নাস্তিক্যবাদ পরিচিতিঃ ধারণা, উৎপত্তি এবং একটি সমালোচনামূলক বিশ্লেষণ

নাস্তিক্যবাদ পরিচিতিঃ ধারণা, উৎপত্তি এবং একটি সমালোচনামূলক বিশ্লেষণ

নাস্তিক্যবাদ পরিচিতিঃ ধারণা, উৎপত্তি এবং একটি সমালোচনামূলক বিশ্লেষণ

সাধারণত যে মতবাদ স্রষ্টার অস্তিত্বে বিশ্বাস করে না তাকে নাস্তিক্যবাদ বলে। এই মতবাদ অনুসারে জড় জগৎ হচ্ছে একমাত্র জগৎ, আর এই জগতের আড়ালে কোনো স্রষ্টা বা আধ্যাত্মিক শক্তির অস্তিত্ব নেই। আমাদের এই মহাবিশ্ব কেবল জড় ও জড় শক্তির খেলা। এই জগতের কোনো উদ্দেশ্য নেই। যান্ত্রিকভাবেই এই জগৎ চলমান। সুতরাং, এই জগৎ পরিচালনায় কোনো উদ্দেশ্য বা অতিপ্রাকৃতিক সত্তার প্রয়োজন নেই।  “নাস্তিক” শব্দটি সংস্কৃত ভাষা থেকে এসেছে। এটি দুটি অংশে গঠিত। যেমন, “না” অর্থাৎ ‘অস্বীকার’ বা ‘নয়’, এবং “অস্তিক” অর্থাৎ ‘যে বিশ্বাস করে’। সুতরাং নাস্তিক শব্দের আক্ষরিক অর্থ হলো যে ঈশ্বর, আত্মা বা ধর্মীয় শাস্ত্রের কর্তৃত্বে বিশ্বাস করে না। তবে ভারতীয় দর্শনে “নাস্তিক” শব্দের অর্থ কেবল ঈশ্বরে অবিশ্বাসী নয়, বরং যিনি বেদ বা শাস্ত্রকে জ্ঞানের উৎস হিসেবে গ্রহণ করেন না তাকেও নাস্তিক বলা হয়। সেই অর্থে চার্বাক, বৌদ্ধ ও জৈন দর্শনকে নাস্তিক দর্শন বলা হয়, কারণ তারা বেদের কর্তৃত্ব অস্বীকার করেছে। অপরদিকে ন্যায়, বৈশেষিক, সাংখ্য, যোগ, মীমাংসা ও বেদান্ত এই ছয় দর্শনকে অস্তিক দর্শন বলা হয়, যেহেতু তারা বেদকে স্বীকার করে। তবে আধুনিক ব্যবহারে “নাস্তিক” বলতে সাধারণভাবে বোঝানো হয় এমন একজন ব্যক্তিকে, যিনি ঈশ্বর বা কোনো অতিপ্রাকৃত শক্তির অস্তিত্বে বিশ্বাস করেন না। Stanford Encyclopedia of Philosophy এর মতে, নাস্তিকতা হল একটি মনস্তাত্ত্বিক অবস্থা, বিশেষত একজন নাস্তিক হওয়ার অবস্থা হলো, যেখানে একজন নাস্তিককে এমন একজন হিসেবে সংজ্ঞায়িত করা হয়, যে আস্তিক নয় (একজন আস্তিককে এমন একজন হিসেবে সংজ্ঞায়িত করা হয় যে বিশ্বাস করে যে ঈশ্বরের অস্তিত্ব রয়েছে) এটা নিম্নলিখিত এই সংজ্ঞা তৈরি করে, নাস্তিকতা হল ঈশ্বরের অস্তিত্ব আছে এমন বিশ্বাসের অভাবের মানসিক অবস্থা। (( Atheism and Agnosticism (Stanford Encyclopedia of Philosophy) )) Merriam Webster dictionary এর মতে, নাস্তিকতা হলো বিশ্বাসের অভাব বা দেবতা বা কোনো দেবতার অস্তিত্বে দৃঢ় অবিশ্বাস/স্রষ্টা বা দেবতারদের প্রতি বিশ্বাসের অভাব অথবা দৃঢ় অবিশ্বাস। (( Atheism Definition & Meaning - Merriam-Webster )) Cambridge dictionary মতে, নাস্তিকতা হচ্ছে স্রষ্টা বা দেবতার প্রতি অবিশ্বাসের ঘটনা, বা কোনো স্রষ্টা বা দেবতা নেই এমন বিশ্বাস। ((  ATHEISM | meaning, definition in Cambridge English Dictionary )) মোনাস ইউনিভার্সিটির দর্শনের অধ্যাপক ও অস্ট্রেলিয়ান অ্যাসোসিয়েশন অফ ফিলোসফির সিইও গ্রাহাম ওপি তার লিখিত ‘ATHEISM AND AGNOSTICISM’ বইতে নাস্তিকতার সংজ্ঞা দিতে গিয়ে লিখেছেন,
যে বৈশিষ্ট্যগুলি মানুষকে নাস্তিক এবং আজ্ঞেয়বাদী করে তোলে - তাদের (নাস্তিকদের) কোনো স্রষ্টা নেই এমন দাবির প্রতি মনোভাব। নাস্তিকরা বিশ্বাস করে তাদের কোনো স্রষ্টা নেই। তাই উপযুক্ত পরিস্থিতিতে নাস্তিকরা নিশ্চিত করে যে তাদের কোনো স্রষ্টা নেই। (( Graham Oppy; ATHEISM AND AGNOSTICISM; Page; 4-5 (Cambridge University Press) ))
বিখ্যাত নাস্তিক দার্শনিক রিচার্ড ডকিন্স তার লিখিত ‘The God Delusion’ গ্রন্থে দার্শনিক প্রকৃতিবাদ সম্পর্কে বলেন,
দার্শনিক প্রকৃতিবাদ অর্থে নাস্তিক হলো এমন কেউ, যে বিশ্বাস করে প্রকৃতি, ভৌত জগৎ, পর্যবেক্ষণযোগ্য মহাবিশ্বের পিছনে কোনো অতিপ্রাকৃতিক সৃজনশীল বুদ্ধিমান সত্তা লুকিয়ে নেই যিনি চুপিসারে অবস্থান করছেন। কোনো আত্মা নেই যেটা শরীর থেকে বেরিয়ে যায়, নেই কোনো অলৌকিক কিছু। আছে কেবল জাগতিক ঘটনাবলি, যা আমরা এখনো বুঝতে পারিনি। (( Richard Dawkins; The God Delusion; P-14 ))
উপরিউক্ত সংজ্ঞাগুলো থেকে আমরা এই সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে পারি যে, নাস্তিকতার মানে কোনো অতিপ্রাকৃতিক সত্তা বা সৃষ্টিকর্তায় অবিশ্বাস করা অথবা অস্বীকার করা। সৃষ্টিকর্তায় অবিশ্বাস বা অস্বীকার করার পক্ষে কি সুস্পষ্ট কোন যুক্তি প্রমাণ নাস্তিকদের নিকট আছে? তারা কি অন্ধভাবে এই দাবিটি মেনে নিয়েছে যে, স্রষ্টা বা অতিপ্রাকৃতিক কোনো সত্তার অস্তিত্ব নেই? নাকি যুক্তি প্রমাণের উপর ভিত্তি করেই তারা স্রষ্টার অস্তিত্ব নাকোচ করে? নাস্তিকদের উচিত তাদের দাবির স্বপক্ষে সুস্পষ্ট যুক্তি-প্রমাণ উপস্থাপন করা। আর তারা যদি বলে, স্রষ্টার অস্তিত্বের পক্ষে আস্তিকরা যে ধরনের যুক্তি উপস্থাপন করে তা তাদের নিকট বোধগম্য নয়, অথবা আস্তিকরা স্রষ্টার অস্তিত্বের কোন প্রমাণ দিতে পারেনি বিধায় স্রষ্টার অস্তিত্বকে অস্বীকার বা অবিশ্বাস করে, তাহলে ব্যাপারটিকে আর নাস্তিক্যবাদের মধ্যে ফেলা যায় না! ব্যাপারটা তখন ‘স্রষ্টার অস্তিত্ব নিয়ে সংশয় আছে’ এমন একটি অবস্থান হবে। কারণ, সঠিক যুক্তি প্রমাণ তাদের সামনে উপস্থাপন করতে পারলে তারা সৃষ্টিকর্তা বা অতিপ্রাকৃতিক কোন সত্তার অস্তিত্বে বিশ্বাস করতেও পারে। কেউ কোন কিছু সত্য প্রমাণ করতে পারেনি বলে তার ‘অস্তিত্ব নেই’ অথবা, কেউ কোন কিছু ভুল প্রমাণ করতে পারেনি বলে তার ‘অস্তিত্ব আছে’ এ ধরনের বিশ্বাস মূলত এক ধরণের যৌক্তিক ভ্রান্তি। যুক্তিবিদ্যার ভাষায় যাকে বলে Argument from ignorance. এই যৌক্তিক ভ্রান্তি তখনই ঘটে যখন একটি প্রস্তাবকে সত্য বলে মেনে নেওয়া হয় কারণ এটি এখনও মিথ্যা প্রমাণিত হয়নি বা একটি প্রস্তাবকে মিথ্যা বলে মেনে নেওয়া হয় কারণ এটি এখনও সত্য বলে প্রমাণিত হয়নি। উদাহরণস্বরূপ, ‘ক’ মিথ্যা। কারণ এর সত্যতার পক্ষে কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি। আবার ‘ক’ সত্য। কারণ একে মিথ্যা প্রমাণ করা যায়নি। আস্তিক এবং নাস্তিক উভয় এই কুযুক্তিটি করতে পারে। অর্থাৎ, কোনো আস্তিক যদি দাবি করে যেহেতু নাস্তিকরা প্রমাণ করতে পারে নি যে, ‘স্রষ্টার অস্তিত্ব নেই’ তাই স্রষ্টার অস্তিত্ব আছে। আবার কোনো নাস্তিক যদি দাবি করে, যেহেতু আস্তিকরা ‘স্রষ্টার অস্তিত্ব আছে’ তা প্রমাণ করতে পারেনি তাই স্রষ্টার অস্তিত্ব নেই। সুতরাং, আস্তিকরা স্রষ্টার অস্তিত্বের পক্ষে কোন ভালো যুক্তি-প্রমাণ উপস্থাপন করতে পারেনি অথবা কোন যুক্তি-প্রমাণই উপস্থাপন করতে পারেনি বিধায় যদি মেনে নেওয়া হয়, অতিপ্রাকৃতিক সত্তা বা স্রষ্টার অস্তিত্ব নেই, তাহলে তা অজ্ঞতামূলক ভ্রান্তি বলে বিবেচিত হবে। আর যদি নাস্তিকরা কোন প্রকার যুক্তি-প্রমাণ ছাড়াই শুধু মাত্র নিজের খেয়ালখুশির কারণে এহেন বিশ্বাস লালন করে যে, অতিপ্রাকৃতিক সত্তা বা সৃষ্টিকর্তা বলতে কিছু নেই, তাহলে তা অন্ধবিশ্বাসের মতোই একটি ব্যাপার। কিছু নাস্তিক হয়ত বলতে পারে আমরা ‘প্রমাণের অভাবে স্রষ্টার অস্তিত্ব অবিশ্বাস করি’। যেহেতু স্রষ্টার অস্তিত্বের পক্ষে দাবি আস্তিকরা করে সেহেতু স্রষ্টা যে আছে তা প্রমাণ করার দায়িত্ব (Burden of proof) আস্তিকের উপর। প্রমাণের বোঝা কার উপর তা নিয়ে ‘আল্লাহর অস্তিত্ব প্রমাণের বোঝা কার উপর?  - Insight Zone’ লিখাতে বিস্তারিত আলোচনা করা হয়েছে। ‘প্রমাণের অভাবে অবিশ্বাস’ এই বিষয়ের উপর ফোকাস দেওয়া যাক। অবিশ্বাস মানে, কোন প্রস্তাবকে সত্য বা বাস্তব হিসেবে গ্রহণ করতে অস্বীকৃতি। তার মানে ‘প্রমাণের অভাবে অবিশ্বাস’ এই দাবিটিতে একজন নাস্তিক স্রষ্টার অস্তিত্বের পক্ষের দাবিকে অস্বীকার বা প্রত্যাখ্যান করে কেবল মাত্র প্রমাণের অভাবে। কিন্তু কোনো কিছুর অস্তিত্ব আমাদের প্রমাণ পাওয়ার উপর নির্ভরশীল নয়। যা কিছু অস্তিত্বশীল, তার স্বপক্ষে আমরা প্রমাণ না পেলেও তা অস্তিত্বশীলই থাকবে। বিষয়টি এমন নয় যে আমরা প্রমাণ পেলাম তার অমনি করে কোন কিছু অস্তিত্বে চলে এসেছে। আমরা কোন কিছুর প্রমাণ পাওয়ার জন্য হলেও প্রমাণিত হওয়ার আগেই তাকে অস্তিত্বশীল হতে হবে। কাজেই,প্রমাণের অভাবে কোন কিছুর অস্তিত্ব প্রত্যাখ্যান করা অজ্ঞতা ভ্রান্তি যুক্তির শামিল। এছাড়া, ‘প্রমাণের অভাবে অবিশ্বাস বা অস্বীকার’ কথাটির মানে হচ্ছে, প্রমাণ পাওয়ার সম্ভাব্য সকল অবস্থা সম্পর্কে তারা জেনেই এহেন সিদ্ধান্ত নিয়েছে। কিন্তু যেখানে আমরা মহাবিশ্বের মাত্র ৪/৫ শতাংশ বিষয় সম্পর্কে জানতে পারবো সেখানে স্রষ্টার অস্তিত্ব থাকার পক্ষে সম্ভাব্য সকল প্রমাণের চুলচেরা বিশ্লেষণ করে স্রষ্টার অস্তিত্ব প্রত্যাখ্যান করা অসম্ভব একটি ব্যাপার। যখন কেউ প্রমাণের অভাবের কারণে অবিশ্বাস বা অস্বীকার প্রকাশ করে তখন সে দাবি করে যে, ‘প্রমাণের অভাব রয়েছে’। উদাহরণস্বরূপ, যদি কেউ দাবি করে যে তাদের একটি পোষা বিড়াল আছে কিন্তু এই দাবিকে সমর্থন করার জন্য কোনো প্রমাণ তারা প্রদান করেনি। তাই আপনি উত্তর দিয়েছেন যে, “প্রমাণের অভাবে আমি আপনার দাবিকে (তাদের একটি পোষা বিড়াল আছে) অবিশ্বাস করি”। এখানে আপনি দাবি করছেন যে পোষা বিড়ালের অস্তিত্বের ‘প্রমাণের অপ্রতুলতা বা অভাব’ রয়েছে। আর ‘প্রমাণের অপ্রতুলতা’ মানে প্রমাণ পাওয়ার সকল সম্ভাব্য অবস্থা সম্পর্কে আপনি জেনেই নিশ্চিত হয়েছেন যে ‘প্রমাণের অপ্রতুলতা’ আছে। তাই আপনার উচিত কোন কোন সম্ভাব্য প্রমাণের চুলচেরা বিশ্লেষণ করে আপনি এহেন সিদ্ধান্তে উপনীত হয়েছেন যে পোষা বিড়াল নেই, তা ব্যাখ্যা করা। একইভাবে, নাস্তিকরা যখন বলে ‘আমরা প্রমাণের অভাবে স্রষ্টার অস্তিত্বকে অস্বীকার করি’ তখন তাদের উচিত সম্ভাব্য কোন কোন প্রমাণের চুলচেরা বিশ্লেষণ করে স্রষ্টার অস্তিত্ব অস্বীকার বা অবিশ্বাস করে তা ব্যাখ্যা করা। উদাহরণস্বরূপ, নাদরুন নামের এক ভদ্রলোক বললো, “স্রষ্টার অস্তিত্বের পক্ষে যে যুক্তি আস্তিকরা প্রধান করে তা আমার কাছে বোধগম্য মনে হচ্ছে না”। এর মানে আপনি যদি মিস্টার নাদরুনকে সষ্ট্রার অস্তিত্বের পক্ষে ভালো কোন যুক্তি প্রদান করতে পারেন তাহলে সে আপনার যুক্তি মেনেও নিতে পারে। এখানে মিস্টার নাদরুন স্রষ্টা আছে নাকি নেই এই বিষয়ে কোনও নিশ্চিত অবস্থান গ্রহণ করেনি। তাই আমরা মিস্টার নাদরুনকে নাস্তিক বলতে পারি না। তার ব্যাপারটি সংশয়ের সাথে যায়। অন্যদিকে, এলেক্স নামের এক ভদ্রলোক বললেন, “স্রষ্টার অস্তিত্বের পক্ষে আস্তিকরা যে দাবি করে তা আমি অস্বীকার করলাম কারণ স্রষ্টার অস্তিত্বের পক্ষে আমি কোন প্রমাণ খুঁজে পাইনি”। অস্বীকার করার পর মিস্টার এলেক্সের অবস্থান কি? সে কি মনে করে যে যদি তাকে আরো ভালো কোন যুক্তি-প্রমাণ দেওয়া হয় তাহলে সে স্রষ্টার অস্তিত্বে বিশ্বাস করবে? নাকি তার অবস্থান হলো, স্রষ্টার অস্তিত্বের প্রমাণগুলো আমি অস্বীকার করলাম এবং এই ব্যাপারে নিশ্চিত যে স্রষ্টা বা অতিপ্রাকৃতিক সত্তা বলতে আদতে কিছু নেই? মিস্টার এলেক্সের অবস্থান যদি ২নং হয় তবেই তার অবস্থানটি নাস্তিকতার সাথে যায়। এক্ষেত্রে তাকে অবশ্যই প্রমাণ করতে হবে, কোন যুক্তি-প্রমাণের উপর ভিত্তি করে সে এহেন সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছে যে, ‘অতিপ্রাকৃতিক সত্তা বলতে আদতে কিছু নেই’। কোন কোন সম্ভাব্য প্রমাণের চুলচেরা বিশ্লেষণ করে সে এহেন সিদ্ধান্ত নিয়েছে যে, ‘স্রষ্টার অস্তিত্বের পক্ষে প্রমাণের অভাব রয়েছে’? একজন যৌক্তিক মানুষ মাত্রই মিস্টার এলেক্সের কাছে জানতে চাওয়া উচিত স্রষ্টার অস্তিত্ব অস্বীকার করার পক্ষে কি প্রমাণ তার কাছে রয়েছে! যদি তার কাছে কোন যুক্তি প্রমাণ থাকে তাহলে তা শুনা উচিত এবং তার দেওয়া যুক্তিতে যদি কোন ত্রুটিবিচ্যুতি থাকে তাহলে তাকে সে বিষয়ে অবগত করা প্রয়োজন এবং স্রষ্টার অস্তিত্বের যুক্তিগুলো তার কাছে মেলে ধরতে হবে। আগেই বলেছি যে, আস্তিকরা স্রষ্টার অস্তিত্বের পক্ষে প্রমাণাদি উপস্থাপন করার পর নাস্তিক যদি উপস্থাপিত প্রমাণগুলোকে বৈধ বা যুক্তিযুক্ত মনে না হওয়ার কারণে প্রত্যাখ্যান করে, তাহলে ব্যাপারটি আর নাস্তিক্যবাদের মধ্যে থাকেনা। ‘স্রষ্টার অস্তিত্ব নিয়ে সংশয় আছে’ ব্যাপারটি এমন  এমন একটি অবস্থান বলে বিবেচিত হবে। কেননা, উপস্থাপিত প্রমাণ যদি বৈধ বা যুক্তিযুক্ত হতো বা তার সামনে যদি যুক্তিযুক্ত প্রমাণ উপস্থাপন করা হয় তাহলে সে মেনে নিতো যে, স্রষ্টার অস্তিত্ব আছে। সুতরাং, নাস্তিক হওয়ার মানে, স্রষ্টার অস্তিত্বকে অস্বীকার করা। কিছু নাস্তিক, নাস্তিক্যবাদকে জাস্টিফাই করতে এমন যুক্তিও দিয়ে থাকে যে, আমরা স্রষ্টাকে স্বচক্ষে দেখিনি। তাই আমরা স্রষ্টার অস্তিত্বে বিশ্বাস করিনা। কিন্তু আমি কিছু দেখিনি বলে তার অস্তিত্ব নেই, এই দাবিটিও মূলত অজ্ঞতামূলক ভ্রান্তি। এই ভ্রান্তি নিয়ে ইতোমধ্যেই আমরা বিস্তর আলোচনা করেছি। এছাড়াও, আমাদের দেখার উপরে কোন কিছুর অস্তিত্ব নির্ভর করে না, এবং আমাদের সমস্ত জ্ঞান কেবল মাত্র দেখার উপর ভিত্তি করে হয় না। উদাহরণস্বরূপ, আপনি বিশ্বাস করেন যে, ‘আপনার পূর্ব পুরুষদের অস্তিত্ব ছিল’। কিন্তু আপনি তো কখনোই আপনার পূর্ব পুরুষদের অস্তিত্ব স্বচক্ষে দেখেননি? তাহলে কেন বিশ্বাস করেন? কারণ, যদি আপনার পূর্ব পুরুষদের অস্তিত্ব না থাকতো তবে আপনি অস্তিত্বে আসতে পারতেন না। আপনার পূর্ব পুরুষদের অস্তিত্ব ছিল এটা বুঝতে আপনার স্বচক্ষে দেখে আসা লাগেনি যে আসলেই আপনার পূর্ব পুরুষদের অস্তিত্ব ছিল কি না! আপনার অস্তিত্বই আপনার পূর্ব পুরুষদের অস্তিত্ব প্রমাণ করে। আমাদের সাধারণ বোধ-বিবেচনা বা যুক্তির মাধ্যমে আমরা বুঝে উঠতে পারি আমাদের পূর্ব পুরুষদের অস্তিত্ব ছিল। একইভাবে, আমাদের এই মহাবিশ্বের অস্তিত্বই স্রষ্টার অস্তিত্ব প্রমাণ করে। কারণ, এই মহাবিশ্ব এবং মহাবিশ্বের মধ্যে যা কিছু আছে সব কিছুর অস্তিত্বের জন্য শুরু আছে। অস্তিত্বের জন্য যা কিছুর শুরু আছে তার অস্তিত্বের কারণ (Cause) থাকা অপরিহার্য। সুতরাং, আমাদের সাধারণ বোধ-বিবেচনার মাধ্যমেই আমরা এহেন সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে পারি যে এই মহাবিশ্ব সৃষ্টির জন্য কারণ (Cause) রয়েছে। সুতরাং, আমরা স্রষ্টাকে স্বচক্ষে দেখিনি, তাই আমরা স্রষ্টার অস্তিত্বে বিশ্বাস করিনা, এই দাবিটিও যৌক্তিক নয়। নাস্তিক্যবাদকে জাস্টিফাই করতে কিছু নাস্তিক এমন যুক্তির আশ্রয় নিয়ে থাকে যে, ধর্মগ্রন্থে ভুল তথ্য দেওয়া হয়েছে, সাংঘর্ষিক মূলক কথা বলা হয়েছে, অবৈজ্ঞানিক কথা বলা হয়েছে, ইত্যাদি। এই যুক্তিতে আগে থেকেই ধরে নেওয়া হয় যে, যদি ধর্মগ্রন্থগুলি ভুল হয়, তবে নাস্তিকতা স্বয়ংক্রিয়ভাবে সঠিক হতে হবে। তাই এই দাবিটিতে একজন নাস্তিক মূলত ফলস ডাইকোটমি ফ্যালাসি (False Dichotomy Fallacy) করে থাকে। ফলস ডাইকোটমি ফ্যালাসি এমন একটি কুযুক্তি যেখানে ধরে নেওয়া হয় যে, একটি পরিস্থিতির জন্য কেবল দুটি বিকল্প রয়েছে বা অন্য কোনো সম্ভাবনা নেই। যেমন, হয় তুমি ভালো ছাত্র, অন্যথায় তুমি ব্যর্থ। এখানে ধরে নেওয়া হচ্ছে যে একজন ছাত্র হয় ভালো হতে পারে অথবা ব্যর্থ হতে পারে। কিন্তু একজন ছাত্র ভালো না হলেও সফল হতে পারে। তাই ‘হয় তুমি ভালো ছাত্র, অন্যথায় তুমি ব্যর্থ’ এই দাবিটি একটু কুযুক্তি। একইভাবে ‘ধর্মগ্রন্থগুলি ভুল, তাই নাস্তিকতা সঠিক’ এই দাবিটি False Dichotomy Fallacy. কারণ এটি ধরে নিচ্ছে যে কেবল দুটি বিকল্প রয়েছে এবং অন্য কোনো সম্ভাবনা নেই। ধর্মগ্রন্থে ভুল থাকলে নাস্তিক্যবাদ সত্য বলে প্রমাণিত হয় না। কারণ কোনো একটা মতবাদের সত্যতা তার বিপক্ষ কোনো মতবাদের ভুল হওয়ার মধ্যে নিহিত নয়। উদাহরণস্বরূপ, একজন শিক্ষক ক্লাসের দশজন ছাত্রকে একটি অঙ্ক করতে বললো। ছাত্রদের অঙ্ক করা শেষ হওয়ার পর শিক্ষক দেখলেন প্রথম পাঁচ জনের অঙ্কই ভুল হয়েছে। প্রথম পাঁচ জনের অঙ্ক ভুল হওয়া কি কোনোভাবেই প্রমাণ করে যে, বাকি পাঁচ জনের অঙ্ক সঠিক হবে? আমাদের সাধারণ বোধ-বিবেচনা থেকেও আমরা বুঝতে পারি পাঁচ জনের অঙ্ক ভুল হওয়া কখনো এটা প্রমাণ করেনা যে, বাকি পাঁচ জনের অঙ্ক সঠিক। বরং, বাকি পাঁচ জন সঠিক নিয়মে অঙ্ক করেছে কি-না তার উপর নির্ভর করে ফলাফল সঠিক নাকি ভুল। তাই নাস্তিকদের তাদের অবস্থানকে সত্য প্রমাণ করার জন্য এমন কোনো যুক্তি উপস্থাপন করতে হবে যা নাস্তিকতাকে সমর্থন করে। অন্য কোনো মতবাদ বা কোনো ধর্মের ভুল হওয়া কিছুতেই প্রমাণ করেনা যে নাস্তিকতা সত্য। তাই ‘ধর্মগ্রন্থগুলি ভুল, তাই নাস্তিকতা সঠিক’ এই দাবিটি একটি নন সিক্যুইটার ফ্যালাসি (non sequitur fallacy). নন সিক্যুইটার ফ্যালাসি এমন একটি কুযুক্তি যেখানে বলতে বুঝানো হয়, প্রেমিস সিদ্ধান্তেকে জাস্টিফাই করে না। যেমন, আমি নতুন জুতা কিনেছি, তাই আমি পরীক্ষায় ভালো ফলাফল করব। এটি একটি নন সিক্যুইটার ফ্যালাসি। কারণ, পরিক্ষায় ভালো ফলাফল করার সাথে নতুন জুতা কেনার কোনো সম্পর্ক নেই। একইভাবে ধর্মগ্রন্থগুলোর মধ্যে ভুল থাকার সাথে নাস্তিকতার সত্য হওয়ার কোনো সম্পর্ক নেই। তাই ‘ধর্মগ্রন্থগুলি ভুল, তাই নাস্তিকতা সঠিক’ এই দাবিটিও একটি নন সিক্যুইটার ফ্যালাসি। পরিশেষে আমরা বলতে পারি, নাস্তিক্যবাদ স্রষ্টার অস্তিত্বকে অস্বীকার করে। কিন্তু এখন পর্যন্ত তারা স্রষ্টার অস্তিত্বকে অস্বীকার করার জন্য সঠিক যুক্তি-প্রমাণ উপস্থাপন করতে ব্যর্থ  হয়েছে। তাদের দাবির পক্ষে যে-সব যুক্তি উপস্থাপন করা হয় (স্রষ্টার অস্তিত্বের প্রমাণ পায়নি, ধর্মগ্রন্থগুলো ভুল, ইত্যাদি) তা মূলত কুযুক্তি। তবে দুর্ভাগ্যজনকভাবে, কিছু নাস্তিক ইচ্ছাকৃতভাবে অথবা অনিচ্ছাকৃতভাবে, সরাসরি বা পরোক্ষভাবে নাস্তিকতা ও সংশয়বাদ এবং  অ্যাগনস্টিসিজম এর সীমারেখা গুলিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করেন। যদি নাস্তিকতাকে সংশয়বাদ এবং অ্যাগনস্টিসিজম এর সঙ্গে গুলিয়ে ফেলা হয়, তাহলে নাস্তিকরা নিজেদের অবস্থানের পক্ষে প্রমাণ দেওয়ার প্রয়োজনীয়তাকে অস্বীকার করতে পারে। তাই এই বিষয়টি গভীরভাবে আলোচনা করা প্রয়োজন এবং আমাদের নাস্তিক্যবাদ ও অ্যাগনস্টিসিজম সম্পর্কে বিস্তারিত জানা প্রয়োজন।

অজ্ঞেয়বাদী নাস্তিক?

যেহেতু কিছু নাস্তিক ইচ্ছাকৃতভাবে অথবা অনিচ্ছাকৃতভাবে, সরাসরি বা পরোক্ষভাবে নাস্তিকতা এবং  অ্যাগনস্টিসিজম এর সীমারেখা গুলিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করেন এবং দাবি করেন তারা অ্যাগনস্টিক এথিস্ট! কারণ যদি নাস্তিকতাকে সংশয়বাদ এবং অ্যাগনস্টিসিজম এর সঙ্গে গুলিয়ে ফেলা হয়, তাহলে নাস্তিকরা নিজেদের অবস্থানের পক্ষে প্রমাণ দেওয়ার প্রয়োজনীয়তাকে অস্বীকার করতে পারে। অর্থাৎ, নাস্তিকরা নিজেদের উপর থেকে প্রমাণের বোঝা ছুড়ে ফেলে দেওয়ার জন্যই এমন ছলনার আশ্রয় নিয়ে থাকে। তাই এই বিষয়টি গভীরভাবে আলোচনা করা প্রয়োজন এবং আমাদের নাস্তিক্যবাদ ও অ্যাগনস্টিসিজম সম্পর্কে বিস্তারিত জানা প্রয়োজন।

অজ্ঞেয়বাদ বা অ্যাগনস্টিসিজম  কী?

মেরিয়াম ওয়েবস্টার অভিধান অনুসারে ,

অ্যাগনস্টিক হলো এমন ব্যক্তি, যিনি মনে করেন যে চূড়ান্ত বাস্তবতা (যেমন ঈশ্বর) অজানা এবং সম্ভবত অজানাই থেকে যাবে।
বিস্তৃত অর্থে, এমন একজন ব্যক্তি, যিনি ঈশ্বর বা কোনো দেবতার অস্তিত্ব আছে বা নেই — এই দুই অবস্থার কোনোটিতেই বিশ্বাস করার ব্যাপারে অঙ্গীকারবদ্ধ নন। (( AGNOSTIC Definition & Meaning - Merriam-Webster )) অন্যদিকে অজ্ঞেয়বাদ হলো, যে দৃষ্টিভঙ্গি অনুযায়ী কোনো চূড়ান্ত বাস্তবতা (যেমন কোনো দেবতা) অজানা এবং সম্ভবত অজানাই থেকে যাবে — অর্থাৎ এমন এক দার্শনিক বা ধর্মীয় অবস্থান, যা ঈশ্বর বা দেবতাদের অস্তিত্ব সম্পর্কে অনিশ্চয়তার দ্বারা চিহ্নিত। (( AGNOSTICISM Definition & Meaning - Merriam-Webster ))

অক্সফোর্ড ইংলিশ ডিকশনারি (OED) অনুযায়ী,
একজন অ্যাগনস্টিক হলো এমন ব্যক্তি, যিনি বিশ্বাস করেন যে অদৃশ্য বা অধিবাস্তব জিনিস সম্পর্কে—বিশেষ করে ঈশ্বরের অস্তিত্ব বা তাঁর প্রকৃতি সম্পর্কে—কিছুই জানা যায় না বা জানা সম্ভব নয়। (( agnostic, n. & adj. meanings, etymology and more | Oxford English Dictionary ))
ক্যামব্রিজ ডিকশনারি (Cambridge Dictionary) অনুযায়ী,
একজন অ্যাগনস্টিক হলো এমন একজন ব্যক্তি, যিনি জানেন না অথবা মনে করেন যে জানা সম্ভব নয়—ঈশ্বর আছেন কি না। (( AGNOSTIC | English meaning - Cambridge Dictionary ))
এই সংজ্ঞাগুলোর সবগুলোই এই অর্থ প্রকাশ করে যে একজন অ্যাগনস্টিক হচ্ছেন এমন ব্যক্তি যিনি না আস্তিক (ঈশ্বরের অস্তিত্বে বিশ্বাসী), না নাস্তিক (ঈশ্বরের অস্তিত্ব অস্বীকারকারী)। অ্যাগনস্টিক এমন কেউ, যিনি উভয় সম্ভাবনাই বিবেচনা করেছেন কিন্তু নিশ্চিত নন বা কখনো কখনো বিষয়টি সম্পর্কে একেবারেই অজ্ঞ। অথবা যিনি মনে করেন, ঈশ্বরের অস্তিত্ব কখনোই জানা সম্ভব নয়। এর মাধ্যমে অ্যাগনস্টিসিজমের দুইটি স্তর বোঝা যায়। যেমন, "হার্ড অ্যাগনস্টিকিজম" এবং "সফট অ্যাগনস্টিকিজম"।

হার্ড অ্যাগনস্টিকিজম এবং সফট অ্যাগনস্টিকিজম

হার্ড অ্যাগনস্টিকিজম বা দৃঢ় অজ্ঞেয়বাদ হলো এমন এক দার্শনিক অবস্থান, যেখানে বলা হয় যে ঈশ্বর বা কোনো চূড়ান্ত বাস্তবতার অস্তিত্ব মানুষ কখনোই জানতে পারবে না। ঈশ্বর আছেন কি নেই? এই প্রশ্নের উত্তর মূলত মানুষের জ্ঞানের সীমার বাইরে। অর্থাৎ, মানব বুদ্ধি বা অভিজ্ঞতার মাধ্যমে এ বিষয়ে কোনো সিদ্ধান্তে পৌঁছানো অসম্ভব। হার্ড অ্যাগনস্টিকরা বিশ্বাস করেন, ঈশ্বরের অস্তিত্ব নিয়ে অনুসন্ধান করা অর্থহীন, কারণ এই প্রশ্নের জ্ঞানতাত্ত্বিক সমাধান মানব মস্তিষ্কের নাগালের বাইরে। অন্যদিকে সফট অ্যাগনস্টিকিজম সম্ভাবনামূলক দৃষ্টিভঙ্গি ধারণ করে। এরা মনে করে, বর্তমানে ঈশ্বর বা কোনো পরম বাস্তবতার অস্তিত্ব সম্পর্কে আমাদের কাছে যথেষ্ট প্রমাণ নেই, তবে ভবিষ্যতে এমন প্রমাণ পাওয়া সম্ভব হতে পারে। অর্থাৎ, সফট অ্যাগনস্টিকরা ঈশ্বরের অস্তিত্বের প্রশ্নকে সম্পূর্ণ অজানা বা অজানার বাইরে নয়, বরং এখনো অনির্ণীত (undecided) হিসেবে দেখেন। তারা না একে পুরোপুরি অস্বীকার করেন, না নিশ্চিতভাবে স্বীকার করেন, বরং বিষয়টি উন্মুক্ত রেখে সম্ভাবনার জায়গা রাখেন।

তবে, “ঈশ্বর আছেন কি না?” এবং “ইশ্বর আছে কি-না এই বিষয়ে আমরা জানতে পারবো কিনা?”  এই দুটি প্রশ্ন একই ক্যাটাগরির নয়। ঈশ্বর আছে কিনা, এটি অস্তিত্ব বিষয়ক  (ontology)। আর আমরা জানি কি-না? কিংবা, জানতে পারবো কি-না ঈশ্বর আছেন?  এটি জ্ঞান বিষয়ক (জ্ঞানতত্ত্ব বা epistemology) ।

এখানে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, যদি কোনো কিছুর অস্তিত্ব দাবি করা হয় কিন্তু সেই দাবি প্রমাণ করার মতো স্পষ্ট কোনো উপায় না থাকে, তাহলে ওই দাবি গ্রহণযোগ্য নয়। অর্থাৎ, অস্তিত্ব সংক্রান্ত যে কোনো দাবিকে সঠিকভাবে প্রতিষ্ঠা করতে হলে তার পেছনে একটি পরিষ্কার জ্ঞানতাত্ত্বিক ভিত্তি থাকতে হবে। অন্ততত্ত্ব (ontology) এবং জ্ঞানতত্ত্ব (epistemology) – এই দুটি ভিন্ন বিষয়ের পার্থক্য বুঝলে আমরা নাস্তিকতা (atheism), ঈশ্বরবিশ্বাস (theism) এবং অ্যাগনস্টিসিজম (agnosticism)-এর অবস্থানগুলো আরও ভালোভাবে ধরতে পারি।

  • ঈশ্বর-বিশ্বাস এবং অবিশ্বাস হচ্ছে অস্তিত্বসংক্রান্ত অবস্থান। কারণ, এগুলো বলে ঈশ্বর আছেন বা নেই — অর্থাৎ অস্তিত্বের দাবি করছে।

  • কিন্তু সংশয়বাদ (agnosticism) হলো জ্ঞানসংক্রান্ত অবস্থান। এটি বলে, আমরা জানি না বা জানতে পারি না ঈশ্বর আছেন কি না।

এখন "ল অ‍ফ দ্য এক্সক্লুডেড মিডল" অনুযায়ী, একজন ব্যক্তি কেবল একটির মধ্যেই থাকতে পারেন।  হয় তিনি ঈশ্বরে বিশ্বাস করেন (theist), নাহয় তিনি ঈশ্বরে বিশ্বাস করেন না (atheist)। যদি কেউ বিশ্বাস করেন যে "ঈশ্বর আছেন"  তাহলে তিনি স্বাভাবিকভাবেই বিশ্বাস করবেন যে "ঈশ্বর নেই" এই কথা মিথ্যা। একইভাবে, যদি কেউ বিশ্বাস করেন "ঈশ্বর নেই", তাহলে তাকে বলতে হবে "ঈশ্বর আছেন" এটি মিথ্যা। কেউ যদি একই সঙ্গে এই দুইটি কথাই সত্য অথবা মিথ্যা মনে করেন, তাহলে তা হবে স্পষ্ট আত্মবিরোধ।

ঈশ্বর আছেন কি না—এই প্রশ্নের উত্তর দুই রকম হতে পারে: কেউ বলেন ঈশ্বর আছেন (যাকে বলে থিইজম), আবার কেউ বলেন ঈশ্বর নেই (যাকে বলে অ্যাথিইজম)। এটাকে বলা হয় অস্তিত্বের প্রশ্ন বা ontological প্রশ্ন। কিন্তু আরেকটি প্রশ্ন হলো, আমরা কি এটা নিশ্চিতভাবে জানতে পারি? এখানেই আসে জ্ঞানতত্ত্ব বা epistemology। কেউ কেউ বলেন, ঈশ্বর আছে কি না সেটা মানুষ কোনো দিনই জানতেই পারবে না। এটাকে বলে হার্ড অ্যাগনস্টিসিজম। আবার কেউ বলেন, জানার চেষ্টা করা যায়, কিন্তু আমি এখনো নিশ্চিত নই। এটাকে বলে সফট অ্যাগনস্টিসিজম। এইভাবে ঈশ্বর নিয়ে আলোচনা শুধু বিশ্বাসের নয়, বরং জ্ঞান ও যুক্তির বিষয়ও হয়ে ওঠে।

আস্তিকতা (theism) এবং নাস্তিকতা (atheism) — এই দুইটি পরস্পরের বিপরীত বিশ্বাস। একজন বলে ঈশ্বর আছেন, আর অন্যজন বলে ঈশ্বর নেই। এটি বাস্তবতা সম্পর্কে দুই বিপরীত অবস্থান বা ontological দাবি। কিন্তু কেউ যদি এই দুইটি বিষয়ে নিশ্চিত না হয়, অর্থাৎ বলে "জানি না ঈশ্বর আছেন কি না", তাহলে সে হয় সংশয়বাদী বা agnostic। এটাকে বলে epistemological অবস্থান, মানে কেউ জানার যোগ্যতা বা প্রমাণ নিয়ে সংশয়ে আছে। সমস্যা হয় তখনই, যখন এই তিনটি আলাদা অবস্থানকে এক লাইনে সাজিয়ে সবাইকে একটাই স্কেলে ফেলা হয় যার এক পাশে ঈশ্বর আছে, অন্য পাশে ঈশ্বর নেই, আর মাঝখানে সন্দেহ। এতে করে আসল পার্থক্যগুলো ঝাপসা হয়ে যায়, এবং বিশ্বাস, জ্ঞান ও সংশয়ের সীমারেখা হারিয়ে যায়, তৈরি হয় বিভ্রান্তি। তাই এই ধারণাগত বিভাজন পরিষ্কারভাবে বোঝা জরুরি।

দার্শনিক জে. অ্যাঞ্জেলো করলেট বলেছেন,

যদি ঈশ্বরের অস্তিত্ব নিয়ে বিশ্বাস বা অবিশ্বাসকে শুধু সম্ভাবনার শতাংশ দিয়ে বোঝানো হয়, তাহলে বিশ্বাস (আস্তিকতা), অবিশ্বাস (নাস্তিকতা) আর সংশয় (অ্যাগনস্টিসিজম) — এই তিনটি অবস্থানের মাঝে পার্থক্য স্পষ্ট থাকে না। তখন সবাই যেন শুধু একটি স্কেলে দাঁড়িয়ে থাকে, কেউ বেশি বিশ্বাস করে, কেউ কম, কেউ মাঝামাঝি। এতে করে এই ধারণাগুলোর প্রকৃত মানে ও সীমা হারিয়ে যায়, এবং এগুলোকে ঠিকভাবে আলাদা করা সম্ভব হয় না। তাই বিশ্বাস, অবিশ্বাস ও সংশয়—এই তিনটি অবস্থানকে তাদের নিজ নিজ জায়গা থেকে বুঝতে হবে, শুধুমাত্র “সম্ভাবনা” দিয়ে নয়। (( Angelo J. Corlett, The Errors of Atheism (Continuum Books, 2010), 34. ))

এই বিভ্রান্তির বাস্তব উদাহরণ আমরা দেখতে পাই আধুনিক নাস্তিক্য লেখকদের মধ্যে, বিশেষ করে রিচার্ড ডকিন্সের ক্ষেত্রে। তিনি ঈশ্বরের অস্তিত্ব নিয়ে ১ থেকে ৭ পর্যন্ত একটি স্কেল প্রস্তাব করেছেন, যেখানে ১ মানে ঈশ্বর আছেন বলে সম্পূর্ণ নিশ্চিত হওয়া (strong theist), আর ৭ মানে ঈশ্বর নেই বলে সম্পূর্ণ নিশ্চিত হওয়া (strong atheist)। ডকিন্স নিজেকে রেখেছেন ৬ নম্বরে। অর্থাৎ তিনি প্রায় নিশ্চিত যে ঈশ্বর নেই, কিন্তু সম্পূর্ণ নিশ্চয়তা দাবি করেন না। তবে সমস্যা হলো, এই ধরনের স্কেল ঈশ্বরের অস্তিত্ব সংক্রান্ত দুই ভিন্ন ধরনের প্রশ্ন ontological (ঈশ্বর আছেন কি না) এবং epistemological (আমরা জানি কি না) এই দুটোকে গুলিয়ে ফেলে।

এর ফলে “strong theist”, “weak atheist” ইত্যাদি অস্পষ্ট ও বিভ্রান্তিকর ধারণা তৈরি হয়। যেমন প্রশ্ন আসে—“weak atheist” আর “agnostic”-এর মাঝে পার্থক্য কীভাবে নির্দিষ্ট করা হবে? কেমন করে অন্যায্যভাবে (non-arbitrarily) নির্ধারণ করা যাবে কারা “strong atheist” আর কারা “weak atheist”?  এইভাবে পরস্পরবিরোধী অবস্থানগুলো একটি মাত্র স্কেলে পরিণত হলে, তাদের মধ্যে স্পষ্ট সীমারেখা থাকে না এবং ধারণাগত গোলমাল (conceptual muddlement) দেখা দেয়। ডকিন্স আদতে একজন সংশয়বাদী (agnostic), কিন্তু নিজেকে নাস্তিক (atheist) হিসেবে উপস্থাপন করেন—যা আসলে একটি ভুল পরিচয় (mislabeling)। এই ধরণের ভুল নামকরণ বা গুলিয়ে ফেলা বন্ধ করা প্রয়োজন, কারণ এটি নাস্তিকতা ও সংশয়বাদের প্রকৃত পার্থক্যকে বিকৃত করে।

‘Atheism’ শব্দে ব্যবহৃত ‘a-’ উপসর্গটি নিয়ে অনেক ভুল বোঝাবুঝি আছে, কারণ এটি দুটি ভিন্ন অর্থ বহন করতে পারে।

ডিকশনারি অনুযায়ী, “a-” এর দুটি অর্থ হতে পারে:

  1. “not” = সরাসরি অস্বীকার

  2. “without” = অনুপস্থিতি বা ঘাটতি

দুটি অর্থ কাছাকাছি হলেও এক নয়।

‘apolitical’ বলতে বোঝায় কেউ একেবারেই রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত নয়। অন্যদিকে, ‘a-’ যদি ‘without’ অর্থে নেওয়া হয়, তাহলে বোঝায় শুধু কোনো কিছুর অভাব বা অনুপস্থিতি, যেমন কেউ রাজনীতিতে আগ্রহী নয় বা নিরপেক্ষ। এই পার্থক্যটি খুবই গুরুত্বপূর্ণ, কারণ ‘atheism’ শব্দের ক্ষেত্রে যদি ‘a-’ মানে ‘without’ ধরা হয়, তাহলে atheism হয়ে দাঁড়ায় শুধু ঈশ্বরে বিশ্বাসের অভাব—যা আসলে agnosticism-এর কাছাকাছি। কিন্তু দার্শনিক পল ড্রেপারসহ অনেকেই মনে করেন, ‘atheism’-এর ক্ষেত্রে ‘a-’ মানে হওয়া উচিত ‘not’, কারণ এটি একটি দৃঢ় অবস্থান—ঈশ্বর নেই বলে বিশ্বাস করা।

‘Atheism’ শব্দটি সাধারণত ‘theism’-এর বিপরীতে ব্যবহৃত হয়। Theism বলতে বোঝায় ‘ঈশ্বর আছেন’ এই বিশ্বাস। কিন্তু এখানে ‘বিশ্বাস’ মানে কোনো মানসিক অনুভব নয়, বরং একটি দাবিস্বরূপ বক্তব্য, যেটি সত্য বা মিথ্যা হতে পারে। তাই theism যদি হয়: “ঈশ্বর আছেন”—এই দাবির গ্রহণযোগ্যতা, তাহলে atheism হবে: “ঈশ্বর আছেন”—এই দাবির অস্বীকার। ফলে atheism মানে শুধু ঈশ্বরে বিশ্বাস না থাকা নয়, বরং সরাসরি ঈশ্বরের অস্তিত্বকে অস্বীকার করা। এই কারণে ‘atheism’ শব্দে থাকা ‘a-’ উপসর্গকে “without” নয়, বরং “not” অর্থে বোঝা উচিত। অর্থাৎ, এটি কোনো বিশ্বাসের অনুপস্থিতি নয়, বরং একটি বিপরীত বিশ্বাস—যা theism-এর সরাসরি প্রত্যাখ্যান।

  • সাধারণভাবে Theism মানে: ঈশ্বরের অস্তিত্বে বিশ্বাস।

  • কিন্তু এখানে “বিশ্বাস” বলতে বোঝানো হচ্ছে শুধুমাত্র বিশ্বাসের বিষয়বস্তু (propositional content), অর্থাৎ: “ঈশ্বর আছেন” — এই বক্তব্যটি সত্য বা মিথ্যা হতে পারে।

এই দৃষ্টিকোণ থেকে theism মানে হয়:

একটি দাবি (proposition): “God exists” — যা সত্য অথবা মিথ্যা

  • যদি atheism-কে theism-এর বিপরীত ধরা হয়,

  • এবং theism হয়: “God exists” — এই প্রস্তাব,

  • তাহলে atheism হবে: “God does not exist” — অর্থাৎ সেই প্রস্তাবের অস্বীকার

এখানে atheism মানে হচ্ছে না:

“ঈশ্বরে বিশ্বাস নেই” এই মানসিক অবস্থা বা অনুভব (psychological condition)।
বরং এটা হচ্ছে একটি বক্তব্যের অস্বীকৃতি — “ঈশ্বর আছেন” এই দাবিটি সত্য নয়। (( Atheism and Agnosticism (Stanford Encyclopedia of Philosophy/Fall 2017 Edition) ))

দার্শনিক পল ড্রেপার বলছেন,

Atheism হওয়া উচিত ঈশ্বরের অস্তিত্ব সম্পর্কে সরাসরি “না” বলা, যা ধর্মতত্ত্বের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নের একমাত্র সরাসরি উত্তর। অর্থাৎ, ঈশ্বর আছেন কি না—এই প্রশ্নের শুধু দুটি সরাসরি উত্তর আছে: “হ্যাঁ” (theism) অথবা “না” (atheism)। অন্যসব উত্তর যেমন “আমি জানি না”, “কেউ জানে না”, “আমি চিন্তা করি না”, বা “প্রশ্নের কোনো মানে নেই”—সেগুলো সরাসরি কোনো উত্তর নয়। তাই atheism হওয়া দরকার একটি পরিষ্কার, নির্দিষ্ট অবস্থান হিসেবে, শুধু বিশ্বাসের অভাব নয়। (( SHOAIB AHMED MALIK; Defining Atheism and the Burden of Proof; Page: 6 ))

Leave a Comment