অধিকাংশ দার্শনিক বা বিজ্ঞানী নাস্তিক হলে কী নাস্তিকতা সত্য হবে?
সাজ্জাতুল মাওলা শান্ত
10 Aug, 2025
168 বার পঠিত
অধিকাংশ দার্শনিক বা বিজ্ঞানী নাস্তিক হলে কী নাস্তিকতা সত্য হবে??
নাস্তিকদের যুক্তি প্রণালিতে প্রায়ই এমন এক ধরনের কুযুক্তি দেখা যায়, যেখানে নাস্তিকতাকে যৌক্তিক প্রমাণ করতে ‘অধিকাংশ দার্শনিকের ঐকমত্য' অথবা ‘অধিকাংশ দার্শনিক নাস্তিক ' এই ধরনের বক্তব্য ব্যবহার করা হয়। তাদের যুক্তিটি মূলত নিন্মরুপ:
PI: যদি নাস্তিক্যবাদের পক্ষে দার্শনিকদের ঐকমত্য থাকে, অথবা অধিকাংশ দার্শনিক যদি নাস্তিক হয়, তাহলে নাস্তিকতা সত্য ।
P2: নাস্তিক্যবাদের পক্ষে অধিকাংশ দার্শনিকদের ঐকমত্য রয়েছে।
C: সুতরাং, নাস্তিকতা সত্য ।
এই যুক্তিটি আসলে একটি ক্লাসিক্যাল যৌক্তিক ভ্রান্তি, যা ‘জনপ্রিয়তার ভ্রান্তি’ (Appeal to appeal to popularity fallacy) নামে পরিচিত। কোনো কিছুর সত্যতা, বৈধতা, বা যৌক্তিকতার ভিত্তি হিসেবে যদি ন্যায্যতা বা প্রমাণের পরিবর্তে জনপ্রিয়তাকে উপস্থাপন করা হয় তবে এই কুযুক্তিটি ঘটে। উদাহরণস্বরূপ, ধূমপান স্বাস্থ্যসম্মত কারণ অধিকাংশ মানুষ ধূমপান করে ।
কিছু নাস্তিক যুক্তি দিতে পারেন যে, তারা নাস্তিকতাকে জনপ্রিয়তার ভিত্তিতে নয়, বরং অভিজ্ঞ ও বিশেষজ্ঞদের মতামতের উপর ভিত্তি করে যৌক্তিক বলে দাবি করেন। কিন্তু এমন দাবির মাধ্যমেও নাস্তিক্যবাদের সত্যতা প্রমাণ করা সম্ভব নয়। কারণ, অভিজ্ঞদের মতামতের উপর নির্ভর করে কোনো প্রস্তাবকে সত্য বলে প্রতিষ্ঠা করা একটি কুযুক্তি, যা ‘অভিজ্ঞতাগত অধিকার ভ্রান্তি' (Appeal to Authority) নামে পরিচিত। কোনো দাবির ন্যায্যতা প্রমাণ করার পরিবর্তে যদি বিশেষজ্ঞদের মতামতের উপর ভিত্তি করে দাবিটির সত্যতা প্রমাণ করার চেষ্টা করা হয় তবে এই কু-যুক্তি ঘটে । উদাহরণস্বরূপ; আইনস্টাইন বলেছেন, তাই এটি অবশ্যই সত্য। আইনস্টাইন একজন মহান বিজ্ঞানী হলেও, তার প্রতিটি বক্তব্য সত্য হতে হবে এমন কোনো নিশ্চয়তা নেই। তাই এ ধরনের যুক্তি প্রমাণবিহীন এবং ন্যায্যতার অভাবে যুক্তির দিক থেকে ভঙ্গুর।
তদ্রূপ, নাস্তিকদের দাবিতে যদি বলা হয়, 'অধিকাংশ দার্শনিক নাস্তিক এবং তাদের নাস্তিকতার পক্ষে ঐকমত্য রয়েছে; সুতরাং, নাস্তিকতা যৌক্তিক, ' তবে এটি প্রকৃতপক্ষে একটি অবৈধ যুক্তি। সত্য কোনো বিশেষজ্ঞের মতামত বা অভিজ্ঞতার উপর নির্ভর করে নির্ধারিত হয় না। বরং সত্যের ভিত্তি হলো বাস্তব প্রমাণ, যৌক্তিক ন্যায্যতা, এবং নিরপেক্ষ বিশ্লেষণ। সুতরাং, বিশেষজ্ঞদের মতামতকে একমাত্র প্রমাণ হিসেবে উপস্থাপন করে নাস্তিক্যবাদের সত্যতা প্রমাণ করার প্রচেষ্টা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। এটি এক ধরনের কুযুক্তি এবং সত্য প্রতিষ্ঠার জন্য যথেষ্ট নয় ।
এই আলোচনাতে আপনাদের মনে একটি প্রশ্ন জাগতে পারে যে, সত্য আসলে কী? আমার দৃষ্টিতে, সত্য হলো যা বাস্তবতার সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ। উদাহরণস্বরূপ, আপনি যদি এই বইটি পড়েন, তবে সেটি একটি অমোচনীয় সত্য। এটি কখনোই পরিবর্তন হবে না। সারা পৃথিবীর মানুষ যদি একত্রে বলে, আপনি বইটি পড়েননি, তবুও বাস্তবতা সেই অভিজ্ঞতাকে মিথ্যা করে তুলতে পারবে না। সত্য কখনোই পরিবর্তনশীল নয়, এটি কারো ব্যক্তিগত মতামতের ওপর নির্ভর করে না। যা কিছু সত্য, তা সর্বদাই চিরন্তন। গাণিতিক সত্যের উদাহরণ দিয়ে বিষয়টি আরও স্পষ্ট করা যেতে পারে। যেমন, ২+২=৪ এটি একটি অবিসংবাদিত সত্য। যদি সারা পৃথিবীর মানুষ একসাথে দাবি করে, ২+২=৫, তবুও প্রকৃতপক্ষে এটি ৪-ই থাকবে। এই ধরনের সত্য কখনোই স্থান, কাল, বা পরিস্থিতির দ্বারা প্রভাবিত হয় না । তাহলে যদি আমরা ধরে নিই, অধিকাংশ দার্শনিক দাবি করেন যে নাস্তিকতা সত্য, অথবা ভবিষ্যতে যদি এমন সময় আসে যখন অধিকাংশ দার্শনিক আস্তিকতার পক্ষে রায় দেন, তাহলে কি সত্য পরিবর্তিত হবে? ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়, এক সময় নাস্তিকতা শব্দটি আদৌ ছিল না, তখন কি আস্তিকতাই একমাত্র সত্য ছিল?
সত্য কখনো পরিবর্তনশীল নয়। এটি অতীতেও অপরিবর্তিত ছিল, বর্তমানে তা একই রয়েছে, এবং ভবিষ্যতেও তা একই থাকবে। যেমন, একটি বৃত্ত সবসময় গোলাকার থাকবে, ২+২=৪, এটি যেমন আজকের দিনের সত্য, তেমনই এটি অতীতেও সত্য ছিল এবং ভবিষ্যতেও সত্য থাকবে। কোনো কালে গিয়ে একটি বৃত্ত ত্রিভুজ হবে না বা ছিল না, সবসময়ই গোলাকার। কোনো কালে গিয়ে ২+২=৫ হয়ে যাবেনা বা কোনো কালেই ৫ ছিল না।
বিশেষজ্ঞদের ঐক্যমত্যের ভিত্তিতে সত্য নির্ধারণ করার যে প্রচেষ্টা নাস্তিকরা করে থাকে, তা একটি ভ্রান্তি। 'যেহেতু অধিকাংশ দার্শনিক নাস্তিক, তাই নাস্তিকতা যৌক্তিক'—এমন যুক্তি সত্য প্রতিষ্ঠার পক্ষে যথেষ্ট নয়। সত্যের মূল্যায়নে জনমত বা বিশেষজ্ঞের মতামত নয়, বরং প্রয়োজন অপ্রতিরোধ্য প্রমাণ, বাস্তবতার সাথে সামঞ্জস্য, এবং নির্ভুল যৌক্তিকতা।
অধিকাংশ দার্শনিক কী আসলেই নাস্তিক?
২০১৪ সালের ডেভিড বার্গেট এবং ডেভিড শালমার্স ‘দার্শনিকরা কি বিশ্বাস করেন?' এই শিরোনামে একটি গবেষণা পত্র প্রকাশ করেন। উক্ত গবেষণায় দর্শনের বিভিন্ন শাখার দার্শনিকগণের সৃষ্টিকর্তার বিশ্বাস এবং আরো অন্যান্য বিষয়ে প্রশ্ন করা হয় । এই গবেষণার মাধ্যমে তারা জানায়, ধর্মের দর্শন (Philosophy of Religion) ফিল্ডে যারা বিশেষজ্ঞ তাদের মধ্যে ৭৯.১৩ শতাংশ দার্শনিক স্রষ্টার অস্তিত্বে বিশ্বাসী । এবং ২০.৮৭ শতাংশ দার্শনিক স্রষ্টার অস্তিত্বে অবিশ্বাসী। অন্যদিকে, দর্শনের অন্যান্য শাখায় বিশেষজ্ঞ দার্শনিকদের মধ্যে ৮৬.৭৮ শতাংশ দার্শনিক স্রষ্টার অস্তিত্বে অবিশ্বাস করেন। এবং ১৩.২২ শতাংশ দার্শনিক স্রষ্টার অস্তিত্বে বিশ্বাস করেন। এই গবেষণা থেকে এটাই প্রতীয়মান যে, একজন দার্শনিক যদি ধর্মের দর্শন বা স্রষ্টার অস্তিত্বের পক্ষের যুক্তিগুলো নিয়ে গভীর বিশ্লেষণ করে তাহলে তার আস্তিক হওয়ার সম্ভাবনা কয়েকগুণ বেড়ে যায়।
সুতরাং, এই গবেষণার ফলাফল নাস্তিকদের উল্লিখিত যুক্তির বিপক্ষেই কথা বলে । নাস্তিকদের যুক্তিটির প্রথম প্রেমিস (P1) হলো, যদি নাস্তিক্যবাদের পক্ষে দার্শনিকদের ঐকমত্য থাকে, অথবা অধিকাংশ দার্শনিক যদি নাস্তিক হয়, তাহলে নাস্তিকতা সত্য। দ্বিতীয় প্রেমিস (P2) নাস্তিক্যবাদের পক্ষে অধিকাংশ দার্শনিকদের ঐকমত্য রয়েছে। কোনো দাবির সত্যতা, বৈধতা, বা যৈক্তিকতার ভিত্তি হিসেবে যদি যদি ন্যায্যতা বা প্রমাণের পরিবর্তে যদি অধিকাংশের মতামত বা বিশেষজ্ঞদের মতামতের উপর ভিত্তি করে সে দাবিটির সত্যতা প্রমাণ করার চেষ্টা করা হয় মূলত কু-যুক্তি। তাই নাস্তিকদের যুক্তিটির প্রথম প্রেমিস এবং দ্বিতীয় প্রেমিস বৈধ নয়। যুক্তিবিদ্যার নিয়ম অনুযায়ী প্রেমিস (P) যদি ভুল হয় তবে সিদ্ধান্ত (C) ভুল হতে বাধ্য। তাই নাস্তিকদের যুক্তিটির সিদ্ধান্ত (C) 'নাস্তিকতা সত্য' এটিও সত্য নয়।