ইসলামে জিহাদের বিধান; জিহাদ ফি সাবিলিল্লাহ

ইসলামে জিহাদের বিধান; জিহাদ ফি সাবিলিল্লাহ

ইসলামে জিহাদের বিধান; জিহাদ ফি সাবিলিল্লাহ 

বর্তমান সময়ে অমুসলিম মহলে জিহাদ সম্পর্কে নানা ধরনের অপব্যাখ্যা ও অপপ্রচার লক্ষ্য করা যায়। বিশেষ করে অনেকেই জিহাদকে সন্ত্রাসবাদ বা নির্বিচার সহিংসতার সাথে তুলনা করে ইসলাম সম্পর্কে একটি ভুল ধারণা তৈরি করে। অথচ ইসলামের মূল উৎস কুরআন ও সুন্নাহর আলোকে জিহাদ একটি নীতিনির্ভর, সীমাবদ্ধ ও উদ্দেশ্যভিত্তিক ধারণা, যার সাথে অন্যায় বা নিরীহ মানুষের উপর আক্রমণের কোনো সম্পর্ক নেই। এই লেখায় মূলত জিহাদের প্রকৃত ধারণা বিষয়ে ইসলামের অবস্থান তুলে ধরে অমুসলিমদের অভিযোগের জবাব দেওয়ার চেষ্টা করা হয়েছে। 

জিহাদ শব্দের অর্থ কি? 

الجهاد’ আরবী শব্দ, এটা جَاهَدَ، يُجَاهِدُ، مُجَاهِدٌ، مُجَاهَدَةً থেকে গঠিত হয়েছে, যার অর্থ : কঠোর পরিশ্রম ও চরম কষ্টের মাধ্যমে কথা ও কাজের শক্তি ও সামর্থ্যের দ্বারা সর্বাত্মক প্রচেষ্টা ও সাধনা। মানুষের সার্বিক শক্তি ও সামর্থ্যকে বিনিয়োগ করার অর্থ হলো الجهاد প্রখ্যাত আরবী ভাষার বিশ্বকোষ لسان العرب প্রণেতা বলেন : الجهدُ والجُهدُ অর্থ শক্তি-সামর্থ্য ক্ষমতা। এমনি বলা হয় الجهدُ কঠোর পরিশ্রম এবং الجهدُ চরম কষ্ট । (( ইসলামে জিহাদের বিধান; ড. মুহাম্মদ নাজীবুর রহমান; পৃষ্ঠাঃ ৩৯ )) 

জিহাদের পারিভাষিক অর্থ

الْجِهَادُ -কে যখন আল্লাহর পথের সাথে সম্পৃক্ত করা হয় তখন তার অর্থ হয় “আল্লাহর বিধানকে বিজয়ী করার জন্য আল্লাহদ্রোহীদের বিরুদ্ধে সংগ্রাম করা, প্রস্তুতি গ্রহণ করা এবং এজন্য নির্ধারিত কর্মসূচী বাস্তবায়ন করা ।” সুতরাং ইসলামে الْجِهَادُ -কে (فِي سَبِيلِ اللَّهِ) আল্লাহর পথের সাথে সম্পৃক্ত করা হয়েছে, যার কারণে গোত্রের জন্য লড়াই, শ্রেণীর জন্য লড়াই জাতির বা দেশের জন্য লড়াই, দুনিয়াবী কোনো স্বার্থ, লোভ অথবা প্রবৃত্তির চাহিদা পূরণের জন্য লড়াই থেকে তা সম্পূর্ণভাবে আলাদা পরিচিতি লাভ করেছে । এর থেকে জানতে পারলাম যে, শরীয়তের পরিভাষায় الْجِهَادُ বলা হয় : আল্লাহর সন্তুষ্টির লক্ষ্যে ইসলামের বিজয়ের জন্য মু’মিনের জান ও মাল দিয়ে সর্বাত্মক সংগ্রাম সাধনা চালানো । (( ইসলামে জিহাদের বিধান; ড. মুহাম্মদ নাজীবুর রহমান; পৃষ্ঠাঃ ৪১-৪২ )) সাইয়েদ আবুল আলা মওদূদি (রহ) বলেন,

আভিধানিক দিক দিয়ে জিহাদ শব্দের অর্থ হলো “কোন কাজ সম্পাদনের বা কোন উদ্দেশ্য সাধনের জন্য চুড়ান্ত চেষ্টা করা।”... “চেষ্টা” ভালোর জন্যও হতে পারে, মন্দের জন্যও হতে পারে। তাই একে আরো খানিকটা সীমিত করার জন্য 'ফি সাবিলিল্লাহ' বা আল্লাহর পথে কথাটা জুড়ে দেয়া হয়েছে। উদ্দেশ্য হলো প্রবৃত্তির কোন লালসা চরিতার্থ করা, দেশকে পদানত করা, কোন নারীকে হস্তগত করা, কোন ব্যক্তিগত শত্রুতার প্রতিশোধ গ্রহণ করা, কিংবা ধনসম্পদ, ক্ষমতা,পদমর্যাদা ও সুনাম-সুখ্যাতি অর্জনের উদ্দেশ্যে চেষ্টা করা যেন তার মধ্যে প্রবিষ্ট হতে না পারে। বরং শুধুমাত্র সেই চেষ্টাকে বুঝানোই এর উদ্দেশ্য যা শুধুমাত্র আল্লাহর উদ্দেশ্যে নিবেদিত।যার মধ্যে স্বার্থপরতা ও প্রবৃত্তিপুজার নামগন্ধ পর্যন্ত নেই এবং তা শুধুমাত্র আল্লাহর মনোনীত ও পছন্দনীয় উদ্দেশ্য সিদ্ধি করার জন্যই নিয়োজিত। (( আল জিহাদ ফিল ইসলাম; সাইয়েদ আবুল আলা মওদূদি; পৃষ্ঠাঃ ২২৫ ))

কাজেই, ইসলামে জিহাদ বলতে ব্যক্তিগত স্বার্থ, ক্ষমতা বা দুনিয়াবি লাভের জন্য যুদ্ধকে বোঝায় না; বরং আল্লাহর সন্তুষ্টি ও সত্য প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে সর্বাত্মক প্রচেষ্টা ও সংগ্রাম চালানোকে বোঝায়। পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তা;আলা বলেন,

যারা ঈমান এনেছে তারা লড়াই করে আল্লাহর রাস্তায়, আর যারা কুফরী করেছে তারা লড়াই করে তাগূতের পথে। সুতরাং তোমরা লড়াই কর শয়তানের বন্ধুদের বিরুদ্ধে। নিশ্চয় শয়তানের চক্রান্ত দুর্বল। ( সূরা আন-নিসা (An-Nisa) আয়াত ৭৬ - বাংলা অনুবাদ, তাফসীর ও তাজউইদ ))

জিহাদ কখন ফরজ হয়?

পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তা’আলা বলেন,

আর তাদের বিরুদ্ধে লড়াই কর যে পর্যন্ত না ফিতনা খতম হয়ে যায় এবং দীন আল্লাহর জন্য হয়ে যায়। সুতরাং তারা যদি বিরত হয়, তাহলে যালিমরা ছাড়া (কারো উপর) কোন কঠোরতা নেই। (( সূরা আল-বাকারা (Al-Baqara) আয়াত ১৯৩ - বাংলা অনুবাদ, তাফসীর ও তাজউইদ))

এই আয়াতের ব্যাখ্যায় মাওলানা মওদূদি (রহ) বলেন,

এখানে حَتّٰى (যতক্ষণ) শব্দটি একটি সীমারেখা টেনে দিয়েছে। অর্থাৎ যতক্ষণ বিশৃঙ্খলার অস্তিত্ব থাকে এবং ইসলামের অগ্রগতি ও প্রসারের পথে অন্তরায় থাকে ততক্ষণ যুদ্ধ চালাতে হবে। এই দুটো জিনিস যখন দূরীভূত হয় তখন যুদ্ধ বন্ধ করে দিতে হবে। আয়াতের পরবর্তী অংশে বলা হয়েছে : فَلَمَّا انْتَهَوْا فَانْتَهُوا إِنَّ اللَّهَ غَفُورٌ رَّحِيمٌ  “তারা যদি বিশৃঙ্খলা ছড়ানো থেকে বিরত হয় তাহলে জেনে রাখা দরকার যে জালেমদের ছাড়া আর কারো জন্য শাস্তি নেই।” (সূরা বাকারা—২৯৩) সূরা মায়েদায় আরো সুস্পষ্টভাবে মানুষের প্রাণ বধ করা কখন হারাম এবং কখন হালাল তা বলা হয়েছে : مَنْ قَتَلَ نَفْسًا بِغَيْرِ نَفْسٍ أَوْ فَسَادٍ فِي الْأَرْضِ فَكَأَنَّمَا قَتَلَ النَّاسَ جَمِيعًا  “কাউকে হত্যা করেনি এবং অরাজকতা ও গোলযোগ সৃষ্টি করেনি এমন ব্যক্তির প্রাণ যে বধ করবে সে যেন গোটা মানবজাতিকেই হত্যা করলো।” (সূরা মায়েদা—৫)  এ থেকে বুঝা গেল যে, মানুষকে শুধু দুই অবস্থায় হত্যা করা যায়ঃ 
  • প্রথমতঃ সে যদি অন্য কোন মানুষকে অন্যায়ভাবে হত্যা করে।
  • দ্বিতীয়তঃ সে যদি পৃথিবীতে অরাজকতা ও দাঙ্গাহাঙ্গামা সৃষ্টি করে। 
এই দুই অবস্থায় ব্যতীত তৃতীয় কোন অবস্থায় কাউকে হত্যা করা শুদ্ধ নয় — এত বড় পাপ যে আল্লাহ তাকে সমগ্র মানব-জাতিকে হত্যা করার সমান মনে করেন। সূরা তাওবায় জিজিয়া আদায় করাকে যুদ্ধের প্রাত্যক সীমা বলে ঘোষণা করা হয়েছে। যথা : فَإِنْ تَابُوا وَأَقَامُوا الصَّلَاةَ وَآتَوُا الزَّكَاةَ فَخَلُّوا سَبِيلَهُمْ “তারা যতক্ষণ না স্বহস্তে জিজিয়া দিয়ে বশ্যতা স্বীকার করে ততক্ষণ তাদের সাথে যুদ্ধ করো।” (সূরা তাওবা) এ থেকে বুঝা গেল যে, কাফেররা যখন জিজিয়া আদায় করে ইসলামী আইনের আনুগত্য গ্রহণে রাজী হয়ে যায় তখন আর তাদের সাথে যুদ্ধ করা যায় না এবং যুদ্ধের অনুমতির সীমা শেষ হয়ে যায়। সূরা শূরায় একটা মৌলিক বিধি বর্ণনা করা হয়েছে। সে বিধি অনুসারে যারা মানুষের উপর জুলুম করেনা এবং পৃথিবীতে কোন গোলযোগ ও বিশৃঙ্খলার সৃষ্টি করেনা তাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ বিগ্রহ করা বৈধ নয়। مَنْ انْتَصَرَ بَعْدَ ظُلْمِهِ فَأُولَٰئِكَ مَا عَلَيْهِمْ مِنْ سَبِيلٍ ۝ إِنَّمَا السَّبِيلُ عَلَى الَّذِينَ يَظْلِمُونَ النَّاسَ وَيَبْغُونَ فِي الْأَرْضِ بِغَيْرِ الْحَقِّ ۚ أُولَٰئِكَ لَهُمْ عَذَابٌ أَلِيمٌ   “যে ব্যক্তি জুলুমে পিষ্ট হয়ার পর তার বদলা গ্রহণ করে তাকে দোষ দেওয়া যায় না। দোষ দেওয়া যায় কেবল তাদেরকে যারা মানুষের উপর জুলুম করে এবং নাহকভাবে হঠকারিতা ও অহংকার করে। তাদের জন্য রয়েছে যন্ত্রণাদায়ক শাস্তি।”  ( সূরা আশ-শূরা  ৪২:৪১-৪২) সূরা মুমতাহিনায় বলা হয়েছে যে, কাফেরদের মধ্যে যারা সত্য দ্বীন ও তার অনুসারীদের দুশমন, কেবল তাদের সাথেই মুসলমানদের শত্রুতা থাকবে। যারা সে ধরনের নয়, তাদের সাথে সদাচার ও ন্যায় বিচার মূলক ব্যবহার করতে মুসলমানদের নিষেধ করা হয়নি। لَا يَنْهَاكُمُ اللَّهُ عَنِ الَّذِينَ لَمْ يُقَاتِلُوكُمْ فِي الدِّينِ وَلَمْ يُخْرِجُوكُمْ مِنْ دِيَارِكُمْ أَنْ تَبَرُّوهُمْ وَتُقْسِطُوا إِلَيْهِمْ ۚ إِنَّ اللَّهَ يُحِبُّ الْمُقْسِطِينَ ۝ إِنَّمَا يَنْهَاكُمُ اللَّهُ عَنِ الَّذِينَ قَاتَلُوكُمْ فِي الدِّينِ وَأَخْرَجُوكُمْ مِنْ دِيَارِكُمْ وَظَاهَرُوا عَلَىٰ إِخْرَاجِكُمْ أَنْ تَوَلَّوْهُمْ ۚ وَمَنْ يَتَوَلَّهُمْ فَأُولَٰئِكَ هُمُ الظَّالِمُونَ (সূরা মুমতাহিনা ৬০:৮-৯) “যারা দ্বীনের প্রশ্নে তোমাদের সাথে যুদ্ধ করেনি এবং তোমাদেরকে তোমাদের ঘরবাড়ী থেকে বহিষ্কার করেনি তাদের সাথে ইনসাফ ও সদাচার করতে আল্লাহ তোমাদেরকে নিষেধ করেন না। কেননা আল্লাহ ইনসাফকারীদের ভালোবাসেন। আল্লাহ তায়ালা কেবল সেই কাফেরদের সাথে বন্ধুত্ব করতে তোমাদেরকে নিষেধ করেন যারা তোমাদের সাথে দ্বীনের প্রশ্নে যুদ্ধ করেছে, তোমাদেরকে তোমাদের বাড়িঘর থেকে বহিষ্কার করেছে এবং তোমাদেরকে বহিষ্কার করার ব্যাপারে শত্রুদের সাহায্য করেছে। যারা এ ধরনের কাফেরদের সাথে বন্ধুত্ব করে তারা জালেম।” (সূরা মুমতাহিনা) এই সব নির্দেশের মর্ম এত স্পষ্ট যে এর জন্য আদৌ কোন ব্যাখ্যার প্রয়োজন হয় না। এ থেকে পরিষ্কার জানা যায় যে, ইসলামী যুদ্ধের আসল উদ্দেশ্য মানুষকে বল প্রয়োগে মুসলমান করা নয়,—বরং এর প্রকৃত উদ্দেশ্য হলো জুলুম, হঠকারিতা এবং বিশৃঙ্খলা—অরাজকতা নির্মূল করে তাদেরকে সুচিন্তামূলক আইন ও বিধানের অনুগত করে দেওয়া। যারা ইসলাম ও মুসলমানদের নির্মূল করার চেষ্টা করে কিংবা পৃথিবীতে ফেৎনা ও ফাসাদ তথা অরাজকতা ও বিশৃঙ্খলা ছড়ায় তাদের শিরোচ্ছেদ করার ব্যাপারে ইসলামের তরবারি নিঃসন্দেহে অত্যন্ত ধারালো ও শক্তিশালী। এ ব্যাপারে তারা ধারালো ও শক্তিশালী হওয়া যে ন্যায় সঙ্গত তা কেউ অস্বীকার করতে পারবে না। কিন্তু যারা জালেম নয়, পাতকীও নয়, যারা আল্লাহর পথ অবরোধ করেনা, যারা সত্য দ্বীনকে নির্মূল করতে ও তার অগ্রগতি রোধ করতে চেষ্টা করেনা, যারা মানুষের শান্তি, শৃঙ্খলা ও নিরাপত্তা ক্ষুন্ন করেনা, তারা যে জাতির লোকই হোক না কেন এবং তাদের আকীদা বিশ্বাস যত বাতিল ও ভ্রষ্ট হোক না কেন ইসলাম তাদের জান ও মালে হস্তক্ষেপ করে না। তাদের ব্যাপারে ইসলামের তরবারি তোতা। তাদের রক্তপাত ইসলামের চোখে অত্যন্ত হারাম।  (( আল জিহাদ ফিল ইসলাম; সাইয়েদ আবুল আলা মওদূদি; পৃষ্ঠাঃ১৬২-১৬৫ ))

  উপরিউক্ত আলোচনা ও কুরআনের বিভিন্ন আয়াতের ব্যাখ্যা থেকে স্পষ্ট হয় যে, ইসলামে জিহাদ নির্দিষ্ট কিছু নীতিমালা ও সীমারেখার অধীন একটি বৈধ সংগ্রাম। এর মূল উদ্দেশ্য হলো ফিতনা, জুলুম, অরাজকতা ও দ্বীনের পথে বাধা দূর করা এবং ন্যায়ভিত্তিক সমাজ প্রতিষ্ঠা করা। মাওলানা মওদূদী (রহ.)-এর ব্যাখ্যা অনুযায়ী, যতক্ষণ পর্যন্ত সমাজে বিশৃঙ্খলা ও দ্বীনের প্রসারের পথে বাধা বিদ্যমান থাকে, ততক্ষণ পর্যন্ত প্রতিরোধমূলক যুদ্ধ অব্যাহত থাকতে পারে; কিন্তু এসব বাধা দূর হয়ে গেলে যুদ্ধের অনুমতিও শেষ হয়ে যায়। কুরআনের শিক্ষা অনুযায়ী, নিরপরাধ মানুষকে হত্যা করা অত্যন্ত বড় অপরাধ এবং যুদ্ধ কেবলমাত্র তাদের বিরুদ্ধে বৈধ যারা জুলুম করে, দাঙ্গা-ফাসাদ সৃষ্টি করে বা আক্রমণ চালায়। অন্যদিকে যারা শান্তিপূর্ণ, নিরপেক্ষ এবং মুসলমানদের বিরুদ্ধে শত্রুতায় লিপ্ত নয়, তাদের সাথে সদাচার ও ন্যায়বিচার করতে ইসলাম নিষেধ করে না। এমনকি ইসলাম বলপূর্বক ধর্মান্তরের উদ্দেশ্যে যুদ্ধকে বৈধতা দেয় না; বরং এর লক্ষ্য হলো জুলুম ও বিশৃঙ্খলা দূর করে নিরাপত্তা ও ন্যায় প্রতিষ্ঠা করা। সুতরাং, ইসলামে জিহাদ কোনো আগ্রাসী বা স্বার্থভিত্তিক যুদ্ধ নয়; বরং এটি নির্ধারিত পরিস্থিতিতে ন্যায় ও নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠার জন্য পরিচালিত একটি নিয়ন্ত্রিত ও নীতিনির্ভর সংগ্রাম।

ইসলামে জিহাদের স্বরুপ

মাওলানা মওদূদি (রহঃ) আল জিহাদ ফিল ইসলাম গ্রন্থে উল্লেখ করেন,

এই আদর্শ (ইসলাম) অনুসারে যুদ্ধের উদ্দেশ্য প্রতিপক্ষকে নিশ্চিহ্ন করা ও তার অনিষ্ট সাধন করা নয় বরং উদ্দেশ্য হলো শুধু মাত্র তার ক্ষতি ও অনিষ্ট রোধ করা। এইজন্য ইসলামের নীতি হলো, যুদ্ধে শুধুমাত্র যতটা শক্তি প্রয়োগ না করলে ক্ষতি ও অনিষ্ট রোধকরা সম্ভব নয়, কেবল ততটাই প্রয়োগ করা উচিৎ।  আর সেই সীমিত শক্তির প্রয়োগও হওয়া চাই শুধুমাত্র সেই সব লোকের বিরুদ্ধে যারা কার্যতঃ যুদ্ধরত কিংবা বড়জোর যাদের দিক থেকে ক্ষতির আশংকা আছে। এ ছাড়া বাদবাকী সকল শ্রেণীর মানুষের যুদ্ধের প্রভাব থেকে মুক্ত থাকা বাঞ্ছনীয়। আর শত্রুর যে সব জিনিসের সাথে যুদ্ধের সম্পর্ক নেই তাকেও আক্রমনের আওতায় আনা উচিৎ নয়।… আভিধানিক দিক দিয়ে জিহাদ শব্দের অর্থ হলো “কোন কাজ সম্পাদনের বা কোন উদ্দেশ্য সাধনের জন্য চুড়ান্ত চেষ্টা করা।”... “চেষ্টা” ভালোর জন্যও হতে পারে, মন্দের জন্যও হতে পারে। তাই একে আরো খানিকটা সীমিত করার জন্য 'ফি সাবিলিল্লাহ' বা আল্লাহর পথে কথাটা জুড়ে দেয়া হয়েছে। উদ্দেশ্য হলো প্রবৃত্তির কোন লালসা চরিতার্থ করা, দেশকে পদানত করা, কোন নারীকে হস্তগত করা, কোন ব্যক্তিগত শত্রুতার প্রতিশোধ গ্রহণ করা, কিংবা ধনসম্পদ, ক্ষমতা,পদমর্যাদা ও সুনাম-সুখ্যাতি অর্জনের উদ্দেশ্যে চেষ্টা করা যেন তার মধ্যে প্রবিষ্ট হতে না পারে। বরং শুধুমাত্র সেই চেষ্টাকে বুঝানোই এর উদ্দেশ্য যা শুধুমাত্র আল্লাহর উদ্দেশ্যে নিবেদিত।যার মধ্যে স্বার্থপরতা ও প্রবৃত্তিপুজার নামগন্ধ পর্যন্ত নেই এবং তা শুধুমাত্র আল্লাহর মনোনীত ও পছন্দনীয় উদ্দেশ্য সিদ্ধি করার জন্যই নিয়োজিত। (( আল জিহাদ ফিল ইসলাম; সাইয়েদ আবুল আলা মওদূদি; পৃষ্ঠাঃ ২২৫ ))

বেসামরিক লোকদের নিরাপত্তা

মাওলানা মওদূদি (রহঃ) আল জিহাদ ফিল ইসলাম গ্রন্থে উল্লেখ করেন,

এ প্রসঙ্গে প্রথম কথা হলো, যুদ্ধরতদের দুই শ্রেণীতে ভাগ করা হয়েছে। 
  • এক সামরিক লোকজন,
  •  দ্বিতীয় বেসামরিক লোকজন। 
সামরিক লোক হলো যারা সক্রিয়ভাবে যুদ্ধে অংশ নেয় কিংবা প্রচলিত রীতি অনুসারে বা সাধারণ বুদ্ধিবৃত্তির বিচারে সক্রিয়ভাবে যুদ্ধে অংশ গ্রহণ করার যোগ্য বলে বিবেচিত হয়। অর্থাৎ যুবক পুরুষ। আর যারা প্রচলিত রীতিনীতি বা সাধারণ বুদ্ধিবৃত্তির বিচারে যুদ্ধে অংশ নিতে পারেনা বা সাধারণভাবে নেয় না। যেমন নারী, শিশু, বৃদ্ধ, রোগী, আহত, অন্ধ, পঙ্গু, উন্মাদ, পর্যটক, খানকায় বাসকারী তপস্বী, মন্দির ও উপাসনালয়ের সেবক এবং এমনি ধরনের অনিষ্টহীন লোকজন।…একবার রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম রণাঙ্গনে এক মহিলার লাশ দেখতে পেলেন। তিনি রুষ্ট হয়ে বললেনঃ مَا كَانَتْ هٰذِهِ تُقَاتِلُ فِيْنَ يَقَاتِلُ “এই মহিলা তো যুদ্ধকারীদের অন্তর্ভুক্ত ছিল না!” অতঃপর সেনাপতি হযরত খালেদ (রাঃ) কে বলে পাঠালেনঃ لَا تَقْتُلُوا امْرَأَةً وَلَا صَبِيًّا “কোন মহিলা কিংবা মজুরকে হত্যা করো না।” অন্য এক বর্ণনায় জানা যায় যে, এ ঘটনার পর হযরত মহিলা ও শিশুদেরকে হত্যা করা সম্পূর্ণ রূপে নিষিদ্ধ করে দেন। এক হাদিসে হযরত রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন: لَا تَقْتُلُوا شَيْخًا فَانِيًا وَلَا طِفْلًا صَغِيرًا وَلَا امْرَأَةً وَلَا تَغْلُوا وَلَا تَمْثُلُوا وَاصْلَحُوا وَأَحْسِنُوا إِنَّ اللَّهَ يُحِبُّ الْمُحْسِنِينَ “কোন বৃদ্ধ, শিশু ও নারীকে হত্যা করো না। গণিমতের মাল অপহরণ করো না। যুদ্ধে যা কিছু হস্তগত হয় একত্র করো। ভালো কাজ ও ভালো ব্যবহার করো। আল্লাহ সৎকর্মশীলদের ভালোবাসেন।” মক্কা বিজয়ের সময় তিনি স্পষ্ট ভাষায় বলে দেন যে, কোন আহত ব্যক্তির উপর হামলা করা চলবে না, প্রাণ ভয়ে ছুটে পালাচ্ছে এমন কোন ব্যক্তির পিছু ধাওয়া করা চলবে না এবং যে ব্যক্তি দরজা বন্ধ করে ঘরের মধ্যে বসে থাকবে তাকে কিছু বলা যাবে না। হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বর্ণনা করেন যে, হযরত কোথাও সৈন্য প্রেরণের সময় উপাসনালয়ের নিরীহ সেবকদের ও অশ্বমেধ সাধক সাম্যাসীদের হত্যা করতে নিষেধ করে দিতেন। এই সব ঘটনার বর্ণনা থেকে মুসলিম ফেকাহ শাস্ত্রবিদগণ এই মূলনীতি নির্ধারণ করেছেন যে, যে সব লোক যুদ্ধ করতে অক্ষম সাধারণত অক্ষম বলে বিবেচিত হয়ে থাকেন, তাদের সাথে মুসলমানদের যুদ্ধ করা বৈধ নয়, অথবা এ ব্যবস্থা শত্রুহীন নয়। তারা যদি সক্রিয়ভাবে যুদ্ধে অংশ না নেয় তবেই এই ব্যবস্থা। তাদের কেউ যদি সামরিক তৎপরতায় সত্যি সত্যিই শামিল হয় যেমন যুদ্ধ ব্যক্তি খাঁটের উপর শুয়ে শুয়ে যুদ্ধের কৌশল নিষ্ক্রিয় দিতে থাকে। নারী শত্রুর গুপ্তচর বৃত্তিতে লিপ্ত হয়, শিশু গোপন তথ্য আদান প্রদান করে, অথবা ধর্মীয় আশ্রম বা উপাসনালয়ের লোকেরা তার জাতির মধ্যে যুদ্ধের উদ্দীপনা সৃষ্টি করে তা হলে তাকে হত্যা করা বৈধ হবে। কেননা সে নিজেই সামরিক লোকদের সাথে যোগ দিয়ে নিজেকে বেসামরিক লোকদের অধিকার থেকে বঞ্চিত করে। এ ক্ষেত্রে ইসলামী আইনের সার কথা হলো, সামরিক লোকদেরকে হত্যা করা যাবে—চাই তারা সক্রিয়ভাবে যুদ্ধে লিপ্ত থাক বা না থাক। আর বেসামরিক লোকদেরকে কেবল তখনই হত্যা করা যাবে যখন তারা সক্রিয়ভাবে যুদ্ধে লিপ্ত থাকে কিংবা সক্রিয় যোদ্ধাদেরই শোতা পায় এমন তৎপরতা চালায়। (( আল জিহাদ ফিল ইসলাম; সাইয়েদ আবুল আলা মওদূদি; পৃষ্ঠাঃ ২৩০-২৩২ ))

সুতরাং, ইসলামী যুদ্ধনীতিতে মানুষকে সাধারণত দুই ভাগে ভাগ করা হয়েছে—সামরিক ও বেসামরিক। নারী, শিশু, বৃদ্ধ, রোগী, ধর্মীয় উপাসনালয়ের সেবকসহ যারা যুদ্ধে অংশ নেয় না, তারা বেসামরিক হিসেবে গণ্য এবং তাদের হত্যা কঠোরভাবে নিষিদ্ধ। নবী করিম (সা.) যুদ্ধের সময় বেসামরিকদের ক্ষতি করতে স্পষ্টভাবে নিষেধ করেছেন এবং ফিকহবিদরা এ থেকে নীতি নির্ধারণ করেছেন যে, কেবলমাত্র সক্রিয় যোদ্ধা বা যুদ্ধে সরাসরি সহায়তাকারীদের বিরুদ্ধেই ব্যবস্থা নেওয়া যাবে; নিরীহ মানুষের নিরাপত্তা সর্বাবস্থায় রক্ষা করতে হবে। সার্বিক আলোচনার ভিত্তিতে স্পষ্ট হয় যে, ইসলামী জিহাদ কোনো অবস্থাতেই অন্ধ সহিংসতা বা সন্ত্রাস নয়; বরং এটি নির্দিষ্ট নৈতিক ও আইনি সীমার মধ্যে পরিচালিত একটি ন্যায়ভিত্তিক সংগ্রাম। এতে নিরীহ ও বেসামরিক মানুষের নিরাপত্তাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে এবং তাদের ক্ষতি করা কঠোরভাবে নিষিদ্ধ করা হয়েছে। তাই জিহাদ সম্পর্কে সন্ত্রাসবাদমূলক যে প্রচারণা চালানো হয়, তা ইসলামের মৌলিক শিক্ষা ও ঐতিহাসিক বাস্তবতার সম্পূর্ণ বিপরীত।

Leave a Comment