটি হাদিসের বিশুদ্ধতা নষ্ট করে দেয়। কারণ, অনেক সময় একটি হাদিসের বর্ণনাসূত্র বা সনদ শক্তিশালী ও বিশুদ্ধ মনে হলেও, এর অর্থ অন্য অনেক প্রমাণিত ও আমলকৃত বিশুদ্ধ হাদিসের বিরোধী হয়ে যায়।
كما أننا بجمع الأحاديث الواردة في الموضوع الواحد تعرف المعنى المراد من الحديث المدروس، لأنه ربما جاء الحديث في طريق مجملاً أو عاماً أو مطلقاً. وجاء في طريق آخر مفصلاً أو خاصاً أو مقيداً، وبجمع كل الأحاديث المقبولة الواردة في الموضوع الواحد يتحصل المقصود الحقيقي للحديث الذي تدرسه.
আরও গুরুত্বপূর্ণ হলো, একটি নির্দিষ্ট বিষয়ে বর্ণিত সকল হাদিস একত্রিত করার মাধ্যমে আমরা গবেষণাধীন হাদিসটির প্রকৃত উদ্দেশ্য বুঝতে পারি। এর কারণ হলো, একটি হাদিস কোনো একটি সনদে সংক্ষিপ্ত, সাধারণ বা নিরবচ্ছিন্নভাবে বর্ণিত হতে পারে, আবার অন্য একটি সনদে তা বিস্তারিত, সুনির্দিষ্ট বা শর্তারোপিতভাবে বর্ণিত হতে পারে। সুতরাং, একটি বিষয়ে বর্ণিত সকল গ্রহণযোগ্য হাদিস সংগ্রহ করলে, আপনি যে হাদিসটি অধ্যয়ন করছেন তার সত্যিকার অর্থ ও উদ্দেশ্য উপলব্ধি করতে সক্ষম হবেন।
নাস্তিকদের এই আর্টিকেলের ক্ষেত্রেও এটি ঘটেছে এবং উক্ত মূলনীতি গুলির লঙ্ঘন হয়েছে যার কারণে তাদের করা সিদ্ধান্তে বিকৃতি ঘটেছে।
আলবানী (রহ) একা হুজ্জত?
এই পর্যায়ে আলোচনার বিষয় হলো আলবানি (রহ) কি একাই চূড়ান্ত মানদণ্ড হতে পারে হাদীসের যাচাই বাছাইয়ের ক্ষেত্রে? এ ব্যাপারে আমি তার সমসাময়িক মুহাদ্দিস এবং বিখ্যাত আলেম ও ইসলামী ফতোয়ার সাইট থেকেই দেখানোর চেষ্টা করব ইন শা আল্লাহ। বিখ্যাত ফাতওয়ার ওয়েবসাইট “Islam Web” এই বিষয়ে বলা হয়েছে,
وبخصوص الشيخ الألباني ـ رحمه الله ـ فلا شك في أنه من الراسخين في علم الحديث، إلا أن العصمة ليست لأحد، والخطأ جائز على الشيخ وعلى غيره من أهل العلم، وقد سبق الكلام على منهج الشيخ الألباني في الحكم على الحديث، وخاصة في تحسينه في الفتوى رقم:
শাইখ আলবানী (রহ)-র ব্যাপারে, কোনো সন্দেহ নেই যে তিনি হাদীস শাস্ত্রে ছিলেন একজন প্রাজ্ঞ ও সুস্থির পণ্ডিত। তবে, কেউই ভুলের ঊর্ধ্বে নয় এবং শাইখ আলবানি ও অন্যান্য আলেমের পক্ষেও ভুল করা সম্ভব। (( هل نأخذ بتصحيح الألباني لأحاديث ضعفها غيره ))
বর্তমান যুগের শ্রেষ্ঠ মুহাদ্দিসদের একজন মুহাম্মদ আল-হাসান আল-দিদদু আল শানকিতি (হাফী) তিনি বলেন,
الاجتهاد في تحقيق الحديث عند الألباني رحمه الله مثل اجتهاد جميع الناس، فيه الصواب وفيه الخطأ بعض ما صححه من الأحاديث لم يوافقه غيره من العلماء، وقد تبين خطؤه في بعض ذلك.ولذلك رجع هو عن بعض تصحيحاته وبعض ما ضعفه من الأحاديث تبين خطؤه فيه ولذلك رجع عن بعض ذلك. وكل طبعة من كتبه تعكس ردّه على نفسه ورجوعه عن بعض ما كان أنتج. لذلك رجع رحمه الله عن كثير من الأمور التي أخطأ فيها، ولا بد أن يبقى بعض الأخطاء في عمله مثل عمل كل من ليس معصوماً. فلا ينبغي أن يؤخذ تصحيحه بالإطلاق ولا تضعيفه بالإطلاق.
আলবানি (রহ) হাদীসের তাহক্বীকে ইজতিহাদ করতেন এবং তাঁর ইজতিহাদ অন্য সকলের ইজতিহাদের মতোই, যার মধ্যে সঠিকও আছে আর ভুলও আছে।তিনি যে সকল হাদীসকে সহীহ বলেছেন, তার কিছু কিছু ক্ষেত্রে অন্যান্য আলেমগণ তাঁর সাথে একমত হননি এবং তাঁর ভুল স্পষ্ট প্রমাণ হয়ে গেছে। ফলশ্রুতিতে, তিনি নিজেই তাঁর কিছু 'সহীহ' সাব্যস্তকরণ থেকে রজু করে ফিরে এসেছেন। একইভাবে, তিনি যে সকল হাদীসকে দুর্বল বলেছেন, তার কিছু কিছু ক্ষেত্রেও তাঁর ভুল স্পষ্ট হয়েছে এবং সে কারণে তিনি সেগুলোর কয়েকটি থেকে ফিরে এসেছেন…. তাঁর প্রতিটি বইয়ের নতুন সংস্করণে তাঁর নিজের পূর্বের সিদ্ধান্তের স্ববিরোধীতা এবং কিছু সিদ্ধান্ত থেকে ফিরে আসা লক্ষ্য করা যায়।সুতরাং, তিনি (আলবানী রহ.) এমন অনেক বিষয় থেকে ফিরে এসেছিলেন যাতে তিনি ভুল করেছিলেন। তবে, তাঁর কাজে কিছু ভুল-ত্রুটি থাকা স্বাভাবিক, ঠিক যেমনটা যেকোন মানুষের কাজেই থেকে থাকে। তাই, আর তাঁর 'সহীহ' সাব্যস্তকরণকেও চূড়ান্তভাবে গ্রহণ করা উচিত নয়, আবার তাঁর 'দুর্বল' সাব্যস্তকরণকেও চূড়ান্তভাবে গ্রহণ করা উচিত নয়। ((تضعيف الشيخ الألباني وتصحيحه))
শাইখ ড. সাআদ বিন আব্দুল্লাহ আল-হামিদ (হাফি) একজন সৌদি আলেম, যিনি ‘উলুমুল হাদীস’ ও ‘ফিকহ’-এ বিশেষজ্ঞ। তিনি এই ব্যাপারে বলেন,
وقال الشيخ الدكتور سعد الحميد: أما بالنسبة لتصحيحات الشيخ الألباني، فالشيخ من المجتهدين في علم الحديث، وفي الغالب أنه إذا ضعف حديثًا لا تجد بعده شيئًا - في الغالب -، ولكن لست أدعي أنه لا يفوته شيء، ولكن إذا ضعف حديثًا ففي الغالب أن حكمه يكون لائقًا على ذلك الحديث، وكذلك في كثير من الأحيان إذا حكم على حديث بالصحة أن حكمه يكون جيدًا، وقد يخطئ في نظري.
শাইখ আলবানি উলূমিল হাদীসে মুজতাহিদদের অন্তর্ভুক্ত। তিনি যখন কোন হাদীসকে দুর্বল বলে সাব্যস্ত করেন, সাধারণত তখন তার রায়ের পরে এটা সহিহ হওয়ার সমর্থনে আপনি কিছুই পাবেন না। তবে আমি এ দাবি করি না যে তাঁর নজর থেকে কিছুই ছুটে যায় না, কিন্তু তিনি যদি কোন হাদীসকে দুর্বল বলে রায় দেন, তবে সাধারণত সে হাদীসের জন্য তাঁর রায় যথাযথ হয়। একইভাবে, অনেক সময় তিনি যখন কোন হাদীসকে সহীহ বলে রায় দেন, তখন তাঁর রায় ভালো বলে বিবেচিত হয়, যদিও আমার মতে তিনি ভুলও করতেন।
শাইখ নাসিরুদ্দিন আলবানি (রহ) এর সমসাময়িক বিখ্যাত আলেমে দ্বীন শাইখ আব্দুল আজিজ আবদুল্লাহ বিন বায (রহ) এই সম্পর্কে বলেন,
محمد ناصر الألباني، هو رجل متفرغ لهذا الأمر، وقد اعتنى به كثيرًا في تحري الأحاديث الصحيحة، والتنبيه عليها، والأحاديث الضعيفة، فكتبه مفيدة، ونافعة، ولكن ليس معصومًا، فقد يقع بعض الخطأ في بعض الأحاديث، وقد يعتقدها صحيحة وهي ضعيفة، وقد يعتقدها ضعيفة وهي صحيحة، لكن هذا قليل، وطالب العلم يجتهد في معرفة الصحيح، والسقيم بالطرق التي أوضحها العلماء.
শাইখ মুহাম্মদ নাসির আল-আলবানী, তিনি এই কাজে(হাদীসের তাহকিকে) নিবেদিতপ্রাণ একজন মানুষ। তিনি সহীহ হাদীসগুলো যাচাই-বাছাই, সেগুলোকে চিহ্নিত করা এবং দুর্বল হাদীসগুলো [চিহ্নিত করা]-তে অনেক যত্ন নিয়েছেন। তাই, তাঁর বইগুলো উপকারী ও কার্যকরী। তবে, তিনি ভুলের ঊর্ধ্বে নন। তিনি কিছু হাদীস নিয়ে ভুল করতে পারেন; তিনি কোনো হাদীসকে সহীহ মনে করতে পারেন, অথচ তা দুর্বল, অথবা কোনো হাদীসকে দুর্বল মনে করতে পারেন, অথচ তা সহীহ। কিন্তু এটি খুবই কম হয়। ((توجيه حول كتب الألباني وتصحيحه وتضعيفه للأحاديث))
শাইখুল ইসলাম মুফতি তাকি উসমানি (হাফি)-কে আলবানি (রহ) তাহকিক সম্পর্কে প্রশ্ন করলে তিনি বলেন,
شیخ ناصرالدین البانی صاحب (اللہ ہم سب کو ہدایت عطا فرمائے) تصحیح وتضعیف کے بارے میں حجت نہیں ہیں،
শাইখ নাসিরউদ্দিন আলবানি হাদীসের সহিহ এবং দুর্বল ঘোষণার ক্ষেত্রে তিনি কোনো চূড়ান্ত হুজ্জত (মানদণ্ড) নন।
আলবানি (রহ) সমসাময়িক বিখ্যাত মুহাদ্দিস শাইখ শুয়াইব আল আরনাউত (রহ) তার তিনিও হাদীসের তাহকীকে আলবানি (রহ) মতোই মুজতাহিদ আলেম তিনি আলবানি (রহ) সম্পর্কে বলেন,
شیخ ناصر الدین البانیv کے کام پر نظرِثانی کی ضرورت انہی امور کی بنا پر میری دانست میں شیخ ناصرالدین البانی v کے کام پر درج ذیل انداز سے نظر ثانی ہونی چاہئے:
۱- جن احادیث کو شیخ نے صحیح یا ضعیف قرار دیا ہے اور ان سے پہلے ائمہ متقدمین نے بھی ان کو صحیح یا ضعیف ہی کہا ہے، انہیں اپنے حال پر رہنے دیا جائے۔
۲- جن احادیث پر ائمہ متقدمین کے برخلاف شیخ نے صحت یا ضعف کا حکم لگایاہے تو دونوں حکموں میں موازنہ کیا جائے اور دلائل وقرائن کی روشنی میں شیخ ناصر کے موافق یا مخالف حکم بیان کیا جائے۔
اپنی سابقہ بات دہراتے ہوئے میں پھر کہتا ہوں کہ شیخ ناصر الدینv ’’محدث‘‘ تھے، میں نہیں کہتا کہ وہ ’’حافظُ العصر‘‘ تھے، انہوں نے اپنی زندگی کے ساٹھ برس اس علم کے پڑھنے پڑھانے میں صرف کئے ہیں اور اس طویل صحرانوردی نے ان میں فن کی بہترین مہارت ولیاقت پیداکر دی تھی، اس لیے اس میدان میں ان کی مہارت کو کلی طور پر نظراندازکرناحق ناشناسی ہوگا۔
আমার মতে, শাইখ নাসিরুদ্দীন আলবানী (রহ.)-এর কাজের উপর নিম্নলিখিত পদ্ধতিতে পুনর্বিবেচনার প্রয়োজন রয়েছে:
১-যে হাদীসগুলো শাইখ সহিহ বা যঈফ বলে আখ্যায়িত করেছেন এবং তাঁর পূর্ববর্তী প্রাথমিক যুগের ইমামগণও সেগুলোকে সহিহ বা যঈফ বলেছেন, সেগুলোকে তাদের অবস্থানেই থাকতে দেওয়া উচিত।
২-যে হাদীসগুলোতে প্রাথমিক যুগের ইমামগণের বিপরীতে শাইখ সহিহ বা যঈফের রায় দিয়েছেন, সেখানে উভয় রায়ের মধ্যে তুলনামূলক আলোচনা করতে হবে এবং প্রমাণ ও নির্দেশনার আলোকে শাইখ নাসিরের পক্ষে বা বিপক্ষে রায় ব্যক্ত করতে হবে। ((عالمِ عربی کے معروف عالم شیخ البانی رحمہ اللہ شیخ شعیب ارنؤوط کی نظر میں))
হাফেজ জুবাইর আলী যাই (রহ), তিনিও একজন প্রখ্যাত মুহাদ্দিস এবং আলবানি (রহ) সমপর্যায়ের, তিনি আলবানি (রহ) সম্পর্কে বলেন,
তিনি আলবানি (রহ) মানুষদের মাঝে হাদীছের জ্ঞান বিস্তার করেছেন এবং সহীহ হাদীসকে দুর্বল হাদীস থেকে চেনার জ্ঞান ছড়িয়ে দিয়েছেন এবং তিনি সুন্নাহর সর্বোত্তম খিদমত করেছেন আল্লাহ তাকে উত্তম প্রতিদান দিন এবং তিনি উত্তম রচনা ও শক্তিশালী কিতাব লিখেছেন, বিশেষভাবে 'ইরওয়াউল গালীল', 'সিলসিলাতুদ দা'ঈফাহ' ও 'সিলসিলাতুস সহীহাহ' এবং এছাড়াও অন্যান্য বই এবং [আমার গবেষণা অনুযায়ী] শাইখ (রহিমাহুল্লাহ) কিছু হাদীসের সনদ নির্ধারণে এবং কিছু [হাদীস] দুর্বল ঘোষণায় ভুল করেছেন, একইভাবে তিনি কিছু বর্ণনাকারীর সনদ নির্ধারণে এবং কিছু বর্ণনাকারীকে দুর্বল ঘোষণায় ভুল করেছেন, আর এই [ভুল করা] মানুষের স্বভাবগত বৈশিষ্ট্য এবং তিনি সত্যের অনুসারীদের স্বভাব অনুযায়ী নিজের ভুলগুলো থেকে ফিরেও এসেছেন, আর কিছু ভুল রয়ে গেছে। আর এটা তার [মর্যাদার] ক্ষেত্রে কোনো কমতি ঘটায় না। ((Hafız Zubayr Ali Zai on Shaykh al-Albani))
এখানে সবচেয়ে লক্ষণীয় বিষয় হলো ইসলাম বিদ্বেষী নাস্তিকরা শাইখ আলবানি (রহ)-এর কোনো একটি হাদীস সম্পর্কিত তাহকীক দেখেই সেটিকে চূড়ান্ত ও অখণ্ড সিদ্ধান্ত হিসেবে ধরে নেয়, যেন তাঁর মতামতই হাদীসের তাহক্বীকি গবেষণার শেষ এবং চূড়ান্ত কথা। অথচ আমরা প্রমাণসহ দেখেছি যে, শাইখ আলবানির সমসাময়িক মুহাদ্দিসরাও একমত হয়েছেন তিনি ভুল করতে পারেন এবং করেছেন এবং তিনি নিজের কিছু রায় থেকেও পরে রুজু করে ফিরেছেন, তার রায় কোনো চূড়ান্ত তাহক্বীক হতে পারে না যদি তার রায়ের বিরুদ্ধে প্রমাণ প্রতিষ্টিত হয়ে যায় এবং অন্যান্য বেশির ভাগ মুহাদ্দিস তার বিরোধিতা করে তাহলে তার রায় ভুল বলেই বিবেচিত হবে।
অতএব, আলবানি (রহ)-এর তাহকীক চূড়ান্ত কোনো প্রমাণ নয়। ইসলামী দৃষ্টিকোণ থেকে গ্রহণযোগ্য হলো সেই সিদ্ধান্ত, যা দলিল, প্রমাণ ও তুলনামূলক বিশ্লেষণের ভিত্তিতে প্রতিষ্ঠিত হয় ব্যক্তিগত ইজতিহাদের ভিত্তিতে নয়।
আলোচিত হাদীসটি কি আসলেই সহিহ?
এ পর্যায়ে উক্ত হাদিসগুলি যেগুলি দিয়ে প্রমাণ দেয়া হয়েছে আমরা সেগুলি পর্যালোচনা করব এবং আলবানি (রহ) যেই প্রমাণের ভিত্তিতে হাদীসটি হাসান বলেছেন এটা যাচাই করে দেখব।
মজার ব্যাপার হলো আলবানি (রহ) নিজেই এই হাদিসকে প্রথমে দুর্বল বলে রায় দিয়েছিলেন অতপর তা শাহেদ সনদ থাকার কারণে হাসান বলেছেন এবং আমরা এ পর্যায়ে হাদীসটির তাহকিক এবং এই হাদীস সম্পর্কে অন্যান্য মুহাদ্দিসের রায় এবং উক্ত হাদীসের সনদ এবং প্রাসঙ্গিক অন্যান্য সনদ এবং মতন নিয়েই আলোচনা করব।
(٤) أخرجه أبو داود ٦/ ١٠٠ (٣٩٧١)، والترمذي ٥/ ٢٥٧ (٣٢٥٥)، وابن جرير ٦/ ١٩٤. وأورده الثعلبي ٣/ ١٩٥ من طريق عبد الواحد بن زياد، حدثنا خصيف، حدثنا مقسم مولى ابن عباس، عن ابن عباس به.
قال الترمذي: «حديث حسن غريب». وقال المناوي في الفتح السماوي ١/ ٤١٣: «أعلّه ابن عدي بخصيف، فالحديث ضعيف، ووهم من حسَّنه كالجلال السيوطي اغترارًا بتحسين الترمذي له». وضعَّفه الألباني في الصحيحة ٦/ ٦٨٢ ضمن الحديث (٢٧٨٨)، وأعلّه بخصيف واضطرابه فيه، ثم حسّنه بطرقه.
(٥) أخرجه الضياء في المختارة ٩/ ٥٢٩ (٥١٢)، والطبراني في الكبير ١٢/ ١٣٤ (١٢٦٨٤).
قال الهيثمي في المجمع ٦/ ٣٢٨ (١٠٩٠٨): «رجاله ثقات». وقال السيوطي: «بسند جيد». قال أبو عبد الرحمن مقبل بن هادي الوادعي في الصحيح المسند من أسباب النزول ص ٥١: «الأمر كما قالا من حيث الرجال، ولكن حبيب بن أبي ثابت مدلس، ولم يصرح بالتحديث، وهو وإن كان قد سمع من ابن عباس، وقد أثبت له علي بن المديني لقي ابن عباس، كما في جامع التحصيل، وأثبت له العجلي السماع من ابن عباس، كما في تهذيب التهذيب؛ لكِنَّه مُدَلِّس، وقد روى عن ابن عباس بواسطتين وهما محمد بن علي بن عبد الله بن عباس وأبوه، كما في تحقيق الإلزامات والتتبع ص ٤٨٣؛ فعلم بهذا أنّ الحديث ضعيف بهذا السند». وفي السير لأبي إسحاق الفزاري (ت ١٨٨ هـ)، ص ٢٦٣، عن حبيب بن أبي ثابت قال: بعث نبي من الأنبياء جيشًا فرُدَّت رايته، ثم بعث غيرها فرُدَّت رايته، ثم بعث أخرى فردت رايته، فنظروا فوجدوه قد غلوا رأس غزال من ذهب. لم يذكر ابن عباس، وهكذا رواه الضياء في المختارة عقب الرواية السابقة (٥١٣).
মাওসুয়াত তাফসীরিল মাথুর উক্ত বইয়ের মুহাক্কিকগণ(তামীম মুহাম্মাদ আবদুল্লাহ আল-আসনাজ আম্মার মুহাম্মাদ আবদুল্লাহ আল-আসনাজ জালাল আবদু মুহাম্মাদ আল-বাদ'আনী নাসসার মুহাম্মাদ মুহাম্মাদ আল-মুরসিদ মুহাক্কিকগণ হাদিসটি সম্পর্কে যা বলেছেন;
ইবনু আব্বাস (রাঃ) সূত্রে বর্ণিত। তিনি বলেন, ‘‘আর নবীর জন্য শোভনীয় নয় যে, তিনি খিয়ানাত করবেন।’’ এই আয়াত বদরের যুদ্ধের সময় অবতীর্ণ হয়েছে, বদরের যুদ্ধের সময় একটা লাল চাঁদর হারিয়ে গেলে কতিপয় লোক বলাবলি করলো, সম্ভবত রাসূলুল্লাহ ﷺ তা নিয়েছেন। তখন আল্লাহ এ আয়াত অবতীর্ণ করলেনঃ ‘‘আর নবীর জন্য শোভনীয় নয় যে, তিনি খিয়ানাত করবেন।((এ হাদিসটি বর্ণনা করেছেন আবু দাউদ ৩৯৭১~ আত-তিরমিযী ৩০০৯ এবং ইবন জারীর (৬/১৯৪)। আস-সা'লাবী এটি উল্লেখ করেছেন (৩/১৯৫) আবদুল ওয়াহিদ বিন যিয়াদের সনদে: "আবদুল ওয়াহিদ বিন যিয়াদ আমাদের কাছে বর্ণনা করেছেন, তিনি বলেন: আমাদের কাছে বর্ণনা করেছেন খাসিফ, তিনি বলেন: আমাদের কাছে বর্ণনা করেছেন মুকাসিম, ইবন আব্বাস (রাঃ)-এর আযাদকৃত গোলাম, তিনি ইবন আব্বাস (রাঃ) থেকে বর্ণনা করেছেন।"))
আত-তিরমিযী বলেছেন: "হাদিসটি হাসান গরীব।" কিন্তু আল-মুনাওয়ী তাঁর "আল-ফাতহুস সামাওয়ী" গ্রন্থে বলেছেন:
"ইবন 'আদী এ হাদিসটিকে খাসিফ-এর কারণে দুর্বল বলে মন্তব্য করেছেন। তাই হাদিসটি দুর্বল (য'ঈফ)। যারা এটিকে হাসান বলেছেন, যেমন জালালুদ্দীন আস-সুয়ূতী, তারা ভুল করেছেন এবং তিরমিযীর উক্ত হাদিসকে হাসান বলার উপর ভিত্তি করে ভুলের স্বীকার হয়েছেন।"
আলবানী "আস-সিলসিলাহ আস-সাহীহহা" (৬/৬৮২, হাদিস নং ২৭৮৮-এর মধ্যে) এটিকে দুর্বল বলেছেন খাসিফের কারণে ও তার করা গড়মিল করার কারণে এর সমালোচনা করেছেন। এরপর তিনি অন্যান্য সহায়ক সনদের ভিত্তিতে এটিকে হাসান বলে মূল্যায়ন করেছেন। (( আল-ফাতহুস সামাওয়ী ১/৪১৩))
আমরা আলবানি (রহ) হাদীসটি “হাসান” রায় দেয়ার সিদ্ধান্ত নিয়ে আলোচনার আগে এই হাদিসটা নিয়ে এবং প্রাসঙ্গিক অন্যান্য সনদে বর্নিত হাদীস নিয়ে অন্যান্য মুহাদ্দিসদের রায় দেখে নেই আসুন।
দারুস সালাম থেকে প্রকাশিত সুনানে আবু দাউদের ৩৯৭১ নং হাদীসের তাহকীকে জুবাইর আলী যাই (রহ) তিনিও এই হাদিস সম্পর্কে বলেছেন,
ضعيف، خصيف - وهو ابن عبد الرحمن - سيئ الحفظ، وباقي رجاله ثقات رجال الشيخين غير مقسم فمن رجال البخاري. وأخرجه أبو داود (٣٩٧١). وهو في «شرح مشكل الآثار» للطحاوي (٥٦٠١) و(٥٦٠٢)
দুর্বল হাদীস খুসাইফের কারণে তিনি ‘আব্দুল রহমান-এর পুত্র – কম স্মৃতিশক্তির,আর বাকি সকল বর্ণনাকারী বিশ্বস্ত, দু'ইমাম (বুখারী ও মুসলিম)-এর রিজালের অন্তর্ভুক্ত।
প্রখ্যাত মুহাদ্দিস শুয়াইব আল আরনাউত (রহ) এর লেটেস্ট তাহকীকে সুনানে তিরমিজির উক্ত হাদীসের তাহকিকে বলেন,
ضعيف، خصيف - وهو ابن عبد الرحمن - سيئ الحفظ، وباقي رجاله ثقات رجال الشيخين غير مقسم فمن رجال البخاري.
দূর্বল হাদীস খুসাইফের কারণে - যিনি ইবনে আবদুর রহমান - তার স্মৃতিশক্তি দুর্বল, এবং বাকি সকল বর্ণনাকারী বিশ্বস্ত যারা দুই শাইখ (বুখারী ও মুসলিম) এর বর্ণনাকারী; শুধুমাত্র মুকাসসিম ব্যতীত, যিনি আল-বুখারীর বর্ণনাকারীদের অন্তর্ভুক্ত। ((كتاب سنن الترمذي - ط الرسالة))
শেখ মুকবিল হাদি (রহ) যিনি ইলমে জরাহ ওয়াদ তাদিল সম্পর্কে বিশেষজ্ঞ একজন আলেম এবং একজন প্রখ্যাত মুহাদ্দিস তিনি উক্ত আয়াতের শানে নুযুল এবং হাদীসটি এবং প্রাসঙ্গিক অন্যান্য হাদীসের সনদ এবং আয়াতটির শানে নজুল সম্পর্কে বলেন,
وَمَا كَانَ لِنَبِيٍّ أَنْ يَغُلَّ﴾ وكيف لا يكون له أن يغل وله أن يقتل قال الله ﴿وَيَقْتُلُونَ الْأَنْبِيَاءَ﴾ ولكن المنافقين اتهموا النبي صلى الله عليه وعلى آله وسلم في شيء فأنزل الله عز وجل ﴿وَمَا كَانَ لِنَبِيٍّ أَنْ يَغُلَّ﴾ الحديث أخرجه الطبراني في الصغير ج٢ ص١٥.
والواحدي في أسباب النزول ص٨٤ والخطيب في تاريخ بغداد ج١ ص٣٧٢.
الحديث رجاله ثقات إلا شيخ الطبراني فلم أجد له ترجمة إلا في تارخ بغداد ج١ ص٣٧٢ قال الخطيب روى عنه أبو القاسم الطبراني ثم لم يذكر الخطيب فيه جرحا ولا تعديلا.
وقد أخرج أبو داود والترمذي نحوه ولكنه من طريق خصيف بن عبد الرحمن قال الحافظ في تخريج الكشاف أعله ابن عدي بن خصيف. ا. هـ.
قال أبو عبد الرحمن خصيف ضعفه الأكثرون وقد اضطرب في هذا الحديث فتارة يرسله وتارة يوصله وتارة يقول عن مقسم وتارة يقول عن عكرمة وتارة يقول عن عكرمة أو غيره. راجع تفسير ابن جرير ج٤ ص١٥٥.
ثم وجدت له طريقا صالحا للحجية قال الإمام البزار رحمه الله كما في كشف الأستار ج٣ ص٤٣ حدثنا محمد بن عبد الرحيم ثنا عبد الوهاب بن عطاء ثنا هارون القارئ عن الزبير بن الخريت عن عكرمة عن ابن عباس ﴿وَمَا كَانَ لِنَبِيٍّ أَنْ يَغُلَّ﴾ ما كان لنبي أن يتهمه أصحابه. ا. هـ. هارون هو ابن موسى الأزدي العتكي مولاهم أبو عبد الله ويقال أبو إسحاق النحوي البصري الأعور صاحب القراءات وثقه ابن معين وغيره كما في تهذيب التهذيب.
وهذا الأثر وإن لم يكن فيه سبب نزول فإنه يؤيد ما تقدم من سبب النزول عن ابن عباس والله أعلم.
আয়াত "আর কোনো নবীর পক্ষে ইহা সম্ভব নয় যে তিনি কিছু খেয়ানত করবেন। [সূরা আলে ইমরান: ১৬১]
কিছু মুনাফিকরা রাসূলুল্লাহ ﷺ-কে উহুদ যুদ্ধের গনীমতের মাল সম্পর্কে একটি অভিযোগ করেছিল। এর প্রেক্ষিতেই আল্লাহ তাআ'লা এই আয়াত নাযিল করেন: "আর কোনো নবীর জন্য এটা সম্ভব নয় যে, তিনি গুলূল (খিয়ানত) করবেন...এই হাদীসের (যে কিছু মুনাফিকরা অভিযোগ করেছিল) বর্ণনা করেছেন: আত-তাবারানী তাঁর "আস-সাগীর" কিতাবে (২য় খণ্ড, পৃ. ১৫), আল-ওয়াহিদী তাঁর "আসবাবুন নুজুল" কিতাবে (পৃ. ৮৪), আল-খতীব তাঁর "তারীখ বাগদাদ" কিতাবে (১ম খণ্ড, পৃ. ৩৭২)
উক্ত হাদীসের রাবিগণ অর্থাৎ বর্ণনাকারীগন সকলে নির্ভরযোগ্য (সিকাহ) তবে একজন বাদে তা হলো তাবারানী সরাসরি তার যে শাইখ থেকে বর্ণনা করেছেন তিনি ছাড়া। আমি তার কোনো জীবনী "তারীখ বাগদাদ" (১ম খণ্ড, পৃ. ৩৭২) ছাড়া অন্য কোথাও পাইনি। সেখানে আল-খতীব শুধু এতটুকু বলেছেন যে, আবুল কাসিম আত-তাবারানী তার থেকে বর্ণনা করেছেন। কিন্তু খতীবে বাগদাদী (রহ) তাকে দুর্বল বা নির্ভরযোগ্য কোনোটাই বলেননি (তাই এটি দিয়ে দলিল দেয়া যাবেনা)
প্রাসঙ্গিক অন্যান্য হাদিসের “সনদ” যাছাই। তিনি আরো বলেন, আবু দাউদ ও তিরমিযী একই রকম একটি হাদীস বর্ণনা করেছেন কিন্তু সেটি খুসাইফ বিন আবদুর রহমান-এর সূত্রে। ইবনে হাজার (রহ.) "তাখরিজুল কাশশাফ"-এ বলেছেন: "ইবনে আদি এই হাদীসটিকে খুসাইফ-এর কারণে দুর্বল বলেছেন।"
Note: ইবনে হাজার ইবনে আদির বক্তব্য সর্মথন করেছেন কারণ তিনি ইবনে আদির কালামে কোনো আপত্তি করেননি।
আবু আব্দুর রহমান আন নাসাঈ (রহ) বলেছেন: "অধিকাংশ আলেমই খুসাইফকে দুর্বল বলেছেন। আরও সমস্যা হলো, তিনি এই হাদীসটি বর্ণনায় অনেক গড়বড় করেছেন: কখনো তিনি এটি বিচ্ছিন্ন সূত্রে (মুরসাল) বর্ণনা করেছেন, কখনো সংযুক্ত সূত্রে (মাওসুল); কখনো বলেছেন মুকাসিম থেকে, কখনো ইকরিমা থেকে, আবার কখনো বলেছেন 'ইকরিমা বা অন্য কারো থেকে'।" (তাফসীর ইবনে জারীর, ৪র্থ খণ্ড, পৃ. ১৫৫ দেখুন)।
এরপর আমি এই হাদীসের আরেকটি শক্তিশালী ও গ্রহণযোগ্য সনদ পেয়েছি: ইমাম আল-বাযযার (রহ.) "কাশফুল আসতার" (৩য় খণ্ড, পৃ. ৪৩) কিতাবে বর্ণনা করেছেন: ... হারুন আল-কারি → যুবাইর বিন খারিত → ইকরিমা →ইবন আব্বাস (রাদিয়াল্লাহু আনহুমা) থেকে বর্ণনা করেন (নিম্নোক্ত আয়াতের ব্যাখ্যায়): "এবং কোন নবীর পক্ষে খিয়ানত করা (ইয়াগুল্ল) সঙ্গত নয়।" তিনি (ইবন আব্বাস) বলেছেন: "এর অর্থ হলো,"কোনো নবীর সম্পর্কে নবীর সাহাবিরা তাঁকে অভিযুক্ত করবে এটা কল্পনাতীত।
বাযযারের এই বর্ণনাটি যদিও সরাসরি "আয়াত নাযিলের কারণ" বলে উল্লেখ করেনি, তবুও এটি ইবনে আব্বাস (রাদিয়াল্লাহু আনহুমা) থেকে বর্ণিত পূর্বোক্ত "আয়াত নাযিলের কারণ"-কে সমর্থন করে। আর আল্লাহই সর্বজ্ঞ। (( الصحيح المسند من أسباب النزول | تراث))
বাশার আওয়াদ মারুফ, সাইয়্যিদ আবু আল-মা'আতি আল-নুরী, মুহাম্মদ মাহদী আল-মুসলিমি, আহমদ আবদ আল-রাজ্জাক ঈদ, আয়মান ইব্রাহিম আল-জামিলি, মাহমুদ মুহাম্মদ খলিল উক্ত হাদিসটি সম্পর্কে তারা মন্তব্য করে বলেন,
ইমাম ইকরিমাহ (রহ.) থেকে, যিনি ছিলেন আবদুল্লাহ ইবন আব্বাস (রাঃ)-এর আযাদকৃত গোলাম, তিনি আবদুল্লাহ ইবন আব্বাস (রাঃ) থেকে বর্ণনা করেন, তিনি বলেন:
"বদরের দিনে মুশরিকদের থেকে নেওয়া গনীমতের মালের মধ্য থেকে একটি লাল রেশমী কাপড় (কাতীফা) হারিয়ে যায়। কিছু লোক বলল, 'হয়তো নবী ﷺ এটি নিয়ে নিয়েছেন?' তখন আল্লাহ্ এই আয়াত নাযিল করেন: 'কোনো নবীর পক্ষে খিয়ানাত করা শোভনীয় নয়...' (সূরা আলে-ইমরান, ৩:১৬১)।"
- ডক্টর বাশার আওয়াদ মা'রূফ (প্রখ্যাত মুহাদ্দিস)
- আস-সাইয়িদ আবুল মাআতী আন-নূরী (মুহক্কিক)
- মুহাম্মাদ মাহদী আল-মুসলিমী - (মুহাক্কিক)
- আহমাদ আবদুর রাযযাক ঈদ (মুহাক্কিক)
- আইমান ইবরাহীম আয-যামিলী (মুহাক্কিক)
- মাহমূদ মুহাম্মাদ খলীল(মুহাক্কিক)
আমরা বলি: এর সনদটি দুর্বল। খাসিফ বিন আবদুর রহমান, আবু আওন আল-জাযারী, হাদীস বর্ণনায় দুর্বল। দেখুন হাদীস নম্বর (২৩৭৪)-এর ফায়দাসমূহ। (( المسند المصنف المعلل | تراث ))
ইমাম হাফেজ ইবনে হাজার আসকালানী (রহ) রচিত গ্রন্থ “কিতাবুল আজাব ফি বায়ানিল আসবাব” গ্রন্থে তিনি এই বর্ণনাটা উল্লেখ্য করেছেন,
আল্লাহ তায়ালার বাণী: কোনো নবীর পক্ষে এটা সম্ভব নয় যে তিনি কোনো কিছু আত্মসাৎ করবেন [সূরা আলে-ইমরান, আয়াত: ১৬১]
বর্ণনা: আবদ ইবনে হুমাইদ, আত-তিরমিজী আত-তাবারী, আবু ইয়া'লা এবং ইবনে আবি হাতিম খুসাইফের সূত্রে, মুকসিম থেকে বর্ণনা করেছেন। তিনি বলেন: ইবনে আব্বাস আমাকে বলেছেন যে এই আয়াতটি নাযিল হয়েছিল: {"কোনো নবীর জন্য এটা শোভনীয় নয় যে তিনি খিয়ানত করবেন..."} বদরের দিনে হারিয়ে যাওয়া একটি লাল চাদর সম্পর্কে। কিছু লোক বলল, "সম্ভবত মুহাম্মাদ ﷺ এটা নিয়েছেন।" তারা এই বিষয়ে অনেক কথা বলল। তাই আল্লাহ তায়ালা নাযিল করলেন: {"কোনো নবীর জন্য এটা শোভনীয় নয় যে তিনি খিয়ানত করবেন এবং যে খিয়ানত করবে, সে কিয়ামতের দিন তার খিয়ানতকৃত বস্তু নিয়ে উপস্থিত হবে।"
কিতাবের মুহাক্কিক আবদ আল-হাকিম মুহাম্মদ আল-আনিস উক্ত রেওয়াত সম্পর্কে বলেন, তার"জামি (সুনান আত-তিরমিজী)"-এর "তাফসীর" অধ্যায়ে (৫/২১৪) আবদুল ওয়াহিদ ইবনে যিয়াদের সূত্রে। (৭/৩৪৮ - ৮১৩৬) আবদুল ওয়াহিদের সূত্রে। তার"মুসনাদ"-এ (৫/৬০ - ২৬৫১) এবং তিনি এটা (৪/৩২৭ - ২৪৩৮) খুসাইফের সূত্রে, ইকরিমা থেকে, ইবনে আব্বাস (রা.) থেকে বর্ণনা করেছেন। অনুরূপভাবে, আল-ওয়াহিদী তার "আল-আসবাব"-এ (পৃ. ১২১-১২২)।
(২/১/৬৩৭ - ১৭৬০) মুকসিমের পরিবর্তে ইকরিমা থেকে। একইভাবে, এটি বর্ণনা করেছেন আত-তাবারানী তার "আল-মু'জাম আল-কাবীর"-এ (১১/৩৬৪) এবং ইবনে আদি "আল-কামিল"-এ খুসাইফের জীবনীতে (৩/৯৪২) এবং তিনি এই হাদিসটি তার কারণেই দুর্বল বলেছেন।
আল-মুনাওয়ী "আল-ফাতহুস সামাওয়ী"-তে (১/৪১৪) বলেছেন:
সুতরাং হাদিসটি দুর্বল, এবং যারা এটিকে হাসান বলেছেন, যেমন আল-জালাল আস-সুয়ুতী (আল-বাইদাওয়ীর উপর তার টীকায়), তারা ভুল করেছেন, আত-তিরমিজীর রায়ের উপর ভিত্তি করে। ((كتاب العجاب في بيان الأسباب))
যাওয়ায়েদে তারিখে বাগদাদ 'আলাল কুতুবিস সিত্তাহ লেখক খালদুন আল আহদাব তিনি উক্ত হাদীস সম্পর্কে বলেন,
‘আর কোনো নবীর জন্য এটা কল্পনাতীত যে তিনি খেয়ানত করবেন...’ এর তাফসীরে বিশুদ্ধ ভাবে যেটা প্রমানিত সেখানে তিনি (ইবনে আব্বাস) বললেন: “কোনো নবীর ব্যাপারে তার সাহাবীরা তাকে অভিযুক্ত করবেন এটা কল্পনাতীত”
এটিকে আল-বাযযার তার "মুসনাদ"-এ (২১৯৭ - কাশফুল আসতার) বর্ণনা করেছেন: তিনি আমাদের বলেছেন, মুহাম্মাদ ইবনে আবদুর রহিম আমাদের বলেছেন, আবদুল ওয়াহহাব ইবনে আতা আমাদের বলেছেন, হারুন আল-কারী' যুবায়র ইবনুল খারিতের সূত্রে, তিনি ইকরিমার সূত্রে, তিনি ইবনে আব্বাস (রা.)-এর সূত্রে... এবং তিনি এটি উল্লেখ করেছেন।
আমি (লেখক) বলছি: এই সনদটি সহীহ (বিশুদ্ধ)। এর সকল বর্ণনাকারীই নির্ভরযোগ্য (সিকা) এবং তারা সকলেই আল-বুখারীর বর্ণনাকারী, শুধুমাত্র আবদুল ওয়াহহাব ইবনে আতা ছাড়া, তিনি মুসলিমের বর্ণনাকারীদের অন্তর্ভুক্ত। আল-হায়সামী "মাজমাউয যাওয়াইদ"-এ (৬/৩২৮) বলেছেন: "এটি আল-বাযযার বর্ণনা করেছেন এবং এর রাবীরা (বর্ণনাকারীরা) সহীহ গ্রন্থের (বুখারী ও মুসলিম) রাবী।”
জাওয়ায়িদ তারীখু বাগদাদ ‘আলা আল-কুতুবিস্-সিত্তাহ গ্রন্থের লেখক খালদুন আল-আহদাব যিনি এখন সমকালীন মুহাক্কিক তিনি এই হাদিসের সনদ সম্পর্কে বলেন
আবু দাউদ তার "সুনান"-এ, 'হারুফ ওয়াল কিরাআত' অধ্যায়ে (৪/২৮০) নং (৩৯৭১), আত-তিরমিজী কুরআনের তাফসীরে, 'সূরা আলে-ইমরান' প্রসঙ্গে (৫/২৩০) নং (৩০০৯), এবং ইবনে জারীর আত-তাবারী তার "তাফসীর"-এ (৭/৩৪৮) নং (৮১৩৬)।
এটি বর্ণিত হয়েছে আবদুল ওয়াহিদ ইবনে যিয়াদের সূত্রে, তিনি খুসাইফ থেকে, তিনি মুকসিম থেকে, তিনি ইবনে আব্বাস (রা.) থেকে। তিনি বলেছেন:
"এই আয়াতটি নাযিল হয়েছিল: 'আর কোনো নবীর জন্য এটা শোভনীয় নয় যে তিনি খিয়ানত করবেন...' বদরের দিনে হারিয়ে যাওয়া একটি লাল চাদর সম্পর্কে। কিছু লোক বলল, 'সম্ভবত আল্লাহর রাসূল ﷺ এটি নিয়েছেন।' তাই আল্লাহ তা'আলা নাযিল করলেন: 'আর কোনো নবীর জন্য এটা শোভনীয় নয় যে তিনি খিয়ানত করবেন...' আয়াতের শেষ পর্যন্ত।"
আত-তিরমিজী বলেছেন: "এটি একটি হাসান গারীব হাদিস।"
আমি (লেখক) বলছি: এর সনদটি দুর্বল, কারণ এর মধ্যে রয়েছেন (খুসাইফ ইবনে আবদুর রহমান আল-জাযারী, আবু আওন), এবং তিনি হলেন, যেমন আল-হাফিজ "আত-তাকরীব"-এ (১/২২৪) বলেছেন: "সত্যবাদী (সাদুক), কিন্তু তার স্মৃতিশক্তি খারাপ, এবং তিনি তার জীবনের শেষের দিকে (হাদিস বর্ণনায়) গড়বড় করে দিয়েছেন।" তাঁর জীবনী পরবর্তীতে হাদিস (৭২০) এ আসবে। ((زوائد تاريخ بغداد على الكتب الستة | تراث))
তাহলে আমরা এতক্ষণ বিখ্যাত মুহাদ্দিস এবং স্কলাদের তাহকিক পড়ে যা যা বুঝলাম,
উক্ত হাদীসের সনদে একজন রাবি আছে যার নাম খুসাইফ অর্থাৎ খুসাইফ ইবনে আবদুর রহমান আল-জাযারী হাদীসে দুর্বল এবং দুর্বল স্মৃতিশক্তির অধিকারী যার কারণে আলবানি (রহ) প্রথমে তারই কারণে হাদীসটি দুর্বল বলে রায় দিয়েছিলেন পরবর্তীতে তিনি অন্যান্য শাহেদ সনদ পাওয়ার কারণে হাদীসটি হাসান বলে সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করেন, তার উক্ত হাসান বলার সিদ্ধান্ত নিয়ে আমরা পরে আলোচনা করব তার আগে আমরা রাবি খুসাঈফ সম্পর্কে ইলমে জারাহ ওয়াদ তাদিল শাস্ত্রের ইমামদের থেকে কিছু দলিল দেখে নেই।
وقال علي بن المديني: كان يحيى بن سعيد يضعفه
এবং আলী ইবনুল মাদিনি বলেছেন: “ইয়াহইয়া ইবন সাঈদ তাকে দুর্বল বলতেন।” ((ইকমাল তাহযীব আল-কামাল ৪/১৯১, তাহযীব আত-তাহযীব ১/৫৪৩))
وقال أبو بكر محمد بن إسحاق بن خزيمة: لا يحتج بحديثه
আবু বকর মুহাম্মদ ইবন ইসহাক ইবন খুযাইমাহ বলেছেন: “তার হাদিস দ্বারা প্রমাণ কায়েম করা যায় না।”((ইকমাল তাহযীব আল-কামাল ৪/১৯১; তাহযীব আত-তাহযীব ১/৫৪৩))
وقال أبو أحمد الحاكم: ليس بالقوي عندهم
أبو العرب محمد بن أحمد
وذكره أبو العرب في «جملة الضعفاء»، وذكره البرقي في «طبقة المنسوبين إلى الضعف» [إكمال تهذيب الكمال (4/ 191)]
আবু আহমদ আল-হাকিম বলেছেন: “মুহাদ্দিসদের নিকট তিনি শক্তিশালী নন।”((ইকমাল তাহযীব আল-কামাল ৪/১৯১; তাহযীব আত-তাহযীব ১/৫৪৩))
আবু আল-আরব তাকে “জুমলাত আল-দুইয়াফাʾ” অর্থাৎ দূর্বল রাবীদের সংকলিত কিতাবে এর মধ্যে তাকে উল্লেখ করেছেন, আর আল-বারকী তাকে “তাবাকাত আল-মানসুবীন ইলা আল-দাইফ” এর মধ্যে উল্লেখ করেছেন।((ইকমাল তাহযীব আল-কামাল ৪/১৯১))
রাবি খুসাইফ সম্পর্কে ইমাম আহমদ ইবন হাম্বল (রহ),
وقال عبد الله بن أحمد، عن أبيه: ليس بقوي في الحديث. قال: وقال مرة: ليس بذاك. قال أبي: خصيف شديد الاضطراب في المسند [تهذيب التهذيب (1/ 543)]
আবদুল্লাহ ইবন আহমদ তার বাবার কাছ থেকে বর্ণনা করেছেন: “সে হাদিসে শক্তিশালী নয়।” আবার একবার তিনি বলেছেন: “সে কিছুই নয়।” আমার বাবা(আহমাদ বিন হাম্বল) বলেছেন: “খুসাইফ হাদীসের সানাদে খুবই প্রচণ্ডভাবে বিরোধ করতেন।”((তাহযীব আত-তাহযীব ১/৫৪৩))
وقال أبو طالب، عن أحمد بن حنبل: ضعيف الحديث [تهذيب الكمال (8/ 257)]
আবু তালিব, আহমদ ইবন হাম্বল থেকে: “সে হাদিসে দুর্বল।”((তাহযীব আল-কামাল ৮/২৫৭))
ثنا ابن حماد، ثنا صالح، ثنا علي، سمعت يحيى يقول: كنا نجتنب خصيفا [الكامل في الضعفاء (3/ 522)]
ইবন হাম্মাদ আমাদেরকে বর্ণনা করেছেন, সালেহ আমাদেরকে বর্ণনা করেছেন, আলী আমাদেরকে বর্ণনা করেছেন, তিনি বললেন: আমি ইয়াহইয়াকে বলতে শুনেছি: “আমরা খুসাইফকে এড়িয়ে চলতাম।”((আল-কামিল ফি আল-দু‘আফা ৩/৫২২))
حدثنا عبد الرحمن، نا صالح بن أحمد بن حنبل، نا علي - يعني ابن المديني - قال: سمعت يحيى بن سعيد يقول: كنا تلك الأيام نجتنب حديث خصيف، وما كتبت عن خصيف بالكوفة شيئا إنما كتبت عنه، عن خصيف بأخرة. وكان يحيى يضعف خصيفا [الجرح والتعديل لابن أبي حاتم (3/ 403)]
আবদুর রহমান আমাদেরকে বর্ণনা করেছেন, সালেহ ইবন আহমদ ইবন হাম্বল আমাদেরকে বর্ণনা করেছেন, আলী – অর্থাৎ ইবনুল মাদিনি – আমাদেরকে বর্ণনা করেছেন, তিনি বললেন: আমি ইয়াহইয়া ইবন সাঈদকে বলতে শুনেছি: “সে সময় আমরা খুসাইফের হাদিস এড়িয়ে চলতাম, এবং কুফায় খুসাইফ থেকে কিছুই লিখিনি। কেবল পরে আমি তার থেকে লিখেছিলাম।” এবং ইয়াহইয়া খুসাইফকে দুর্বল বলতেন।((আল-জারহ্ ওয়াত-তাআদীল ৩/৪০৩))
আলবানী (রহ) কর্তৃক হাদীসটি “হাসান” রায় দেয়া সম্পর্কে আলোচনা।
এবার আসেন আলবানি (রহ) উক্ত হাদীস “হাসান” বলা নিয়ে আলোচনায় আসি আপনারা যদি এই লিখার একদম উপরে আলবানি (রহ) “হাদীসের সিদ্ধান্তে চূড়ান্ত মানদণ্ড নন” এটা নিয়ে যেই মুহাদ্দিস আলেমদের থেকে প্রমাণ দেখানো হয়েছিল তাদের মধ্যে একজন ছিল শাইখ ড. সাআদ বিন আব্দুল্লাহ আল-হামিদ (হাফি) যিনি একজন সৌদি আলেম, যিনি ‘উলুমুল হাদীস’ ও ‘ফিকহ’-এ বিশেষজ্ঞ। তিনি ‘তাহকিকি’ গবেষণা ও ইসলামী ‘দিরাসাত’ ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখেছেন তিনি আলবানি (রহ) ভুলের ব্যাপারে বলেছেন যেটা আপনার ইতিমধ্যেই দেখেছেন এবং তার পরের অংশটায় কি বলেছেন সেটা আমি ইচ্ছা করেই উপরে দেয়নি এবার আপনার এটা প্রথম থেকে পড়ুন।
وقال الشيخ الدكتور سعد الحميد: أما بالنسبة لتصحيحات الشيخ الألباني، فالشيخ من المجتهدين في علم الحديث، وفي الغالب أنه إذا ضعف حديثًا لا تجد بعده شيئًا - في الغالب -، ولكن لست أدعي أنه لا يفوته شيء، ولكن إذا ضعف حديثًا ففي الغالب أن حكمه يكون لائقًا على ذلك الحديث، وكذلك في كثير من الأحيان إذا حكم على حديث بالصحة أن حكمه يكون جيدًا، وقد يخطئ في نظري.
শাইখ আলবানি উলূমিল হাদীসে মুজতাহিদদের অন্তর্ভুক্ত। তিনি যখন কোন হাদীসকে দুর্বল বলে সাব্যস্ত করেন, সাধারণত তখন তার রায়ের পরে এটা সহিহ হওয়ার সমর্থনে আপনি কিছুই পাবেন না। তবে আমি এ দাবি করি না যে তাঁর নজর থেকে কিছুই ছুটে যায় না, কিন্তু তিনি যদি কোন হাদীসকে দুর্বল বলে রায় দেন, তবে সাধারণত সে হাদীসের জন্য তাঁর রায় যথাযথ হয়। একইভাবে, অনেক সময় তিনি যখন কোন হাদীসকে সহীহ বলে রায় দেন, তখন তাঁর রায় ভালো বলে বিবেচিত হয়, যদিও আমার মতে তিনি ভুলও করতেন।
এরপর তিনি বলেন,
কিন্তু তিনি যদি কোন হাদীসকে হাসান বলে রায় দেন; এটিই হচ্ছে পর্যালোচনার বিষয়। হাদীসকে হাসান বলে সনাক্তকরনের ক্ষেত্রে শাইখের একটি নিজস্ব পদ্ধতি রয়েছে যা তিনি অনুসরণ করেন এবং আমি সেই পদ্ধতির উপর আপত্তি রাখি। তিনি একটি দুর্বল সনদকে অন্য একটি দুর্বল সনদের সাথে একত্রিত করতে উক্ত হাদীসের ক্ষেত্রে নমনীয়ত প্রদর্শন করেন, এবং এভাবেই তিনি সেগুলোর মধ্যে সমন্বয় করেন এবং হাদীসটিকে "হাসান লি গায়রিহী" (অন্যান্য সনদের কারণে হাসান) বলে রায় দেন – অথচ বিজ্ঞদের নিকট সেই সনদগুলোর কিছু অংশ মুনকার হতে পারে, অথবা এমন হতে পারে যে কিছু রাবিরা এমনভাবে একক বর্ণনা করেছেন যা আলেমদের নিকট মুনকার হিসেবে বিবেচিত, কিন্তু শাইখ এই ব্যাপারে ভ্রুক্ষেপ করেন নি।
তাহলে আমরা বুঝলাম আলবানি (রহ) উসুল ছিল তিনি হাদীসকে হাসান বলে সনাক্তকরনের ক্ষেত্রে একটি দুর্বল সনদকে অন্য দুর্বল সনদের সাথে একত্রিত করে উক্ত হাদীসের ক্ষেত্রে নমনীয়ত প্রদর্শন করেন হাসান রায় দিতেন এবং এটাই অন্যান্য মুহাদ্দিসদের সাথে আলবানি (রহ) তাহক্বীক এক না হওয়ার কারণ।
উক্ত হাদীস যতগুলি সনদে বর্ণিত হয়েছে তার সব গুলিই দুর্বল কোথাও রাসুলের সাহাবীরা অভিযোগ করেছেন এটা প্রমাণিত হয়নি এবং এর প্রাসঙ্গিক যতগুলি হাদিস আছে এইগুলি যাচাই করে দেখা যায় অভিযোগকারী ছিল মুনাফিক এবং উক্ত হাদিসগুলোও দুর্বল!
যেটা সাহীহ ভাবে বর্ণিত হয়েছে তা হলো, ইমাম আল-বাযযার (রহ.) "কাশফুল আসতার" (৩য় খণ্ড, পৃ. ৪৩) কিতাবে বর্ণনা করেছেন: ... হারুন আল-কারি → যুবাইর বিন খারিত → ইকরিমা →ইবন আব্বাস (রাদিয়াল্লাহু আনহুমা) থেকে বর্ণনা করেন (নিম্নোক্ত আয়াতের ব্যাখ্যায়): "এবং কোন নবীর পক্ষে খিয়ানত করা (ইয়াগুল্ল) সঙ্গত নয়।" তিনি (ইবন আব্বাস) বলেছেন: "এর অর্থ হলো,"কোনো নবীর সম্পর্কে নবীর সাহাবিরা তাঁকে অভিযুক্ত করবে এটা কল্পনাতীত।
হাদিসটি সহিহ ধরেও কি কোনো আপত্তি থাকে?
অবশ্যই না, ধরুন আব্দুর রহিম একজন দোকানের মালিক সে এবং তার কিছু কর্মী মিলে দোকানটা পরিচালনা করে, একদিন দোকান থেকে একটা চাদর হারিয়ে যাওয়ায় দোকানের কিছু কর্মী অভিযোগ করলো, হয়তো আব্দুর রহিম সাহেব এটা নিয়ে গেছেন!
হ্যাঁ একই ঘটনা উক্ত হাদীসের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য কারণ রাসুল্লাহর জন্য গনিমতের এক পঞ্চমাংশ বরাদ্দ থাকে।
وَاعۡلَمُوۡۤا اَنَّمَا غَنِمۡتُمۡ مِّنۡ شَیۡءٍ فَاَنَّ لِلّٰہِ خُمُسَہٗ وَلِلرَّسُوۡلِ وَلِذِی الۡقُرۡبٰی وَالۡیَتٰمٰی وَالۡمَسٰکِیۡنِ وَابۡنِ السَّبِیۡلِ ۙ اِنۡ کُنۡتُمۡ اٰمَنۡتُمۡ بِاللّٰہِ وَمَاۤ اَنۡزَلۡنَا عَلٰی عَبۡدِنَا یَوۡمَ الۡفُرۡقَانِ یَوۡمَ الۡتَقَی الۡجَمۡعٰنِ ؕ وَاللّٰہُ عَلٰی کُلِّ شَیۡءٍ قَدِیۡرٌ
(হে মুসলিমগণ!) জেনে রাখ, তোমরা যা-কিছু গনীমত অর্জন কর, তার এক-পঞ্চমাংশ আল্লাহ, রাসূল, (তাঁর) আত্মীয়বর্গ, ইয়াতীম, মিসকীন ও মুসাফিরদের প্রাপ্য,যদি তোমরা আল্লাহর প্রতি ও সেই বিষয়ের প্রতি ঈমান রাখ, যা আমি নিজ বান্দার উপর মীমাংসার দিন অবতীর্ণ করেছি যে দিন দু’ দল পরস্পরের সম্মুখীন হয়েছিল। আল্লাহ সর্ব বিষয়ে শক্তিমান।
সুতরাং রাসুল ﷺ যদি গনিমত থেকে কিছু গ্রহণ করেন, সেটি তাঁর শরীয়তসম্মত অধিকারভুক্ত অংশ, আর মুসলিমদের এটা জানা বিষয় এতে করে যখন মুনাফিকদের পক্ষ থেকে আপত্তিটা আসছে তখন বুঝতে হবে এটা অপবাদ আরোপ করার জন্য নয়তো মুসলিমদের বিভ্রান্ত করার জন্য কিংবা এটাও হতে পারে তারা শুধুই বলেছিল এটি রাসুল্লাহ নিয়েছেন এতে তারা খারাপ কিছু মনে করেননি।
এইবার আসুন আমরা আলেমদের বক্তব্য দেখে নেই এই সম্পর্কে। সুনান আবু দাউদ এর ব্যাখ্যাগ্রন্থ (শারহু সুনান আবি দাউদ) লেখক শাইখ আবদুল মুহসিন আল-আববাদ উক্তি হাদীসের ব্যাখ্যায় বলেন,
شرح سبب نزول قوله تعالى: (وما كان لنبي أن يغل)]
قال المصنف رحمه الله تعالى: [حدثنا قتيبة بن سعيد حدثنا عبد الواحد بن زياد حدثنا خصيف حدثنا مقسم مولى ابن عباس قال: قال ابن عباس رضي الله عنهما: (نزلت هذه الآية: {وَمَا كَانَ لِنَبِيٍّ أَنْ يَغُلَّ} [آل عمران:١٦١] في قطيفة حمراء فقدت يوم بدر، فقال بعض الناس: لعل رسول صلى الله عليه وآله وسلم أخذها، فأنزل الله عز وجل: {وَمَا كَانَ لِنَبِيٍّ أَنْ يَغُلَّ} [آل عمران:١٦١] إلى آخر الآية).
قال أبو داود: يغل مفتوحة الياء].
أورد أبو داود حديث ابن عباس: أنه في يوم بدر فقدت قطيفة فقال الناس: لعل الرسول أخذها، ومعلوم أنه إن أخذها فيكون أخذها اصطفاء لا غلولاً؛ لأن الرسول كما هو معلوم يصطفي من الغنيمة ما يشاء، ونصيبه الخمس، وليس المقصود أنهم يريدون أنه غل؛ لأن الغلول محرم ولا يضاف إلى الرسول صلى الله عليه وسلم، فأنزل الله هذه الآية: {وَمَا كَانَ لِنَبِيٍّ أَنْ يَغُلَّ} [آل عمران:١٦١]، وفيها قراءتان: يَغلُ ويُغَلُ، يعني يخون، أو يُغَلُ: يخان, فهذه قراءة وهذه قراءة.
আল্লাহর বাণী: "আর কোনো নবীর জন্যে এটি সম্ভব নয় যে, তিনি গুলুল (বিশ্বাসঘাতকতা/অন্যের অধিকার আত্মসাৎ) করবেন..."-এর নাযিলের কারণের ব্যাখ্যা।
লেখক, আল্লাহ তার উপর রহমত করুন, বলেছেন: [কুতাইবা ইবনে সাঈদ আমাদের কাছে বর্ণনা করেছেন, আবদুল ওয়াহিদ ইবনে যিয়াদ আমাদের কাছে বর্ণনা করেছেন, খুসাইফ আমাদের কাছে বর্ণনা করেছেন, মুকসিম, ইবনে আব্বাসের মুক্তদাস, বলেছেন: ইবনে আব্বাস (রা) বলেছেন: (এই আয়াত: "আর কোনো নবীর জন্যে এটি শোভনীয় নয় যে, তিনি গুলুল করবেন..." [সূরা আলে-ইমরান: ১৬১] বদরের দিন হারিয়ে যাওয়া একটি লাল চাদর (কতীফা) সম্পর্কে নাযিল হয়েছিল। তখন কিছু লোক বলল: 'সম্ভবত আল্লাহর রাসূল ﷺ এটি নিয়েছেন।' তাই আল্লাহ তা'আলা নাযিল করলেন: "আর কোনো নবীর জন্যে এটি শোভনীয় নয় যে, তিনি গুলুল করবেন..." [সূরা আলে-ইমরান: ১৬১] আয়াতের শেষ পর্যন্ত।)
আবু দাউদ বলেছেন: "ইয়াগ্ল" (يَغْلَّ)- ইয়া (ي) হরকত সহ (ফাতহা সহ)।
আবু দাউদ ইবনে আব্বাসের হাদিসটি উল্লেখ করেছেন: বদরের দিন একটি লাল চাদর হারিয়ে গিয়েছিল। তখন কিছু লোক বলল: "সম্ভবত রাসূল ﷺ এটি নিয়ে নিয়েছেন।" এটা জানা বিষয় যে, তিনি যদি সেটি নিয়ে থাকতেন, তাহলে সেটা তার জন্য বরাদ্দ অংশ (গনীমত থেকে) হিসেবে নেওয়া হতো, গুলুল (বিশ্বাসঘাতকতা) হিসেবে নয়; কারণ রাসূল ﷺ, যেমনটি জানা আছে, গনীমতের মাল থেকে তার পছন্দমত জিনিস বেছে নেয়ার অধিকার ছিল এবং তার অংশ ছিল এক পঞ্চমাংশ। উদ্দেশ্য এই নয় যে, তারা তাকে গুলুলের অভিযোগে অভিযুক্ত করা , কারণ গুলুল নিষিদ্ধ এবং রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর প্রতি এটা আরোপ করা যায় না। তাই আল্লাহ এই আয়াত নাযিল করলেন: "আর কোনো নবীর জন্যে এটি কল্পনীয় নয় যে, তিনি গুলুল করবেন..." [সূরা আলে-ইমরান: ১৬১]। এই শব্দটির দুটি কিরাআত (পাঠপদ্ধতি) রয়েছে: "ইয়াগ্লুলু" (يَغْلُل) এবং "ইউগুল্ল" (يُغَلَ), যার অর্থ যথাক্রমে "বিশ্বাসঘাতকতা করা" বা "বিশ্বাসঘাতকতার শিকার হওয়া"। সুতরাং, এটি এক কিরাআত এবং সেটি অন্য কিরাআত। (( كتاب شرح سنن أبي داود للعباد))
তইসীর ফি তাফসীরের লেখক নাজমুদ্দিন উমর ইবনে মুহাম্মদ ইবনে আহমাদ আন-নাসাফি (রহ) তার কিতাবে একটি বর্ণনা নিয়ে এসেছে সেই বর্ণনার টিকায় উক্ত কিতাবের মুহাক্কিক মাহের আদীব হাবূশ (হাফি) কি বলেছেন আসুন সেটা দেখি,
আল্লাহর বাণী: "আর কোনো নবীর জন্য এটা সম্ভব নয় যে তিনি ঘূলুল (আত্মসাৎ)করবেন" [সূরা আলে-ইমরান: ১৬১]
অর্থাৎ, তার জন্য এটি (আত্মসাৎ) বৈধ নয়। আর যদি তার জন্য কিছু বৈধ না হয়, তাহলে তিনি তা করেন না।
আবার কেউ কেউ বলেছেন এর অর্থ হলো: গুলূল করা তার চরিত্রের মধ্যে ছিল না; কারণ নবীগণ (আ.) এ ধরনের কাজ থেকে ‘মাসুম’।
ইবনে আব্বাস (রা.) বলেছেন: "এই আয়াতটি একটি লাল রেশমী চাদরের প্রসঙ্গে নাযিল হয়েছিল যা হারিয়ে গিয়েছিল। মুনাফিকেরা বললো, সম্ভবত আল্লাহর রাসূল ﷺ এটি নিয়েছেন, তাই আল্লাহ এই আয়াত অবতীর্ণ করে তাকে এই ঘুলুলের বৈশিষ্ট্য থেকে পবিত্র ঘোষণা করলেন।
মুহাক্কিক মাহের আদীব হাবূশ (হাফি) বলেন,
এটি বর্ণনা করেছেন আবু দাউদ (৩৯৭১), তিরমিযী (৩০০৯) এবং তাবারী তাঁর 'তাফসীর'-এ (৬/১৯৪) খুসাইফের সূত্রে, তিনি মিকসাম থেকে, তিনি ইবনে আব্বাস (রা.) থেকে। তিরমিযী বলেছেন: হাদিসটি"হাসান গরীব।" কিছু বর্ণনাকারী এই হাদীসটি খুসাইফ থেকে, তিনি মিকসাম থেকে বর্ণনা করেছেন, কিন্তু সেখানে 'ইবনে আব্বাস থেকে' উল্লেখ নেই। এটিকে আবু ইয়া'লা তাঁর 'মুসনাদ'-এ (২৪৩৮), তাবারী তাঁর 'তাফসীর'-এ (৬/১৯৫), ইবনুল মুনযির তাঁর 'তাফসীর'-এ (১১২৫), ইবনে আবি হাতিম তাঁর 'তাফসীর'-এ (৩/৮০৩), তাবারানী 'আল-কাবীর'-এ (১২০২৮, ১২০২৯) এবং ওয়াহিদী 'আসবাবুন নুযুল'-এ (পৃ. ১২৬) খুসাইফের সূত্রে, তিনি ইকরিমা থেকে, তিনি ইবনে আব্বাস (রা.) থেকে বর্ণনা করেছেন।
এই খুসাইফ (ইবনে আবদুর রহমান)-এর স্মৃতিশক্তিতে দুর্বলতা ছিল। হাফিয ইবনে হাজার 'আত-তাকরীব'-এ বলেছেন: "তিনি সদুক ছিলেন কিন্তু স্মৃতিশক্তিতে দুর্বল এবং শেষ বয়সে অনেক ইখতিলাত( বর্ণনায় উল্টা পাল্টা)করে ফেলতেন এবং তিনি এই হাদীসটি বর্ণনায় গরমিল করেছেন, কখনো বলেছেন 'মিকসাম থেকে' আবার কখনো 'ইকরিমা থেকে'। তবে, হাদীসটির মুজাহিদের সূত্রে ইবনে আব্বাস (রা.) থেকে আরও একটি শক্তিশালী সনদ আছে, যা পরে উল্লেখ করা হবে।
আমার মন্তব্য (মাহের আদীব হাবূশ) এই বিষয়ে বলেন,
যারা এ কথা বলেছিল তারা মুনাফিক ছিল কিনা। মুফাসসিরগণ এ বিষয়ে মতভেদ করেছেন। কিছু আলেম লেখক (বাগাভী)-এর মতকেই গ্রহণ করেছেন যে, তারা ছিল মুনাফিক, যাঁরা যাঁরা এই মত দিয়েছেন তাদের মধ্যে আছেন যামাখশারী ও তাঁর অনুসারীগণ যেমন বাইদাভী ও আলুসী। অন্যদিকে, ইবনে আতিয়্যা দ্বিধাগ্রস্ত ছিলেন, তিনি বলেছেন:
"কথিত আছে, এই বক্তব্য এমন মুমিনদের পক্ষ থেকে এসেছিল যারা মনে করত না যে এতে কোনো (নবীজির গনিমত থেকে নেয়াতে) দোষ আছে, আর কেউ বলেন তা মুনাফিকদের পক্ষ থেকে।" কুরতুবী ও আবু হায়্যান এ বিষয়ে তাঁর অনুসরণ করেছেন। অন্যদিকে, ইবনে কামাল পাশা তাঁর 'তাফসীর'-এ দৃঢ়তার সাথে বলেছেন যে বক্তা ছিল মুমিন, তিনি বলেন: "যে এ কথা বলেছিল সে ছিল একজন মুমিন, যে রাসূলের গনীমত থেকে নেয়া কোনো দোষ মনে করেনি।"
দুইটি মত উল্লেখ্য করার পর তিনি বলেন,
আমার মতে প্রথম মতটি (যে বক্তা মুনাফিক ছিল) গ্রহনযোগ্য।
قلت: ولعل القول الأول مرجَّح بما رواه الطبراني في «الكبير» (١١١٧٤)، وفي «الأوسط» (٥٣١٣)، وفي «الصغير» (٨٠٣)، ومن طريقه الواحدي في «أسباب النزول» (ص: ١٢٧)، والخطيب البغدادي في «تاريخه» (١/ ٣٧٢)،
কারণ মুজাহিদের সূত্রের সনদ যা তাবারানী 'আল-কাবীর'-এ (১১১৭৪), 'আল-আওসাত'-এ (৫৩১৩) এবং 'আস-সাগীর'-এ (৮০৩) যা বর্ণনা করেছেন – এবং তাঁর সূত্রে ওয়াহিদী 'আসবাবুন নুযুল'-এ (পৃ. ১২৭) এবং খতীব আল-বাগদাদী তাঁর 'তারীখ'-এ (১/৩৭২) – আবু আমর ইবনুল আলার সূত্রে, তিনি মুজাহিদ থেকে, তিনি ইবনে আব্বাস (রা.) থেকে:
من طريق أبي عمرو بن العلاء، عن مجاهد، عن ابن عباس أنه كان يقرأ: ﴿وَمَا كَانَ لِنَبِيٍّ أَنْ يَغُلَّ﴾ وكيف لا يكون له أن يُغَلَّ وله أن يُقتَل، قال اللَّه: ﴿وَيَقْتُلُونَ الْأَنْبِيَاءَ﴾ [آل عمران: ١١٢] ولكن المنافقين اتهموا النبي صلى اللَّه عليه وعلى آله وسلم في شيء، فأنزل اللَّه عز وجل: ﴿وَمَا كَانَ لِنَبِيٍّ أَنْ يَغُلَّ﴾، لفظ الطبراني،
তিনি (ইবনে আব্বাস) 'আর কোনো নবীর জন্য এটা সম্ভব নয় যে, তিনি গুলূল করবেন… এই আয়াতটি তিলাওয়াত করতেন এইভাবে এবং বলতেন, এটা কিভাবে বলা যায় যে,কোনো নবীর সাথে বিশ্বাসঘাতকতা হওয়া সম্ভব নয়?অথচ নবীদের নিহত হওয়াও সম্ভব ছিল? আল্লাহ তো বলেছেন, "এবং তারা নবীদের হত্যা করে" [সূরা আলে-ইমরান: ১১২]। বরং এর অর্থ হলো মুনাফিকরা নবী (সা.)-কে কোনো বিষয়ে অভিযোগ করেছিল, তাই আল্লাহ তা'আলা নাযিল করেন: 'আর কোনো নবীর জন্য এটা সম্ভব নয় যে, তিনি গুলূল করবেন(তাবারানীর শব্দ)।
وفي رواية الواحدي: أنه كان يُنْكِرُ على مَن يقرأُ: (ومَا كانَ لِنَبِيٍّ أَنْ يُغَلَّ) ويقولُ: كيف لا يكونُ له أنْ يُغَلَّ وقد كان يُقتلُ. . . الحديث.
আল-ওয়াহিদীর বর্ণনায় আছে: তিনি (ইবনে আব্বাস) যারা "وَمَا كَانَ لِنَبِيٍّ أَنْ يُغَلَّ" (এবং কোনো নবীর পক্ষে বিশ্বাসঘাতকতার শিকার হওয়া সম্ভব নয়) বলে পাঠ করতেন, তাদেরকে তিনি নিষেধ করতেন এবং বলতেন: "কিভাবে তার পক্ষে ঘুলুলের শিকার হওয়া সম্ভব নয়, অথচ নবীদের হত্যা করা হতো?...” (( التيسير في التفسير - أبو حفص النسفي | تراث ))
অতএব আমরা দেখলাম আমরা যদি হাদিসগুলি সহিহ ধরেও নেই যেমনটা উক্ত ব্যাখ্যাগুলিতে দেখলাম তাহলেও এখানে কোনো আপত্তি থাকে না।
গনিমতের ব্যাপারে রাসুল্লাহ ﷺ-এর স্পষ্ট বক্তব্য তিনি বলেছেন,
হে লোকসকল! তোমাদের এ যুদ্ধলব্ধ সম্পদ থেকে আমার নিজের তো কিছুই নেই এমনকি এই পশমও নেই।কেবল এক পঞ্চমাংশ আমার জন্য; আর তাও তোমাদেরকে দিয়ে দেওয়া হয়।হে আনসার সম্প্রদায়। তোমরা কি দুনিয়ার তুচ্ছ সম্পদের কারণে আমার প্রতি মনোকষ্ট নিয়েছ? যেই সম্পদ দিয়ে আমি একদল মানুষের মন জয় করার চেষ্টা করেছি। যাতে তারা ইসলাম গ্রহণ করে। আর তোমাদেরকে তোমাদের ইসলামের হাতে তুলে দিয়েছি? হে আনসার সম্প্রদায়। তোমরা কি এতে সন্তুষ্ট নও যে, তারা ঐ সকল বকরী-ভেড়া নিয়ে তাদের ঘরে ফিরে যাবে। আর তোমরা আল্লাহর রাসূলকে নিয়ে তোমাদের ঘরে ফিরে যাবে? ঐ সত্তার কসম। যার হাতে মুহাম্মাদের প্রাণ। যদি হিজরত না থাকত তবে তো আমি আনসারদেরই একজন সদস্য হতাম। যদি সমস্ত মানুষ এক পথে চলে আর আনসাররা চলে অন্য পথে তবে আমি আনসারদের পথই বেছে নিব। হে আল্লাহ আপনি আনসারদের উপর রহম করুন। আনসারদের সন্তানদের উপর রহম করুন। আনসারদের সন্তানদের সন্তানদের উপর রহম করুন। (( আর রাহীকুল মাখতুম পৃষ্ঠা নং ৬৮৮ এবং ৬৯০ ইবনে হিশামের উদ্ধৃতি সহ))
মুনাফিকদের সম্পর্কে কিছু কথা
হাদিসগুলি স্পষ্ট উল্লেখ্য করা হয়েছে অভিযোগকারী ছিল মুনাফিক আর মুনাফিকরা হলো ইসলামের সবচেয়ে বড় শত্রু। তবে আমার আগেই প্রমাণ করেছি উক্ত হাদীস গুলিও দুর্বল তর্কের খাতিরে আমরা এটি যদি ধরেও নেই মুনাফিকদের থেকে অভিযোগ এসেছিল রাসুল্লাহ ﷺ গনিমত থেকে চাদর নিয়েছিল তাহলেও এতে কিছু প্রমাণ হয়না।
প্রথমত মুনাফিকদের এই অভিযোগ পরস্পর বিরোধী এর কারণ তারা জানত রাসুলের জন্য যেটা বরাদ্দ সেটা নিয়ে অভিযোগ তোলা সম্ভব নয় তাহলে তারা এই অভিযোগ তুলে কেন নিজেদের বিতর্কের পাত্র করে তুলবে? আর এটা জানা কথা যে তারা বিভিন্ন অপবাদ আরোপ করত মুসলিমদের বিরুদ্ধে ফিতনা সৃষ্টি করার জন্য। আর এটা তো যৌক্তিকভাবে সম্ভব নয় যে, তারা সেই বিষয়ে সন্দেহ করবে যেটাকে সন্দেহ করার কোনো অবকাশ নেই? এবার যদি তাদের এই অযৌক্তিক অপবাদ টাও ধরে নেই তাহলেও কোনো আপত্তি থাকে না এটা নিয়ে আলোচনা করার আগে আমি আরেকটি বিষয় খোলাসা করছি।
IslamWeb এ একটি প্রশ্নের জবাবে বলা হয়েছে;
“কাফেররা বলল, সে মিথ্যাচারী যাদুকর (সুরা ছাদ, ৩৮:৪), এবং আল্লাহর অপর বাণী “নিশ্চয়ই তারা আপনাকে মিথ্যাবাদী মনে করে না” (সুরা আনআম, ৬:৩৩) —আমরা কিভাবে এর মধ্যে সামঞ্জস্য স্থাপন করব?
এর জবাবে বলা হলো,
'তাকযীব' (মিথ্যা বলা বা মিথ্যা বলার অভিযোগ দেওয়া) শব্দটি দুটি অর্থে ব্যবহৃত হতে পারে এক. কোনো ব্যক্তিকে মিথ্যাবাদী বলে আখ্যায়িত করা, অথচ অন্তরে তার সত্যবাদিতা বিশ্বাস করা। দুই. তাকে মিথ্যাবাদী বলে আখ্যায়িত করা এবং অন্তরে তাকে মিথ্যাবাদী বলে বিশ্বাস করা। প্রথম অর্থের উদাহরণ হলো কিছু কাফেরের কাজ; তারা নবী ﷺ-এর সত্যবাদিতা ও আমানতদারীতে বিশ্বাস করত, কিন্তু তারা জিদবশত, তাদের মর্যাদা হারানোর ভয়ে এবং সাধারণ মানুষকে তার ﷺ থেকে দূরে রাখার জন্য তাকে মিথ্যাবাদী বলে আখ্যায়িত করত।
ইবনুল কাইয়্যিম “আত-তিবইয়ান ফি আকসামিল কুরআন”-এ বলেন:
ইবনুল কাইয়্যিম (রহ.) 'আত-তিবইয়ান ফি আকসামিল কুরআন'-এ বলেছেন: 'কাযাবা আর-রাজুল' (ব্যক্তি মিথ্যা বলল) বলা হয় যখন সে মিথ্যা কথা বলে। আর 'কাযযাবতু-হু' (আমি তাকে মিথ্যাবাদী বললাম) অর্থ আমি তাকে মিথ্যার সাথে সম্পৃক্ত করলাম, যদিও আমি তার সত্যবাদিতায় বিশ্বাস করি। আর 'কাযযাবতু-হু' অর্থ আমি তাকে মিথ্যাবাদী বলে অভিযুক্ত করলাম, যদিও সে সত্যবাদী। আল্লাহ তা'আলা বলেন: "আর যদি তারা আপনাকে মিথ্যাবাদী বলে, (তবে আপনি বলে দিন) 'অবশ্যই আপনার পূর্বে অনেক রাসূলকেই মিথ্যাবাদী বলা হয়েছে'" (সূরা ফাতির, ৩৫:৪)। আর তিনি বলেন: "নিশ্চয় তারা আপনাকে মিথ্যাবাদী বলে না" (সূরা আল-আন'আম, ৬:৩৩)।
এক জায়গায় বলা হচ্ছে তারা আপনাকে মিথ্যাবাদী বলে না আবার অন্য জায়গায় বলা হচ্ছে তারা আপনাকে মিথ্যাবাদী বলে এর সমাধান কি?
ইবনে কায়্যিম (রহ) বলেন,
প্রথমটির অর্থ হলো তারা জানে আপনি সত্যবাদী 'যদিও তারা আপনাকে মিথ্যার সাথে সম্পৃক্ত করে'। দ্বিতীয়টির অর্থ হলো 'তারা বিশ্বাস করে না যে আপনি মিথ্যাবাদী, বরং তারা জিদ করে এবং সত্য জেনে শুনে অস্বীকার করে, মুখ ফিরিয়ে নেওয়া ও জিদবশত।' এটাই এই শব্দের মূল অর্থ।
ক্রিয়াটি (কাযযাবা) সরাসরি সংবাদ বস্তুর সাথে অথবা 'বা' বা 'ফি' ব্যবহৃত হয়ে সকর্মক হতে পারে। বলা হয়: 'কাযযাবতু-হু বি-কাযা' (আমি অমুক বিষয়ে তাকে মিথ্যাবাদী বললাম) এবং 'কাযযাবতু-হু ফীহি' (আমি এতে তাকে মিথ্যাবাদী বললাম)। প্রথম ব্যবহারটি বেশি প্রচলিত, যেমন তাঁর বাণী: "বরং তারা সত্যকে মিথ্যা বলেছে যখন তা তাদের কাছে এসেছে" (সূরা সাবা, ৩৪:৪৩) এবং তাঁর বাণী: "এবং তারা আমাদের নিদর্শনসমূহকে মিথ্যা বলেছে" (সূরা আন-নামল, ২৭:১৪)। [উদ্ধৃতি সমাপ্ত]
বদরুদ্দীন আল-কিনানী “কাশফুল মা‘আনী”-তে বলেন:
“আল্লাহ বলেন: ‘নিশ্চয়ই তারা আপনাকে মিথ্যাবাদী মনে করে না’ এবং পরে বলেন: ‘যদি তারা আপনাকে মিথ্যাবাদী মনে করে, তবে বলুন: তোমাদের প্রভু…’ এর জবাব হলো: তারা অন্তরে আপনাকে মিথ্যাবাদী মনে করে না, কারণ আপনি তাদের কাছে ‘আল-আমীন’ নামে পরিচিত ছিলেন। তবে তারা আপনার নামে বাহ্যিকভাবে মিথ্যাবাদী বলে প্রচার করে, যাতে মানুষ আপনাকে অনুসরণ না করে।”
ওয়াহিদি “আল-বাসীত”-এ বলেন:
আল-ওয়াহিদী 'আত-তাফসীরুল বাসীত'-এ বলেছেন: "নিশ্চয় তারা আপনাকে মিথ্যাবাদী বলে না" - এই বাণীর অর্থ সম্পর্কে তারা মতভেদ করেছেন। ইবনে আব্বাস (রা.) বলেছেন, "ফা-ইন্নাহুম লা ইউকাযযিবূনাক" এর অর্থ হলো, তারা গোপনে আপনাকে মিথ্যাবাদী বলে না; বরং তারা জানে যে আপনি সত্যবাদী। পক্ষান্তরে, "ওয়া লাকিন্নায-যালিমীনা বিআইয়াতিল্লাহি ইয়াজহাদূন" অর্থ বস্তুত যালিমরা প্রকাশ্যে মুহাম্মাদ (সা.) ও কুরআন সম্পর্কে আল্লাহর আয়াতসমূহ অস্বীকার করে। এ কথাই বলেছেন অধিকাংশ মুফাসসির, যেমন— আবু সালিহ, কাতাদাহ, আস-সুদদী ও মুকাতিল। তাঁদের বক্তব্য হলো: এ আয়াত ঐসব জিদী ও হঠকারী লোকদের সম্পর্কে নাযিল হয়েছে, যারা মুহাম্মাদ ﷺ-এর সত্যতা স্বীকার করত এবং জানত যে তিনি কোনো মিথ্যা বলেন না; কিন্তু তারা জিদ ও হিংসাবশতই তা অস্বীকার করত।মুকাতিল বলেছেন: এ আয়াত হারিস ইবনে আমির সম্পর্কে নাযিল হয়েছে। সে প্রকাশ্যে নবীজি ﷺ-কে মিথ্যাবাদী বলত; কিন্তু যখন পরিবার-পরিজনের সাথে নির্জনে থাকত, তখন বলত: "মুহাম্মাদ ﷺ মিথ্যুকদের অন্তর্ভুক্ত নন। আমরা জানি, তিনি যা বলেন তা সত্য। তবে আমাদেরকে তাঁর অনুসরণ করতে শুধুমাত্র এই ভয়ই বাধা দিচ্ছে যে, আমাদেরকে আমাদের এলাকা থেকে (আরব গোত্রগুলো কর্তৃক) উৎখাত করা হবে। কারণ আমরা সংখ্যায় অতি নগণ্য এবং আরব গোত্রদের মোকাবেলার আমাদের কোনো শক্তি নেই।” ((التوفيق بين قول الله: وقال الكافرون هذا ساحر كذاب، وبين قوله: فإنهم لا يكذبونك))
অতএব আমরা বুঝলাম যদিও রাসুলুল্লাহ ﷺ-কে তারা সত্য নবী হিসেবেই জানতো কিন্তু মুনাফিক এবং কাফিররা এমন অনেক কারণে তারা ইসলাম যাতে বাধাগ্রস্থ হয় এরজন্য তাদের যা যা করা দরকার তারা তাই করত, যার কারণে তারা রাসুল ﷺ-কে যাদুকর, কবি, গনক, মিথ্যাবাদী ইত্যাদি আরো অনেক কিছুরই অপবাদ দিয়েছিল কিন্তু তারা এর সাথে এটাও নিশ্চিত ছিল তিনি সত্য নবী।
মুনাফিকদের কিছু বৈশিষ্ট্য
বিখ্যাত ওয়েবসাইট Alukah.Net এ এই বিষয়ে একটি আর্টিকেলে শেইখ আসামা আল বাদউ (হাফি) আলোচনা করেছেন,
আল্লাহ তা'আলা বলেছেন: "তারা শত্রু, অতএব তাদের থেকে সতর্ক থাকো।" [আল-মুনাফিকুন: ৪]
মুনাফিকরাই হল ইসলামী উম্মাহর সবচেয়ে তীব্র শত্রু এবং মুমিনদের জন্য সবচেয়ে বিপজ্জনক। তারা পরিবেশ অনুযায়ী রঙ বদলায়; তারা নিজেদেরকে উপস্থাপন করে সহানুভূতিশীল ভাই রূপে, অথচ তারা মানুষের চামড়ায় ঢাকা নেকড়ে স্বরুপ। পিপাসু ব্যক্তি তাদের পানি ভেবে ভুল করে; মুমিন মনে করে তারা তার সাহায্যকারী, কিন্তু তারা মুমিনদের বিরুদ্ধেই কাফেরদের সাহায্যকারী। সে(মুমিন) তাদের(মুনাফিকদের) তার পরামর্শদাতা মনে করে, কিন্তু তারা তার ধ্বংস ও বিনাশের কারণ। তারা পৃথিবীতে ফাসাদ সৃষ্টি করতে সচেষ্ট। প্রায় কোনো সমাজ বা সমাবেশই তাদের থেকে মুক্ত নয়। তারা পর্দার আড়ালে এবং কাতারের পিছন থেকে কাজ করে।
তাদের বিপদ এতই ভয়াবহ যে বর্ণনা করা যায় না এবং এতই বিশাল যে পাতায় ও বইয়ের ভলিউমে তা ধারণ করা সম্ভব নয়। পরাক্রম ও সম্মানের অধিকারী (আল্লাহর) বাণীই তোমার জন্য যথেষ্ট:
لَوۡ خَرَجُوۡا فِیۡکُمۡ مَّا زَادُوۡکُمۡ اِلَّا خَبَالًا وَّلَا۠اَوۡضَعُوۡا خِلٰلَکُمۡ یَبۡغُوۡنَکُمُ الۡفِتۡنَۃَ ۚ وَفِیۡکُمۡ سَمّٰعُوۡنَ لَہُمۡ ؕ وَاللّٰہُ عَلِیۡمٌۢ بِالظّٰلِمِیۡنَ
তারা তোমাদের সঙ্গে বের হলে তোমাদের বিভ্রান্তিই বৃদ্ধি করত আর তোমাদের মধ্যে ফিতনা সৃষ্টির উদ্দেশ্যে তোমাদের মধ্যে ছুটাছুটি করত। তোমাদের মধ্যে এদের জন্যে কথা শুনার লোক আছে। আল্লাহ্ জালিমদের সম্বন্ধে সবিশেষ অবহিত। (সূরা তাওবাহ ৪৭) ((خطر المنافقين على الإسلام والمسلمين))
রাসূলের আমানতের কিছু উদাহরন এবং একটি প্রশ্নের জবাব দেয়ার চেষ্টা করব কেন রাসুল সত্যবাদী হওয়ার পরেও মক্কার কাফেররা ইসলাম কবুল করেননি।
নবী চরিত্রের এ মাহাত্ম্যের কোনো নির্দিষ্ট সীমারেখা নেই। তার চরিত্র যেমন চিন্তাগত দিক থেকে মহৎ ঠিক তেমনি বাস্তবায়নের দিক থেকেও মহৎ। রাসূলুল্লাহ্ ﷺ স্বীয় জীবনে এ সত্যকে বাস্তবায়ন করে দেখিয়েছেন যে, আল-কুরআনে বর্ণিত যাবতীয় বিধিবিধানই মানব জীবনে বাস্তবায়নযোগ্য এবং গোটা মানবগোষ্ঠীকে সুশৃঙ্খলিত করার জন্য ও সৎপথ প্রত্যাশীদের জন্য একমাত্র সঠিক কার্যকরী দিক-নির্দেশনা। তাঁর জীবন ছিল আল-কুরআনের সুস্পষ্ট ব্যাখ্যা। তার চরিত্রের বর্ণনা দিতে গিয়ে আয়েশা (রা) কতইনা সুন্দর কথা বলেছেন, তিনি বলেছেন,
كَانَ خُلُقُهِ الْقُرْآنَ»
রাসূলুল্লাহ্ ﷺ-এর চরিত্রেরই পূর্ণ ব্যাখ্যা হলো আল-কুরআন। ((সাহীহ বুখারী ৩০৮, মুসনাদে আহমদ হাদীস ২৫৩৪১))
আবু হুরায়রা (রাযি.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন: রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:
وَحَدَّثَنَا مُحَمَّدُ بْنُ مُقَاتِلٍ، أَخْبَرَنَا عَبْدُ اللَّهِ، أَخْبَرَنَا مَعْمَرٌ، عَنْ هَمَّامِ بْنِ مُنَبِّهٍ، عَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ ـ رضى الله عنه ـ عَنِ النَّبِيِّ ﷺ قَالَ " إِنِّي لأَنْقَلِبُ إِلَى أَهْلِي، فَأَجِدُ التَّمْرَةَ سَاقِطَةً عَلَى فِرَاشِي فَأَرْفَعُهَا لآكُلَهَا، ثُمَّ أَخْشَى أَنْ تَكُونَ صَدَقَةً فَأُلْفِيَهَا
“আল্লাহর কসম, যখন আমি আমার বিছানায় অন্য জায়গায় এসেছে পরিবারের নিকট ফিরে এসে আমার বিছানায় একটি পড়ে থাকা খেজুর পাই। আমি জানি না এটি সদকার খেজুর নাকি আমার পরিবারের খেজুর, তাই আমি তা খাই না।" ((হিলইয়াতুল আউলিয়া, খণ্ড ৮, পৃষ্ঠা ২০১। তাখরিজ: বুখারি হাদিস নং ২৪৩২, মুসলিম (মাওসুল আকারে, হাদিস নং ১০৭০) সামান্য পার্থক্যসহ।))
নবীজি ﷺ-এর সততা স্পষ্টই এখানে অবাক করে, নবী ﷺ প্রতিটি ক্ষুদ্র বিষয়েও সতর্কতা অবলম্বন করেছেন এ থেকে আমরা শিখি কোনো বিষয়ে পরিপূর্ণ নিশ্চিত না হওয়ার পর্যন্ত অর্থাৎ সেটা আদৌ কি আমার অধিকারের কিনা আমার জন্য বৈধ কিনা সেটা নিজের বাসায়ও যদি থাকে তাহলে সেটার উপর আমার কোনো অধিকার নেই, যতক্ষণ না আমি জানতে পারছি এটা কোথায় থেকে আসলো।
হিজরতের সময় আমানতগুলো ফেরত দেওয়া
رد الأمانات إلى أهلها عند الهجرة
عن عائشة -رضي الله عنها- في هجرة النبي ﷺ قالت: وأمر -تعني رسول الله رضى الله عنه- عليًّا أن يتخلف عنه بمكة؛ حتى يؤدِّيَ عن رسول الله ﷺالودائع التي كانت عنده للناس. وكان رسول الله ﷺ وليس بمكة أحدٌ عنده شيء يُخشى عليه إلا وضعه عنده؛ لما يُعلم من صدقه وأمانته... فخرج رسول الله ﷺ , وأقام علي بن أبي طالب رضى الله عنه ثلاث ليالٍ وأيامها؛ حتى أدَّى عن رسول الله ﷺ الودائع التي كانت عنده للناس، حتى إذا فرغ منها لَحِق رسولَ الله ﷺ
আয়েশা (রা) থেকে বর্ণিত, নবী ﷺ-এর হিজরত প্রসঙ্গে তিনি বলেন: আর তিনি – অর্থাৎ আল্লাহর রাসূল ﷺ – আলী (রা)-কে মক্কায় পিছনে থাকার নির্দেশ দিলেন; যাতে তিনি তাঁর নিকট গচ্ছিত আমানতগুলো মালিকদের কাছে ফেরত দিতে পারেন। আর মক্কায় এমন কোনো লোক ছিল না যার কাছে কোনো মূল্যবান জিনিস ছিল, যা নিরাপদে রাখার প্রয়োজন হতো, কিন্তু সেটা সে আল্লাহর রাসূল ﷺ-এর নিকট জমা রাখত; কারণ তাঁর সত্যবাদিতা ও আমানতদারিতা সম্পর্কে সবাই জানত... অতঃপর আল্লাহর রাসূল ﷺ রওনা হলেন, আর আলী ইবনে আবি তালিব (রা) তিন দিন ও তিন রাত সেখানে অবস্থান করলেন; যতক্ষণ না তিনি আল্লাহর রাসূল ﷺ-এর নিকট গচ্ছিত সকল আমানত মালিকদের কাছে ফেরত দিলেন। যখন তিনি এ কাজ শেষ করলেন, তখন তিনি আল্লাহর রাসূল ﷺ-এর সাথে মিলিত হওয়ার জন্য রওনা হলেন।
আল-বায়হাকী আল-সুনান আল-কুবরায়, ইবনে কাথির আল-বিদায়া ওয়াল-নিহায়াতে এবং আল-তাবারী তারিখে আল-উমাম ওয়াল-মুলুক থেকে বর্ণনা করেছেন,
من كان يعلم بهجرة الرسول صلى الله عليه وسلم
قال ابن إسحاق : ولم يعلم فيما بلغني ، بخروج رسول الله صلى الله عليه وسلم أحد ، حين خرج ، إلا علي بن أبي طالب ، وأبو بكر الصديق ، وآل أبي بكر . أما علي فإن رسول الله صلى الله عليه وسلم - فيما بلغني - أخبره بخروجه ، وأمره أن يتخلف بعده بمكة ، حتى يؤدي عن رسول الله صلى الله عليه وسلم الودائع ، التي كانت عنده للناس ، وكان رسول الله صلى الله عليه وسلم ليس بمكة أحد عنده شيء يخشى عليه إلا وضعه عنده ، لما يعلم من صدقه وأمانته صلى الله عليه وسلم .
এই ব্যাপারে ইবনে ইসহাক বলেছেন:
“আমার কাছে যতটুকু পৌঁছেছে, রাসূলুল্লাহ ﷺ যখন মক্কা থেকে বের হন, তখন তাঁর এই প্রস্থান সম্পর্কে কেউ জানত না—শুধু আলী ইবন আবি তালিব, আবু বকর সিদ্দীক ও আবু বকরের পরিবার ব্যতীত। আর আলীর ব্যাপারে — রাসূলুল্লাহ ﷺ, যেমনটা আমার কাছে পৌঁছেছে, তাঁকে তাঁর প্রস্থানের খবর দিয়েছিলেন এবং আদেশ করেছিলেন যেন তিনি মক্কায় কিছুদিন থেকে যান; যতক্ষণ না তিনি রাসূলুল্লাহ ﷺ -এর পক্ষ থেকে মানুষের কাছে তাঁদের আমানতগুলো ফিরিয়ে দেন।“রাসূলুল্লাহ এর ব্যাপারে ﷺ — মক্কায় এমন কেউ ছিল না যার কাছে এমন কিছু ছিল যার ব্যাপারে সে ভয় করত (হারিয়ে যাবে), বরং সে তা আমানত হিসেবে তাঁর (রাসূলুল্লাহ ﷺ) নিকট জমা রাখত কারণ সবাই তাঁর সত্যবাদিতা ও আমানতের জন্যই তাঁকে জানত।”
بن أبي طالب - رضي الله عنه - ثلاث ليالٍ وأيامها -يعني بعد هجرة رسول الله - ﷺ - وصاحبه-
حتى أدى عن رسول الله - ﷺ - الودائع التي كانت عنده للناس، حتى إذا فرغ منها
لحق رسولَ الله - ﷺ» قال ابن حجر: رواه ابن إسحاق بسند قوي (التلخيص
٣/ ١١٢) وحسنه الألباني (إرواء الغليل ٥/ ٣٨٤ رقم ١٥٤٦).
“আর আলী ইবন আবী তালিব (রা) তিন রাত ও তার দিনগুলো—অর্থাৎ আল্লাহর রাসূল (ﷺ) ও তাঁর সঙ্গীর হিজরতের পরে—স্থিতি করলেন, যতক্ষণ না তিনি আল্লাহর রাসূল (ﷺ)-এর নিকট গচ্ছিত আমানতগুলো লোকদের কাছে ফেরত দিলেন। যখন তিনি তা শেষ করলেন, তখন আল্লাহর রাসূল (ﷺ)-এর সাথে মিলিত হলেন।”
ইবন হাজার বলেন: "ইবন ইসহাক এটিকে একটি শক্তিশালী সনদে বর্ণনা করেছেন।"((আত-তালখীস ৩/১১২)) আল-আলবানী এটির হাসান (ভাল) হওয়ার রায় দিয়েছেন।((ইরওয়াউল গালীল ৫/৩৮৪, নং ১৫৪৬))
বিস্তারিত তাহক্বীক
[(١٥٤٦) - (حديث: " روى أنه صلى الله عليه وسلم كان عنده ودائع فلما أراد الهجرة أودعها عند أم أيمن وأمر عليا أن يردها إلى أهلها ".]
* حسن دون ذكر أم أيمن.
أخرجه البيهقى (٦/٢٨٩) من طريق محمد بن إسحاق قال: أخبرنى محمد بن جعفر بن الزبير عن عروة بن الزبير عن عبد الرحمن بن عويم بن ساعدة قال: حدثنى رجال قومى من أصحاب رسول الله صلى الله عليه وسلم ـ فذكر الحديث فى خروج النبى صلى الله عليه وسلم قال فيه ـ: " فخرج رسول الله صلى الله عليه وسلم , وأقام على بن أبى طالب رضى الله عنه ثلاث ليال وأيامها , حتى أدى عن رسول الله صلى الله عليه وسلم الودائع التى كانت عنده للناس , حتى إذا فرغ منها لحق رسول الله صلى الله عليه وسلم ".
قلت: وهذا إسناد حسن
وقال الحافظ: " قوى ".
(تنبيه) وقع الحديث فى " الخلاصة " فى تخريج أحاديث الرافعى (ق ١٣٦/١) كما وقع هنا " أم أيمن " , ووقع فى " التلخيص " نقلا عن الرافعى " أم المؤمنين " فقال فى تخريج هذا اللفظ: " لا يعرف , بل لم تكن عنده فى ذلك الوقت , إن كان المراد بها عائشة , نعم كان قد تزوج سودة بنت زمعة قبل الهجرة , فإن صح فيحتمل أن تكون هى ".
قلت: أغلب الظن أن أصل هذه الكلمة فى الرافعى " أم أيمن " كما وقع
বর্ণিত হয়েছে যে নবী ﷺ-এর নিকট কিছু আমানত ছিল। যখন তিনি হিজরাতের ইচ্ছা করলেন, তখন তিনি সেগুলো উম্মু আইমানের নিকট আমানত রাখেন এবং আলী (রা)-কে নির্দেশ দেন যেন তিনি সেগুলো তাদের মালিকদের ফেরত দেন।")
উম্মু আইমানের উল্লেখ ছাড়া হাদীসটি হাসান।
বাইহাকী (৬/২৮৯) মুহাম্মাদ ইবনে ইসহাক-এর সূত্রে এটি বর্ণনা করেছেন, তিনি বলেছেন: মুহাম্মাদ ইবনে জাফর ইবনে যুবায়ের আমাকে জানিয়েছেন, 'উরওয়া ইবনে যুবায়ের এর সূত্রে, তিনি 'আবদুর রহমান ইবনে 'উওয়াইম ইবনে সা'আদাহ এর সূত্রে, তিনি বলেছেন: রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর সাহাবীদের মধ্য থেকে আমার গোত্রের কয়েকজন ব্যক্তি আমাকে বর্ণনা করেছেন – এবং তিনি নবী ﷺ-এর প্রস্থান সংবলিত হাদীসটি উল্লেখ করেছেন। তাতে ছিল: "...অতঃপর রাসূলুল্লাহ ﷺ বের হয়ে গেলেন, এবং 'আলী ইবনে আবী তালিব (রা) তিন রাত ও তার দিনগুলো অবস্থান করলেন, যতক্ষণ না তিনি রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর নিকট থাকা লোকদের আমানতগুলো ফেরত দিলেন। যখন তিনি এগুলো থেকে فارغ (ফারিগ/মুক্ত) হলেন, তখন তিনি রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর সাথে মিলিত হলেন।"
আমি [আল-হাফিয] বলি: আর এই সনদটি হাসান।
এবং আল-হাফিয বলেছেন: "এটি কাওয়ী (শক্তিশালী)।"
(মনোযোগ দিন) "আল-খুলাসা" কিতাবের রাফেঈ-এর বর্ণনাসমূহের তাখরীজ অংশে (ফলিও ১৩৬/১) এই হাদীসটি "উম্মু আইমান" শব্দসহ এসেছে, যেমনটি এখানে এসেছে। কিন্তু "আত-তালখীস"-এ, রাফেঈ থেকে উদ্ধৃত করে, "উম্মুল মু'মিনীন" (মুমিনদের মা) শব্দটি এসেছে। তাই, এই শব্দের তাখরীজ প্রসঙ্গে তিনি বলেছেন: "এটি অজ্ঞাত। বরং সে সময় তিনি (আয়েশা রা) তাঁর সাথে ছিলেন না, যদি এর দ্বারা উদ্দেশ্য আয়েশা হন। তবে হিজরাতের পূর্বে তিনি সাওদা বিনত যাম'আ-কে বিয়ে করেছিলেন। যদি এটি সহীহ হয়, তাহলে সম্ভবত তিনিই উদ্দেশ্য।"
আমি [আল-হাফিয] বলি: সবচেয়ে বেশি সম্ভাবনা হলো যে, রাফেঈ-এর মূল পাঠে এই শব্দটি ছিল "উম্মু আইমান", যেমনটি এসেছে।((https://shamela.ws/book/22592/1879))
আল-সুয়াইয়ানী তার আস-সহীহ মিন আহাদীস আস-সীরাহ গ্রন্থের পৃষ্ঠা ১৪১-এ এর সনদকে সহীহ বলেছেন যেটা উপরে উল্লেখ্য করা হয়েছে নিচে বিস্তারিত দেয়া হলো,
قال ابن إسحاق: أخبرني محمَّد بن جعفر بن الزبير عن عروة بن الزبير عن عبد الرحمن بن عويم بن ساعدة قال: حدثني رجال من قومي من أصحاب رسول الله - صلى الله عليه وسلم - فذكر الحديث في خروج النبي - صلى الله عليه وسلم - قال فيه: فخرج رسول - صلى الله عليه وسلم - وأقام علي بن أبي طالب - رضي الله عنه - ثلاث ليال وأيامها حتى أدى عن رسول الله - صلى الله عليه وسلم - الودائع التي كانت عنده للناس، حتى إذا فرغ منها لحق رسول الله - صلى الله عليه وسلم -.
[درجته: سنده صحيح، رواه البيهقي في الكبرى (٦ - ٢٨٩)، هذا السند: صحيح شيخ ابن إسحاق ثقة انظر تقريب التهذيب (٤٧١)، وعروة إمام معروف أما شيخ عروة فثقة، قال عنه ابن سعد في الطبقات الكبرى (٥ - ٧٨): عبد الرحمن بن عويم بن ساعدة بن عائش بن قيس بن النعمان
ইবনে ইসহাক বলেছেন: মুহাম্মাদ বিন জাফর বিন যুবায়ের আমাকে উরওয়া বিন যুবায়েরের সূত্রে বর্ণনা করেছেন, তিনি আবদুর রহমান বিন আওয়াইম বিন সায়াদাহর সূত্রে বর্ণনা করেছেন। তিনি বলেছেন: রাসূলুল্লাহ্ - ﷺ - এর সাহাবীদের মধ্য থেকে আমার সম্প্রদায়ের কিছু লোক আমাকে বর্ণনা করেছেন। অতঃপর তিনি নবী ﷺ- এর প্রস্থান সংক্রান্ত হাদীসটি উল্লেখ করেছেন। তাতে তিনি বলেছেন: অতঃপর রাসূলুল্লাহ্ ﷺ - বের হয়ে গেলেন, এবং আলী বিন আবী তালিব (রা) - তিনটি রাত ও তার দিনগুলো অবস্থান করলেন, যতক্ষণ না তিনি রাসূলুল্লাহ্ (ﷺ) - এর নিকটে থাকা লোকদের আমানতগুলো তাদের কাছে ফেরত দিলেন। যখন তিনি এ কাজ শেষ করলেন, তখন তিনি রাসূলুল্লাহ্ ﷺ - এর সাথে মিলিত হলেন।
এর সনদ সহীহ (বিশুদ্ধ)। আল-বায়হাকী এটি আল-কুবরা (৬/২৮৯) গ্রন্থে বর্ণনা করেছেন। এই সনদ: সহীহ। ইবনে ইসহাকের শাইখ নির্ভরযোগ্য (সিকাহ), দেখুন তাকরীব আত-তাহযীব (৪৭১)। উরওয়া একজন প্রসিদ্ধ ইমাম। আর উরওয়ার শাইখ (অর্থাৎ আবদুর রহমান বিন আওয়াইম) তিনি নির্ভরযোগ্য (সিকাহ)। ইবনে সা'দ আত-তাবাকাত আল-কুবরা (৫/৭৮) গ্রন্থে তার সম্পর্কে বলেছেন: আবদুর রহমান বিন আওয়াইম বিন সায়াদাহ বিন 'আইশ বিন কায়েস বিন আন-নু'মান।] (( ص141 - كتاب الصحيح من أحاديث السيرة النبوية - هجرة النبي صلى الله عليه وسلم - المكتبة الشاملة ))
কাফেররা ইসলাম কবুল করেনি কেন?
এবার আসুন আমরা দেখি এত কিছুর পরও কেন কুফফরা ইসলাম কবুল করেননি। তারা তো জানতোই নবীজির সত্যতা আমানতের ব্যাপারে তাহলে কেন তারা জেনে শুনে চিরস্থায়ী জাহান্নামের আগুন বেছে নিবেন। এ ব্যাপারে বিখ্যাত islamWeb ফতোয়ার ওয়েবসাইটে বলা হয়েছে একই প্রশ্নের উত্তরে,
সমস্ত প্রশংসা আল্লাহর জন্য, এবং দরুদ ও সালাম বর্ষিত হোক আমাদের নবী মুহাম্মাদ ﷺ-এর উপর, তাঁর পরিবার-পরিজন, তাঁর সাহাবীগণ এবং তাঁর অনুসারীদের উপর। অতঃপর:
নবী ﷺ-কে সত্য জেনেও অনেকেই তাঁর আনীত ওহীর প্রতি অবিশ্বাস পোষণ করেছিল; তাদেরকে কুফরির দিকে ঠেলে দিয়েছিল সত্যের প্রতি তাদের বিদ্বেষ। যেমন আল্লাহ তা'আলা বলেছেন: "বরং তিনি তাদের কাছে সত্য নিয়ে এসেছেন, আর তাদের অধিকাংশই সত্যকে অপছন্দ করে।" (সূরা আল-মুমিনুন: ৭০)
আস-সা'দী (রহ.) বলেছেন: "মূলত সত্যের প্রতি তাদের এই বিদ্বেষই তাদেরকে সত্যকে মিথ্যা বলতে বাধ্য করেছে, কোনো সন্দেহের কারণে নয়, আর না রাসূলকে মিথ্যাবাদী মনে করার কারণে…”
তাদের মধ্যে কেউ কেউ ছিল যাদের কুফরির প্রেরণা ছিল হিংসা ও জিদ, যেমন আবু জাহলের ক্ষেত্রে। তাফসীরকারগণ উল্লেখ করেছেন যে, তার প্রসঙ্গেই এই আয়াত নাযিল হয়েছে: "কারণ,তারা আপনাকে মিথ্যাবাদী মনে করে না; বরং যালিমরা আল্লাহর আয়াতসমূহকে অস্বীকার করে।" (সূরা আল-আন'আম: ৩৩)
এই আয়াত নাযিলের প্রসঙ্গে বর্ণিত হয়েছে যে, আল-আখনাস একদা আবু জাহলকে একান্তে নিয়ে বলল: "হে আবুল হাকাম, আপনি আমাকে মুহাম্মাদ সম্পর্কে বলুন: তিনি সত্যবাদী নাকি মিথ্যাবাদী? কারণ, কুরাইশদের মধ্যে আমাদের দু'জন ছাড়া এখানে আর কেউ নেই আমাদের কথোপকথন শুনবার।" আবু জাহল জবাব দিল: "ধিক তোমাকে! আল্লাহর শপথ, মুহাম্মাদ নিশ্চয়ই সত্যবাদী, আর মুহাম্মাদ কখনো মিথ্যা বলেননি। কিন্তু যদি বনু কুসাইয়েরা লিওয়া (নেতৃত্বের পতাকা), সিকায়া (হাজীদের পানি সরবরাহ), হিজাবা (কাবা ঘরের চাবির দায়িত্ব) এবং নবুয়ত—এই সবকিছুই নিয়ে নেয়, তাহলে বাকি কুরাইশদের জন্য আর কী অবশিষ্ট থাকবে?" আর এটাই হল আল্লাহর বাণীর প্রেক্ষাপট: "কারণ, তারা আপনাকে মিথ্যাবাদী মনে করে না; বরং যালিমরা আল্লাহর আয়াতসমূহকে অস্বীকার করে।"
আর ইয়াহুদীদের ব্যাপারে, হিংসাই তাদেরকে নবী ﷺ-এর প্রতি অবিশ্বাস করতে প্ররোচিত করেছিল।
আশ-শানকীতী (রহ.) তাঁর 'আদওয়াউল বায়ান' গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন: "ইয়াহুদীদের কুফরি ছিল জেনে-বুঝে অস্বীকার। তারা তাঁকে ﷺ চিনত ঠিক যেমন তারা তাদের নিজেদের সন্তানদের চিনত, এবং নিশ্চয়ই তাদের মধ্যে একটি দল সত্য জেনেও তা গোপন করত। তাঁর নাম তাদের নিকট নাযিলকৃত কিতাবে উল্লেখিত ছিল, যেমন ঈসা (আ) বলেছিলেন: 'আর সেই রাসূলের সুসংবাদদাতা, যিনি আমার পরে আসবেন, তাঁর নাম আহমাদ।' কিন্তু কোনো স্পষ্ট ব্যাখ্যা তাদের কোনো উপকারে আসেনি; বরং তা ছিল হিংসা ও জিদ, যেমন আল্লাহ তাআলা তাদের অবস্থা স্পষ্ট করে দিয়েছেন তাদের সম্পর্কে তাঁর বাণীতে: 'কিতাবীদের অনেকেই চায়, তোমাদের ঈমান আনার পর তোমাদেরকে পুনরায় কাফিরে পরিণত করতে, তাদের নিজেদের মনগড়া হিংসার বশে, সত্য তাদের কাছে স্পষ্ট হওয়ার পরও।' (সূরা আল-বাকারাহ: ১০৯) এবং তাঁর বাণী: 'আহলে কিতাবের একটি দল চায় যে, তারা তোমাদেরকে পথভ্রষ্ট করে দেয়।' (সূরা আলে-ইমরান: ৬৯) এবং তাঁর বাণী: 'আর নিশ্চয়ই তাদের মধ্যে একটি দল আল্লাহর কালাম শোনার পর তা বিকৃত করে, অথচ তারা বুঝে; তারা জানে।' (সূরা আল-বাকারাহ: ৭৫ - অনুরূপ অর্থ) এবং তাঁর বাণী: 'হে আহলে কিতাব! তোমরা সত্যকে মিথ্যার সাথে মিশিয়ে দাও কেন এবং সত্য গোপন কর কেন, অথচ তোমরা জান?' (সূরা আলে-ইমরান: ৭১) তারা ছিল মানুষকে পথভ্রষ্ট করার, কিতাব বিকৃত করার এবং সত্যকে মিথ্যার সাথে মিশ্রিত করার একটি মোর্চা, আর এসবই ছিল ইচ্ছাকৃত ও জেনেশুনে, হিংসা ও শত্রুতার তাড়নায়।" শেষ উক্তি
আর তাদের নবী ﷺ-এর নবুয়তের সত্যতা সম্পর্কে তাদের যে নিশ্চয়তা (ইয়াকীন) হয়েছিল, তা কীভাবে হয়েছিল? এর কারণ ছিল সেই সকল মু'জিযা (অলৌকিক নিদর্শন) ও সুস্পষ্ট প্রমাণ যা তিনি তাদের নিকট নিয়ে এসেছিলেন। কারণ আল্লাহ তাআলা তাঁর নবী ও রাসূলগকে তাদের নবুয়তের সত্যতা প্রমাণকারী সত্য ও সঠিক দলিল-প্রমাণ দ্বারা শক্তিশালী করেছিলেন। যেমন আল্লাহ তাআলা বলেছেন: 'তাদের নিকট তাদের রাসূলগণ স্পষ্ট প্রমাণাদি নিয়ে এসেছিলেন...' (সূরা আল-আরাফ: ১০১)”
আস-সা'দী (রহ.) বলেছেন: "(আয়াতের) অর্থ হলো: তারা যে দাওয়াত নিয়ে এসেছিলেন তার সত্যতা প্রমাণকারী দলিল-প্রমাণসহ (তারা এসেছিলেন)। আল্লাহ এমন কোনো রাসূল প্রেরণ করেননি, যাকে তিনি এমন নিদর্শন (মু‘জিযা) দেননি, যার ভিত্তিতে মানুষের ঈমান আনা উচিত।" (উদ্ধৃতি শেষ)
আর আল্লাহই সর্বজ্ঞ। ((كيف حصل للمشركين اليقين التام بصدق رسول الله؟ ولماذا كفروا مع علمهم؟))
ইবনুল কাইয়িম তার "হিদায়াতুল হায়ারা" (পথভ্রষ্টদের জন্য পথনির্দেশ) গ্রন্থে বলেছেন:
وقال ابن القيم في كتابه "هداية الحيارى": "سأل المسور بن مخرمة خاله أبا جهل عن حقيقة محمد صلى الله عليه وسلم، إذ قال: يا خالي! هل كنتم تتهمون محمداً بالكذب قبل أن يقول ما قال؟ فقال: يابن أختي، والله! لقد كان محمد فينا وهو شاب يدعى الأمين، فما جربنا عليه كذباً قط، قال: يا خال! فما لكم لا تتبعونه؟ قال: يابن أختي! تنازعنا نحن وبنو هاشم الشرف، فأطعموا وأطعمنا، وسقوا وسقينا، وأجاروا وأجرنا، حتى إذا تجاثينا على الركب (جلسنا على الركب للخصومة) كنا كفرسي رهان (متساويين في الفضل)، قالوا: منا نبي، فمتى ندرك مثل هذه؟!. وقال الأخنس بن شريق يوم بدر لأبي جهل: يا أبا الحكم، أخبرني عن محمد، أصادق هو أم كاذب؟ فإنه ليس ها هنا من قريش أحد غيري وغيرك يسمع كلامنا؟ فقال أبو جهل: ويحك! والله إن محمداً لصادق، وما كذب محمد قط، ولكن إذا ذهبت بنو قصي باللواء والحجابة والسقاية والنبوة، فماذا يكون لسائر قريش؟".
মিসওয়ার ইবন মাখরামাহ তার মামা আবু জাহলকে মুহাম্মাদ ﷺ-এর সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করলেন। তিনি বললেন, 'হে আমার চাচা! তিনি যা বলেছেন (অর্থাৎ নবুয়তের দাবি করেছেন) তার আগে কি আপনি কখনও মুহাম্মাদকে মিথ্যার অভিযোগে অভিযুক্ত করেছিলেন?'
তিনি জবাব দিলেন, 'হে আমার বোনের ছেলে, আল্লাহর শপথ! মুহাম্মাদ আমাদের মধ্যে যুবক হিসেবে ছিলেন এবং তাকে 'আল-আমীন' বলা হত। আমরা তার কাছ থেকে কখনও কোন মিথ্যা প্রত্যক্ষ করিনি।'
মিসওয়ার বললেন, 'হে চাচা! তাহলে আপনারা তাকে অনুসরণ করছেন না কেন?'
তিনি জবাব দিলেন, 'হে আমার বোনের ছেলে! আমরা (বনু মাখজুম গোত্র) এবং বনু হাশিম সম্মানের জন্য প্রতিযোগিতা করছিলাম। তারা (হাজীদের) খাওয়াতো এবং আমরাও খাওয়াতাম তারা পানি পান করাতো এবং আমরাও পান করাতাম এবং তারা আশ্রয় দিত এবং আমরাও আশ্রয় দিতাম এমনকি যখন আমরা হাঁটুতে হাঁটু রেখে বসে পড়লাম (অর্থাৎ প্রতিযোগিতায় সমান এবং মুখোমুখি হলাম) আমরা ছিলাম দুইটি প্রতিযোগিতার ঘোড়ার মতো (গুণে সমকক্ষ)। তারপর তারা বলল, "একজন নবী আমাদের মধ্য থেকে।" তাহলে আমরা (যদি এটা স্বীকার করে নেই) তাহলে কখনই এর মতো কিছু অর্জন করতে পারব(অর্থাৎ আরেকটা নবী আনতে পারব)?!'"
"এবং বদরের দিন, আল-আখনাস ইবন শারীক আবু জাহলকে বলল, 'হে আবুল হাকাম, আমাকে মুহাম্মাদ সম্পর্কে বলুন—সে সত্যবাদী নাকি মিথ্যাবাদী? কারণ কুরাইশদের মধ্যে আপনাকে এবং আমাকে ছাড়া আমাদের কথা শোনার মতো এখানে আর কেউ নেই।'
আবু জাহল বলল, 'তোমার সর্বনাশ হোক! আল্লাহর শপথ, মুহাম্মাদ নিশ্চয়ই সত্যবাদী, এবং মুহাম্মাদ কখনও মিথ্যা বলেনি। কিন্তু যদি কুসাই এর বংশধরেরা পতাকা (আল-লিওয়া), কাবা শরিফের তত্ত্বাবধানের দায়িত্ব (আল-হিজাবাহ), পানি সরবরাহ (আস-সিকায়হ) এবং এখন নবুয়তও নিয়ে যায়, তাহলে বাকি কুরাইশদের জন্য আর কি অবশিষ্ট থাকবে। (( مفتاح دار السعادة ومنشور ولاية العلم والإرادة - ط العلمية | تراث ))
যদিও শেইখ সালেহ আল মুনাজ্জিদ (হাফি) উক্ত রেওয়াত দিয়ে আবু জেহেলের অন্ধতার প্রমাণ দিয়েছেন তবে রেওয়াতটি দুর্বল এবং উনি যেই সনদের কথা বলেছেন সেটা মুনকাতি,তবে এর মতন সহিহ অর্থাৎ আবু জাহেলের বক্তব্যের সমর্থনে অন্যান্য সহিহ রেওয়াত বিদ্যমান যেমন বানু মাখজুম, বানু হাশেমের মধ্যে প্রতিযোগিতার লড়াই এবং সহিহ বুখারীতে তো এটা প্রমাণিত আছে, যে আবু জেহেল এবং যাদের কাছে নবীজি লা ইলাহা ইল্লাল্লাহের দাওয়াত নিয়ে এসেছিলেন তাদের সবাই তাকে ইসলাম প্রচারের আগে আল আমিন হিসেবেই জানতো। ((مفتاح دار السعادة ومنشور ولاية العلم والإرادة - ط عطاءات العلم | تراث))
islam Web আরো একটি প্রশ্ন করা হয়েছে যে কেন কুরাইশরা ইসলাম কবুল করেননি এর কারণ কি কি?
উত্তরে বিস্তারিত কিছু পয়েন্ট বলা হয়েছে যেমন ধর্মান্ধতা, পিতৃপুরুষের অন্ধ অনুসরণ,তবে আমাদের এই লেখার সাথে যেটা প্রাসঙ্গিক সেটাই উল্লেখ্য করছি!
কুরাইশদের অন্যান্য আরবদের উপর চরম প্রভাব, তারা ভয় পেত যে ইসলাম গ্রহণ করলে তারা আরবদের উপর তাদের নেতৃত্ব হারিয়ে ফেলবে।
আমর ইবনে সালামাহ থেকে আল-বুখারী বর্ণনা করেছেন: "আরবরা মক্কা বিজয় পর্যন্ত ইসলাম গ্রহণ করতে বিলম্ব করত, তারা বলত, 'তাকে এবং তার সম্প্রদায়কে ছেড়ে দাও; যদি সে তাদের উপর বিজয়ী হয়, তাহলে সে সত্যি নবী।' যখন মক্কা বিজয় সংঘটিত হয়, তখন প্রত্যেক গোষ্ঠী ইসলাম গ্রহণে ত্বরান্বিত হয়।”
গোত্রীয় রীতিনীতির আধিপত্য (প্রাক-ইসলামী অজ্ঞানতার যুগের গোষ্ঠীতন্ত্র): গোত্রীয় দ্বন্দ্ব এবং নেতৃত্ব ও সম্মানের জন্য প্রতিযোগিতা তাদেরকে তাদের পদমর্যাদা ও অবস্থান নিয়ে ভয়ে ইসলাম প্রত্যাখ্যান করতে বাধ্য করত। কিছু গোষ্ঠী নবী ﷺ এর প্রতি ঈর্ষাবশত ইসলাম গ্রহণ করেনি কারণ তিনি অন্য গোষ্ঠীভুক্ত ছিলেন, যেমনটি আবু জাহলের সাথে ঘটেছিল। তার অবিশ্বাসের কারণ ছিল যে সে বনু মাখজুম গোষ্ঠীর ছিল, যা কুরাইশদের নেতৃত্বের জন্য বনু হাশিমের সাথে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করত। ((https://www.islamweb.net/ar/consult/2427467/لماذا-لم-يؤمن-كفار-قريش-بدعوة-الرسول-صلى-الله-عليه-وسلم))
Islam Web এর আরেকটি আর্টিকেল বলা হয়েছে,
সমস্ত প্রশংসা আল্লাহর জন্য, এবং দরুদ ও সালাম বর্ষিত হোক আমাদের নবী মুহাম্মদের উপর, তাঁর পরিবার-পরিজন, তাঁর সাহাবাগণ এবং তাঁর অনুসারীদের উপর। অতঃপর –
অনেকেই নবী ﷺ-এর নবুয়ত সম্পর্কে জ্ঞান রাখা সত্ত্বেও যারা তাঁর প্রতি কুফরি করেছে, তাদেরকে কুফরির দিকে চালিত করেছিল সত্যের প্রতি তাদের বিদ্বেষ। যেমন আল্লাহ তাআলা বলেছেন: "বরং তিনি তাদের কাছে সত্য নিয়ে এসেছেন, অথচ তাদের অধিকাংশই সত্যকে অপছন্দ করে।" (সূরা আল-মুমিনুন: ৭০)
আস-সাদী বলেছেন: "মূলত তাদের সত্যের প্রতি বিদ্বেষই তাদেরকে সত্যকে মিথ্যা বলতে বাধ্য করেছে, সন্দেহের কারণে নয়, আর না রাসূলকে মিথ্যা বলে মনে করার কারণে..."
তাদের মধ্যে কেউ কেউ ছিল, যাদের কুফরির কারণ ছিল হিংসা ও জিদ, যেমন আবু জাহলের ক্ষেত্রে। মুফাসসিরগণ উল্লেখ করেছেন যে, তার প্রসঙ্গেই এই আয়াত নাযিল হয়েছে: "কারণ তারা তোমাকে মিথ্যাবাদী মনে করে না; বরং যালিমরা আল্লাহর আয়াতসমূহকে অস্বীকার করে।" (সূরা আল-আনআম: ৩৩)
এই আয়াত নাযিলের কারণ বর্ণনায় এসেছে যে, একদা আল-আখনাস আবু জাহলকে একান্তে নিয়ে বলল: "হে আবুল হাকাম, মুহাম্মদ সম্পর্কে আমাকে বলো: তিনি সত্যবাদী না মিথ্যাবাদী? কেননা কুরাইশদের মধ্যে আমাদের দুজন ছাড়া আমাদের কথাবার্তা শোনার কেউ এখানে নেই।" আবু জাহল উত্তর দিল: "তোমার ধ্বংস হোক! আল্লাহর কসম, মুহাম্মদ নিশ্চয়ই সত্যবাদী, আর মুহাম্মদ কখনো মিথ্যা বলেননি। কিন্তু যদি কুসাই-এর বংশধররা (কাবার) লিওয়া (পতাকাধারী), সিকায়া (পানীয় পরিবেশনার দায়িত্ব), হিজাবা (তত্ত্বাবধায়কের দায়িত্ব) এবং নবুয়ত – এই সবকিছুই নিয়ে নেয়, তাহলে বাকি কুরাইশদের জন্য কী থাকবে?" আর এটাই হলো আল্লাহর বাণীর অর্থ: "কারণ তারা তোমাকে মিথ্যাবাদী মনে করে না; বরং যালিমরা আল্লাহর আয়াতসমূহকে অস্বীকার করে।" ((https://www.islamweb.net/ar/fatwa/218368/كيف-حصل-للمشركين-اليقين-التام-بصدق-رسول-الله-ولماذا-كفروا-مع-علمهم))
বিখ্যাত Alukah ওয়েবসাইটের একটি আর্টিকেল বলা হয়েছে,
যে বিষয়গুলোতে মানুষের ইচ্ছে অনুসরণের প্রভাব সত্য থেকে বিচ্যুত হওয়ায় প্রকাশ পায়, তার মধ্যে একটি হলো পদ, নেতৃত্ব ও সম্মানের প্রতি অতিরিক্ত আগ্রহ।
ইমাম ইবনে ক্বয়্যিম (রহ) বলেছেন:" পথভ্রষ্ট হওয়ার অন্যতম কারণ হলো শাসন ও ক্ষমতার প্রতি আকর্ষণ। যদিও ঈর্ষা বা অহংকার সত্যের প্রতি আনুগত্যে বাধা দেয় না তবুও একজন মানুষের মধ্যে আনুগত্য, শাসন ও নেতৃত্ব একত্রিত হওয়া সম্ভব নয়; তাই সে তার ক্ষমতা ও নেতৃত্ব ধরে রাখে। হেরাক্লিয়াস এবং অন্যান্য অবিশ্বাসী রাজাদের মতো যারা তাঁর নবুয়াত ও সততা জানতেন, অন্তরে স্বীকার করতেন এবং তাঁর ধর্মে প্রবেশ করতে চাইতেন, কিন্তু তাদের রাজ্যের জন্য ভয় করতেন। এটি হলো যারা রাজত্ব, ক্ষমতা এবং নেতৃত্বে অধিকারী তাদের রোগ, এবং কমই কেউ এতে থেকে বাঁচেছে, শুধুমাত্র যাদেরকে আল্লাহ রক্ষা করেছেন।"
যারা রাজনৈতিক লক্ষ্যসম্পন্ন তারা দেখেন যে সত্য ধর্ম এবং এর স্থায়ী বিশ্বাসসমূহ বিশ্বাসীদের হৃদয়ে তাদের শাসনের পথে একটি বাধা। তাই তারা এই ধর্মের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করে। সম্ভবত সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কারণগুলোর মধ্যে একটি হলো, মক্কায় প্রচলিত ঐতিহ্য এবং সামাজিক নিয়মের কারণে কুরাইশের নেতা ও ধনী মানুষরা ভয় পেতেন যে ইসলামের নতুন ধর্ম তাদের ক্ষমতা, মর্যাদা এবং অর্থনৈতিক সুবিধা কমিয়ে দিতে পারে। কারণ কাবা মক্কায় ছিল এবং তারা তা রক্ষা করতেন। তাই তারা ইসলামের সাফল্যকে নিজেদের জন্য হুমকি হিসেবে দেখত।পবিত্র ঘর (কাবা) ছিল সকল আরবদের জন্য আশ্রয়স্থল এবং নিরাপত্তার উৎস, এবং তারা কুরাইশকে ধর্মীয় ও দুনায়াবি বিষয়ে তাদের নেতা হিসেবে বিবেচনা করত। এই নেতৃত্ব তাদের জন্য সম্মান এবং বিশাল মর্যাদা সংরক্ষণ করত। তাই তাদের মনে ভয় জন্মায় যে নতুন ধর্মীয় আহ্বান (ইসলাম) সফল হলে মানুষ মক্কা থেকে বিচ্যুত হবে। ফলে তারা ইসলামী আহ্বানকে এই মহান মর্যাদা এবং গুরুত্বপূর্ণ সুবিধার জন্য হুমকি হিসেবে দেখেছিল এবং তা প্রতিহত করতে কঠোর হয়েছিল।কিছু আরব উপজাতি নেতৃত্ব এবং শাসনের প্রতি তাদের ভালোবাসা প্রকাশ করেছিল, এবং ইসলামকে একটি মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার করতে চেয়েছিল শাসন ও নেতৃত্ব অর্জনের জন্য। এর মধ্যে একটি ঘটনা হলো, যখন নবী ﷺ নিজেকে হজ্জের সময় আরব সম্প্রদায়ের কাছে উপস্থাপন করেছিলেন যাতে তারা তাকে সাহায্য ও সমর্থন করতে পারে। তাদের একজন বলল:
"“আল্লাহর কসম, যদি আমি কুরাইশের এই যুবক (নবী ﷺ) কে নিজের দিকে নিয়ে নিতাম, তবে আমি তার সাহায্যে পুরো আরবদের ওপর ক্ষমতা বা নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করতাম।”
তারপর তিনি জিজ্ঞাসা করলেন:
"যদি আমরা তোমার অনুসরণ করি এবং আল্লাহ তোমাকে তাদের ওপর বিজয় দান করেন, তবে তোমার পর নেতৃত্ব কি আমাদের হবে?"
নবী ﷺ উত্তর দিলেন: "নেতৃত্ব আল্লাহর, তিনি যেখানে ইচ্ছা রাখেন।" তিনি বললেন: "তাহলে আমরা তোমার জন্য আমাদের প্রচেষ্টা চালিয়ে কি করবো যদি আল্লাহ তোমাকে বিজয় দান করেন অথচ নেতৃত্ব অন্যের কাছে যাবে? আমাদের তোমার ব্যাপারে কোন প্রয়োজন নেই।"
তাই তারা তাকে প্রত্যাখ্যান করল।
একইভাবে, হাওধা ইবন আলি আল-হানফি, যখন নবী ﷺ তাকে ইসলামের আহ্বানে পাঠালেন, বললেন:
"তুমি যা আহ্বান করছ তা কত সুন্দর এবং মহিমান্বিত… কিন্তু আমাকে কিছু ক্ষমতা দাও, আমি তোমার অনুসরণ করব । ((https://www.alukah.net/sharia/0/90679/خوف-زعماء-قريش-على-مكانتهم-عند-بدء-الدعوة/))
মোট কথা হলো রাসুলুল্লাহ ﷺ–এর সত্যতা সম্পর্কে কুরাইশদের কোনো সন্দেহ ছিল না। তারা তাঁর সততা, চরিত্র এবং ভাষণশক্তি ভালোভাবেই জানত। তবুও তারা ইসলাম গ্রহণ করেনি। এর পেছনে ছিল নানা মানসিক, সামাজিক ও অর্থনৈতিক কারণ গোত্রীয় অহংকার ও প্রতিযোগিতা ছিল কুরাইশরা ভাবত, যদি তারা ইসলাম গ্রহণ করে, তাহলে নবী ﷺ–এর গোত্র ‘বানু হাশিম’ তাদের উপর শ্রেষ্ঠত্ব পাবে। তারা সেই মর্যাদা মেনে নিতে পারেনি। তাদের কাছে বিষয়টা ধর্ম নয়, বরং রাজনৈতিক মর্যাদার লড়াই ছিল।
নেতৃত্ব ও ক্ষমতা হারানোর ভয়ঃ মক্কার নেতৃত্ব ও ধর্মীয় প্রভাব কুরাইশের হাতেই ছিল। তারা কাবা ও মূর্তিপূজার রক্ষণাবেক্ষণের মাধ্যমে আরবের সম্মান ও আধিপত্য ভোগ করত। ইসলাম গ্রহণ করলে এই নেতৃত্ব হারানোর ভয় তাদের ভিতরে গভীরভাবে কাজ করেছিল।
অর্থনৈতিক স্বার্থের সংঘাতঃ কুরাইশদের ব্যবসা ও আয়ের বড় অংশ আসত হজ ও মূর্তিপূজা-নির্ভর বাণিজ্য থেকে। ইসলাম যখন এক আল্লাহর উপাসনার কথা বলল, তারা বুঝল—এর মানে হলো মূর্তি ভেঙে ফেলা, আর তাতে তাদের আর্থিক উৎস নষ্ট হয়ে যাবে। তাই তারা ধর্মের আহ্বান নয়, নিজের স্বার্থ বাঁচাতে প্রতিরোধ গড়ে তোলে।
পুরোনো ঐতিহ্যের প্রতি অন্ধ আনুগত্যঃ তারা বলত, “আমরা তো আমাদের পূর্বপুরুষদের পথেই আছি।” নতুন কোনো দাওয়াতকে তারা মনে করত ঐতিহ্যের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ। এই অন্ধ অনুকরণ তাদের সত্য মেনে নিতে বাধা দেয়।
এটাই কুরআনে এসেছে,
وَاِذَا قِیۡلَ لَہُمُ اتَّبِعُوۡا مَاۤ اَنۡزَلَ اللّٰہُ قَالُوۡا بَلۡ نَتَّبِعُ مَاۤ اَلۡفَیۡنَا عَلَیۡہِ اٰبَآءَنَا ؕ اَوَلَوۡ کَانَ اٰبَآؤُہُمۡ لَا یَعۡقِلُوۡنَ شَیۡئًا وَّلَا یَہۡتَدُوۡنَ
যখন তাদেরকে বলা হয়, ‘আল্লাহ্ যা অবতীর্ণ করেছেন তা তোমরা অনুসরণ কর’, তারা বলে, ‘না, বরং আমরা আমাদের পিতৃপুরুষদেরকে যাতে পেয়েছি তার অনুসরণ করব।’ এমন কি, তাদের পিতৃপুরুষগণ যদিও কিছুই বুঝত না এবং তারা সৎপথেও পরিচালিত ছিল না-তৎসত্ত্বেও।
অহংকার ও মানসিক জেদঃ অনেকেই জানত নবী ﷺ সত্যবাদী ও বিশ্বস্ত। কিন্তু সত্যকে মেনে নেওয়া মানে ছিল নিজেদের ভুল স্বীকার করা—যা তাদের অহংকার সইতে পারত না। ইসলাম যে সমতা ও বিনয় শেখায়, তা তাদের গর্বিত মন মানতে পারেনি।
ভোগ-বিলাসে নিমগ্ন সমাজঃ মক্কার সমাজে মদ্যপান, জুয়া, নারীর প্রতি অন্যায় আচরণ, বর্ণবাদ,সমাজের গরীব এবং দাস শ্রেনীর মানুষদের প্রতি অবিচার—সবই ছিল সাধারণ ব্যাপার। ইসলাম যখন এসব বন্ধ করার আহ্বান জানাল, তারা বুঝল—এই ধর্ম মানে তাদের স্বাধীনতা হারানো। তাই তারা সত্য জানলেও নিজেদের কামনা-বাসনার দাস হয়ে রইল।