ইসলামী রাষ্ট্রে কোনো মুসলিম কাফের হত্যা করলে তার শাস্তির বিধান
ইসলাম সম্পর্কে অমুসলিমদের প্রচলিত অভিযোগগুলোর একটি হলো; ইসলামী রাষ্ট্রে নাকি কোনো মুসলিম যদি কোনো অমুসলিমকে হত্যা করে, তবে তার কোনো শাস্তি হয় না। এ ধরনের দাবি সাধারণত অজ্ঞতা, ভুল ব্যাখ্যা এবং প্রাসঙ্গিক উৎস না পড়ে মতামত দেওয়ার ফল। প্রকৃতপক্ষে, এ ধরনের দাবি বিভিন্ন স্থানে প্রচার করা হলেও বাস্তবতা এমন নয়। এই লেখায় আমরা প্রথমে অভিযোগটির মূল উৎস ও বিষয়বস্তু পর্যালোচনা করবো, তারপর ইসলামী শরিয়াহ কী বলে—তা প্রমাণসমেত পরিষ্কারভাবে তুলে ধরবো। উদ্দেশ্য হলো অপপ্রচারের জবাবে ইসলামের প্রকৃত অবস্থান পাঠকের সামনে উপস্থাপন করা।
অভিযোগের উৎস
হাদিসে উল্লেখিত আছে,হাদিসে উল্লেখিত রয়েছে কাফেরের বদলে মুসলিমকে হত্যা করা যাবেনা। তাই নাস্তিকরা অভিযোগ করেন ইসলামী রাষ্ট্রে যদি কোনো মুসলিম কোনো কাফেরকে হত্যা করে তবে সেই মুসলিমের কোনো শাস্তি নেই।পরিচ্ছেদঃ ৮৭/৩১. কাফেরের বদলে মুসলিমকে হত্যা করা যাবে না।
৬৯১৫. আবূ জুহাইফাহ (রহ.) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি ’আলী (রাঃ)-কে জিজ্ঞেস করলাম, আপনাদের কাছে এমন কিছু আছে কি যা কুরআনে নেই? তিনি বললেন, দিয়াতের বিধান, বন্দী-মুক্তির বিধান এবং (এ বিধান যে) কাফেরের বদলে কোন মুসলিমকে হত্যা করা যাবে না। [১১১] (আধুনিক প্রকাশনী- ৬৪৩৫, ইসলামিক ফাউন্ডেশন- ৬৪৪৭) (( সহীহ বুখারী (তাওহীদ পাবলিকেশন) | হাদিস: ৬৯১৫ | Sahih al-Bukhari, Hadith No. 6915 ))
ইসলামে শাস্তির বিধান
অমুসলিমরা সাধারণত যেসব হাদিসের ভিত্তিতে এই অভিযোগ করেন সেসব হাদিসে বলা হয়েছে যে “কাফিরের বদলে মুসলিমকে হত্যা করা যাবে না।” কিন্তু এই বক্তব্যের অর্থ এই নয় যে কোনো মুসলিম যদি অমুসলিমকে হত্যা করে, তবে তাকে কোনো ধরনের শাস্তিই দেওয়া হবে না। বরং হাদিসটি মূলত কিসাসের নির্দিষ্ট বিধান সম্পর্কে, যা ইসলামী ফৌজদারি আইনের কেবল একটি অংশ। এটি বুঝতে হলে আগে জানতে হবে ইসলামে শাস্তির বিভিন্ন প্রকারভেদ আছে, এবং প্রতিটি প্রকারের নিজস্ব শর্ত, ব্যাখ্যা ও বিচারিক কাঠামো রয়েছে। কোনো একটি হাদিস বা বিধানকে বিচ্ছিন্নভাবে নিয়ে পুরো আইনের ওপর অভিযোগ তোলা তাই সঠিক পদ্ধতি নয়।
সুতরাং বিষয়টি সম্পূর্ণভাবে বুঝতে হলে আমাদের ইসলামের শাস্তির প্রকারভেদ—যেমন হুদুদ, কিসাস, দিয়া ও তাজীর এসবের পার্থক্য ও প্রয়োগবিধি সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা অর্জন করতে হবে। এরপরই পরিষ্কার হবে যে ইসলামী আইনে অমুসলিম নাগরিকের জীবন কতটা সুরক্ষিত এবং তার বিরুদ্ধে অন্যায় করলে মুসলিম হলেও কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়।
হুদুদ, কিসাস, দিয়া ও তাজীর ইসলামী ফৌজদারি আইনের চারটি প্রধান শাস্তিব্যবস্থা।
১. হুদুদ (حدود) হুদুদ হলো সেইসব শাস্তি, যেগুলো আল্লাহ নিজে নির্ধারণ করেছেন, যার সীমা (সাজা) নির্দিষ্ট এবং পরিবর্তনযোগ্য নয়। উদাহরণ: চুরি, ব্যভিচার, মদপান, ইত্যাদি। জমহুরদের সংজ্ঞায় হুদুদ হলো;শরী'আত কর্তৃক সেসব শাস্তি যা কতগুলো নির্দিষ্ট অপরাধের জন্য প্রবর্তিত।” অপরাধগুলো হচ্ছে, ব্যভিচার, ব্যভিচারের অপবাদ, মদ্যপান, চুরি, ডাকাতি (রাহাজানী), বিদ্রোহ ও ধর্মত্যাগ। (( ইসলামে শরী;আতে শাস্তির বিধান; ডা. আব্দুল কারীম যাইদান, অনুবাদঃ মুহাম্মদ বুরহানুদ্দীন; পৃষ্ঠাঃ ৪১ ))২. কিসাস (قصاص) কিসাস মানে “সমপরিমাণ প্রতিশোধ”। যেমন হত্যা করলে হত্যাকারীর বিরুদ্ধেও হত্যা (জীবন-বদলে জীবন)। অপরাধী কোন ব্যক্তির যেই পরিমাণ দৈহিক ক্ষতি সাধন করবে তারও সে-ই পরিমাণ দৈহিক ক্ষতি সাধন করাই হচ্ছে কিসাস। অপরাধী তাকে হত্যা করলে প্রতিশোধ স্বরূপ সেও মৃত্যুদণ্ড প্রাপ্ত হবে এবং যখম করে থাকলে প্রতিশোধ স্বরূপ তাকেও যখম করা হবে। উল্লেখ্য যে, কিসাসের শাস্তিও হুদূদের মতোই কুর'আন মজীদে নির্ধারিত রয়েছে। (( ইসলামের শাস্তির আইন; ড. আহমেদ আলী; পৃষ্ঠাঃ ২৮ )) ৩. দিয়াত (دية) যখন কিসাস কার্যকর হয় না অথবা ভিক্টিমের পরিবার ক্ষমা করে, অথবা কিছু পরিস্থিতিতে বিচারক কিসাসের পরিবর্তে দিয়াত নির্ধারণ করেন। দিয়াত হলো “রক্তপণ” বা আর্থিক ক্ষতিপূরণ, যা নিহত ব্যক্তির পরিবারের কাছে প্রদান করা হয়। হত্যা, যখম ও অঙ্গচ্ছেদ -এ অপরাধগুলো কেউ ইচ্ছাকৃত ও পরিকল্পিতভাবে ঘটালে তার শাস্তি হয় কিসাস (অপরাধী যা করেছে তাই করে তাকে শাস্তি দেওয়া)। স্বয়ং বিধানদাতা আল্লাহর পক্ষ থেকে এ শাস্তি নির্ধারিত। কিসাসের হকদার আক্রান্ত ব্যক্তি বা তার উত্তরাধিকারীগণ। পক্ষান্তরে এ অপরাধগুলো যদি কারো দ্বারা ভ্রম বসত হয় অথবা ইচ্ছাকৃত হয় কিন্তু কিসাসের সকল শর্ত পূরণ না থাকে তখন শাস্তি হয় দিয়ত বা রক্তমূল্য। দিয়তও শরী'আত কতৃক নির্ধারিত শাস্তি। আর মানুষের অঙ্গ কর্তন বা যখমের ক্ষেত্রে ধার্য শাস্তিকে বলে (1) আরশ। এখানে দিয়ত না বলার কারণ হলো, দিয়ত শব্দটি পূর্ণ দিয়তের জন্য ব্যবহৃত হয় যা কেবল প্রাণ বধের ক্ষেত্রে ওয়াজিব হয়। তবে কোনো কোনো ফকীহ দিয়ত শব্দকে প্রাণবধ ছাড়াও যখম ও অঙ্গ কর্তনের ক্ষেত্রেও ব্যবহার করেন। এটা তাদের নিজস্ব পরিভাষা মাত্র। আর পরিভাষার মধ্যে কোনো আপত্তি থাকে না। (( ইসলামে শরী;আতে শাস্তির বিধান; ডা. আব্দুল কারীম যাইদান, অনুবাদঃ মুহাম্মদ বুরহানুদ্দীন; পৃষ্ঠাঃ ৪১ )) ৪. তাজীর (تعزير) তাজীর হলো বিচারক বা রাষ্ট্রপ্রধানের বিবেচনায় নির্ধারিত শাস্তি যেখানে কুরআন-সুন্নাহ সরাসরি নির্দিষ্ট কোনো শাস্তি ঠিক করে দেয়নি। তাজির শাস্তির ধরন হলো কারাদণ্ড, প্রহার, দেশান্তর, জরিমানা, মৃত্যুদণ্ড (কিছু গুরুতর অপরাধে) তা'যীর এর আভিধানিক অর্থ শিক্ষামূলক শাস্তি (রমনা) শরী‘আতের পরিভাষায় সেসব অন্যায় ও পাপ কর্মের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দেওয়াকে তা'যীর বলে যে ব্যপারে নির্ধারিত শাস্তি নেই। যেসব অপরাধে তা'যীর ওয়াজিব হয় সেগুলো হচ্ছে শরী‘আত কতৃক ঐসব নিষিদ্ধ কাজ যার জন্য ইসলামী শরী'আতের পক্ষ থেকে কোনো শাস্তি নির্ধারিত নেই। যেমন, বেগানা মহিলার সাথে একান্তে থাকা, সুদ খাওয়া, ইয়াতিমের মাল আত্মসাৎ করা, আমানতের খিয়ানত করা, মৃত প্রাণি ভক্ষণ করা, ব্যাভিচার বাদে অন্য কোনো বিষয়ে অপবাদ দেওয়া, মিথ্যা সাক্ষ্য দেওয়া, ঘুষ খাওয়া ও অন্যান্য যেসব কাজ শরী‘আত হারাম করেছে তা করা কিংবা শরী'আত যা অবশ্য পালনীয় করেছে তা ত্যাগ করা। (( ইসলামে শরী;আতে শাস্তির বিধান; ডা. আব্দুল কারীম যাইদান, অনুবাদঃ মুহাম্মদ বুরহানুদ্দীন; পৃষ্ঠাঃ ৪১ )) আল্লাহ বা মানুষের অধিকার সংশ্লিষ্ট যে সব অপরাধের জন্য শরী'আত নির্দিষ্ট কোন শাস্তি কিংবা কাফ্ফারা নির্ধারণ করে দেয়নি সে সব অপরাধের শাস্তিকে তা'যীর বলে।১২ স্থান, কাল- অবস্থার নিরিখে কল্যাণের দাবি অনুপাতে এ ধরনের অপরাধের শাস্তি নির্ধারিত হবে। সুতরাং, অপরাধ, অপরাধী, সময় ও পরিবেশের প্রতি লক্ষ্য রেখে বিচারক যতটুকু ও যেরূপ শাস্তি দান করা যৌক্তিক মনে করবেন, ততটুকুই দেবেন। (( ইসলামের শাস্তির আইন; ড. আহমেদ আলী; পৃষ্ঠাঃ ২৮ ))
কাফের হত্যা করলে তার শাস্তির বিধান
কোনো মুসলিম যদি ইসলামী রাষ্ট্রে কোনো অমুসলিমকে হত্যা করে তাহলে তা দিয়াত বা তাজীর শাস্তির আওতাভুক্ত। যদি কোনো মুসলিম অমুসলিম নাগরিককে হত্যা করে
এবং কিসাসের নির্দিষ্ট শর্ত না মেলে তাহলে বিচারকের এখতিয়ারে তাজীরের আওতায় কঠোর শাস্তি দেওয়া হবে।
হাদিসে উল্লেখিত রয়েছে,
হাদিসে উল্লেখিত রয়েছে,পরিচ্ছেদঃ ২৩. যিম্মীর দিয়াত
৪৫৮৩। আমর ইবনু শু’আইব (রহঃ) থেকে পর্যায়ক্রমে তার পিতা এবং তার দাদার সূত্রে বর্ণিত। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেনঃ যিম্মীর দিয়াত স্বাধীন ব্যক্তির দিয়াতের অর্ধেক। হাসান। (( সুনান আবূ দাউদ (তাহকিককৃত) | হাদিস: ৪৫৮৩ | Sunan Abu Dawood, Hadith No. 4583 ))
আমর ইবনে শুয়াইব তাঁর পিতা হতে তিনি তাঁর (সামর্থ্যের) দাদা হতে বর্ণনা করেছেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বর্ণনা করেছেন, কোনো মুসলমানকে কাফেরের বদলে কতল করা যাবে না। একই সনদ সূত্রে নবী করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে আরো বর্ণিত আছে, তিনি বলেন, কাফেরের দিয়াত মুসলমানের দিয়াতের অর্ধেক।ইমাম তিরমিযীর বক্তব্য
ইমাম তিরমিযী রহ. বলেছেন, এ অনুচ্ছেদে বর্ণিত আবদুল্লাহ ইবনে আমর রা. এর বর্ণিত হাদিসটি। ইহুদি ও খ্রিস্টানের দিয়াতের ব্যাপারে ওলামায়ে কেরাম মতপার্থক্য করেছেন। অনেক আলেম ইহুদি ও খ্রিস্টানের দিয়াতের ক্ষেত্রে হাদিসে যা বর্ণিত হয়েছে সে মতই অবলম্বন করেছেন ।হজরত ইবনে আবদুল আজিজ (রহ.) বলেছেন,
ইহুদি ও খ্রিস্টানের দিয়াত মুসলমানের দিয়াতে অর্ধেক । ইমাম আহমদ ইবনে হাম্বল রহ. এ মতই পোষণ করেন।হজরত উমর ইবনে খাত্তাব (রা.) হতে বর্ণিত আছে,
তিনি বলেছেন, ইহুদি ও খ্রিস্টানের দিয়াত চার হাজার দিরহাম। আর অগ্নি উপাসকের দিয়াত আটশত দিরহাম। মালেক ইবনে আনাস, শাফেয়ি ও ইসহাক রহ. এ মতই পোষণ করেন ।অনেক আলেম বলেছেন, ইহুদি ও খ্রিস্টানের দিয়াত মুসলমানের দিয়াতের মতো। সুফিয়ান সাওরি ও কুফাবাসীর মত এটাই । (( দরসে তিরমিযী; খন্ডঃ৫ পৃষ্ঠাঃ ৩৩৬ ))
হদিসে উল্লেখিত রয়েছে,
পরিচ্ছেদঃ ১৮. দিয়াতের (ক্ষতিপূরণের) পরিমাণ কত?
৪৫৪২। আমর ইবনু শু’আইব (রহঃ) থেকে পর্যায়ক্রমে তার পিতা এবং তার দাদার সূত্রে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর যুগে মুদ্রায় দিয়াত ছিলো আটশো দীনার অথবা আট হাজার দিরহাম। সে সময় আহলে কিতাবদের জন্য ছিলো মুসলিমদের জন্য নির্ধারিত দিয়াতের অর্ধেক। বর্ণনাকারী বলেন, দিয়াতের এ পরিমাণ উমার (রাঃ)-এর খলীফা নির্বাচিত হওয়ার পূর্ব পর্যন্ত কার্যকর ছিলো। খলীফা হয়ে তিনি ভাষণ দানকালে বলেন, উটের দাম বেড়েছে। বর্ণনাকারী বলেন, অতঃপর উমার (রাঃ) দিয়াতের পরিমাণ স্বর্ণের মালিকের জন্য এক হাজার দীনার, রৌপ্যের মালিকের জন্য বার হাজার দিরহাম, গাভীর মালিকের জন্য দু’শো গাভী, ছাগলের মালিকের জন্য দু’ হাজার ছাগল ও কাপড়ের মালিক বা ব্যবসায়ীদের জন্য দু’শো জোড়া কাপড় ধার্য করলেন। বর্ণনাকারী বলেন, তিনি যিম্মীদের দিয়াত বাদ রাখলেন অর্থাৎ দিয়াতের পরিমাণ বৃদ্ধিকালে তাদের জন্য নির্ধারিত পূর্বের পরিমাণে বৃদ্ধি করেননি। [1] হাসান। (( সুনান আবূ দাউদ (তাহকিককৃত) | হাদিস: ৪৫৪২ | Sunan Abu Dawood, Hadith No. 4542 ))
Islam QA org-তে 'যদি কোন মুসলিম কোন ইসলামী রাষ্ট্রে কোন কাফেরকে হত্যা করে, তাহলে তার শাস্তি কী?' শীর্ষক প্রশ্নের জবাবে বলেন,
ইসলামী রাষ্ট্রে বসবাসকারী একজন অমুসলিমের জীবন একজন মুসলিমের জীবনের মতোই। তার জীবন পবিত্র এবং ইসলামী রাষ্ট্র কর্তৃক সুরক্ষিত থাকবে। যদি কোন মুসলিম তাকে কোন যুক্তিসঙ্গত শরীয়ত সম্মত কারণ ছাড়াই হত্যা করে, তাহলে মুসলিমের উপর কিসাসের (তলোয়ারের আঘাতে হত্যা) আইন প্রযোজ্য হবে। আর আল্লাহ তা'আলাই সবচেয়ে ভালো জানেনমাসিক আত-তাহরিক-এ "প্রশ্ন (২০/৪৬০): মুসলিম দেশে বসবাসকারী কোন অমুসলিমকে কোন মুসলমান শরী‘আতসম্মত কারণে হত্যা করে ফেললে তার বিধান কি?" এই প্রশ্নের জবাবে বলেন,
উত্তর : যে কোন অপরাধ রাষ্ট্রীয় ইসলামী আদালতের মাধ্যমে প্রমাণিত হওয়ার পূর্বে কারো জন্য আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়া জায়েয নয়। এরূপ করলে উক্ত ব্যক্তি অপরাধী হিসাবে গণ্য হবে। রাসূল (ছাঃ) বলেন, চুক্তিবদ্ধ অমুসলিমকে হত্যাকারী ব্যক্তি জান্নাতের সুগন্ধিও পাবে না (বুখারী, মিশকাত হা/৩৪৫২)। তবে কাফেরকে হত্যার বদলে কোন মুসলিমকে হত্যা করা যাবে না (আবুদাঊদ, মিশকাত হা/৩৪৭৫)। এক্ষেত্রে রক্তমূল্য দিতে হবে। কাফেরের রক্তমূল্য মুসলিমের রক্তমূল্যের অর্ধেক এবং চুক্তিবদ্ধ ব্যক্তির রক্তমূল্য স্বাধীন নাগরিকের অর্ধেক (আবুদাঊদ হা/৪৫৮৩, মিশকাত হা/৩৪৯৬)। রাসূল (ছাঃ)-এর সময়ে একজন মুসলিমের রক্তমূল্য ছিল ১০০ উট এবং আহলে কিতাব, অমুসলিম কিংবা চুক্তিবদ্ধ ব্যক্তির জন্য ছিল তার অর্ধেক (আবুদাঊদ হা/৪৫৪২, ৪৫৮৩; নাসাঈ হা/৪৭৯৩; মিশকাত হা/৩৪৯২, ৩৪৯০)। প্রশ্নে বর্ণিত অপরাধের ক্ষেত্রে ঐ ব্যক্তি শাস্তিপ্রাপ্ত না হ’লে তওবা করবে ও আল্লাহর নিকট ক্ষমা প্রার্থনা করবে (যুমার ৫৩)।ড. ইউসূফ আল কারজাভি (রহ) তার লিখিত মুসলিম দেশে অমুসলিম অধিকার বইতে বলেন,
সব মাজহাবের ইমামদের ঐক্যমত্যে অমুসলিম নাগরিকের খুন-রক্ত নিষ্পাপ এবং তাদের হত্যা করা মহাপাপ। নবিজি ইরশাদ করেছেন- "যে ব্যক্তি সংখ্যালঘুকে হত্যা করবে, সে জান্নাতের ঘ্রাণও পাবে না। অথচ বেহেশতের সুঘ্রাণ পাওয়া যাবে ৪০ বছরের দূরত্বে থেকেও। এজন্য ফকিহদের সম্মিলিত রায় হলো- হাদিসের এই সতর্কবাণীর কারনে সংখ্যালঘুদের হত্যা করা জঘন্য পাপ ও কবিরা গুণাহ। (( মুসলিম দেশে অমুসলিম অধিকার ; ড. ইউসূফ আল কারজাভি (রহ); পৃষ্ঠাঃ২৬ ))ইমাম শাফেয়ি ও ইমাম আহমেদ (রহ.) এর মতে, হত্যাকারী মুসলিমকে প্রাণদন্ড দেওয়া হবেনা। তাদের দলিল হলো- 'কাফিরের হত্যার প্রতিশোধে মুসলমানকে পালটা হত্যা করা হবে না।' সহিহ বুখারী। (( মুসলিম দেশে অমুসলিম অধিকার ; ড. ইউসূফ আল কারজাভি (রহ); পৃষ্ঠাঃ২৬ )) ইমাম মালেক ও লাইস (রহ.) এর অভিমত হলো,
যদি কোনো মুসলিম কোনো সংখ্যালঘুকে অতর্কিত হামলা করে হত্যা করে, তবে পালটা হত্যার মাধ্যমে তার বিচার করা হবে। আর যদি অতর্কিত হত্যা না করে, তাহলে এ শাস্তি প্রযোজ্য হবে না। (( নাইলুল আওতার, খন্ডঃ ০৭, পৃষ্ঠাঃ ১৫৪ (মুসলিম দেশে অমুসলিম অধিকার ; ড. ইউসূফ আল কারজাভি (রহ); পৃষ্ঠাঃ২৬) ))আবানা বিন উসমান (রা.) মদিনার প্রশাসকের দায়িত্ব পালনকালে একটি মামলার এ ধরণের ( অতর্কিত হামলা করে হত্যা করলে, তবে পালটা হত্যার মাধ্যমে তার বিচার ) রায় দিয়েছেন।