সৃষ্টিকর্তাকে কে সৃষ্টি করেছে?
সৃষ্টিকর্তার অস্তিত্ব সম্পর্কিত নাস্তিকদের সাধারণ যে আপত্তি শোনা যায়, তা হলো ‘যদি সব কিছুর সৃষ্টিকর্তা থাকে, তাহলে সৃষ্টিকর্তাকে কে সৃষ্টি করেছে?' বা আল্লাহকে কে সৃষ্টি করেছে? অনেক নাস্তিক এই প্রশ্নটিকে ইসলামের বিরুদ্ধে শক্তিশালী আপত্তি হিসেবে উপস্থাপন করেন। প্রথম দেখায় প্রশ্নটি আকর্ষণীয় মনে হলেও এই প্রশ্নটি অত্যন্ত অবান্তর এবং শিশুসুলভ। মহাবিশ্বের অস্তিত্বের জন্য যে সর্বশক্তিমান, চিরন্তন সত্তার প্রমাণ রয়েছে, সেক্ষেত্রে সৃষ্টিকর্তাকে কে সৃষ্টি করেছে, এমন প্রশ্ন একটি অদ্ভুত অর্থহীনতা। আসুন, এই বিষয়টি যুক্তি, দর্শন এবং ইসলামী দৃষ্টিকোণ থেকে একটু গভীরভাবে ব্যাখ্যা করি ।
সর্বশক্তিমান সৃষ্টিকর্তা এই মহাবিশ্ব সৃষ্টি করেছেন। তবে, তিনি সৃষ্ট নয়; বরং তিনি স্রষ্টা। স্রষ্টা এই জগতের নিয়মকানুনের গণ্ডিতে আবদ্ধ নন। আমরা যে জগতের মধ্যে বাস করি, এখানে প্রতিটি বস্তুই কোনো না কোনো কিছুর উপর নির্ভরশীল। আপনি যে মোবাইল ফোন ব্যবহার করছেন, সেটি বিভিন্ন উপাদান দিয়ে তৈরি। সেই উপাদানগুলোরও কারণ রয়েছে। একইভাবে এই মহাবিশ্বের প্রতিটি বস্তুই নির্ভরশীল।
কিন্তু এখান থেকেই কি প্রমাণ হয় যে সৃষ্টিকর্তাও একই নিয়মের অধীন? অবশ্যই নয়। কারণ, সৃষ্টিকর্তা মহাবিশ্বের কোনো অংশ নন। তিনি মহাবিশ্বের স্রষ্টা।
আপনি কি কখনও মোবাইল ফোনের ভেতরে তার নির্মাতাকে খুঁজবেন? অথবা একটি চেয়ারের ভেতরে কাঠমিস্ত্রিকে খুঁজবেন অবশ্যই না। কারণ নির্মাতা এবং নির্মিত বস্তু একই রকম বাস্তবতা নয়। ঠিক তেমনি, স্রষ্টা এবং সৃষ্টি একই শ্রেণির ক্যাটাগরি বা শ্রেণির নয়। তাই সৃষ্টির উপর প্রযোজ্য নিয়ম স্রষ্টার উপর প্রয়োগ করা একটি ক্যাটাগরি মিস্টেক ফ্যালাসি।
আমাদের মহাবিশ্বের সব কিছুই কোনো না কোনোভাবে নির্ভরশীল; কিন্তু সৃষ্টিকর্তা এমন কিছু যা কোনো বাহ্যিক কিছুতে নির্ভরশীল নয়। কারণ তিনি অনিবার্য সত্তা, চিরন্তন সত্তা, তার অস্তিত্ব থাকা বাধ্যতামূলক। যেহেতু সৃষ্টির সব কিছু নির্ভরশীল, তাই সৃষ্টিকর্তার অস্তিত্বেও যদি এমন নির্ভরশীলতার প্রয়োগ করা হয়, তবে তা সৃষ্টিকর্তার প্রকৃতির সঙ্গে সাংঘর্ষিক হয়ে পড়বে। সম্ভাব্য অস্তিত্বশীল সব কিছুর অস্তিত্বের জন্য যদি কোনো-না- কোনো কিছুর উপর নির্ভরশীল। একারণে যদি চিরন্তন সত্তাও তার অস্তিত্বে আসার জন্য কোনো কিছুর উপর নির্ভরশীল হয়, তাহলে চিরন্তন সত্তা ও সসীম সত্তার মধ্যে পার্থক্য রইলো কোথায়? কিংবা যে সত্তা অস্তিত্বের আসার জন্য অন্য কিছুর উপর নির্ভর করতে হয় সেই সত্তা চিরন্তনই বা কিভাবে হবেন?
সৃষ্টি বলতে আমরা বুঝি এমন কিছু, যা একসময় ছিল না, পরে অস্তিত্ব লাভ করেছে। কিন্তু সৃষ্টিকর্তার ধারণাই হলো এমন এক সত্তা, যার কখনো অস্তিত্বের শুরু হয়নি। তিনি চিরন্তন এবং স্বয়ংসম্পূর্ণ। দর্শনের ভাষায় একে বলা হয় Necessary Being বা অনিবার্য সত্তা। অর্থাৎ তিনি এমন নন, যার অস্তিত্ব অন্য কিছুর উপর নির্ভরশীল। বরং অন্য সবকিছুই তাঁর উপর নির্ভরশীল।সৃষ্টিকর্তা এবং সৃষ্টির মধ্যে তফাত বুঝতে পারলে 'সৃষ্টিকর্তাকে কে সৃষ্টি করেছে' এই ধরনের প্রশ্ন একেবারেই অবান্তর। বিবাহিত এবং কুমার যেমন একই ক্যাটাগরিতে পরেনা, তেমনি সসীম এবং অসীমও একই ক্যাটাগরিতে পরে না।
এছাড়া, 'সৃষ্টিকর্তাকে কে সৃষ্টি করেছে?' এই প্রশ্নটি একটি লোডেড কোশ্চেন ফ্যালাসি, বা কমপ্লেক্স কোশ্চেন ফ্যালাসি । এখানে controversial বা unjustified assumption করা হয়। কারণ, এতে প্রশ্নকারীর মধ্যে এক ধরনের পূর্বধারণা থাকে, সে আগেই ধারণা করে নিয়েছে যে সৃষ্টিকর্তাকে সৃষ্টি হতে হবে। কিন্তু, আসলে এটি শুধু একটি অনুমান, যা কোনো প্রমাণ দ্বারা সমর্থিত নয়। এই ধরনের প্রশ্ন অনেকটা এমন, কেউ আপনাকে হঠাৎ করে প্রশ্ন করলো, “আপনি কি এখনো বউ পেটান?” এখানে প্রশ্নকারী, আসলে, আগে থেকেই ধরে নিয়েছে যে আপনার বউ আছে এবং আপনি তাকে নির্যাতন করেন।
নাস্তিকদের প্রশ্ন অনুযায়ী যদি মেনেও নেওয়া হয় যে সৃষ্টিকর্তারও স্রষ্টা থাকা আবশ্যক, তাহলে এর মানে দাঁড়ায়, সৃষ্টিকর্তা একসময় অস্তিত্বে ছিল না, এবং এক নির্দিষ্ট সময়ে তার অস্তিত্ব শুরু হয়েছে। এখন, যেসব নাস্তিকরা এমন চমকপ্রদ প্রশ্ন দিয়ে মানুষের চিন্তায় বিভ্রান্তি সৃষ্টির চেষ্টা করছেন, তাদের কাছে আমার প্রশ্ন যদি সৃষ্টিকর্তারও সৃষ্টি হওয়া আবশ্যক হয়, তবে তিনি কি সৃষ্টিকর্তা হিসেবে অবিরত থাকবেন, নাকি সৃষ্ট হয়ে যাবেন?
ধরুন, X হচ্ছে সৃষ্টিকর্তা।
যদি X কে X₁ সৃষ্টি করে থাকে, তাহলে প্রকৃত সৃষ্টিকর্তা কে?
স্পষ্টভাবেই X₁।
তাহলে X আর সৃষ্টিকর্তা নয়, বরং সৃষ্টি।
আবার যদি X₁-কেও X₂ সৃষ্টি করে থাকে, তাহলে প্রকৃত সৃষ্টিকর্তা হবে X₂।
এভাবে প্রশ্ন চলতেই থাকবে। অর্থাৎ আপনি যাকে সৃষ্টিকর্তা বলছেন, সে আর সৃষ্টিকর্তা থাকছে না।
এখানে আরেকটি বড় সমস্যা হলো যদি প্রত্যেক স্রষ্টার জন্য আবার আরেকজন স্রষ্টা লাগে, তাহলে এই ধারা কখনো শেষ হবে না।
X → X₁ → X₂ → X₃ → X₄ → ...............
ধরুন, X হচ্ছে সৃষ্টিকর্তা। এখন যদি আমরা ধরে নিই, X এর জন্যও একজন স্রষ্টার প্রয়োজন তাহলে X সৃষ্টি হয়েছে, X₁ থেকে। তখন একটি প্রশ্ন উঠবে-তাহলে X₁কে সৃষ্টি করেছে? যদি বলা হয়, X₁ সৃষ্টি লাভ করেছে X₂ থেকে, তবে প্রশ্ন হবে X₂কে সৃষ্টি করেছে? এভাবে, যদি প্রশ্নের ধারা অব্যাহত থাকে, তাহলে আপনি অসীম সংখ্যকবার প্রশ্ন করতে পারবেন। এইভাবে চলতে থাকলে, প্রশ্নের উত্তর কখনোই শেষ হবে না। কারণ, X অস্তিত্বের জন্য X₁ এর উপর নির্ভরশীল, X₁ অস্তিত্বের জন্য X₂ এর উপর নির্ভরশীল, X₂ অস্তিত্বের জন্য X₃ এর উপর নির্ভরশীল, এই ধারা অব্যাহত। এখন X অস্তিত্বে আসার জন্য তার অতীতে অসীম সংখ্যক কারণের উপর নির্ভর করতে হয় তাহলে অসীম সংখ্যক কারণ অতিক্রম করে X কখনোই বর্তমানে আসতে পারবে না।
এটি দর্শনে Infinite Regress নামে পরিচিত। যদি এই নির্ভরশীলতার শৃঙ্খল সত্যিই অসীম হয়, তাহলে কোনো কিছুর অস্তিত্বই কখনো বাস্তবে প্রতিষ্ঠিত হতে পারত না। কারণ প্রতিটি সত্তাই অন্য কিছুর অপেক্ষায় থাকত, কিন্তু কোথাও সেই অপেক্ষার সমাপ্তি ঘটত না। তাই যুক্তি আমাদের এমন এক সত্তার দিকেই নিয়ে যায়, যিনি নিজে কারও উপর নির্ভরশীল নন, কিন্তু সবকিছুই তাঁর উপর নির্ভরশীল। এই কারণেই দর্শনে তাঁকে Necessary Being, Uncaused Cause, অথবা First Cause বলা হয়। ইসলামও ঠিক এই ধারণাই উপস্থাপন করে।
কুরআনের মত
পবিত্র কুরআনে আল্লাহ সুবাহানাহুওয়া তা'আলা বলেন,
বল, তিনিই আল্লাহ, এক অদ্বিতীয়। আল্লাহ কারো মুখাপেক্ষী নন, সকলেই তার মুখাপেক্ষী। তিনি কাউে জন্ম দেননি এবং তাকেও জন্ম দেওয়া হয়নি। (( (১১২) আল-ইখলাস | (112) Al-Ikhlas | سورة الإخلاص-অনুবাদ/তাফসীর ))
দার্শনিকদের মতামত
অধ্যাপক এন্থনি ফ্লিউয়ের 'দেয়ার ইজ গড' বইয়ের পরিশিষ্টে অধ্যাপক আব্রাহাম ভার্গসে জোরালোভাবে বলেছে,
আস্তিক নাস্তিক একটি বিষয়ে একমত হতে পারে যদি কোনো কিছুর অস্তিত্ব থাকে, তা হলে এর আগে অবশ্যই এমন কিছু থাকতে হবে যা সব সময় অস্তিত্বশীল। চিরকালীন অস্তিত্ববান এই সত্তা কীভাবে এসেছে এর উত্তর হলো, এটা কোনোভাবেই আসেনি। এটা সব সময় অস্তিত্ববান। (( দেয়ার ইজ এ গভ: হাউ দ্য ওয়ার্ল্ডস মোস্ট নতরিয়াস এবিস্ট চেইনজড হিজ মাইল্ড | পৃষ্ঠা নঃ ১৫৬ ))
অতএব, "সৃষ্টিকর্তাকে কে সৃষ্টি করেছে?" প্রশ্নটি গভীর কোনো দার্শনিক প্রশ্ন নয়। এটি এমন একটি প্রশ্ন, যা সৃষ্টিকর্তার সংজ্ঞাকেই অস্বীকার করে বসে। তাই এটি যুক্তিগতভাবে একটি লোডেড কোয়েশ্চেন, একই সঙ্গে ক্যাটাগরি মিস্টেক, এবং শেষ পর্যন্ত ইনফিনিট রিগ্রেস সমস্যার মধ্যে পতিত হয়। সুতরাং, সৃষ্টিকর্তার ধারণা সঠিকভাবে বুঝতে পারলে এই প্রশ্ন নিজেই অর্থহীন হয়ে যায়।