"গড অফ দ্য গ্যাপস" নাস্তিকদের একটি জনপ্রিয় যুক্তির দার্শনিক পর্যালোচনা
সাজ্জাতুল মাওলা শান্ত
29 Apr, 2026
220 বার পঠিত
"গড অফ দ্য গ্যাপস" নাস্তিকদের একটি জনপ্রিয় যুক্তির দার্শনিক পর্যালোচনা
মানব ইতিহাসে প্রকৃতিকে বোঝার চেষ্টা সবসময়ই মানুষের চিন্তার কেন্দ্রবিন্দুতে ছিল। মানুষের এই জানার ইচ্ছা থেকেই জন্ম নিয়েছে দর্শন, বিজ্ঞান কিংবা জ্ঞানের অন্যান্য শাখা। মানুষ সব সময় জানতে চেয়েছে—
এই দুনিয়া কীভাবে এলো?
আমি কে?
আমি এখানে কেন?
এই প্রশ্নগুলোর উত্তর খুঁজতে গিয়েই সৃষ্টিকর্তার অস্তিত্বের প্রশ্নটি সামনে আসে। সৃষ্টিকর্তার অস্তিত্ব প্রমাণ করতে আমরা ব্যবহার করি বিভিন্ন যুক্তি। যেমন, কালাম কমসোলজিক্যাল আর্গুমেন্ট, কন্টিনজেন্সি আর্গুমেন্ট, ডিজাইন আর্গুমেন্ট ইত্যাদি। সৃষ্টিকর্তা এই মহাবিশ্ব সৃষ্টি করেছেন — এই দাবির বিপরীতে আধুনিক নাস্তিক বিতর্কে একটি পরিচিত আপত্তি হলো "গড অফ দ্য গ্যাপস" যুক্তি। এই দাবি মূল কথা হলো ইশ্বরের অস্তিত্ব নেই! বরং, মানুষ যা বুঝত না, সেখানেই ঈশ্বরকে বসিয়ে দিত। যেখানে বৈজ্ঞানিক জ্ঞানের অভাব রয়েছে সেখানে ঐশ্বরিক হস্তক্ষেপের ধারণা প্রবেশ করানো হয়। অর্থাৎ, বিজ্ঞান যদি কোনো বিষয়ের ব্যাখ্যা দিতে অক্ষম হয়, তখন তা ঈশ্বর করেছে বলে মেনে নেওয়া হয়।
উদাহরণস্বরূপ বলা হয়, এই মহাবিশ্বের উৎপত্তি হয়েছিল মহাবিস্ফোরণ বা বিগ ব্যাংয়ের মাধ্যমে — কিন্তু এই বিগ ব্যাংয়ের আগে কী ছিল? মহাবিস্ফোরণের আগে সিঙ্গুলারিটি এল কোথা থেকে? এসব প্রশ্নের উত্তর বিজ্ঞানের পরিধির বাইরে। এই শূন্যস্থান পূরণে আস্তিকরা দাবি করেন, এগুলো ইশ্বর সৃষ্টি করেছেন এবং মহাবিশ্বকে অস্তিত্বে এনেছেন।অথবা, প্রাচীন মানুষ অনেক সময় কোনো বিষয়ে অজানা থাকলে অতিপ্রাকৃত শক্তির সঙ্গে যুক্ত করতো। যেমন, আকাশে বজ্রপাত হলে বলত "ঈশ্বরের রাগ", ভূমিকম্প হলে বলত "দেবতার শাস্তি"।
কিন্তু বর্তমানে বিজ্ঞান এই ব্যাখ্যাগুলো দিয়ে দিয়েছে — তাই আমরা জানতে পেরেছি এসব ঘটনার পেছনে আসলে ইশ্বরের কোনো হস্তক্ষেপ ছিলো না। এই প্রেক্ষাপটে নাস্তিকদের দাবি হলো—মানুষ যখন কিছু বুঝতে পারতো না, তখন সেখানে “ঈশ্বর” বসিয়ে দিত। তাই ঈশ্বরের ধারণা মূলত অজ্ঞতার ফল। এটি মূলত "গড অফ দ্য গ্যাপস" ( God of the Gaps ) বা অজ্ঞতার জায়গায় ঈশ্বর। তাদের মতে, বিজ্ঞান একদিন এই সমস্ত প্রশ্নের উত্তর খুঁজে বের করবে — সুতরাং এখানে ঈশ্বরের অস্তিত্বে কোনো প্রয়োজন নেই। এই যুক্তিটি শুনতে বেশ শক্তিশালী মনে হলেও, একটু গভীরে গেলে এর বেশ কিছু মৌলিক দুর্বলতা স্পষ্ট হয়ে ওঠে।
নাস্তিকদের দাবি ঠিক কী?
আগেকার মানুষ বজ্রপাত, ঝড়, রোগব্যাধি বুঝত না বলে ঈশ্বরকে কারণ হিসেবে দাঁড় করাত। বিজ্ঞান এসে সেই ফাঁকগুলো পূরণ করে দিয়েছে। সুতরাং ঈশ্বরের ধারণা মূলত মানুষের অজ্ঞতা থেকে জন্ম নেওয়া একটি কল্পনা। বিজ্ঞান যত এগোবে, ঈশ্বর তত পিছিয়ে যাবে — এবং একসময় ঈশ্বরের কোনো "জায়গাই" থাকবে না।
এই যুক্তির পাশাপাশি একটি গুরুত্বপূর্ণ দাবিও যোগ করা হয় — "জান কেবল বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে জানা সম্ভব।" অর্থাৎ, বিজ্ঞান যা প্রমাণ করতে পারেনি, তা বিশ্বাস করা অযৌক্তিক। এই দুটো দাবি মিলেই তৈরি হয় "গড অফ দ্য গ্যাপস" যুক্তির পূর্ণ কাঠামো।
জ্ঞান কেবল বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতেই জানা যায়?
নাস্তিকদের দাবি জ্ঞান কেবল বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে জানা সম্ভব। বিজ্ঞান যেহেতু আমাদের বলেনি ইশ্বর বলে কেউ আছেন তাই আমাদের এটি বিশ্বাস করার উচিত নয় যে, ইশ্বর আছেন। কিন্তু প্রশ্ন হলো "জ্ঞান কেবল বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে জানা সম্ভব" — এই দাবিটি কি বৈজ্ঞানিক? এটিই হলো যুক্তির সবচেয়ে বড় ফাঁক। "জ্ঞান কেবল বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে জানা সম্ভব" — এই দাবিটি নিজেই বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে প্রমাণযোগ্য নয়। এটি পরস্পরবিরোধী একটি অনুমান। ফলে, নাস্তিকরা এই ধারণা গ্রহণ করে এমন কিছু অনুমান গ্রহণ করেছে যা বৈজ্ঞানিক পদ্ধতির আওতায় পড়ে না।
কোনো কিছু বৈজ্ঞানিক হওয়ার অর্থ হলো, যা পর্যবেক্ষণযোঘ্য হতে হবে, যা পরিক্ষণযোগ্য হতে হবে। এখন "জ্ঞান কেবল বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে জানা সম্ভব" এই কথাটি না পর্যবেক্ষণযোগ্য, না পরিক্ষণযোগ্য। বরং, এটি হলো একটা অনুমান বা চিন্তা যা মূলত যুক্তির সাথে রিলেটেড। বাস্তবে জ্ঞান অর্জনের পথ বহুমুখী। যুক্তি, অভিজ্ঞতা এবং দার্শনিক বিশ্লেষণও জ্ঞান অর্জনের গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম। তাই যুক্তি ছাড়া বিজ্ঞানও অসম্পূর্ণ — কারণ বিজ্ঞান নিজেই যুক্তির উপর নির্ভরশীল।
নাস্তিক নিউরো সায়েন্টিস্ট র্যামন্ড ট্যালিস বলেন,
বিজ্ঞানের চোখে ধরা পড়েনি, তাই এর কোনো অস্তিত্ব নেই — এমন মানসিকতার সাথে বিজ্ঞানের কোনো সম্পর্ক নেই। এটা বিজ্ঞানবাদী আচরণ। (( ড. রাফসান আহমেদ, হোমো সেপিয়েন্স; পৃষ্ঠাঃ ১৪৩ ))
"গড অফ দ্য গ্যাপস" এটি একটি Loaded Question ফ্যালাসি
"গড অফ দ্য গ্যাপস" যুক্তির শুরুতেই একটি ভুল অনুমান লুকিয়ে আছে — তা হলো আস্তিকরা কেবল বৈজ্ঞানিক ফাঁকা জায়গায় ঈশ্বরকে বসায়। কিন্তু বাস্তবে, ঈশ্বরের অস্তিত্বের পক্ষে আস্তিকরা বিজ্ঞানের সীমাবদ্ধতাকে ব্যবহার করেন না। বরং যুক্তির বিভিন্ন শাখা ও দৃষ্টিভঙ্গি ব্যবহার করেন। ঈশ্বরের অস্তিত্বের পক্ষে রয়েছে বহু যৌক্তিক, দার্শনিক প্রমাণ। যেমন, কামাল কমমোলজিক্যাল আর্গুমেন্ট, কন্টিনজেন্সি আর্গমেন্ট ইত্যাদি। নাস্তিকদের এই যুক্তিটি একই সাথে একটি Strawman ফ্যালাসিও। কারণ ধর্মের শক্তিশালী দার্শনিক যুক্তিগুলো বজ্রপাতের ব্যাখ্যার উপর নির্ভর করে না।
ঐতিহাসিক দাবিটি অতিরঞ্জিত এবং অসম্পূর্ণ
কিছু প্রাচীন সংস্কৃতিতে বজ্রপাতকে দেবতার রাগ মনে করা হতো — এটা সত্য। কিন্তু ইসলাম, খ্রিস্টধর্ম বা ইহুদি ধর্মের মূল ধর্মতাত্ত্বিকরা কখনো বলেননি "বজ্রপাত ব্যাখ্যা করা যায় না, তাই ঈশ্বর আছেন।" আল-গাজ্জালি, ইবনে রুশদ, আকুইনাস — এঁদের যুক্তি ছিল সম্পূর্ণ দার্শনিক যুক্তির উপর। তাঁরা অস্তিত্বের মূল প্রশ্ন থেকে শুরু করতেন, প্রকৃতির অব্যাখ্যাত ঘটনা থেকে নয়।
বিজ্ঞান "কীভাবে" বলে, "কেন" নয় — এই পার্থক্যটি মৌলিক
বিজ্ঞান ব্যাখ্যা করে বজ্রপাত কীভাবে হয় — মেঘে বৈদ্যুতিক চার্জ জমে, প্লাজমা তৈরি হয়। কিন্তু প্রশ্ন থেকে যায় — এই পদার্থবিদ্যার নিয়মগুলো কেন আছে? কেন এভাবেই কাজ করে? কেন আদৌ কোনো কিছু অস্তিত্বে আছে? বিজ্ঞান এই "কেন"-র উত্তর দেওয়ার দাবি করে না। ঈশ্বরের অস্তিত্বের প্রশ্নটি মূলত এই "কেন"-র জগতে — "কীভাবে"-র জগতে নয়। অর্থাৎ, বিজ্ঞান বজ্রপাতের মেকানিজম ব্যাখ্যা করে, বিজ্ঞান নিজে বজ্রপাত ঘটায়নি। তাই প্রশ্ন থেকেই যায় কেন এই নিয়মগুলো অস্তিত্বে আছে?
বজ্রপাতের বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা পাওয়া মানে এই নয় যে ঈশ্বরের ধারণা ভুল প্রমাণিত হয়েছে। কারণ এখানে দুটি আলাদা প্রশ্ন আছে:
- বজ্রপাত কিভাবে হয়? → বিজ্ঞান উত্তর দেয়
- মহাবিশ্ব কেন আছে? → এটি একটি দার্শনিক প্রশ্ন
বিজ্ঞান “কিভাবে” (how) ব্যাখ্যা করে, কিন্তু “কেন” (why) প্রশ্নের চূড়ান্ত উত্তর দেয় না।এই “কেন” প্রশ্ন থেকেই উদ্ভব হয়েছে Cosmological Argument, যা বলে—মহাবিশ্বের অস্তিত্বের জন্য একটি চূড়ান্ত কারণ বা ভিত্তি প্রয়োজন।
Science of the gaps
নাস্তিকদের যুক্তিটির মূল দাবি — "বিজ্ঞান একদিন সব ব্যাখ্যা করে দেবে।" কিন্তু এটি কোনো প্রমাণিত সত্য নয় — এটি নিজেই একটি বিশ্বাস, যাকে দার্শনিকরা বলেন Promissory Materialism। তাই "বিজ্ঞান একদিন সব ব্যাখ্যা করে দেবে"এই দাবিটিই মূলত এই মিথ্যা অনুমানের উপর দাঁড় করানো। এটি যেন "গড অফ দ্য গ্যাপস" যুক্তির আরেকটি রূপ যাকে Science of the gaps বলা যায়। যেমন বিজ্ঞান একদিন সব ফাঁক পূরণ করবে — এই ধারণাটিকেই যৌক্তিকভাবে প্রমাণ করা সম্ভব নয়।
প্রাকৃতিক প্রক্রিয়া আবিষ্কার করা, স্রষ্টা নাকচ করা নয়
ধরুন বিজ্ঞান প্রমাণ করল মহাবিশ্ব একটি নির্দিষ্ট প্রক্রিয়ায় তৈরি হয়েছে। তাতে কি প্রমাণ হয় সেই প্রক্রিয়ার পেছনে কোনো উদ্দেশ্য বা কারণ নেই? একজন ইঞ্জিনিয়ার যদি গাড়ির ইঞ্জিন সম্পূর্ণ বুঝে ফেলেন — তাতে কি প্রমাণ হয় গাড়ির কোনো নির্মাতা ছিল না? প্রাকৃতিক কারণ ব্যাখ্যা করা, আর সেই কারণের উৎস নাকচ করা — এ দুটো সম্পূর্ণ আলাদা কাজ।
যা প্রমাণ হয়, যা হয় না
বজ্রপাতের মতো প্রাকৃতিক ঘটনার ভুল ব্যাখ্যা অতীতে ছিল—এটা অস্বীকার করার উপায় নেই। কিন্তু সেখান থেকে এই সিদ্ধান্তে আসা যে “ঈশ্বরের ধারণা শুধুই অজ্ঞতার ফল”—এটা একটি তাড়াহুড়া করে দেওয়া সিদ্ধান্ত (hasty generalization)। এই যুক্তি সত্যিকার অর্থে যা প্রমাণ করে তা হলো — কিছু মানুষ ঈশ্বরকে ভুলভাবে, অজ্ঞতার ঢাল হিসেবে ব্যবহার করেছে। এটি সমালোচনার যোগ্য। কিন্তু দুর্বল ধর্মীয় অবস্থান খণ্ডন করা, শক্তিশালী দার্শনিক প্রশ্নের উত্তর দেওয়া নয়।
কিন্তু ঈশ্বরের ধারণা মূলত উঠে এসেছে আরও গভীর প্রশ্ন থেকে—অস্তিত্ব, কারণ, এবং বাস্তবতার চূড়ান্ত ভিত্তি নিয়ে চিন্তা থেকে। সুতরাং, "গড অফ দ্য গ্যাপস" যুক্তি একটি ভ্রান্তি। এটি এমন একটি কু-যুক্তি যা নাস্তিকরা তাদের অবস্থান প্রতিষ্ঠা করতে ব্যবহার করেন। কিন্তু বাস্তবে, ঈশ্বরের অস্তিত্বের পক্ষে প্রমাণ ও যুক্তি এতটাই বিস্তৃত যে এটি কোনো "ফাঁকা জায়গা" পূরণের চেষ্টা নয়। স্রষ্টার অস্তিত্বের প্রতি বিশ্বাস মানব মনের সহজাত এবং প্রাকৃতিক একটি অনুভূতি। এটি কোনো বৈজ্ঞানিক জ্ঞানের ফাঁকা জায়গা পূরণের প্রচেষ্টা নয়, বরং এটি একটি প্রজ্ঞাসম্পন্ন ও যৌক্তিক বিশ্বাস, যা দর্শন, অধিবিদ্যা এবং অভিজ্ঞতার আলোকে প্রতিষ্ঠিত। আমরা কখনোই বলি না যে, “বিজ্ঞান প্রমাণ করতে পারেনি, তাই স্রষ্টা আছেন।” বরং, স্রষ্টার অস্তিত্বের পক্ষে আমাদের বুদ্ধিমত্তার ইতিবাচক প্রমাণ, যৌক্তিক প্রমাণ আছে ।