বিজ্ঞানের দর্শন; বিজ্ঞান ও বিজ্ঞানবাদ

বিজ্ঞানের দর্শন; বিজ্ঞান ও বিজ্ঞানবাদ

বিজ্ঞানের দর্শন; বিজ্ঞান ও বিজ্ঞানবাদ

আমাদের প্রজন্মের একটি বড় অংশ বিজ্ঞানবাদ বা সায়েন্টিজমে আক্রান্ত। এটি এমন একটি মানসিকতা যেখানে বিজ্ঞানকেই সর্বোচ্চ সত্য ও সমস্ত জ্ঞানের চূড়ান্ত মানদণ্ড হিসেবে গণ্য করা হয়। নিঃসন্দেহে, আমরা এমন এক যুগে বাস করছি, যেখানে বিজ্ঞান মানুষের জীবন ও সমাজকে আমূল পরিবর্তন করেছে, বদলে দিয়েছে পুরো দুনিয়াকে । মানুষের জীবন যাত্রায় বিজ্ঞান যে পরিবর্তন সাধন করেছ তা আর জ্ঞানের অন্য কোনো শাখা করতে পারেনি । তাই বিজ্ঞানের অসামান্য অবদান নিয়ে সন্দেহের কোনো অবকাশ নেই। এটি আমাদের জীবনযাত্রা, কাজ করার পদ্ধতি, এমনকি দৃষ্টিভঙ্গিকেও বদলে দিয়েছে। কিন্তু বিজ্ঞানের এই সাফল্য অনেকের মনে কিছু ভ্রান্ত ধারণার জন্ম দিয়েছে। অনিচ্ছায় বা সচেতনভাবেই তারা বিজ্ঞানকে এক ধরনের ‘ঈশ্বরের আসনে বসিয়ে ফেলেছে। বিজ্ঞানকে মনে করা হচ্ছে চূড়ান্ত সত্যের মানদণ্ড, নির্ভুল এবং পবিত্র। এর প্রতিটি ফলাফলকে ‘পুতঃপবিত্র মহান হিসেবে মেনে নেওয়া হচ্ছে। এমনকি বাংলাদেশের একজন বিজ্ঞানবাদী লেখক জাফর ইকবাল তার ‘আরো একটু খানি বিজ্ঞান' বইয়ে এমনটাই দাবি করেছেন । (( জাফর ইকবাল; আরো একটুখানি বিজ্ঞান; পৃষ্ঠাঃ ১৭ )) এটি এমন এক বিভ্রান্তি যা বিজ্ঞানের প্রকৃত সীমাবদ্ধতা এবং এর প্রেক্ষাপটকে ভুলভাবে উপস্থাপন করে । শুধু জাফর ইকবালের মতো লোকেরা নয়, বিখ্যাত দার্শনিক বাট্রান্ড রাসেল বলেন,

যা যা জ্ঞান অর্জন সম্ভব তা কেবল মাত্র বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতেই সম্ভব। বিজ্ঞান যা আবিষ্কার করতে পারবে না তা কখনোই আমরা জানতে পারবো না। (( Philosophy of Science: A very short introduction (Oxford University press, 2nd edition) Page; 115 ))

বিজ্ঞানের প্রতি ভালোবাসা বা তারিফ করায় কোনো আপত্তি নেই। কিন্তু এটি পরম সত্যের একমাত্র মাধ্যম নয়। বিজ্ঞানের নিজস্ব পদ্ধতি এবং কাঠামোর মধ্যেও সীমাবদ্ধতা রয়েছে। তবে সো-কল্ড নাস্তিকদের একটি বড় অংশ এসব সীমাবদ্ধতা গোপন করে বিজ্ঞানকে হাতিয়ার বানিয়ে ধর্মীয় বিশ্বাস নিয়ে ব্যঙ্গ-বিদ্রূপ করতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করে। তাদের দাবি অনুযায়ী, স্রষ্টা, পরকাল, ফেরেশতা বা ধর্মীয় বিশ্বাসের কোনো কিছুতে আস্থা রাখা অযৌক্তিক। বরং, বিজ্ঞানকে একমাত্র নির্ভরযোগ্য মাধ্যম হিসেবে অন্ধভাবে অনুসরণ করাই নাকি ঢের যৌক্তিক। এই জায়গাতেই প্রশ্ন ওঠে—তারা কি সত্যিই বিজ্ঞানকে যুক্তির ভিত্তিতে গ্রহণ করে, নাকি এটি নিছক অন্ধ বিশ্বাস?

আমার ‘অন্ধ অনুসরণ' শব্দটি ব্যবহারের কারণ রয়েছে। কথিত এই বিজ্ঞানপূজারিরা বৈজ্ঞানিক তত্ত্বগুলো যাচাই না করেই এগুলোকে চূড়ান্ত সত্য হিসেবে মেনে নেয়। উদাহরণস্বরূপ, আমরা বিশ্বাস করি আর্সেনিক মানুষের জন্য বিষাক্ত। কিন্তু আমাদের কয়জন এই বিষাক্ততা নিজ চোখে দেখেছি বা পরীক্ষার মাধ্যমে যাচাই করেছি? আমরা প্রায় সবাই বিশ্বাস করি পৃথিবী সূর্যের চারপাশে ঘোরে। আবার, বিবর্তনবাদে বিশ্বাসীরা মনে করে যে মানুষ বিবর্তনের মাধ্যমে অন্যান্য প্রাণী থেকে উদ্ভূত। আমরা বিশ্বাস করি পানি অক্সিজেনের দ্বিগুণ হাইড্রোজেনের সমন্বয়ে তৈরি। অথচ এ বিশ্বাসের ভিত্তি কতটুকু আমাদের প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা থেকে এসেছে? বাস্তবিক অর্থে আমরা বেশিরভাগই বিজ্ঞানীদের দাবিগুলো সরাসরি যাচাই না করেই মেনে নিয়েছি।

এই অধ্যায়টি সাজানো হয়েছে সায়েন্টিজম বা বিজ্ঞানবাদে আক্রান্ত লোকদের জন্য যারা মনে করে বৈজ্ঞানিক তত্ত্ব মানেই সত্য হতে বাধ্য বা বিজ্ঞান মানেই পুতঃপবিত্র মহান !

বিজ্ঞান কী ?

Scientia থেকে ইংরেজি Science শব্দটির উৎপত্তি যার অর্থ হলো জ্ঞান । সাধারণ মানুষের কাছে যদি জিজ্ঞেস করা হয়, বিজ্ঞান কী? তাদের কাছে এই প্রশ্নের উত্তর দেওয়া সহজ বলে মনে হতে পারে। সে হয়ত বলবে, পদার্থবিদ্যা, রসায়ন, এবং জীববিদ্যা, ইত্যাদি বিষয়গুলো নিয়ে গঠিত হয় বিজ্ঞান। কিন্তু একজন দার্শনিকের কাছে যখন প্রশ্ন রাখা হবে যে, বিজ্ঞান কি? সে কিন্তু আমাদের সাধারণ মানুষের মতো উত্তর দিবে না। তিনি হয়ত বলতে পারেন, ভৌত বিশ্বের যা কিছু পর্যবেক্ষণযোগ্য, পরীক্ষণযোগ্য ও যাচাইযোগ্য এবং তার গবেষণা ও তার ফলাফল দেওয়ার মানবীয় চেষ্টাই হলো বিজ্ঞান । অথবা বলতে পারে বিজ্ঞান হলো, যে জগতে আমরা বসবাস করি তা বুঝার, ব্যাখ্যা করার এবং বোঝানোর প্রচেষ্টা। অন্যদিকে, বিভিন্ন ধর্মও এই জগতকে বোঝার এবং ব্যাখ্যা করার চেষ্টা করে। কিন্তু ধর্মকে বিজ্ঞানের শাখা হিসেবে গণ্য করা হয় না। একইভাবে ইতিহাসবিদরাও জগতে অতীতে কি ঘটেছে তা বুঝার চেষ্টা করে। কিন্তু ইতিহাসকে বিজ্ঞানের শাখা হিসেবে বিবেচনা করা হয় না।

বিজ্ঞানকে আমরা দুভাগে ভাগ করতে পারি। ১. প্রাকৃতিক বিজ্ঞান ২.সামাজিক বিজ্ঞান। পদার্থবিদ্যা, রসায়ন, জ্যোতির্বিদ্যা, ভূতত্ত্ব এবং জীববিদ্যা, এগুলো প্রাকৃতিক বিজ্ঞানের অন্তর্ভুক্ত। অন্যদিকে, মনোবিজ্ঞান, সমাজবিজ্ঞান, নৃতত্ত্ব এবং অর্থনীতির মতো বিষয়গুলো সামাজিক বিজ্ঞানের অন্তর্ভুক্ত। যদিও, সমাজবিজ্ঞানের মতো একটি বিষয় বৈজ্ঞানিক হতে পারে বা হওয়া উচিত কিনা তা সামাজিক বিজ্ঞানের দর্শনে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।

Cambridge dictionary তে বিজ্ঞানের সংজ্ঞা দিতে গিয়ে বলা হয়েছে,

ভৌত জগতের গঠন এবং আচরণের যত্ন সহকারে অধ্যয়ন, বিশেষ করে পর্যবেক্ষণ, পরিমাপ এবং পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে, এবং এই ক্রিয়াকলাপের ফলাফলগুলি বর্ণনা করার জন্য তত্ত্বগুলির বিকাশ। (( SCIENCE | English meaning - Cambridge Essential British ))

বিজ্ঞান কি? এ সম্পর্কে ন্যাশনাল একাডেমি অব সায়েন্সেস এর বিজ্ঞানীরা আলোকপাত করেছেন;

বিজ্ঞান প্রাকৃতিক জগৎ সম্পর্কে জ্ঞান অর্জনের একটি উপায়। প্রাকৃতিক জগৎ সম্পর্কে জাগতিক ব্যাখ্যা প্রদানে এটি সীমাবদ্ধ। বিজ্ঞান অতিপ্রাকৃত সম্পর্কে কিছুই বলতে পারে না। স্রষ্টা আছেন নাকি নেই- এ প্রশ্নের ব্যাপারে বিজ্ঞান নিরপেক্ষ । (( Teaching About Evolution and the Nature of Science. Page 58. ))

গণিতবিদ ও বিজ্ঞান দার্শনিক বাট্রান্ড রাসেল বলেছেন,

পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে আবিষ্কারের চেষ্টা এবং এর ওপর ভিত্তি করে যুক্তি দেখানো.....পৃথিবীর কোনো নির্দিষ্ট ঘটনা সম্বন্ধে এবং ঘটনার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট নিয়ম সম্বন্ধে। (( রাসেল, বি. (১৯৩৫) রিলিজিয়ন অ্যান্ড সায়েন্স। অক্সফোর্ড ইউনিভার্সিটি প্রেস, পৃষ্ঠা: ৮ ))

নিউ মেক্সিকো ইউনিভার্সিটির ইমেরিটাস অধ্যাপক ম্যানুয়েল মোলস বলেন,

ব্যাপকভাবে বলতে গেলে, বিজ্ঞান হল কিছু আনুষ্ঠানিক পদ্ধতি ব্যবহার করে প্রাকৃতিক জগৎ সম্পর্কে জ্ঞান অর্জনের একটি উপায়। (( Ecology: Concepts and Applications. Page; 511. ))

তবে বিজ্ঞানের সংজ্ঞা নিয়ে দার্শনিকদের মধ্যে বিতর্কও রয়েছে। ব্রিস্টল ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক জেমস লেডিম্যান বলেন,

আমাদের সামনে বিজ্ঞানের অজস্র উদাহরণ থাকলেও বিজ্ঞানকে কীভাবে সংজ্ঞায়িত করা যায় কিংবা কোন ধরনের বিতর্কমূলক কার্যক্রম বা বিশ্বাস কে বৈজ্ঞানিক বলা হবে তা আমরা জানি না। (( James Ladzman; Understanding Philosophy Of Science. Page: 4  ))

উপরিউক্ত সংজ্ঞাগুলোর আলোকে আমরা বলতে পারি যে, বিজ্ঞান একটি পদ্ধতিগত অনুসন্ধানের প্রক্রিয়া, যার মাধ্যমে আমরা পর্যবেক্ষণ ও পরীক্ষা-নিরীক্ষার মাধ্যমে মহাবিশ্বের গঠন এবং এর অভ্যন্তরে ঘটে যাওয়া বিভিন্ন ঘটনাকে ব্যাখ্যা করার চেষ্টা করি।

বিজ্ঞানের দর্শন

বর্তমান যুগে জীবনের প্রায় প্রতিটি ক্ষেত্রেই আমরা বিজ্ঞানের উপর নির্ভরশীল। আমাদের দৈনন্দিন জীবনযাত্রা থেকে শুরু করে স্বাস্থ্য, প্রযুক্তি, পরিবহণ, এবং এমনকি পরিবেশ সংরক্ষণ, প্রতিটি ক্ষেত্রেই বিজ্ঞানের অবদান অপরিসীম। তবে, অধিকাংশ মানুষ বিজ্ঞানকে প্রায়শই যৌক্তিক অনুসন্ধানের চূড়ান্ত মাধ্যম বা সর্বোচ্চ মাপকাঠি হিসেবে বিবেচনা করে। তাই আমাদের বিজ্ঞান সম্পর্কে জানা, বোঝা, এবং চিন্তা করা প্রয়োজন। এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো, ‘কীভাবে আমরা কেবল বিশ্বাস বা মতামতের বিপরীতে জ্ঞান পেতে পারি?' এবং এর একটি খুব সাধারণ উত্তর হল, ‘বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি অনুসরণ করুন'। উদাহরণস্বরূপ, খাবারে ফরমালিনের উপস্থিতি সম্পর্কে ধরা যাক। মানুষের মধ্যে কেউ হয়তো মনে করেন, সামান্য পরিমাণ ফরমালিন ক্ষতিকর নয়, আবার কেউ ভাবেন এটি মারাত্মক বিপজ্জনক। তবে, একটি দেশের সরকার কিংবা সংশ্লিষ্ট স্বাস্থ্য অধিদপ্তর কেবল সাধারণ ধারণার উপর ভিত্তি করে নীতি নির্ধারণ করবে না। তারা পদক্ষেপ নেবে তখনই, যখন বৈজ্ঞানিক পরীক্ষার মাধ্যমে সুনির্দিষ্ট প্রমাণ উপস্থাপিত হবে যে, কত পরিমাণ ফরমালিন মানুষের শরীরের জন্য ক্ষতিকর হতে পারে। ঠিক একইভাবে বৈজ্ঞানিক সকল মতামতকে মূল্যায়ন করা হয়।

দর্শনের একটি গুরুত্বপূর্ণ শাখা হলো জ্ঞানতত্ত্ব যা জ্ঞান ও ন্যায্যতা (knowledge and justification) সম্পর্কে অনুসন্ধান করে। জ্ঞানতত্ত্বের মৌলিক প্রশ্নগুলোর মধ্যে কিছু গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো; নিছক বিশ্বাসের বিপরীতে কীভাবে জ্ঞান অর্জন করা সম্ভব? আমরা কীভাবে নিশ্চিত হতে পারি যে আমাদের কোনো জ্ঞান আছে? আমরা আসলে কতটুকু জানি এবং কী জানি? পৃথিবীর প্রতিটি মানুষ নানা রকম বিশ্বাস ধারণ করে। কিছু বিশ্বাস সত্যের উপর প্রতিষ্ঠিত, আবার কিছু মিথ্যার উপর। তবে যদি কোনো ব্যক্তি এমন কিছু বিশ্বাস করেন যা প্রকৃতপক্ষে মিথ্যা, তাহলে সেই বিষয় সম্পর্কে তাকে জ্ঞানী বলা যাবে না। উদাহরণস্বরূপ; কেউ বিশ্বাস করলেন যে বাংলাদেশের রাজধানী চট্টগ্রাম। এমন বিশ্বাস রাখা মানে স্পষ্টতই প্রমাণ করে যে, বাংলাদেশের রাজধানী সম্পর্কে তার সঠিক জ্ঞান নেই। এটি শুধু তার ভুল ধারণা বা মিথ্যা বিশ্বাস। যদি আমরা কোনো দাবি করি বা কোনো প্রস্তাব উপস্থাপন করি, তাহলে সেই দাবি বা প্রস্তাব সম্পর্কে আমাদের নির্ভুল জ্ঞান থাকা জরুরি। কেবল তখনই সেই দাবি সত্য বলে বিবেচিত হবে এবং এটি বিশ্বাসযোগ্য হতে পারবে।

কিন্তু প্রশ্ন থেকে যায়; জ্ঞান অর্জনের জন্য কি কেবল সত্য ও বিশ্বাস যথেষ্ট? ‘জ্ঞানের ত্রিপক্ষীয় বিশ্লেষণ' অনুযায়ী, কোনো প্রস্তাবকে জ্ঞানে পরিণত করতে হলে চারটি বিষয় অপরিহার্য । ১. বিশ্বাস ২. ন্যায়সংগত ৩. সত্য। কিন্তু কেবল মাত্র ন্যায্য, সত্য, বিশ্বাস হলেই জ্ঞানে পরিণত হয় এই দাবিটি সমস্যা যুক্ত । তাই আমরা এর সাথে আরো একটি উপাদান যুক্ত করে নিয়েছি তা হলো ‘ওয়ারেন্ট’ ।

দর্শনের একটি শাখা, যা বিজ্ঞানের দর্শনের সাথে গভীরভাবে জড়িত, সেটিই হলো জ্ঞানতত্ত্ব। এটি এমন এক ক্ষেত্র যেখানে আমরা জ্ঞানের প্রকৃতি, উৎস, এবং সীমাবদ্ধতা নিয়ে আলোচনা করে। জ্ঞানতাত্ত্বিক প্রশ্নগুলির মধ্যে রয়েছে, বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি কী? কীভাবে কোনো প্রমাণ একটি তত্ত্বকে সমর্থন করে? বিজ্ঞান কি চূড়ান্ত সত্যের ধারক? বিজ্ঞানে তত্ত্বের পরিবর্তন কী একটি যৌক্তিক প্রক্রিয়া? ইত্যাদি। এসব প্রশ্নের উত্তর খোঁজার মাধ্যমে বিজ্ঞানের দর্শন আমাদের শেখায় যে, বিজ্ঞান কেবল একটি জ্ঞানচর্চার মাধ্যম নয়, বরং এটি একটি অনবরত বিশ্লেষণ, সংশোধন, এবং নতুনতর সত্যের সন্ধানের ধারা। সুতরাং, বিজ্ঞানের দর্শনের মূল উদ্দেশ্য হলো; বিজ্ঞানের প্রকৃতিকে সংজ্ঞায়িত করা, বিজ্ঞানের সীমাবদ্ধতাগুলো চিহ্নিত করা, বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে অন্তর্নিহিত ধারণাগুলোকে প্রশ্নবিদ্ধ করা, ইত্যাদি ।

এভাবে বিজ্ঞানের দর্শন, বৈজ্ঞানিক পদ্ধতির অন্তর্নিহিত যুক্তি ও অনুমানের গভীরে প্রবেশ করে সত্য ও জ্ঞানের একটি সুগঠিত কাঠামো নির্মাণ করে। এটি আমাদের মনে করিয়ে দেয়, বিজ্ঞান একটি গতিশীল প্রক্রিয়া, যেখানে প্রতিটি প্রশ্নের জবাবই আরেকটি নতুন প্রশ্নের জন্ম দেয়। একটি সহজ দৃশ্যপট কল্পনা করুন। আতিকুর রহমান নামের এক বিজ্ঞানী আকাশের দিকে একটি বল ছুঁড়ে পরীক্ষা করতে চাইলেন, ছোড়ার পর বলটি তার দিকে ফিরে আসে নাকি আকাশের দিকে অদৃশ্য হয়ে যায়। এভাবে তিনি বারবার বল ছুড়লেন এবং প্রতিবারই দেখলেন, বলটি তার দিকেই ফিরে আসছে। বারংবার একই ফলাফল পাওয়ার পর তিনি পরীক্ষা বন্ধ করলেন এবং এই সিদ্ধান্তে পৌঁছালেন যে, যতবারই আকাশের দিকে বল ছোড়া হবে, ততবারই তা ফিরে আসবে। এই সিদ্ধান্ত হয়তো আপনার কাছে অত্যন্ত স্বাভাবিক ও সহজ মনে হতে পারে। কিন্তু দর্শন ঠিক এখানেই প্রশ্ন তোলে, কেন আতিকুর রহমান এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছালেন? ভবিষ্যতেও কি প্রতিবার একই ফলাফল পাওয়া যাবে? আমরা কীভাবে নিশ্চিত হবো যে, এই সিদ্ধান্ত সর্বদা সত্য?

বিজ্ঞানের দর্শনের আসল কাজই হলো এই প্রশ্নগুলো উত্থাপন করা। আতিকুর রহমান তার সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে যে পদ্ধতি ব্যবহার করেছেন, তা বিশ্লেষণ করা। সেই পদ্ধতির ভিত্তি হিসেবে তিনি যে অনুমানগুলোর ওপর নির্ভর করেছেন, তাদের সঠিকতা ও যুক্তিসংগততা নিয়ে প্রশ্ন তোলা । এভাবেই বিজ্ঞানের দর্শন আমাদের সিদ্ধান্তের ভিত্তি ও সীমাবদ্ধতা নিয়ে গভীরভাবে ভাবতে শেখায় ৷

বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি

ভৌত বিশ্বের যা কিছু পর্যবেক্ষণ, পরীক্ষণ এবং যাচাইয়ের আওতায় আসে, তার গবেষণা ও ফলাফলই হলো বিজ্ঞান। যা কিছু ভৌত নয় বা পর্যবেক্ষণ ও পরিমাপযোগ্য নয়, তা নিয়ে বিজ্ঞান আলোচনা করে না। উদাহরণস্বরূপ, আমাদের মানবদেহ একটি ভৌত বস্তু । তাই বিজ্ঞান মানবদেহ নিয়ে বিশদ আলোচনা করতে পারে। কিন্তু দেহের সৌন্দর্য-যা একেবারেই ভৌত নয় এবং পরিমাপের সীমার বাইরে, তা নিয়ে বিজ্ঞান কোনো কথা বলে না। সৌন্দর্য নিয়ে আলোচনা করার জন্য রয়েছে আলাদা শাস্ত্র, যার নাম নন্দনতত্ত্ব। একইভাবে, আমাদের মন, নৈতিকতা, মূল্যবোধ, স্রষ্টার অস্তিত্ব, আত্মা বা পরকাল এসব বিষয় বিষয়ে বিজ্ঞান আলোচনা করে না । কারণ, এগুলো পর্যবেক্ষণ ও পরিমাপের আওতার বাইরে । বিজ্ঞান প্রথমে পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে একটি হাইপোথিসিস (অনুমান) তৈরি করে। এরপর সেই হাইপোথিসিসকে নানা ধাপে পরীক্ষা-নিরীক্ষার মাধ্যমে একটি তত্ত্ব বা থিওরিতে রূপান্তরিত করে । এই তত্ত্ব সর্বদা পরীক্ষার জন্য উন্মুক্ত থাকে, এবং যেকোনো সময় তা যাচাই কিংবা সংশোধন করা সম্ভব।

বিজ্ঞান বনাম ছদ্ম বিজ্ঞান

বৈজ্ঞানিক থিওরির অন্যতম একটি বৈশিষ্ট্য হচ্ছে একে মিথ্যা প্রমাণ করা যায় এমন (Falsifiable) হতে হবে। বিংশ শতাব্দীর একজন প্রভাবশালী অস্ট্রিয়ান দার্শনিক এবং বিজ্ঞানী কার্ল পপার এর মতে, একটি বৈজ্ঞানিক তত্ত্বের মৌলিক বৈশিষ্ট্য হল এটি মিথ্যা প্রমাণ করা যায় এমন (Falsifiable) হতে হবে। ১৫০ বৈজ্ঞানিক পদ্ধতির অন্যান্য বৈশিষ্ট্যগুলোর সাথে মিথ্যাচারযোগ্যতাকে (মিথ্যা প্রমাণ করা যায় এমন) বৈজ্ঞানিক পদ্ধতির মৌলিক নীতি হিসেবে বিবেচনা করা হয় । মিথ্যাচারযোগ্যতার নিয়ম অনুসারে, একটি বৈজ্ঞানিক অনুমান শুধু মাত্র তখনই বিশ্বাসযোগ্য বলে বিবেচিত হবে যদি এটাকে মিথ্যা প্রমাণ করা যায়। এর মানে বৈজ্ঞানিক হাইপোথেসিস বা অনুমানকে অবশ্যই পরীক্ষা করা এবং ভুল প্রমাণ করতে সক্ষম হতে হবে।

একটি দৃশ্যপট কল্পনা করুন; নাদিয়া তার জীবনের বিভিন্ন সময়ে যত রাজহাঁস দেখেছেন, প্রত্যেকটিই ছিল শুভ্র সাদা । তাই তিনি একটি অনুমান দাঁড় করালেন যে পৃথিবীর সমস্ত রাজহাঁসই সাদা রঙের। এই অনুমান তার অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে হলেও, তা নিঃসন্দেহে ভুল প্রমাণিত হতে পারে। নাদিয়ার এই অনুমান মিথ্যা প্রমাণ করার জন্য শুধুমাত্র একটি অ-সাদা রঙের রাজহাঁসই যথেষ্ট । একবার কোনো কালো, ধূসর, বা অন্য রঙের রাজহাঁস আবিষ্কৃত হলে তার অনুমানের ভিত্তি ধূলিসাৎ হয়ে যাবে। এখানেই কার্ল পপারের দর্শন প্রাসঙ্গিক হয়ে ওঠে। পপারের মতে, কোনো বৈজ্ঞানিক তত্ত্বকে সত্যিকারের বিজ্ঞান হিসেবে স্বীকৃতি পেতে হলে তা অবশ্যই মিথ্যাচারযোগ্যতার শর্ত পূরণ করতে হবে । অর্থাৎ, তত্ত্বটি এমন হতে হবে যা প্রমাণ করার পাশাপাশি মিথ্যা প্রমাণ করাও সম্ভব। যদি একটি তত্ত্ব এমন হয়, যা কোনোভাবেই খণ্ডনযোগ্য নয়, তাহলে তা বিজ্ঞান নয়; বরং নিছক ছদ্মবিজ্ঞান ।

বৈজ্ঞানিক অনুমানের প্রকৃতি

কসমোলজিস্টরা আমাদের বলেন আমাদের মহাবিশ্ব সিংগুলারিটি থেকে মহাবিস্ফোরণের মাধ্যমে সৃষ্টি হয়েছে এবং ক্রমাগত সম্প্রসারিত হচ্ছে। বায়োলজিস্টরা আমাদের বলেন শিম্পাঞ্জির সাথে আমাদের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রয়েছে। কিন্তু বিজ্ঞানীরা কখনোই সিঙ্গুলারিটিকে পর্যবেক্ষণ করেনি, মহাবিশ্ব দিন দিন বড় হচ্ছে এটাও কেউ দেখেনি, কেউ কখনও একটি প্রজাতিকে অন্য প্রজাতি থেকে বিবর্তিত হতে দেখেনি। তাহলে বিজ্ঞানীরা কীভাবে এই সিদ্ধান্তগুলোতে পৌঁছেছেন? উত্তর হচ্ছে, বিজ্ঞানীরা যুক্তি (Reasoning) বা অনুমান (Inference) প্রক্রিয়ার মাধ্যমে যে কোন বিষয়ে সিদ্ধান্তে পৌঁছায়। বিজ্ঞানীদের সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর এই প্রক্রিয়া সম্পর্কে জানতে বৈজ্ঞানিক অনুমানের প্রক্রিয়া সম্পর্কে জানতে হবে।

ডিডাকশন এবং ইনডাকশন

ডিডাকশন অনুমান বা ডিডাক্টিভ আর্গুমেন্ট বলতে বুঝানো হয়, যে অনুমানে আশ্রয়বাক্য গুলো সিদ্ধান্তের সত্যতার চূড়ান্ত ভিত্তি হিসেবে কাজ করে। এই অনুমানের ক্ষেত্রে যদি প্রেমিস গুলো সত্য হয় তাহলে সিদ্ধান্ত সত্য হতে বাধ্য। যেমন,

  • P: সকল মানুষ হয় মরণশীল। 
  • P: মিস্টার নাদরুন একজন মানুষ।
  • C: সুতরাং, মিস্টার নাদরুন মরণশীল।

এখানে যদি প্রেমিসগুলো সত্য হয় তাহলে সিদ্ধান্ত সত্য হতে বাধ্য।

অন্যদিকে, ইনডাক্টিভ আর্গুমেন্ট বলতে বুঝানো হয়, যে অনুমানে প্রেমিস গুলো সিদ্ধান্তের সত্যতার পক্ষে এক ধরনের সমর্থন দেয় তাকে ইন্ডাকক্টিভ আর্গুমেন্ট বলে। সিদ্ধান্তের সত্যতার পক্ষে প্রেমিস গুলো যে সমর্থন যোগায় তার মাত্রার উপর ভিত্তি করে ইনডাক্টিভ অনুমান ভালো অনুমান বা মন্দ অনুমান হিসেবে মূল্যায়ন করা যেতে পারে। প্রেমিসগুলো সিদ্ধান্তের সত্যতার পক্ষে যত বেশি সমর্থন দিবে ইনডাক্টিভ অনুমানের মূল্যও তত বেড়ে যাবে; সমর্থনের মাত্রা যত কমবে মূল্যও তত কমবে। এক্ষেত্রে ইনডাক্টিভ অনুমান ডিডাক্টিভ অনুমানের মতো নিশ্চিত কোনো সিদ্ধান্ত দিতে পারে না। ইনডাক্টিভ অনুমানে সমসময় সম্ভাবতার দিকটাই নির্দেশ করে। যেমন,

  • P: প্রেমা বাজার থেকে ১০টি পাউরুটি কিনেছে।
  • P: প্রেমা বাসায় এসে ৮টা পাউরুটি খুলে দেখেছে সেগুলো খুব ভালো।
  • P: সবগুলো পাউরুটিতে একই মেয়াদ উত্তীর্ণের তারিখ দেওয়া।
  • C: সুতরাং, বাকি পাউরুটি গুলোও ভালো। 

এখানে সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর ক্ষেত্রে সবগুলো পাউরুটি ভালো নাকি খারাপ তা দেখা হয়নি। অধিকাংশ পাউরুটি যেহেতু ভালো এবং সবগুলোর মেয়াদ উত্তীর্ণের তারিখ এক থাকার কারণে অনুমান করে নেওয়া হয়েছে যে, বাকি পাউরুটিগুলো সম্ভবত ভালো। যদিও প্রথম ৮টি পাউরুটি ভালো ছিল এবং সবগুলো পাউরুটির মেয়াদ উত্তীর্ণের তারিখ একই, তবুও এটা সম্ভব যে বাকি দুটো পাউরুটি আসলে ভালো নাও হতে পারে। সুতরাং, যৌক্তিকভাবে ইন্ডাক্টিভ অনুমানে সিদ্ধান্ত মিথ্যা হতে পারে। তবে দৈনন্দিন জীবনে আমরা ইন্ডাক্টিভ অনুমানে অনেকাংশেই নির্ভর করি।

একটি দৃশ্যপট কল্পনা করুন। মিছবাউল হক প্রতিদিন বিকেলে তাদের স্কুলের মাঠে গিয়ে বন্ধুদের সাথে ক্রিকেট খেলে। প্রতিদিন মাঠে যাওয়ার সময় তার মনে সন্দেহ থাকে-আজ তার বন্ধুরা আসবে তো? কিন্তু যেহেতু প্রতিদিনই তার বন্ধুরা উপস্থিত থাকে, তাই সে ধরে নেয় যে আজও তারা আসবে। এই অনুমান তার আগের অভিজ্ঞতার ওপর ভিত্তি করে করা। তবে যৌক্তিকভাবে এটা পুরোপুরি নিশ্চিত নয়, কারণ কোনো একদিন এমনও হতে পারে যে তার বন্ধুরা খেলতে না আসার সিদ্ধান্ত নেয়। মিছবাউল হকের এই অনুমান ইন্ডাক্টিভ, ডিডাক্টিভ নয়। ইন্ডাক্টিভ অনুমান অভিজ্ঞতার পুনরাবৃত্তির ওপর নির্ভরশীল, কিন্তু তা চূড়ান্তভাবে অবশ্যম্ভাবী বা নির্ভুল নয়।

বিজ্ঞান কী ইন্ডাক্টিভ অনুমানের উপর নির্ভর করে?

উত্তর হলো, হ্যাঁ, বিজ্ঞান ইন্ডাক্টিভ অনুমানের উপর নির্ভর করে । বৈজ্ঞানিক পদ্ধতির মূল স্তম্ভ হলো পর্যবেক্ষণ, পরীক্ষণ, এবং এই পরীক্ষণের ভিত্তিতে গড়ে ওঠা তত্ত্ব। তবে বৈজ্ঞানিক তত্ত্বের প্রথম শর্ত হলো এটি পর্যবেক্ষণযোগ্য হতে হবে। কিন্তু আমাদের পর্যবেক্ষণেরও তো কিছু সীমাবদ্ধতা রয়েছে। একটি উদাহরণ দিয়ে বিষয়টি পরিষ্কার করা যাক।

ধরা যাক, আপনি সকালের নাস্তা শেষে একটি পত্রিকা পড়ছেন। সেখানে একটি প্রতিবেদন বলছে “বিজ্ঞানীরা প্রমাণ পেয়েছেন যে আনারস এবং দুধ একই সঙ্গে খাওয়া সম্পূর্ণ নিরাপদ।” এখন প্রশ্ন হলো, “বিজ্ঞানীরা প্রমাণ পেয়েছেন” বলতে কি বোঝায়? এটা কি এমন যে, বিজ্ঞানীরা পৃথিবীর প্রতিটি মানুষের উপর পরীক্ষা চালিয়ে দেখেছেন যে আনারস এবং দুধ একসাথে খাওয়ার পর কারো কোনো ক্ষতি হয়নি? প্রকৃতপক্ষে, এমন কিছুই হয়নি। বিজ্ঞানীরা কেবল তাদের নিয়ন্ত্রণে থাকা নির্দিষ্ট সংখ্যক মানুষের উপর এই পরীক্ষা চালিয়েছেন এবং দেখেছেন যে তাদের মধ্যে এই খাদ্য সংমিশ্রণের কোনো নেতিবাচক প্রভাব পড়েনি । এখান থেকেই তারা অনুমান করেছেন যে, আনারস এবং দুধ একসঙ্গে খাওয়া নিরাপদ। তবে এই অনুমান যে চূড়ান্ত সত্য, তা নয়। কারণ, কিছুদিন পর যদি অন্য কোনো স্থানে নতুন পরীক্ষা করা হয় এবং দেখা যায় যে আনারস ও দুধ একসঙ্গে খাওয়ার পর কেউ অসুস্থ হয়ে পড়ছে, তাহলে ‘আনারস এবং দুধ একসঙ্গে খাওয়া নিরাপদ’-এই তত্ত্বটি ভুল প্রমাণিত হবে। এখানেই বৈজ্ঞানিক পদ্ধতির একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য প্রকাশ পায়। বৈজ্ঞানিক সিদ্ধান্তগুলো ইন্ডাক্টিভ যুক্তির উপর নির্ভরশীল, যেখানে পর্যবেক্ষণের বৃদ্ধি বা পরিবর্তনের সাথে সাথে সিদ্ধান্তও পরিবর্তনশীল হতে পারে ।

প্রবলেম অব ইন্ডাকশন

একটি দৃশ্যপট কল্পনা করুন। একদল বিজ্ঞানী এশিয়া মহাদেশের বিভিন্ন দেশে ভ্রমণ করলেন। ভ্রমণের সময় তারা লক্ষ্য করলেন, সেখানকার প্রতিটি রাজহাঁসের রং সাদা। এরপর তারা ইউরোপ মহাদেশে পাড়ি জমালেন এবং সেখানে গিয়েও একই ফল পেলেন, সব রাজহাঁস সাদা । অবশেষে, তারা অ্যামেরিকা মহাদেশে ভ্রমণ করলেন এবং সেখানেও প্রত্যেকটি রাজহাঁস সাদা দেখতে পেলেন। এই পর্যবেক্ষণের উপর ভিত্তি করে বিজ্ঞানীরা একটি সিদ্ধান্তে উপনীত হলেন যে, পৃথিবীর সকল রাজহাঁস সাদা। এই উদাহরণটি যদি আমরা প্রেমিস আকারে উপস্থাপন করি, তাহলে সেটি নিম্নরূপ হবে;

  • P: এশিয়ার সকল রাজহাঁসের রং সাদা।
  • P: ইউরোপের সকল রাজহাঁসের রং সাদা।
  • P: অ্যামেরিকার সকল রাজহাঁসের রং সাদা।
  • C: সুতরাং, পৃথিবীর সকল রাজহাঁসের রং সাদা।

বিজ্ঞানীরা এখানে কিছু নির্দিষ্ট দেশের রাজহাঁস পর্যবেক্ষণ করেছেন এবং প্রত্যেক ক্ষেত্রেই দেখতে পেয়েছেন, রাজহাঁসগুলোর রং সাদা। এই পর্যবেক্ষণের ভিত্তিতে তারা একটি সার্বজনীন সিদ্ধান্তে উপনীত হয়েছেন যে, পৃথিবীর সকল রাজহাঁস সাদা। তবে, এই সিদ্ধান্তটি নির্ভুল নয়। যেমনটি অবরোহ বা ডিডাক্টিভ যুক্তির ক্ষেত্রে হয়। কেননা, যদি ভবিষ্যতে বিজ্ঞানীরা সাদা ছাড়া অন্য কোনো রঙের রাজহাঁস খুঁজে পান, তবে তাদের এই সিদ্ধান্ত মুহূর্তেই মিথ্যা প্রমাণিত হবে। অর্থাৎ, পর্যবেক্ষণ পরিবর্তন হলে সিদ্ধান্ত পরিবর্তন হবে। এটাই হলো ইন্ডাক্টিভ পদ্ধতির স্বরূপ।

রাজহাসের এই উদাহারণটি কাল্পনিক নয়, বরং বাস্তব। ১৬৬৭ সাল পর্যন্ত ইউরোপে প্রচলিত ধারণা ছিল যে পৃথিবীর সমস্ত রাজহাঁস সাদা। কারণ, সেই সময় পর্যন্ত আমাদের পর্যবেক্ষণে পাওয়া সব রাজহাঁসের রং সাদা ছিল। কিন্তু ১৬৯৭ সালে উইলিয়াম দ্য ব্লামিং অস্ট্রেলিয়ায় কালো রাজহাঁস আবিষ্কার করেন। এই আবিষ্কার 'All swans are white and have always been white' তত্ত্বকে ভুল প্রমাণ করে। সুতরাং, আমরা দেখতে পাচ্ছি যে পর্যবেক্ষণের পরিমাণ বৃদ্ধি পেলে যেকোনো বৈজ্ঞানিক তত্ত্ব ভুল প্রমাণিত হওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হয়। আর যা ভুল হতে পারে বা যা কোনো সময় ভুল হিসেবে প্রতিপন্ন হয়, সেটি কখনোই চূড়ান্ত বা পরম সত্য হতে পারে না।

চূড়ান্ত সত্য এমন একটি বিষয়, যা সর্বদা এবং সর্বত্র সত্য থাকে। সত্যের প্রকৃতির মধ্যে কখনো মিথ্যা হওয়ার কোনো সম্ভাবনা থাকে না। কিন্তু বৈজ্ঞানিক তত্ত্বের ক্ষেত্রে তত্ত্ব মিথ্যা হওয়ার সম্ভাবনা থাকে। ইন্ডাক্টিভ আর্গুমেন্টের জন্য আমরা প্রেমার বাজার থেকে পাউরুটি কেনা এবং মিছবাউল হকের মাঠে খেলতে যাওয়ার উদাহরণগুলোও স্মরণ করতে পারি। এই উদাহরণগুলোতে আমরা লক্ষ্য করেছি যে, ইন্ডাক্টিভ আর্গুমেন্ট বিশেষ বিশেষ দৃষ্টান্ত থেকে অনুমান করে সিদ্ধান্তে পৌঁছায়। এর মাধ্যমে ধরে নেওয়া হয় যে, যে-সব দৃষ্টান্ত এখনো পরীক্ষা করা হয়নি, সেগুলোর আচরণও একই রকম হবে। এ ধরনের অনুমানকে দার্শনিক ডেভিড হিউম প্রকৃতির অভিন্নতা বলে অভিহিত করেছেন। প্রকৃতির অভিন্নতা বলতে বোঝানো হয়, যে বিষয়গুলো আমরা পরীক্ষা করে দেখিনি, সেগুলোও পরীক্ষিত বিষয়গুলোর মতোই আচরণ করবে।

উদাহরণস্বরূপ; ১০টি পাউরুটির মধ্যে ৮টি ভালো, সেহেতু বাকি দুটিও ভালো হবে। বিগত দিনগুলোতে মিছবাউল হকের বন্ধুরা মাঠে খেলেছে, তাই আজও তারা খেলবে। এশিয়া, ইউরোপ, এবং আমেরিকার সব রাজহাঁস সাদা, সুতরাং পৃথিবীর সমস্ত রাজহাঁস সাদা। এক্ষেত্রে দেখা যায়, প্রকৃতি যেন অভিন্ন আচরণ করছে। কিন্তু প্রশ্ন হলো, আমরা কি নিশ্চিতভাবে জানতে পারি যে প্রকৃতির অভিন্নতা অনুমান সত্য? আমরা কি কোনোভাবে এটি প্রমাণ করতে পারি? ডেভিড হিউম এই প্রশ্নের উত্তরে অত্যন্ত সরলভাবে বলেন, না, আমরা পারি না। যৌক্তিকভাবে এটা সম্ভব যে, ১০টি পাউরুটির মধ্যে ৮টি ভালো হলেও বাকি দুটোর একটি বা উভয়ই খারাপ হতে পারে, যদিও সবগুলোর মেয়াদ উত্তীর্ণের তারিখ একই। তেমনই, মেসবাহ উল হক প্রতিদিন মাঠে গিয়ে তার বন্ধুদের খেলতে দেখতে পেলেও এমন দিন আসতেই পারে, যেদিন তার বন্ধুরা মাঠে আসবে না। এই উদাহরণগুলো আমাদের শেখায় যে প্রকৃতি সবসময় অভিন্ন আচরণ করে না, বরং, ভিন্ন আচরণও করে।

সুতরাং, প্রকৃতির অভিন্নতার উপর ভিত্তি করে করা ইন্ডাক্টিভ অনুমান চূড়ান্ত নয়, বরং সম্ভাবনামূলক। এ কথার প্রেক্ষিতে আরও কিছু বাস্তব উদাহরণ দেওয়া যায়। যেমন, নিউটনের তত্ত্ব বিজ্ঞান মহলে পুরো দুইশত বছর টিকে ছিল। এই দুইশত বছর বিজ্ঞান পূজারি থেকে সাধারণ মানুষও এই তত্ত্বকে সত্য হিসেবে মেনে নিয়েছিল। কিন্তু আলবার্ট আইনস্টাইন নিউটনের তত্ত্বকে প্রশ্নবিদ্ধ করে দেয়। একটা সময় বিজ্ঞানীরা মনে করতো পৃথিবী স্থির হয়ে আছে এবং চন্দ্র, সূর্য, ও অন্যান্য জ্যোতিষ্ক তার চারদিকে ঘুরছে। এই মতবাদ ভূকেন্দ্রিক মতবাদ (Geo- centric theory) হিসেবে পরিচিত। জ্যোতির্বিজ্ঞানী টলেমি মূলত এই মতবাদের প্রবর্তক। কিন্তু ষোড়শ শতাব্দীর জ্যোতির্বিজ্ঞানী কোপার্নিকাস দেখালেন যে, টলেমির এই সিদ্ধান্ত ভুল। তিনি প্রচার করলেন, সূর্য স্থির, পৃথিবীসহ অন্যান্য গ্রহ তাকে কেন্দ্র করে আবর্তিত হচ্ছে। তার এই মতবাদকে সূর্যকেন্দ্ৰিক মতবাদ (Helio-centric theory) বলে। বর্তমানে বিজ্ঞান আবার আমাদের জানায় সবকিছুই নিজ নিজ অক্ষে ঘূর্ণায়মান। মহাবিশ্ব কীভাবে সৃষ্টি হয়েছে? এই বিষয়ে একটা সময় বিজ্ঞানীরা মনে করতো মহাবিশ্বের কোন শুরু নেই। যাকে বলে Steady State Theory (অটল মহাবিশ্ব মডেল) । কিন্তু বর্তমানে আমরা জানতে পারি মহাবিশ্ব বিগ ব্যাং এর মাধ্যমে সৃষ্টি হয়েছে। সুতরাং, আমরা দেখতে পাচ্ছি বিজ্ঞান প্রতিনিয়ত পরিবর্তনশীল। পরিবর্তনশীল কোনো কিছু কখনোই চূড়ান্ত সত্য হতে পারে না ।

বিজ্ঞানের সীমাবদ্ধতা

ভৌত বিষয়ের গভীরতা ও প্রকৃতি অনুধাবনে বিজ্ঞানের চেয়ে অধিকতর সমৃদ্ধ জ্ঞান হয়তো অন্য কোনো শাখা দিতে সক্ষম নয়। তবে বৈজ্ঞানিক পদ্ধতির রয়েছে কিছু মৌলিক সীমাবদ্ধতা। এর অন্যতম হলো; এটি পর্যবেক্ষণের গণ্ডিতে আবদ্ধ এবং তার পরিসীমা অতিক্রম করতে অক্ষম। বিজ্ঞান পরম বা অবধারিত সত্য জানাতে অপারগ, নৈতিকতা কিংবা ভালো-মন্দের মানদণ্ড নির্ধারণেও এটি নীরব। এছাড়া, ‘কেন ঘটে?’ এই মৌলিক প্রশ্নের উত্তর বিজ্ঞানের পরিধির বাইরে। অধিবিদ্যার গভীর রহস্য কিংবা স্বতঃসিদ্ধ ধারণার আলোচনাতেও বিজ্ঞান অক্ষম ।

পর্যেবক্ষণের মাঝে সীমাবদ্ধ

পর্যবেক্ষণের সীমাবদ্ধতা বুঝতে আমরা একটি বাস্তব উদাহরণ বিবেচনা করতে পারি। ধরুন, একজন বিজ্ঞানী ৫ বছর বয়সী শিশুদের মধ্যে কোন ধরনের খেলাধুলার প্রতি বেশি আগ্রহ রয়েছে, তা নির্ধারণ করতে চান। এই লক্ষ্যে তিনি একটি ফাঁকা ঘর বা খেলার মাঠে বিভিন্ন খেলার সামগ্রী-যেমন ক্রিকেট, ফুটবল, টেনিস, হকি ইত্যাদি সাজিয়ে রাখলেন। এরপর, তিনি একদল ৫ বছর বয়সী শিশুকে সেই ঘর বা মাঠে প্রবেশ করতে দিলেন এবং তাদের আচরণ পর্যবেক্ষণ শুরু করলেন। এখানে বিজ্ঞানীর পর্যবেক্ষণ উপস্থিত শিশুদের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে। যে শিশুরা পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করছে না, তাদের পছন্দ-অপছন্দ বা আচরণ এই গবেষণার বাইরে থেকে যাবে। বিজ্ঞান দার্শনিক এলিয়েট সোবার তার এম্পিরিজম প্রবন্ধে লিখেন,

যে-কোনো মুহূর্তে বিজ্ঞানীরা তাদের নাগালের মাঝে থাকা পর্যবেক্ষণ দ্বারা সীমাবদ্ধ । ..এই সীমাবদ্ধতা হলো বিজ্ঞানকে এমন সমস্যাগুলোর প্রতি মনোযোগ দিতে বাধ্য করা, যেগুলো পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে সমাধান করা সম্ভব। (( The Routledge Companion to Philosophy of Science, Page: 137-38 ))

বিজ্ঞান কী পরম সত্য বা নিশ্চয়তার দিকে নিয়ে যায়?

বিজ্ঞান নিয়ে অনেক বড় বড় দার্শনিক থেকে শুরু করে বিজ্ঞানীদের মধ্যেও ভুল ধারণা রয়েছে । বিশেষ করে নাস্তিক বিজ্ঞানী বা দার্শনিকদের মাঝে । তারা বিজ্ঞানের থিওরিকে বা বিজ্ঞান কোনো কিছু দাবি করলে সেটাকে পরম সত্য হিসেবে মেনে নেয়। দার্শনিক বাট্রান্ড রাসেল বলেন,

যা যা জ্ঞান অর্জন সম্ভব তা কেবল মাত্র বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতেই সম্ভব। বিজ্ঞান যা আবিষ্কার করতে পারবে না তা কখনোই আমরা জানতে পারবো না। (( Samir Okasha (2016), Philosophy of science : A very short introduction ( Oxford university press, 2nd edition) Page: 115 ))

বিজ্ঞান কখনোই আমাদের চূড়ান্ত বা পরম সত্যে পৌঁছানোর নিশ্চয়তা দিতে পারে না । আরও মজার ব্যাপার হলো, এই দাবিটিও ‘বিজ্ঞান সত্য জানার একমাত্র মাধ্যম’-বিজ্ঞান নিজেই তা প্রমাণ করতে অক্ষম। কারণ এই বক্তব্য নিজেই একটি অধিবিদ্যাগত (মেটাফিজিক্যাল) বিবৃতি, যা বৈজ্ঞানিক পরীক্ষার মাধ্যমে যাচাই করা সম্ভব নয়। সুতরাং, বিজ্ঞান পরম সত্য জানার মাধ্যম বা বিজ্ঞান নিশ্চয়তার দিকে নিয়ে যায়, এটা এহেন আত্মঘাতী কথা যে, ‘বাংলা বাক্যে তিন শব্দের চেয়ে বড় কোনো বাক্য নেই' । এই বাক্যেই তিন শব্দের চেয়ে বেশি শব্দ রয়েছে।

অনেক দার্শনিক মনে করেন যে দার্শনিক অনুসন্ধানের নিজস্ব পদ্ধতি আছে, যার মাধ্যমে সত্যকে প্রকাশ করতে পারেন যেটা বিজ্ঞান পারে না। দার্শনিক পদ্ধতিগুলোর মধ্যে রয়েছে যুক্তি, চিন্তার পরীক্ষা-নিরীক্ষার ব্যবহার, এবং ধারণাগত বিশ্লেষণ।

বৈজ্ঞানিক থিওরি বেশ কিছু কারণে আমাদের নিশ্চিত জ্ঞান পর্যন্ত পৌঁছে দিতে পারেনা। তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে, 1. The problem of induction 2. Scatter graph problem. Problem of induction নিয়ে ইতোমধ্যেই আলোচনা হয়েছে ।

Scatter graph problem

Scatter graph problem হলো একই পর্যবেক্ষণ বা তথ্য থেকে একাধিক ভিন্ন সিদ্ধান্তে উপনীত হওয়া। এটি বৈজ্ঞানিক অনুসন্ধানের একটি গুরুত্বপূর্ণ সীমাবদ্ধতা। উদাহরণস্বরূপ, আমাদের সামনে ১০০টি বিন্দু রয়েছে, এগুলো হলো তথ্য। আমাদেরকে যদি এই তথ্য থেকে সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে বলা হয় তাহলে দেখা যাবে, কেউ সেই বিন্দুগুলো সংযুক্ত করে একটি সরলরেখা তৈরি করবে। কেউ সেগুলো দিয়ে একটি বক্ররেখা আঁকবে। আবার কেউ ত্রিভুজ, চতুর্ভুজ বা বর্গক্ষেত্র তৈরি করবে। এটি বোঝায়, একই পর্যবেক্ষণ বা তথ্য থেকে একাধিক তত্ত্ব দাঁড় করানো সম্ভব। এই কারণে তত্ত্বগুলো ক্রমাগত পরিবর্তিত হয় এবং নতুন তথ্য বা পর্যবেক্ষণের ভিত্তিতে পুরোনো তত্ত্বগুলো সংশোধিত বা প্রতিস্থাপিত হয় । 

বিশেষজ্ঞদের মত

প্রখ্যাত পদার্থবিদ ফ্রিম্যান ডাইসন নিউ ইয়র্ক রিভিউতে এক আর্টিকেলে লিখেন,

বিজ্ঞান সম্পর্কে মানুষের একটা বিকৃত দৃষ্টিভঙ্গি রয়েছে। বাচ্চাকাচ্চাদের স্কুলে শেখানো হয় যে, বিজ্ঞান হচ্ছে সুপ্রতিষ্ঠিত সত্যের সমাহার! আসলে বিজ্ঞান কোন ‘কালেকশন অব ট্রুথ' নয়। বিজ্ঞান হচ্ছে ক্রমাগত রহস্য উন্মোচন। (( Quote by Freeman John Dyson: “The public has a distorted view of science beca...” ))

Stanford Encyclopedia of Philosophy তে বলা হয়েছে,

বৈজ্ঞানিক তত্ত্বগুলোর একটা নির্দিষ্ট মেয়াদ রয়েছে। বিজ্ঞানের ইতিহাসের দিকে একটু লক্ষ করলে একসময়ে প্রভাবশালী ও গ্রহণযোগ্য এমন অনেক তত্ত্ব চোখে পড়বে, যেগুলো আজ বিজ্ঞানের ইতিহাসে পড়ানো হচ্ছে। অর্থাৎ সেগুলো আর গ্রহণযোগ্য নয়। (( Realism and Theory Change in Science (Stanford Encyclopedia of Philosophy) ))

ইংরেজ তাত্ত্বিক পদার্থবিদ, কসমোলজিস্ট এবং লেখক, স্টিফেন হকিং তার লিখিত, ‘A brief history of time’ বইতে বলেন,

যেকোনো ভৌত তত্ত্ব সর্বদা অস্থায়ী হয়, এই অর্থে যে এটি শুধু মাত্র একটি অনুমান; আপনি এটি প্রমাণ করতে পারবেন না। পরীক্ষা-নিরীক্ষার ফলাফল যতবারই কিছু তত্ত্বের সাথে একমত হোক না কেন, আপনি কখনই নিশ্চিত হতে পারবেন না যে পরের বার ফলাফলটি তত্ত্বের বিরোধিতা করবে না। অন্যদিকে, আপনি তত্ত্বের ভবিষ্যদ্বাণীগুলির সাথে একমত নয় এমন একটি একক পর্যবেক্ষণ খুঁজে বের করে একটি তত্ত্বকে অস্বীকার করতে পারেন। (( Stephen Hawking a Brief History of Time; Page:Chapter:1  ))

মনোবিজ্ঞানী কিথ স্ট্যানোভিচ বলেন,

বিজ্ঞান ইতঃপূর্বে যা সত্য বলে প্রমাণ করেছিল, তাকেই প্রতিনিয়ত মিথ্যা প্রমাণ করে চলেছে। (( How to think straight about Psychology. Boston: Pearson Education. Page-106-107 ))

বিজ্ঞান দার্শনিক কার্ল পোপার বলেন,

বৈজ্ঞানিক জ্ঞান সৃষ্টি হয় সত্যের সন্ধান করতে, কিন্তু মনে রাখতে হবে এটি কোন নিশ্চয়তার সন্ধান নয়... মানুষের সকল জ্ঞান ভুলপ্রবণ, তাই অনিশ্চিত। (( মুজাজ্জাজ নাঈম; মুক্তচিন্তা ও ইসলাম ; পৃঃ ৫৬ ))

ব্রিস্টল বিশ্ববিদ্যালয়ের দর্শনের অধ্যাপক ড.সামির ওসাকা তার লিখিত, 'Philosophy of Science : a very short introduction' গ্রন্থে উল্লেখ করেন,

ঐতিহাসিকভাবে, বৈজ্ঞানিক তত্ত্বের অনেক উদাহরণ রয়েছে যা তাদের দিনে অভিজ্ঞতাগতভাবে সফল হয়েছিল কিন্তু পরে মিথ্যা বলে প্রমাণিত হয়েছিল। (( Samir okasha; Philosophy of Science: A Very Short Introduction; Page:60 ))

কানাডার দার্শনিক উইলিয়াম নিউটন স্মিথ, তার লিখিত ‘The Rationality Of Science' গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন,

যদি আমরা এই সত্যের উপর চিন্তা করি যে অতীতের সমস্ত ভৌত তত্ত্বগুলো তাদের উত্তম দিনে ছিল এবং অবশেষে মিথ্যা হিসেবে প্রত্যাখ্যান হয়েছে। প্রকৃতপক্ষে, একটি হতাশাজনক প্রস্তাবের পক্ষে প্রস্তাবনামূলক সমর্থন রয়েছে যে, যে কোন তত্ত্ব ২০০ বছরের মধ্যে মিথ্যা বলে প্রমাণিত হবে।  (( W H Newton Smith; The Rationality Of Science; Page: 14 ))

মার্কিন দার্শনিক Larry Laudan তার লিখিত,  Philosophy of Science: Contemporary Readings গ্রন্থে বৈজ্ঞানিক যে-সব তত্ত্ব কার্যকর হওয়া সত্ত্বেও পরবর্তী সময়ে ভুল প্রমাণিত হয়েছে এমন কিছু তত্ত্বের সংক্ষিপ্ত তালিকা দিয়েছেন। তালিকাটি নিম্নরূপ:

  • The crystalline spheres of ancient and medieval astronomy. (প্রাচীন এবং মধ্যযুগীয় জ্যোতির্বিদ্যার স্ফটিক গোলক) The humoral theory of medicine. (ঔষধের হাস্যকর তত্ত্ব) The effluvial theory of static electricity. (স্ট্যাটিক বিদ্যুতের প্রবাহ তত্ত্ব)
  • Catastrophist' geology, with its commitment to a universal (Noachian) deluge. ('বিপর্যয়বাদী' ভূতত্ত্ব, একটি সর্বজনীন (নোয়াচিয়ান) প্রতি প্রতিশ্রুতি সহ প্রলয়)
  • The phlogiston theory of chemistry. ( রসায়নের ফ্লোজিস্টন তত্ত্ব)
  • The caloric theory of heat. (তাপের ক্যালরি তত্ত্ব)
  • The vibratory theory of heat. (তাপের কম্পনশীল তত্ত্ব)
  • The vital force theories of physiology. (ফিজিওলজির অত্যাবশ্যক শক্তি তত্ত্ব)
  • The electromagnetic aether. (ইলেক্ট্রোম্যাগনেটিক ইথার) The optical aether. (অপটিক্যাল ইথার
  • The theory of circular inertia. (বৃত্তাকার জড়তা তত্ত্ব)
  • Theories of spontaneous generation. (স্বতঃস্ফূর্ত প্রজন্মের তত্ত্ব)। (( Larry Laudan; Philosophy of Science: Contemporary Readings; Page: 224  ))

বিজ্ঞান পরম সত্য না জানানোর আরো একটি অন্যতম কারণ হলো, প্রত্যেকটি পর্যবেক্ষণের পেছনে একজন পর্যবেক্ষক (মানুষ) থাকে। আবার সিদ্ধান্তও গ্রহণ করে কোনো-না-কোনো মানুষ। মানুষের মধ্যে সীমাবদ্ধতা রয়েছে, স্মৃতি- বিস্মৃতির বিভ্রাট ও স্বেচ্ছাচারিতা, সামাজিক চাপ বা কোনো গোষ্ঠীর প্রভাব রয়েছে। তাই এগুলো সবকিছুই সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়াকে প্রভাবিত করে। এই কারণে সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে অনিচ্ছাকৃত ভুল ও ইচ্ছাকৃত ভুল দুটোই থাকতে পারে। এছাড়াও বিজ্ঞানীদের বড় একটি অংশ বস্তুবাদের হাতে জিম্মি। (( Lars-Göran Johansson; philosophy of Science for Scientists; Page: 70 ))

উপরিউক্ত আলোচনার আলোকে আমরা সহজেই এই সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে পারি যে, বৈজ্ঞানিক তত্ত্ব কখনোই আমাদের চূড়ান্ত বা সুনিশ্চিত জ্ঞান প্রদান করতে পারে না। তত্ত্বগুলো সবসময় পরিবর্তনশীল এবং নতুন তথ্যের আলোকে পুনঃমূল্যায়ন ও সংশোধনযোগ্য। বৈজ্ঞানিক তত্ত্বের এই পরিবর্তনশীল প্রকৃতির মধ্যেই রয়েছে এর শক্তি এবং সৌন্দর্য। আজ যে তত্ত্বটি প্রতিষ্ঠিত ও গ্রহণযোগ্য, কাল তা সম্পূর্ণভাবে মিথ্যা প্রমাণিত হতে পারে। বিজ্ঞান তাই এক নিরন্তর অনুসন্ধানের মাধ্যম। 

চূড়ান্ত সত্য বা পরম সত্য বলে কিছু নেই?

‘বিজ্ঞান কখনো চূড়ান্ত সত্য বা পরম সত্য জানাতে পারে না’–এই দাবি করার পর কিছু নাস্তিক প্রায়শই পালটা যুক্তি দেন, “চূড়ান্ত সত্য বলতে আদৌ কিছু নেই।” কিন্তু যদি কেউ সত্যিই মনে করে যে; চূড়ান্ত সত্য বলতে কিছু নেই, এবং যদি এই দাবিই সত্য হয়, তাহলে সেটি নিজেই চূড়ান্ত সত্যে পরিণত হয়। সুতরাং, চূড়ান্ত সত্য নেই এমন দাবিটি আত্মঘাতী এবং সেলফ-ডিফিটিং। এটি এমনই এক কন্ট্রাডিকটরি বক্তব্য, যেমন কেউ বলে, ‘বাংলা বাক্যে তিন শব্দের চেয়ে বড় কোনো বাক্য নেই,' অথচ ওই বাক্যেই তিন শব্দের বেশি শব্দ রয়েছে।

মনে করুন, আতিক নামের এক ব্যক্তি দাবি করলো যে, “এই দুনিয়াতে চূড়ান্ত সত্য বলতে আসলেই কিছু নেই”।

এই কথা শুনে তার বন্ধু মিছবাহ তাকে জিজ্ঞেস করলো, “আচ্ছা তুমি যে দাবিটি করেছে (এই দুনিয়াতে চূড়ান্ত সত্য বলতে আসলে কিছু নেই) তা কি চূড়ান্তভাবে সত্য নাকি মিথ্যা হওয়ার সম্ভবনা রয়েছে?” 

আসিফ বললো, “হুম, আমার দাবিটি চূড়ান্তভাবে সত্য”।

তখন মিছবাহ বললো, “যদি এটা চূড়ান্তভাবে সত্য হয় তাহলে চূড়ান্ত সত্যের অস্তিত্ব যে আছে তা এই কথা থেকেই প্রমাণ হয়ে গেল। আর যদি তুমি বলো তোমার দাবিটি (চূড়ান্ত সত্য নেই) মিথ্যা হয় তাহলেও চূড়ান্ত সত্য আছে এটাই সত্য!”

নৈতিকতা নির্ধারণ করতে পারে না

ভালো-মন্দ বা নৈতিকতা নির্ধারণ করতে পারে না বিজ্ঞান নৈতিকভাবে নিরপেক্ষ। এখন এর মানে এই নয় যে বিজ্ঞানীদের নৈতিকতা নেই। এর অর্থ হল বিজ্ঞান নৈতিকতার ভিত্তি প্রদান করতে পারে না। ‘স্রষ্টা এবং ব্যক্তিনিরপেক্ষ নৈতিকতা' অধ্যায়ে আমরা এই বিষয়ে আলোচনা করে এসেছি। 

‘কেন ঘটে’? এই প্রশ্নের উত্তর দিতে পারে না

কুয়াশায় আচ্ছাদিত কোনো এক শীতের সকালে, হঠাৎই আপনার দরজায় কড়া নাড়ে এক প্রতিবেশী । দরজা খুলতেই তিনি আপনাকে কিছু ভাপা পিঠা দিয়ে যান । আপনার মনে প্রশ্ন জাগে, তিনি হঠাৎ কেন আপনাকে পিঠাগুলো দিয়ে গেলেন? আপনি পিঠাগুলো নিয়ে নানা পরীক্ষা-নিরীক্ষায় মনোনিবেশ করলেন। পরীক্ষার মাধ্যমে জানতে পারলেন, কত ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপে পিঠাগুলো রান্না হয়েছে, পিঠাগুলোর উপাদান কী কী, কিংবা সেগুলোর ভেতরে কী ধরনের শস্যের মিশ্রণ রয়েছে। আপনি বুঝতে পারলেন পিঠাগুলোর তৈরির প্রক্রিয়া এবং উপাদানের বৈজ্ঞানিক বিশ্লেষণ। কিন্তু এত কিছু জানার পরও, মূল প্রশ্ন—‘কেন আপনার প্রতিবেশী পিঠাগুলো নিয়ে এসেছেন?'-এর উত্তর আপনি পেলেন না। এই প্রশ্নের উত্তর জানার একমাত্র উপায় হলো সরাসরি আপনার প্রতিবেশীকে জিজ্ঞাসা করা। তার অভিপ্রায় ও উদ্দেশ্য ব্যাখ্যা করার জন্য বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি কোনো সাহায্য করতে পারবে না। সুতরাং, বৈজ্ঞানিক পদ্ধতির মাধ্যমে আমরা ‘কি’ এবং ‘কীভাবে’ প্রশ্নের উত্তর দিতে পারি। কিন্তু ‘কেন’ প্রশ্নের উত্তর দিতে পারি না। 

অধিবিদ্যাগত বিষয়ের উত্তর দিতে পারে না

বিজ্ঞান কিছু আধিভৌতিক প্রশ্নের সমাধান করতে পারে যেগুলো এমন যা অভিজ্ঞতামূলকভাবে সমাধান করা যেতে পারে। উদাহরণ স্বরূপ, বিজ্ঞান মহাবিশ্বের সূচনাকে তার ক্ষেত্রের মাধ্যমে সম্বোধন করতে সক্ষম হয়েছে যা কসমোলজি নামে পরিচিত। তবুও, কিছু বৈধ প্রশ্নের উত্তর বৈজ্ঞানিকভাবে দেওয়া যায় না। এর মধ্যে রয়েছে; ডিডাক্টিভ যুক্তিতে উপসংহার কেন পূর্ববর্তী প্রেমিস থেকে অনুসরণ করা আবশ্যক? স্রষ্টার অস্তিত্ব আছে? আত্মার অস্তিত্ব আছে? কেন কিছুই না থেকে কিছু আছে? (Why is there something rather than nothing?), নৈতিকতা বলতে কিছু আছে? বিজ্ঞান এই প্রশ্নগুলির সমাধান করতে পারে না কারণ বিজ্ঞান এমন জিনিসগুলিকে এড়িয়ে যায় যা শারীরিক বা পর্যবেক্ষণযোগ্য জগতের বাইরে। অনিবার্য সত্যকে প্রমাণ করতে পারেনা নিচের যুক্তিটি লক্ষ করুন,

  • P: মানুষ হয় মরণশীল।
  • P: রহিম হয় একজন মানুষ।
  • C: সুতরাং রহিম হয় মরণশীল।

এই যুক্তিটিতে সিদ্ধান্ত আশ্রয় বাক্য থেকে অনিবার্যভাবে নিঃসৃত হয়েছে। তাই এটি একটি বৈধ যুক্তি । এখানে আশ্রয় বাক্যের সাথে যেহেতু সিদ্ধান্তের একটা অনিবার্য সম্পর্ক রয়েছে তাই আশ্রয়বাক্য যদি সত্য হয় তাহলে সিদ্ধান্ত সত্য হতে বাধ্য। আশ্রয়বাক্য ও সিদ্ধান্তের এই সম্পর্ক অভিজ্ঞতামূলক কিছুর উপর ভিত্তি করে আসেনি। বরং, এটা আমাদের চিন্তার জগতের উপর ভিত্তি করে এসেছে। সিদ্ধান্ত কেন আশ্রয় বাক্য থেকে আসবে বা যৌক্তিকভাবে কেন এটাই আসতে হবে তা বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি দিয়ে ব্যাখ্যা করা যায় না। তাই বিজ্ঞান আশ্রয় বাক্য আর সিদ্ধান্তের মধ্যে সিদ্ধান্তের ন্যায্যতা দিতে পারবে না। যুক্তি বস্তু জগতের কোনো বিষয় নয়। বরং, বস্তুজগতের ঊর্ধ্বে।

এছাড়াও, ২+২= ৪ এগুলো অনিবার্য সত্য। এগুলো পর্যবেক্ষণযোগ্য বা বৈজ্ঞানিকভাবে স্বীকৃত কিছু নয়। আমরা যদি বলি, ২টা আপেল + ২টা আপেল সমান কত? তাহলে ফলাফল আসবে ৪টা আপেল। আবার যদি বলি ২টা উল্লাবুল্লা + ২টা উল্লাবুল্লা সমান কত? তাহলেও ফলাফল আসবে ২টা উল্লাবুল্লা। অথচ উল্লাবুল্লা বলতে আসলে কিছুর অস্তিত্ব আছে কিনা তা আমাদের জানা নেই। উল্লাবুল্লা জিনিসটা কি সেটা না বুঝলেও আপনি এদের একটার সাথে আরেকটা যোগ করলে যোগফল দুই-ই হবে।

বিজ্ঞানের বিশ্বাস

বিজ্ঞান পূজারি ও নাস্তিকরা প্রায়ই বলে থাকে যে, “বিজ্ঞানে বিশ্বাসের কোনো স্থান নেই,” এবং তারা যুক্তি দেয় যে ধর্মের ভিত্তি যেহেতু বিশ্বাস, তাই বিজ্ঞান ধর্মের চেয়ে বেশি নির্ভরযোগ্য। কিন্তু তারা উপলব্ধি করতে ব্যর্থ হয় যে, বিজ্ঞানের ভিত্তি নিজেও মূলত বিশ্বাসের উপর প্রতিষ্ঠিত। আমরা আগেই দেখেছি যে বিজ্ঞান যুক্তি, পর্যবেক্ষণ এবং ইন্ডাক্টিভ অনুমানের মাধ্যমে সিদ্ধান্তে পৌঁছায়। তবে এই সিদ্ধান্তগুলোর সঠিকতা নির্ভর করে একাধিক পূর্বানুমানের (assumptions) উপর, যেগুলোকে বিজ্ঞানীরা কোনো প্রশ্ন ছাড়াই সত্য বলে বিশ্বাস করে নেন। নাস্তিক বিজ্ঞান দার্শনিক গ্লেন বরচার্ড 'The Ten Assumptions of Science Towards a New Scinetific Worldview' গ্রন্থে ১০টি বৈজ্ঞানিক অনুমান নিয়ে আলোচনা করেন যেগুলো বিজ্ঞান চোখ বন্ধ করে মেনে নেয় প্রমাণ ছাড়াই। অনুমানগুলো হলো, MATERIALISM, CAUSALITY, UNCERTAINTY, INSEPARABILITY, CONSERVATION, COMPLEMENTARITY, IRREVERSIBILITY, INFINITY, RELATIVISM, INTERCONNECTION. (( Glenn Borchardt; The ten assumptions of science: Toward a new scientific worldview. ))

আইনস্টাইন এর মতে,

মহাবিশ্বের যে আসলেই অস্তিত্ব আছে, এমন বিশ্বাস সকল প্রাকৃতিক বিজ্ঞানের ভিত্তি। (( Glenn Borchardt; The ten assumptions of science: Toward a new scientific worldview; Chapter;1  ))

বিজ্ঞান লেখিকা মারগারেট ভার্থেইম এর মতে,

আমরা সবাই কিছু-না-কিছু বিশ্বাস করি এবং বিজ্ঞান নিজেও কিন্তু একগাদা বিশ্বাসের উপর দাঁড়িয়ে আছে। (( ডা.রাফান আহমেদ; অবিশ্বাসী কাঠগড়ায়; পৃঃ ৩৪ ))

স্কেপটিক ম্যাগাজিনের প্রতিষ্ঠাতা প্রকাশক, ডঃ মাইকেল শেরমার (নাস্তিক) তার ব্যক্তিগত ওয়েবসাইটে ‘What I Believe But Cannot Prove' শিরোনামের লিখাতে বলেন,

আমি বিশ্বাস করি কিন্তু প্রমাণ করতে পারি না যে বাস্তবতা বিদ্যমান এবং বিজ্ঞান এটি বোঝার সর্বোত্তম পদ্ধতি; কোন ঈশ্বও নেই; মহাবিশ্ব নির্ধারিত কিন্তু আমরা স্বাধীন; নৈতিকতা মানুষ এবং মানব সম্প্রদায়ের একটি অভিযোজিত বৈশিষ্ট্য হিসাবে বিকশিত হয়েছে; এবং শেষ পর্যন্ত সমস্ত অস্তিত্ব বিজ্ঞানের মাধ্যমে ব্যাখ্যাযোগ্য। (( What I Believe But Cannot Prove » Michael Shermer ))

দার্শনিক, আর.জি. কলিংউড এর মতে,

বিজ্ঞান অনুমানের উপর ভিত্তি করে । এটা বলার সমতুল্য যে বিজ্ঞান ‘তথ্য’ এর পরিবর্তে ‘বিশ্বাসের’ উপর ভিত্তি করে। (( Glenn Borchardt; The ten assumptions of science: Toward a new scientific worldview; Page: 119 ))

ব্রিটিশ জনপ্রিয় বিজ্ঞান লেখক জিম ব্যাগট এর মতে, অধিবিদ্যা ছাড়া একটি বৈজ্ঞানিক তত্ত্ব তৈরি করা অসম্ভব বলে প্রমাণিত হয়। প্রথমে কিছু জিনিস অনুমান না করে আমরা আসলে প্রমাণ করতে পারি না। যেমন একটি বস্তুনিষ্ঠ বাস্তবতার অস্তিত্ব এবং আমরা বিশ্বাস করি অদৃশ্য সত্তা এতে বিদ্যমান। (( Post-empirical science is an oxymoron, and it is dangerous | Aeon Essays )) ব্রিটিশ জীববিজ্ঞানী, এবং প্যারাসাইকোলজি গবেষক, এবং লেখক রুপার্ট শেলড্রেক, বিজ্ঞানীরা বিশ্বাস করেন এমন ১০টি মূল বিশ্বাসের তালিকা দিয়েছে। তালিকাটি নিন্মরুপ;

  • সবকিছুই যান্ত্ৰিক । এমনকি মানুষও মেশিন।
  • সমস্ত বস্তু অচেতন। এর কোনো অভ্যন্তরীণ জীবন বা বিষয়গততা বা দৃষ্টিভঙ্গি নেই। এমনকি মানুষের চেতনাও মস্তিষ্কের বস্তুগত কার্যকলাপ দ্বারা উৎপাদিত একটি বিভ্রম ।
  • পদার্থ এবং শক্তির মোট পরিমাণ সবসময় একই থাকে (বিগ ব্যাং বাদে, তখন মহাবিশ্বের সমস্ত পদার্থ এবং শক্তি আকস্মিক উদ্ভব হয়েছিল)।
  • প্রকৃতির নিয়ম স্থির । তারা শুরুতে যেমন ছিল আজও তেমনি আছে এবং চিরকাল একই থাকবে ।
  • প্রকৃতি উদ্দেশ্যহীন, এবং বিবর্তনের কোনো লক্ষ্য বা দিক নেই ।
  • সমস্ত জৈবিক উত্তরাধিকার বস্তুগত, জেনেটিক উপাদান, ডিএনএ এবং অন্যান্য উপাদান কাঠামোতে বহন করা হয় ।
  • মন মাথার ভিতরে থাকে এবং মস্তিষ্কের কার্যকলাপ ছাড়া কিছুই নয়। আপনি যখন একটি গাছের দিকে তাকান, তখন আপনি যে গাছটির প্রতিচ্ছবি দেখছেন সেটি বাইরে নয়, মনে হয় আপনার মস্তিষ্কের ভিতরে।
  • স্মৃতি মস্তিষ্কে বস্তুগত চিহ্ন হিসেবে সংরক্ষণ করা হয় এবং মৃত্যুর সময় মুছে ফেলা হয়।
  • টেলিপ্যাথির মত অব্যক্ত ঘটনাগুলি অলীক।
  • যান্ত্রিক ওষুধই একমাত্র প্রকার যা সত্যিই কাজ করে। (( Setting Science Free from Materialism ))

উপসংহার

বিজ্ঞান মানবসভ্যতার অন্যতম শ্রেষ্ঠ অর্জন। প্রকৃতিকে বোঝা, রোগের চিকিৎসা, প্রযুক্তির উন্নয়ন এবং মানুষের জীবনকে সহজ ও সমৃদ্ধ করার ক্ষেত্রে বিজ্ঞানের অবদান অনস্বীকার্য। তাই বিজ্ঞানের গুরুত্ব অস্বীকার করার কোনো সুযোগ নেই। কিন্তু বিজ্ঞানের এই অসাধারণ সাফল্যকে ভিত্তি করে যদি একে সকল জ্ঞানের একমাত্র উৎস কিংবা পরম সত্যের চূড়ান্ত মানদণ্ড হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা হয়, তাহলে সেটি আর বিজ্ঞান থাকে না, বরং বিজ্ঞানবাদে পরিণত হয়।

এই অধ্যায়ে আমরা দেখেছি যে বৈজ্ঞানিক জ্ঞান মূলত পর্যবেক্ষণ, পরীক্ষা এবং ইন্ডাক্টিভ অনুমানের উপর নির্ভরশীল। নতুন তথ্য ও নতুন পর্যবেক্ষণের আলোকে বৈজ্ঞানিক তত্ত্ব পরিবর্তিত হতে পারে, সংশোধিত হতে পারে, এমনকি সম্পূর্ণ বাতিলও হয়ে যেতে পারে। এ কারণেই বিজ্ঞান নিজেকে সর্বদা সংশোধনের জন্য উন্মুক্ত রাখে। এই পরিবর্তনশীলতাই বিজ্ঞানের শক্তি, কিন্তু একই সঙ্গে এটিই প্রমাণ করে যে বৈজ্ঞানিক তত্ত্বকে পরম সত্য হিসেবে গ্রহণ করা যৌক্তিক নয়।

আমরা আরও দেখেছি যে বিজ্ঞান তার নিজস্ব ক্ষেত্রের মধ্যেই সীমাবদ্ধ। এটি ভৌত জগতের ঘটনাকে ব্যাখ্যা করতে সক্ষম হলেও নৈতিকতা, অধিবিদ্যা, যুক্তির মৌলিক ভিত্তি, চূড়ান্ত কারণ কিংবা অস্তিত্বের গভীর প্রশ্নগুলোর সমাধান করার জন্য নির্মিত নয়। তাই এসব বিষয়ে বিজ্ঞানের নীরবতাকে অস্বীকারের প্রমাণ হিসেবে উপস্থাপন করা একটি যৌক্তিক ভ্রান্তি।

সুতরাং একজন বুদ্ধিবৃত্তিকভাবে সৎ মানুষের উচিত বিজ্ঞানের যথার্থ মর্যাদা স্বীকার করা, কিন্তু তার সীমাবদ্ধতাও সমানভাবে উপলব্ধি করা। বিজ্ঞানকে তার নিজস্ব পরিসরে মূল্যায়ন করতে হবে এবং এমন প্রশ্নের উত্তর তার কাছে প্রত্যাশা করা উচিত নয়, যেগুলো তার অনুসন্ধানের আওতার বাইরে। জ্ঞান অর্জনের ক্ষেত্রে বিজ্ঞান একটি গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম, কিন্তু একমাত্র মাধ্যম নয়। সত্যের অনুসন্ধান আরও বিস্তৃত, যেখানে দর্শন, যুক্তি, অধিবিদ্যা এবং অন্যান্য জ্ঞানশাখাও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। তাই বিজ্ঞানকে সম্মান করার অর্থ বিজ্ঞানবাদকে গ্রহণ করা নয়, বরং বিজ্ঞানের প্রকৃতি, ক্ষমতা এবং সীমাবদ্ধতা সম্পর্কে সঠিক উপলব্ধি অর্জন করাই প্রকৃত বুদ্ধিবৃত্তিক সততার পরিচয়।

Leave a Comment