ইসলামে মুরতাদের শাস্তি মৃত্যুদন্ড কেন?

ইসলামে মুরতাদের শাস্তি মৃত্যুদন্ড কেন?

ইসলামে মুরতাদের শাস্তি মৃত্যুদন্ড কেন?

ইসলামবিরোধীরা ইসলামের বিপক্ষে  আলোচনায় যে অভিযোগটি সবচেয়ে বেশি মুখরোচক ও আবেগপ্রবণভাবে উপস্থাপন করা হয়, তা হলো— ইসলামে ধর্ম ত্যাগের শাস্তি মৃত্যুদণ্ড, আর এই বিধান নাকি অমানবিক ও বর্বর। আধুনিক মানবাধিকার, ব্যক্তি-স্বাধীনতা ও বিবেকের স্বাধীনতার ভাষায় এই অভিযোগকে এমনভাবে সাজানো হয় যেন ইসলাম একটি দমনমূলক মতাদর্শ, যা মানুষকে চিন্তা ও বিশ্বাসের অধিকার থেকে বঞ্চিত করে। কিন্তু এই অভিযোগের পেছনে অধিকাংশ সময়ই থাকে ইতিহাস-বিচ্ছিন্ন পাঠ, ফিকহি আলোচনার আংশিক উপস্থাপন এবং আধুনিক রাষ্ট্রব্যবস্থার সঙ্গে প্রাক-আধুনিক সমাজব্যবস্থার গুলমাল।

বাস্তবতা হলো ইসলামি শরিয়াহ এটি একটি পূর্ণাঙ্গ সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় কাঠামোর ভেতরেই বিধান নির্ধারণ করে। ধর্ম ত্যাগ (রিদ্দাহ) সংক্রান্ত শাস্তি কেবল ব্যক্তিগত বিশ্বাস পরিবর্তনের প্রশ্নে নয়; বরং তা যুক্ত হয়েছে রাজনৈতিক আনুগত্য, সামাজিক চুক্তি, রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা ও প্রকাশ্য বিদ্রোহের মতো গুরুতর বাস্তবতার সঙ্গে। অথচ সমালোচকেরা এই প্রেক্ষাপটগুলো ইচ্ছাকৃতভাবে উপেক্ষা করে বিষয়টিকে শুধুই “বিশ্বাস বদল = মৃত্যু” এই সরল ও বিভ্রান্তিকর সমীকরণে নামিয়ে আনে।

এই লিখাতে আমরা আবেগ নয়, বরং দলিল ও বিশ্লেষণের আলোকে প্রশ্নটি পর্যালোচনা করব। কুরআন, সুন্নাহ, সাহাবায়ে কেরামের আমল, ধ্রুপদি ফিকহি ব্যাখ্যা এবং ঐতিহাসিক বাস্তবতার ভিত্তিতে দেখানোর চেষ্টা করব; ইসলামে ধর্মত্যাগের শাস্তি আদৌ কোনো অমানবিক বিধান কি না, নাকি এটি একটি নির্দিষ্ট সামাজিক-রাজনৈতিক কাঠামোর মধ্যে সীমাবদ্ধ আইন, যাকে উদ্দেশ্যমূলকভাবে বিকৃত করে উপস্থাপন করা হচ্ছে।

ইসলামে মুরতাদের শাস্তি

শুরুতেই আমাদের নির্ধারণ করা জরুরি কুরআন ও সহিহ সুন্নাহ আসলে মুরতাদ বা ধর্মত্যাগকারীর শাস্তি সম্পর্কে কী বলে। কারণ এই বিষয়টি ঘিরে ইসলামের বিরুদ্ধে যে অভিযোগগুলো তোলা হয়, সেগুলোর প্রভাব কেবল অমুসলিমদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে না; বরং সেই অভিযোগের ফাঁদে পড়ে কিছু মুসলিমও ইসলামের এই অকাট্য বিধানকে অস্বীকার করতে শুরু করেন, অথবা বিষয়টিকে খণ্ডিত ও বিকৃত ব্যাখ্যার মাধ্যমে হালকা করে দেখানোর চেষ্টা করেন। অথচ কোনো ইসলামী বিধানকে বুঝতে হলে আমাদের আবেগ বা আধুনিকতার কাছে নতি স্বীকার করা নয়; বরং ওহির ভাষা ও নববী ব্যাখ্যাই হতে হবে একমাত্র মানদণ্ড।

এই কারণেই, শুরুতে কুরআন ও হাদিসের আলোকে স্পষ্টভাবে জেনে নেওয়া প্রয়োজন যে, ইসলামে আদৌ মুরতাদ বা ধর্মত্যাগকারীর শাস্তি কী নির্ধারিত হয়েছে? শাস্তির অস্তিত্ব আছে কি না, থাকলে তা কোন প্রেক্ষাপটে প্রযোজ্য? কী শর্তে তা কার্যকর হয়? তাই এই অংশে আমরা কোনো ব্যাখ্যাগত কৌশল বা আত্মপক্ষসমর্থনের আশ্রয় না নিয়ে, সরাসরি কুরআন ও সহিহ হাদিসের দলিলের সামনে দাঁড়িয়ে বিষয়টি অনুধাবনের চেষ্টা করব।

হাদিসের আলোকে মুরতাদের শাস্তি

হাদিস নংঃ ১

পরিচ্ছেদঃ ১. মুরতাদের শাস্তির বিধান।

৪৩০০. আহমদ ইব্‌ন মুহাম্মদ (রহঃ) .... ইকরামা (রহঃ) থেকে বর্ণিত যে, আলী (রাঃ) ঐ সব লোকদের আগুন দিয়ে পুড়িয়ে দেন, যারা মুরতাদ হয়েছিল। এ সংবাদ ইব্‌ন আব্বাস (রাঃ)-এর নিকট পৌছলে, তিনি বলেনঃ যদি আমি তখন সেখানে উপস্থিত থাকতাম, তবে আমি তাদের আগুনে জ্বালাতে দিতাম না। কেননা, রাসূলুল্লাহ্‌ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ তোময়া আল্লাহ্‌ প্রদত্ত শাস্তির (বস্তু) দ্বারা কাউকে শাস্তি দেবে না। অবশ্য আমি তাদেরকে আল্লাহ্‌র রাসূলের নির্দেশ মত হত্যা করতাম। কেননা, তিনি বলেছেনঃ যদি কেউ দীন পরিত্যাগ করে মুরতাদ হয়ে যায়, তবে তোমরা তাকে হত্যা করবে। আলী (রাঃ) ইব্‌ন আব্বাস (রাঃ)-এর এ নির্দেশ শুনে বলেনঃ ওয়াহ্‌! ওয়াহ্‌! ইব্‌ন আব্বাস (রাঃ) সত্য বলেহছেন। আর ইহাই নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নির্দেশ। (( সুনান আবূ দাউদ (ইসলামিক ফাউন্ডেশন) | ৩৩/ শাস্তির বিধান (كتاب الحدود) ))

মুরতাদের শাস্তি সম্পর্কে আহলে সুন্নাত ওয়াল জামায়াতের দৃষ্টিভঙ্গি

বিখ্যাত স্কলার ও তাফহিমুল কুরআনের লেখক সাইয়েদ আবুল আলা মওদূদি (রহ) তার 'মুরতাদের শাস্তি' গ্রন্থে উল্লেখ করেন, (( মুরতাদের-শাস্তি-আবুল-আলা-মওদূদি-পৃষ্টা-৭ )) শাইখ মুহাম্মদ সালেহ আল-মুনাজ্জিদ islamqa.info তে এই বিষয়ক প্রশ্নের জবাবেও মুরতাদের শাস্তি যে মৃত্যুদন্ড তা সুস্পষ্টাভাবে উল্লেখ করেছেন। (( ইসলাম ত্যাগকারী মুরতাদের শাস্তি মৃত্যুদণ্ড কেন - ইসলাম জিজ্ঞাসা ও জবাব )) ডা. আব্দুল কারীম যাইদান তার লিখিত 'ইসলামী শরিয়াতে শাস্তির  বিধান' গ্রন্থে উল্লেখ করেন, (( ইসলামী শরিয়াতে শাস্তির বিধান; ডা. আব্দুল করিম যাইদান; পৃষ্টা ৪১, ৫১ ))

ধর্মত্যাগী বা মুরতাদের শাস্তি কেন মৃত্যুদন্ড?

প্রথমে আমাদের বুঝতে হবে ইসলাম আসলে কী? ইসলাম কি কেবলই কোনো ধর্ম নাকি একটি পূর্ণাঙ্গ জীবনব্যবস্থা? আল্লাহ তা'আলা কেন আমাদের কাছে দ্বীন ইসলাম দিয়েছেন? পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তা'আলা বলেন,
তিনি তাঁর রসূলকে হিদায়াত আর সঠিক দ্বীনসহ পাঠিয়েছেন যাবতীয় দ্বীনের উপর একে বিজয়ী করার জন্য যদিও মুশরিকগণ অপছন্দ করে। (( (৯) আত-তাওবা | (9) At-Tawba | ٱلتَّوْبَة-অনুবাদ/তাফসীর ))

এই আয়াত স্পষ্টভাবে প্রমাণ করে যে ইসলাম কেবল একটি ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠানের সীমাবদ্ধ নয়, বরং এটি একটি পূর্ণাঙ্গ জীবনব্যবস্থা। ইসলামের বিধান শুধুমাত্র ব্যক্তিগত ইবাদত ও নৈতিকতার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; বরং এটি ব্যক্তিগত, সামাজিক এবং রাষ্ট্রীয় জীবন সমস্ত ক্ষেত্রেই কার্যকর। অর্থাৎ, ইসলামের নিয়ম-কানুন ব্যক্তি পর্যায়ে যেমন প্রযোজ্য, তেমনি সমাজ ও রাষ্ট্রের কাঠামোও ইসলামী নীতি অনুযায়ী পরিচালিত হবে। এই দৃষ্টিকোণ থেকে দেখা যায় ইসলাম শুধুমাত্র ব্যক্তিগত বিশ্বাস নয়, এটি একটি সার্বিক জীবনদর্শন যা ব্যক্তি, সমাজ ও রাষ্ট্র তিন স্তরেই কার্যকর।

একটি ইসলামী রাষ্ট্রের আইন, সংবিধান, প্রশাসনিক কাঠামো, বিচারব্যবস্থা সবকিছুই কুরআন ও সুন্নাহর আলোকে প্রতিষ্ঠিত হবে। তাই, কোনো ব্যক্তি যদি ইসলাম ত্যাগ করে, তখন সে কেবল ব্যক্তিগতভাবে তার ধর্ম পরিবর্তন করছে না; সে মূলত সেই রাষ্ট্রের ভিত্তি ও সংবিধানকেই অস্বীকার করছে, যেটি ইসলামী নীতি ও শাস্ত্রের ওপর নির্মিত। অন্য কথায়, ইসলামী রাষ্ট্রে ধর্মত্যাগ কেবল ব্যক্তি পর্যায়ের ইমানের পরিবর্তন নয়, বরং রাষ্ট্রীয় কাঠামো ও নীতির প্রতি অগ্রহণযোগ্যতার প্রতিফলনও বটে।

যে ব্যক্তি ইসলামের ওপর ভিত্তি করে নির্মিত এই রাষ্ট্রের কাঠামো অস্বীকার করে, সে কেবল ব্যক্তিগতভাবে তার ধর্ম পরিবর্তন করছে না। বাস্তবে, সে রাষ্ট্রের মূল ভিত্তি ও সংবিধানকেই অগ্রহণযোগ্য করছে। রাষ্ট্রের ভিত্তি অস্বীকার করা রাষ্ট্রদ্রোহিতার শামিল, এবং ইতিহাস ও আইন প্রমাণ করে যে প্রতিটি রাষ্ট্রই রাষ্ট্রদ্রোহিতার ক্ষেত্রে কঠোর শাস্তি আরোপ করে, যা প্রায়শই মৃত্যুদণ্ডের মধ্যে পড়ে। কাজেই, ইসলাম ত্যাগ কেবল ব্যক্তিগত ইমানের পরিবর্তন নয়, এটি রাষ্ট্রীয় কাঠামোকে চ্যালেঞ্জ করার সমতুল্য, এবং এর ফলে রাষ্ট্রদ্রোহিতা ও আইনগত বিষয় উত্থিত হয়।

মাওলানা মওদূদি (রহ) বলেন,

শুধু ধর্ম এবং ধর্মীয় রাষ্ট্রের মৌল পার্থক্যঃ মুরতাদের শাস্তি ‘মৃত্যুদন্ডের' ব্যাপারে আপত্তিকারীদের যেসব দলিল- প্রমাণ আমি উপরে বর্ণনা করেছি এবং তাদের জবাবে আমার তরফ থেকে যেসব দলিল প্রমাণ পেশ করেছি সে সবের তুলনামূলক পর্যালোচনা করা হলে যে বিষয়টি স্পষ্ট হয়ে ওঠে তাহলো মুরতাদের সাজা সম্পর্কে বিরুদ্ধবাদীরা যত আপত্তি উত্থাপন করেছে তা কেবল একটি 'ধর্মের' দৃষ্টিভঙ্গীতেই করেছে। পক্ষান্তরে আমরা এ শাস্তিকে অত্যন্ত সঠিক বলে দাবী করার জন্য যে সব দলিল-প্রমাণ পেশ করেছি, আমাদের সে দাবী নিছক ধর্ম হিসাবে নয়। বরং এমন একটি রাষ্ট্র হিসাবে, যে রাষ্ট্র কোন বিশেষ গোষ্ঠী, শ্রেণী বা জাতির শাসনের পরিবর্তে একটি দ্বীন ও এর নীতিমালার শাসনকে ভিত্তি করে গঠিত হয়। (( মুরতাদের-শাস্তি-আবুল-আলা-মওদূদি-পৃষ্টা; ৪৫ ))

মাওলানা মওদূদি (রহ)-এর বক্তব্যের মূল কথা হলো, মুরতাদের শাস্তিকে কেবল ব্যক্তিগত ধর্মত্যাগের প্রশ্ন হিসেবে দেখলে বিষয়টি ভুলভাবে উপস্থাপিত হয়। যারা এই শাস্তির বিরোধিতা করে, তারা বিষয়টিকে শুধুমাত্র ধর্মীয় বিশ্বাস বদলানোর স্বাধীনতা  হিসেবে বিবেচনা করে আপত্তি তোলে। অর্থাৎ তারা ইসলামকে একটি ব্যক্তিগত ধর্ম হিসেবেই ধরে নেয়।

কিন্তু মওদূদি (রহ) স্পষ্ট করেন যে, ইসলাম শুধু একটি ধর্ম নয়; বরং এটি একটি পূর্ণাঙ্গ জীবনব্যবস্থা ও রাষ্ট্রীয় কাঠামো। যে রাষ্ট্র আল্লাহর দ্বীন ও তার নীতিমালার ভিত্তিতে গঠিত, সেখানে নাগরিকত্ব মানেই কেবল বিশ্বাস নয়। বরং, একটি রাজনৈতিক ও আইনগত অঙ্গীকার

এই প্রেক্ষাপটে, মুরতাদ হওয়া মানে শুধু বিশ্বাস ত্যাগ নয়; বরং

  • ইসলামী রাষ্ট্রের আদর্শিক ভিত্তি প্রত্যাখ্যান করা,

  • রাষ্ট্রের প্রতি আনুগত্য ভঙ্গ করা,

  • এবং কার্যত রাষ্ট্রীয় শৃঙ্খলা ও নিরাপত্তার বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়া।

সুতরাং, মুরতাদের শাস্তি দ্বীনভিত্তিক রাষ্ট্রব্যবস্থার বিরুদ্ধে রাষ্ট্রদ্রোহিতার প্রেক্ষাপটেই বিবেচিত হয়। এই কারণেই মওদূদি (রহ)-এর মতে, ধর্মীয় রাষ্ট্রের দৃষ্টিতে এ শাস্তি যুক্তিসংগত ও ন্যায়সংগত।

সংক্ষেপে বলা যায়;

ধর্মকে বিচ্ছিন্ন করে দেখলে আপত্তি জন্মায়, আর দ্বীনভিত্তিক রাষ্ট্র হিসেবে দেখলে শাস্তির যৌক্তিকতা স্পষ্ট হয়।

আব্দুল করিম যাইদান বলেন, (( ইসলামী শরিয়াতে শাস্তির বিধান; ডা. আব্দুল করিম যাইদান; পৃষ্ঠা; ৬৭ ))

ডা. আব্দুল করিম যাইদান এখানে স্পষ্টভাবে দেখিয়েছেন যে মুরতাদ হওয়ার অপরাধ কেবল ব্যক্তিগত বিশ্বাস পরিবর্তনের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়, বরং ইসলাম ত্যাগের প্রকাশ্য ঘোষণা নিজেই একটি স্বতন্ত্র ও গুরুতর সামাজিক অপরাধ। তার যুক্তির কাঠামো মূলত পাঁচটি স্তম্ভের ওপর দাঁড়িয়ে;

প্রথমত, ইসলাম ত্যাগের ঘোষণা মুসলিম উম্মাহর সামষ্টিক আকীদাহকে হেয় করে। এটি ব্যক্তিগত পর্যায়ে সীমাবদ্ধ না থেকে সমাজের বিশ্বাস কাঠামোর ওপর আঘাত হানে।

দ্বিতীয়ত, ইসলামের ভিত্তিতে গড়ে ওঠা সামাজিক ও নৈতিক শৃঙ্খলাকে তাচ্ছিল্য করা হয়। ফলে দ্বীনভিত্তিক সমাজব্যবস্থার প্রতি অবজ্ঞা তৈরি হয়।

তৃতীয়ত, এর মাধ্যমে মুনাফিকদের কপটতা উসকে দেওয়া হয়। যারা অন্তরে ইসলাম মানে না, তারা প্রকাশ্যে ইসলাম বর্জনে উৎসাহিত হয় এবং কপটতা একটি সামাজিক প্রবণতায় পরিণত হয়।

চতুর্থত, দুর্বল আকীদাহ ও বিভ্রান্ত বিশ্বাসের সংমিশ্রণে সমাজে সংশয়, সন্দেহ ও বুদ্ধিবৃত্তিক অস্থিরতা জন্ম নেয়, যা সাধারণ মানুষের ঈমানকে ঝুঁকির মধ্যে ফেলে।

পঞ্চমত, এসব উপাদান মিলিতভাবে সমাজে চাঞ্চল্য সৃষ্টি করে এবং প্রতিষ্ঠিত ইসলামী সমাজব্যবস্থাকে অস্থিতিশীল করে তোলে—যা কার্যত একটি আদর্শিক ও সামাজিক বিশৃঙ্খলার জন্ম দেয়।

এই সব কারণে ডা. যাইদানের সিদ্ধান্ত হলো; সমাজকে রক্ষা করার স্বার্থেই মুরতাদকে শাস্তির আওতায় আনা অপরিহার্য। যেহেতু এই অপরাধের প্রভাব ব্যক্তি ছাপিয়ে পুরো সমাজ ও রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থাকে ক্ষতিগ্রস্ত করে, তাই এর শাস্তি রাখা হয়েছে মৃত্যুদণ্ড, যা অপরাধের ভয়াবহতার সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ।

সংক্ষেপে বলা যায়—

মুরতাদের শাস্তি ব্যক্তিগত স্বাধীনতা দমনের জন্য নয়; বরং আকীদাহ, সমাজ ও দ্বীনভিত্তিক ব্যবস্থাকে ধ্বংসের হাত থেকে রক্ষার জন্য।

কাজেই, ইসলামকে কেবল ‘ব্যক্তিগত ধর্ম’ হিসেবে দেখলে মূল বাস্তবতাই অস্বীকার করা হয়। মওদূদি (রহ) স্পষ্ট করেছেন, ইসলাম নিছক কিছু ইবাদত বা বিশ্বাসের নাম নয়। বরং এটি এমন একটি দ্বীন, যার নিজস্ব আইন, নৈতিকতা, সামাজিক শৃঙ্খলা ও শাসনব্যবস্থা রয়েছে। অর্থাৎ ইসলাম স্বভাবগতভাবেই রাষ্ট্র ও সমাজ পরিচালনার নীতিমালার দাবিদার

ইসলামী রাষ্ট্রের বৈধতা আসে দ্বীন থেকে, কোনো জাতি বা শ্রেণি থেকে নয়। মওদূদি (রহ)-এর ভাষায়, ইসলামী রাষ্ট্র কোনো বিশেষ জনগোষ্ঠীর শাসন নয়; বরং দ্বীনের শাসন। ফলে ইসলামী রাষ্ট্রের সংবিধান, আইন ও কর্তৃত্বের উৎস হলো ইসলাম নিজেই। এখানে ধর্ম আর রাষ্ট্র আলাদা কোনো সত্তা নয়—দুটো একে অপরের সাথে অবিচ্ছেদ্য। তাই ইসলামী রাষ্ট্রে নাগরিকত্ব মানে শুধু ভৌগোলিক বসবাস নয়, বরং আদর্শিক অঙ্গীকার
একজন ব্যক্তি যখন ইসলামী রাষ্ট্রের নাগরিক হিসেবে ইসলাম গ্রহণ করে বা তার আওতায় অবস্থান করে, তখন সে কেবল ব্যক্তিগত বিশ্বাসই গ্রহণ করে না; বরং

  • রাষ্ট্রের আদর্শিক ভিত্তি,

  • আইনগত কাঠামো,

  • এবং শাসনদর্শনের প্রতিও আনুগত্য প্রকাশ করে।

ফলে এই প্রেক্ষাপটে ইসলাম ত্যাগ করা মানে কেবল বিশ্বাস বদল নয়। ডা. আব্দুল করিম যাইদান দেখিয়েছেন—ইসলাম ত্যাগের প্রকাশ্য ঘোষণা সমাজে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করে, আকীদাহকে দুর্বল করে এবং প্রতিষ্ঠিত ইসলামী ব্যবস্থার প্রতি অবজ্ঞা জন্ম দেয়। অর্থাৎ এটি একটি সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় ক্ষতির কারণ। যেহেতু, ইসলামী রাষ্ট্রের সংবিধান ইসলামভিত্তিক, তার আইন ও নীতিমালা ইসলাম থেকেই উৎসারিত, এবং তার বৈধতা দ্বীনের ওপর দাঁড়িয়ে, সেহেতু, ইসলামী রাষ্ট্রে ইসলাম ত্যাগ = রাষ্ট্রের মূল ভিত্তি অস্বীকার / রাষ্ট্রের আদর্শিক ভিত্তি ও সাংবিধানিক কাঠামো প্রত্যাখ্যান করা। এটি আর ব্যক্তিগত ধর্মীয় সিদ্ধান্ত থাকে না; বরং রাষ্ট্রের অস্তিত্ব ও স্থিতিশীলতার বিরুদ্ধে অবস্থান হয়ে দাঁড়ায়।

এখানেই “ধর্ম” ও “দ্বীনভিত্তিক রাষ্ট্র”-এর পার্থক্য স্পষ্ট হয়। যারা ইসলামকে কেবল ধর্ম হিসেবে ধরে, তাদের কাছে মুরতাদের শাস্তি অযৌক্তিক মনে হয়। কিন্তু যারা ইসলামকে একটি পূর্ণাঙ্গ জীবনব্যবস্থা ও রাষ্ট্রীয় আদর্শ হিসেবে বোঝে, তাদের কাছে বিষয়টি দাঁড়ায় 'রাষ্ট্রদ্রোহের মতো অপরাধের শাস্তি।'

রাষ্ট্রদ্রোহিতার শাস্তি কী?

রাষ্ট্রদ্রোহিতা বলতে বুঝানো হয়, গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের সংবিধান অনুযায়ী, (১) কোন ব্যক্তি শক্তি প্রদর্শন বা শক্তি প্রয়োগের মাধ্যমে বা অন্য কোন অসাংবিধানিক পন্থায় - (ক) এই সংবিধান বা ইহার কোন অনুচ্ছেদ রদ, রহিত বা বাতিল বা স্থগিত করিলে কিংবা উহা করিবার জন্য উদ্যোগ গ্রহণ বা ষড়যন্ত্র করিলে ; কিংবা (খ) এই সংবিধান বা ইহার কোন বিধানের প্রতি নাগরিকের আস্থা, বিশ্বাস বা প্রত্যয় পরাহত করিলে কিংবা উহা করিবার জন্য উদ্যোগ গ্রহণ বা ষড়যন্ত্র করিলে- তাহার এই কার্য রাষ্ট্রদ্রোহিতা হইবে এবং ঐ ব্যক্তি রাষ্ট্রদ্রোহিতার অপরাধে দোষী হইবে। (২) কোন ব্যক্তি (১) দফায় বর্ণিত- (ক) কোন কার্য করিতে সহযোগিতা বা উস্কানি প্রদান করিলে; কিংবা (খ) কার্য অনুমোদন, মার্জনা, সমর্থন বা অনুসমর্থন করিলে- তাহার এইরূপ কার্যও একই অপরাধ হইবে।  (৩) এই অনুচ্ছেদে বর্ণিত অপরাধে দোষী ব্যক্তি প্রচলিত আইনে অন্যান্য অপরাধের জন্য নির্ধারিত দণ্ডের মধ্যে সর্বোচ্চ দণ্ডে দণ্ডিত হইবে। (( গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের সংবিধান | ৭ক। সংবিধান বাতিল, স্থগিতকরণ, ইত্যাদি অপরাধ (minlaw.gov.bd) )) সুতরাং, কোনো দেশের সংবিধান পরিপন্থি কাজ করা, বা সংবিধান রহিত, স্থগিত বা রদ করা, অথবা করার জন্য চেষ্টা করা এবং সংবিধানের প্রতি নাগরিকদের যে আস্থা, বিশ্বাস বা প্রত্যয় রয়েছে তা পরাহত বা বাধাগ্রস্ত করলে বা করার চেষ্টা করলে তা রাষ্ট্রদ্রোহিতা বলে গণ্য হবে। এবং অসাংবিধানিক কার্য করতে কাউকে সহযোগিতা করা কিংবা উসকানি প্রদান করিলে বা অসাংবিধানিক কার্য করাকে সমর্থন করাকেও রাষ্ট্রদ্রোহিতা বলে গণ্য করা হবে।

Leave a Comment