বনু মুস্তালিক যুদ্ধ: অতর্কিত আক্রমণ নাকি প্রতিরোধমূলক পদক্ষেপ?

বনু মুস্তালিক যুদ্ধ: অতর্কিত আক্রমণ নাকি প্রতিরোধমূলক পদক্ষেপ?

বনু মুস্তালিক যুদ্ধ: অতর্কিত আক্রমণ নাকি প্রতিরোধমূলক পদক্ষেপ?

অমুসলিমদের একটি বহুল প্রচলিত দাবি হলো—বনু মুস্তালিক যুদ্ধে রাসুলুল্লাহ ﷺ নাকি কোনো পূর্ব সতর্কতা ছাড়াই বনু মুস্তালিক গোত্রের উপর অতর্কিত আক্রমণ চালিয়েছিলেন। তারা এখান থেকে এই সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে চায় যে ইসলাম নাকি অমুসলিমদের উপর হঠাৎ আক্রমণ করাকে বৈধ মনে করে। কিন্তু নির্ভরযোগ্য সিরাতগ্রন্থ আর-রাহীকুল মাখতূম–এর বর্ণনা এই দাবিকে সম্পূর্ণভাবে খণ্ডন করে।

শুরুতে আমরা জানব অমুসলিমদের অভিযোগের উৎস। রাহিকুল মাখতুমে বনু মুস্তালিক যুদ্ধের ঘটনা প্রসঙ্গে আল্লামা ইবনুল কাইয়েমের একটি মত অনুযায়ী বলা হয়েছে,

বনু মুসত্বালাকের সঙ্গে মুসলিমগণের কোন যুদ্ধ সংঘটিত হয় নি। বরং মুসলিম বাহিনী ঝর্ণার ধারে বনু মুসতালাকের উপর আকস্মিক আক্রমণ পরিচালনা করে মহিলা ও শিশুদের আটক করেন এবং সম্পদ ও চতুষ্পদ জন্তুগুলোকে নিজেদের অধিকারে নিয়ে আসেন। সহীহ হাদীসে বর্ণিত আছে যে, রাসূলে কারীম ( তাঁর বাহিনীসহ যখন আকস্মিক আক্রমণ পরিচালনা করেন, তখনও বনু মুসত্বালাক অসতর্ক অবস্থায় ছিল।  (( আর রাহীকুল  মাখতুম; পৃষ্টাঃ ৩৭১; তাওহীদ প্রকাশনি ))

এই বর্ণার উপর ভিত্তি করেই অমুসলিমগণ দাবি করেন রাসুলুল্লাহ ﷺ কোনো পূর্ব সতর্কতা ছাড়াই বনু মুস্তালিক গোত্রের উপর আকস্মিকভাবে বা অতর্কিত আক্রমণ পরিচালনা করেছিলেন। আর এই আকস্মিক আক্রমণকেই তারা অমানবিক দাবি করেন। কিন্তু রাসুলুল্লাহ ﷺ কী আসলেই বনু মুস্তিলিক গোত্রের উপর অতর্কিত আক্রমণ পরিচালনা করেছিলেন? নাকি এই আক্রমণ ছিলো মূলত প্রতিরোধ ব্যবস্থা?

পাঠক এখানে একটি বিষয় লক্ষ্য করুন: নাস্তিকরা যে অভিযোগটি উত্থাপন করেন, তার উৎস আর রাহীকুল মাখতুমের ৩৭২ নং পৃষ্ঠা। অথচ ৩৭১ নং পৃষ্ঠাতেই উল্লেখ রয়েছে যে রাসুলুল্লাহ ﷺ আগেই নির্ভরযোগ্য সূত্র থেকে জানতে পেয়েছিলেন যে বনু মুস্তালিক গোত্র মুসলিমদের বিরুদ্ধে যুদ্ধের প্রস্তুতি নিচ্ছে। তারা শুধু প্রস্তুতিই নিচ্ছিল না; বরং আশপাশের গোত্রগুলোকে একত্রিত করার চেষ্টা করছিল এবং মুসলিমদের উপর আক্রমণের পরিকল্পনা করছিল। এই সংবাদটি রাসুল ﷺ–এর কাছে পৌঁছায়, এবং তিনি সরাসরি সত্যতা যাচাইয়ের জন্য একজন গোয়েন্দা প্রেরণ করেন। সেই গোয়েন্দা বনু মুস্তালিকদের মধ্যে গিয়ে অবস্থান করে তাদের কার্যকলাপ পর্যবেক্ষণ করেন এবং ফিরে এসে নিশ্চিত করেন যে তারা বাস্তবেই মুসলিমদের বিরুদ্ধে আক্রমণের প্রস্তুতি নিচ্ছে। অর্থাৎ, এখানে কোনো অনুমান, গুজব বা ভিত্তিহীন সন্দেহের উপর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়নি; বরং যাচাই–বাছাইয়ের পরই পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। (( আর রাহীকুল মাখতুম পৃষ্ঠা নংঃ ৩৭২; তাওহীদ প্রকাশন ))

এই পরিস্থিতিতে রাসুলুল্লাহ ﷺ যদি চুপ করে বসে থাকতেন, তাহলে মুসলিম সমাজ মারাত্মক ঝুঁকির মুখে পড়ত। কারণ, শত্রু যখন আক্রমণের জন্য সম্পূর্ণ প্রস্তুত, তখন নিরুপায়ভাবে অপেক্ষা করা আত্মঘাতী সিদ্ধান্ত ছাড়া কিছু নয়। তাই রাসুল ﷺ প্রতিরোধমূলক কৌশল হিসেবে আগে থেকেই অগ্রসর হন, যাতে শত্রুর পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হওয়ার আগেই তা নিষ্ক্রিয় করা যায়। এ কারণে একে কোনোভাবেই “অনৈতিক অতর্কিত আক্রমণ” বলা যায় না। বরং এটি ছিল একটি স্পষ্ট প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা । কাজেই, “অতর্কিত আক্রমণ” বলে একে উপস্থাপন করা ইতিহাসের সাথে বিশ্বাসঘাতকতা এবং সিরাতের সুস্পষ্ট বর্ণনাকে ইচ্ছাকৃতভাবে উপেক্ষা করার নামান্তর।

Leave a Comment