মুহাম্মদ (সাঃ) মক্কার স্বীকৃত আল-আমিন: কল্পনা নয়,সহীহ হাদিসের স্বীকৃত সত্য!
হযরত মুহাম্মদ সতাত, বিশ্বতার জন্য তাকে মক্কার কাফেরা তাঁকে আল-আমিন বলে ডাকতেন। এই ঘটনা বহুল প্রচলিত। সম্প্রতি নাস্তিকদের কিছু ভিডিও এবং ব্লগে তারা প্রচার করে যাচ্ছেন যে মুহাম্মদ (সাঃ) কে আল আমিন ডাকার বিষয়টি কেবল সিরাত গ্রন্থে উল্লেখ রয়েছে, তবে এর পক্ষে নাকি কোনো সহীহ বা বিশুদ্ধ হাদিস নেই। মুহাম্মদ (সাঃ) কে “আল-আমিন” ডাকার ঘটনাটি কেবলমাত্র সীরাত গ্রন্থে পাওয়া যায়, বিশেষত ইবনে ইসহাক (মৃত্যু: ১৫০ হিজরি) রচিত সীরাতু রাসূলুল্লাহ–গ্রন্থে। যেহেতু এই বইটি মূল আকারে সংরক্ষিত নেই, বরং ইবনে হিশাম পরে এটি পরিমার্জন করে সংকলন করেছেন। তবে এটিও কোন সূত্র ছাড়া উপস্থাপিত এবং প্রায় দেড় শতাব্দী পরের সংকলন। ফলে এই ঘটনাটি সত্য নয়। তাই নাস্তিকদের দাবী হলো যেহেতু মুহাম্মদ (সাঃ) কে আল আমিন ডাকার পক্ষে সহীহ হাদিস নেই বা সহীহ বর্ণনা নেয় তাই এই ঘটনা সত্য নয়। অর্থাৎ, আল-আমিন” উপাধি কেবল পরবর্তী সংকলনকারীদের বর্ণনা, এ ব্যাপারে কোনো সহীহ হাদিস নেই, অতএব ঘটনাটি সত্য নয়।
কিন্তু নাস্তিকদের দাবী ‘ মুহাম্মদ (সাঃ) কে আল আমিন ডাকার পক্ষে সহীহ হাদিস নেই বা সহীহ বর্ণনা নেয়’ এই দাবিটি সত্য নয়। বরং আমরা পর্যালোচনা করলে দেখতে পায় যে, রাসূলুল্লাহ (সাঃ)-কে আল-আমিন বলা হয়েছিল, এটি শুধু সীরাতের বর্ণনায় সীমাবদ্ধ নয়, বরং একাধিক সহীহ হাদিস ও নির্ভরযোগ্য সূত্রেও এসেছে। “আল-আমিন” শব্দটি আরব সমাজে তার প্রতি দেয়া ঐতিহাসিক উপাধি, যা মুসলিম–অমুসলিম উভয়ের কাছেই স্বীকৃত ছিল। এটি কেবল সীরাত লেখকের কল্পনা নয়।
فَقَالُوا: اجْعَلُوا بَيْنَكُمْ حَكَمًا، قَالُوا: أَوَّلَ رَجُلٍ يَطْلُعُ مِنَ الْفَجِّ، فَجَاءَ النَّبِيُّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ فَقَالُوا: أَتَاكُمُ الْأَمِينُ، فَقَالُوا لَهُ، " فَوَضَعَهُ فِي ثَوْبٍ، ثُمَّ دَعَا بُطُونَهُمْ فَأَخَذُوا بِنَوَاحِيهِ مَعَهُ، فَوَضَعَهُ هُوَ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ " অর্থঃ তারা [কুরাঈশরা] বললঃ “তোমরা নিজেদের মধ্যে একজনকে বিচারক বানাও।” তারা বলল: “যে প্রথম ব্যক্তি এই গিরিপথ থেকে বের হয়ে আসবে, তাকেই (বিচারক বানানো হবে)।” তখন নবী ﷺ এলেন, তারা বললঃ “তোমাদের কাছে আল-আমিন (বিশ্বাসযোগ্য ব্যক্তি) এসে গেছেন!” এরপর তারা তাঁর সাথে কথা বলল, তখন তিনি ﷺ পাথরটিকে একটি কাপড়ে রাখলেন, তারপর বিভিন্ন গোত্রের প্রধানদের ডাকলেন, তারা সবাই কাপড়ের কোণাগুলো ধরে নিল তাঁর সাথে, তারপর তিনি ﷺ পাথরটিকে তার স্থানে বসিয়ে দিলেন। [মুসনাদ আহমাদ, খণ্ড ২৪, পৃষ্ঠা ২৬২, হাদিস নং ১৫৫০২ (সহীহ)] (( ص262 - كتاب مسند أحمد ط الرسالة - حديث السائب بن عبد الله - المكتبة الشاملة )) অনুবাদ: মুহাম্মদ মুশফিকুর রহমান মিনার
فَقَالَ: اجْعَلُوا بَيْنَكُمْ أَوَّلَ رَجُلٍ يَدْخُلُ مِنَ الْبَابِ، فَدَخَلَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ فَقَالُوا: هَذَا الْأَمِينُ، وَكَانُوا يُسَمُّونَهُ فِي الْجَاهِلِيَّةِ الْأَمِينَ، فَقَالُوا: يَا مُحَمَّدُ، قَدْ رَضِينَا بِكَ، " فَدَعَا بِثَوْبٍ فَبَسَطَهُ وَوَضَعَ الْحَجَرَ فِيهِ، অর্থঃ সে বললোঃ “তোমরা নিজেদের মধ্যে প্রথম যে ব্যক্তি দরজা দিয়ে প্রবেশ করবে, তাকে বিচারক বানাও।” তখন রাসূলুল্লাহ ﷺ প্রবেশ করলেন। তারা বললঃ “এ তো আল-আমিন (বিশ্বাসযোগ্য ব্যক্তি)!”। কেননা জাহিলিয়াত যুগে তারা তাঁকে আল-আমিন বলেই ডাকত। তারা বললঃ “হে মুহাম্মাদ, আমরা তোমাকে বিচারক হিসেবে মেনে নিলাম।” তখন তিনি ﷺ একটি কাপড় আনালেন, সেটি বিছিয়ে দিলেন এবং হাজরে আসওয়াদ (কালো পাথর) তাতে রাখলেন। [মুসতাদরাক হাকিম, খণ্ড ১, পৃষ্ঠা ৬২৮, হাদিস নং : ১৬৮৩] (( ص628 - كتاب المستدرك على الصحيحين ط العلمية - بسم الله الرحمن الرحيم أول كتاب المناسك - المكتبة الشاملة )) অনুবাদঃ মুহাম্মদ মুশফিকুর রহমান মিনার।
وَإِنَّ قُرَيْشًا اخْتَلَفُوا وَتَشَاجَرُوا فِي الْحَجَرِ أَيْنَ يَضَعُونَهُ، حَتَّى كَادَ يَكُونُ بَيْنَهُمْ قِتَالٌ بِالسُّيُوفِ، فَقَالَ: انْظُرُوا أَوَّلَ رَجُلٍ يَدْخُلُ مِنْ بَابِ الْمَسْجِدِ، فَدَخَلَ رَسُولُ اللهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ، فَقَالُوا: هَذَا أَمِينٌ، وَكَانُوا يُسَمُّونَهُ فِي الْجَاهِلِيَّةِ أَمِينًا، فَقَالُوا: هَذَا مُحَمَّدٌ، فَجَاءَ وَأَخَذَ ثَوْبًا وَبَسَطَهُ، وَوَضَعَ الْحَجَرَ فِيهِ، فَقَالَ لِهَذَا الْبَطْنِ، وَلِهَذَا الْبَطْنِ، وَلِهَذَا الْبَطْنِ: ” لِيَأْخُذْ كُلُّ وَاحِدٍ مِنْكُمْ بِنَاحِيَةِ الثَّوْبِ “، فَفَعَلُوا، فَأَخَذَهُ رَسُولُ اللهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ، فَوَضَعَهُ فِيمَكَانِهِ অর্থঃ কুরাইশরা যখন হাজরে আসওয়াদ (কাবার কালো পাথর) কোথায় স্থাপন করবে তা নিয়ে মতবিরোধ ও ঝগড়ায় জড়িয়ে পড়ল, এমনকি তাদের মধ্যে প্রায় তলোয়ার যুদ্ধ বেঁধে যেত — তখন তারা বললঃ ‘মসজিদের দরজা দিয়ে যে প্রথম ব্যক্তি প্রবেশ করবে, তার সিদ্ধান্তই মেনে নেব।’ তখন রাসূলুল্লাহ ﷺ মসজিদে প্রবেশ করলেন। তারা বললঃ "এ তো আমিন (বিশ্বাসযোগ্য ব্যক্তি)!" তারা জাহিলিয়াত যুগে তাঁকে আল-আমিন বলেই ডাকত। তারা বললঃ "এ তো মুহাম্মাদ।" এরপর রাসূলুল্লাহ ﷺ একটি চাদর নিলেন এবং তা বিছিয়ে দিলেন, হাজরে আসওয়াদ সেই চাদরের ওপর রাখলেন, তারপর প্রতিটি গোত্রকে বললেনঃ "তোমরা সবাই চাদরের একেক কোণ ধরে নাও।" তারা তা করল। এরপর রাসূলুল্লাহ ﷺ নিজ হাতে পাথরটি তুলে নিয়ে তার স্থানে বসিয়ে দিলেন।” [শারহু মুশকিলিল আছার - আবু জাফর তহাবী, খণ্ড ১৪, পৃষ্ঠা ২৩৯ (সহীহ)] (( ص239 - كتاب شرح مشكل الآثار - باب بيان مشكل ما روي فيمن قرأ قوله وما هو على الغيب بظنين أو بضنين قال أبو جعفر قد ذكرنا مخرج قراءة عاصم فيما تقدم من كتابنا هذا ورجوعها إلى علي وعبد الله وزيد رضي الله عنهم وذكرنا في رواية أبي بكر بن عياش أخذه إياها عنه حرفا حرفا وأنه - المكتبة الشاملة )) অনুবাদঃ মুহাম্মদ মুশফিকুর রহমান মিনার।নবী মুহাম্মদ (সাঃ)কে মক্কার কাফেরগণ “আল-আমিন” ডাকার হাদিসগুলো মুসনাদ আহমদ বাংলা অনুবাদকৃত গ্রন্থেও উল্লেখিত রয়েছে। (( মুসনাদ আহমাদ; খন্ডঃ ৮, পৃষ্ঠাঃ ১৯-২০ ))
পরোক্ষভাবেও অনেক হাদিস থেকে এটা প্রমাণিত যে মক্কার কাফেরগণ হযরত মুহাম্মদ (সাঃ) আল আমিন নামে অবিহিত করতো।
পরিচ্ছেদঃ ৬৫/২৬/২. আল্লাহ্ তা‘আলার বাণীঃ তোমার নিকট আত্মীয়বর্গকে সতর্ক করে দাও এবং (মু’মিনদের প্রতি) বিনয়ী হও। (সূরাহ শু‘আরা ২৬/২১৪-২১৫) اخْفِضْ جَنَاحَكَ ’’তোমার পার্শ্ব নম্র রাখ। ৪৭৭০. ইবনু ’আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, যখন وَأَنْذِرْ عَشِيْرَتَكَ الْأَقْرَبِيْنَ এ আয়াত অবতীর্ণ হল, তখন রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু ’আলাইহি ওয়াসাল্লাম সাফা (পর্বতে) আরোহণ করলেন এবং আহবান জানালেন, হে বানী ফিহর! হে বানী আদী! কুরাইশদের বিভিন্ন গোত্রকে। অবশেষে তারা জমায়েত হল। যে নিজে আসতে পারল না, সে তার প্রতিনিধি পাঠাল, যাতে দেখতে পায়, ব্যাপার কী? সেখানে আবূ লাহাব ও কুরাইশগণও আসল। তখন রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু ’আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, বল তো, আমি যদি তোমাদের বলি যে, শত্রুসৈন্য উপত্যকায় চলে এসেছে, তারা তোমাদের উপর হঠাৎ আক্রমণ করতে প্রস্তুত, তোমরা কি আমাকে বিশ্বাস করবে? তারা বলল, হাঁ আমরা আপনাকে সর্বদা সত্য পেয়েছি। তখন তিনি বললেন, ’’আমি তোমাদেরকে কঠিন শাস্তির ভয় প্রদর্শন করছি।’’ আবূ লাহাব [রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু ’আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে] বলল, সারাদিন তোমার উপর ধ্বংস নামুক! এজন্যই কি তুমি আমাদের জমায়েত করেছ? তখন অবতীর্ণ হল, ’’ধ্বংস হোক আবূ লাহাবের হস্ত দু’টি এবং ধ্বংস হোক সে নিজেও। তার ধন-সম্পদ ও তার অর্জন তার কোন উপকারে লাগেনি।’’ [১৩৯৪] (আধুনিক প্রকাশনীঃ , ইসলামিক ফাউন্ডেশনঃ ৪৪০৮) হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih) (( সহীহ বুখারী (তাওহীদ পাবলিকেশন) | হাদিস: ৪৭৭০ | Sahih al-Bukhari, Hadith No. 4770 ))নাস্তিকদের দাবির বিপরীতে সহীহ বুখারী, মুসনাদ আহমাদ, তিরমিজি প্রভৃতি গ্রন্থেই রাসূল ﷺ-এর “আল-আমিন” উপাধি প্রমাণিত। তাই “আল-আমিন” উপাধি কেবল ইবনে ইসহাক বা ইবনে হিশামের সীরাত সংকলনের উপর নির্ভর করে এমন দাবি ভিত্তিহীন। ঐতিহাসিকভাবেও মুসলিম ও অমুসলিম উভয়ের নিকট রাসূল ﷺ-এর সততা ও আমানতদারিত্ব প্রশ্নাতীত ছিল।
নবী (সাঃ)কে আল আমিন ডাকার হাদিস কি আলবানী (রহ) যইফ বলেছেন?
সীরাতে রাসুল্লাহ গ্রন্থের ৭৫ নং পৃষ্ঠায় উল্লেখ রয়েছে মক্কার সব কাফেরের মুখে মুখে নবী মুহাম্মদ ﷺ “আল-আমিন” নামে পরিচিত হয়ে ওঠেন। তারা শ্রদ্ধাভরেই তাঁকে এই উপাধিতে ডাকতেন। এই বক্তব্যের দলিল হিসেবে লেখক ৭৩ নং টিকায় “ইবনু হিশাম ১/৯৮” রেফারেন্সটি উল্লেখ করেছেন। কিন্তু ঐ একই টিকার পরবর্তী অংশে লেখক প্রসঙ্গক্রমে আরেকটি হাদীস তুলে ধরেন, যা সরাসরি “আল-আমিন” উপাধির মূল বর্ণনার সঙ্গে সম্পর্কিত নয়। হাদীসটি উদ্ধৃত করার পর লেখক উল্লেখ করেন যে, আলবানী (রহ.) ঐ হাদীসটিকে যঈফ বলেছেন। এখান থেকেই কিছু নাস্তিক বা সমালোচক বিভ্রান্তি ছড়িয়ে দাবি করছে যে, “আল-আমিন” উপাধি সংক্রান্ত পুরো বর্ণনাই যঈফ। অথচ বাস্তবে লেখক বা আলবানী (রহ.)—কেউই এমন দাবি করেননি। বরং, “আল-আমিন” নামে নবী ﷺ পরিচিত ছিলেন এ বিষয়টির রেফারেন্স ইবনু হিশাম ১/৯৮ যা একটি ঐতিহাসিকভাবে স্বীকৃত দলিল। এরপর লেখক কেবল একই প্রসঙ্গে একটি দুর্বল (যঈফ) বর্ণনা পাঠকদের অবহিত করার জন্য যুক্ত করেছেন, যাতে পাঠক সত্য ও দুর্বল বর্ণনার পার্থক্য বুঝতে পারেন। অতএব, “আল-আমিন” উপাধি সংক্রান্ত মূল দাবিটি সহীহ সূত্রে প্রমাণিত, এবং সীরাতে রাসুল্লাহ গ্রন্থের লেখকও কিংবা আলবানী (রহ.) সেটিকে যঈফ বলেননি।