ইসলামে কী যুক্তি চর্চা হারাম? যুক্তিবিদ্যা ও ইলমুল কালাম।
ইদানীং বংগীয় নাস্তিকদের মধ্যে একটি নতুন কৌশল লক্ষ করা যাচ্ছে। যুক্তি ও দর্শনভিত্তিক আলোচনায় মুসলিমদের কাছে ধারাবাহিকভাবে পরাজিত হওয়ার পর তারা এখন অভিযোগ তুলছে “ইসলামে নাকি যুক্তি চর্চাই হারাম!” তাদের দাবি অনুযায়ী, যেহেতু ইসলামে যুক্তি চর্চা করা শরিয়তসম্মত নয়, সেহেতু মুসলিমরা নাকি আদৌ যুক্তি দিয়ে কাউকে পরাস্ত করতে পারে না। অর্থাৎ মুসলিমরা যুক্তি ব্যবহার করলে সেটা হবে নিজের ধর্মের বিরোধিতা! সত্য বলতে কী, যুক্তিতে টিকতে না পেরে পালিয়ে বাঁচার জন্য এর চেয়ে হাস্যকর অজুহাত আর হতে পারে না।
জর্দানের সরকারি মুসলিম ফতোয়া বিভাগ বা Iftaa Department-এর অফিসিয়াল ওয়েবসাইটে 'যুক্তিবিদ্যা (Logic) শিক্ষা করা এবং যুক্তিবিদ্যার প্রভাব রয়েছে এমন উসূলুল ফিকহ শিক্ষা দেওয়া কি জায়েয?' প্রশ্নের জবাবে বলা হয়েছে,
মাসিক আল ইতিছামে “যুক্তি শেখার জন্য বিভিন্ন যুক্তিবিদ্যার বই পড়া কি জায়েয?” শিরোনামের প্রশ্নের জবাবে বলেন,প্রশ্ন:
যুক্তিবিদ্যা (Logic) শিক্ষা করা এবং যুক্তিবিদ্যার প্রভাব রয়েছে এমন উসূলুল ফিকহ শিক্ষা দেওয়া কি জায়েয?
উত্তর:
সমস্ত প্রশংসা আল্লাহর জন্য। দরুদ ও সালাম বর্ষিত হোক মহানবী মুহাম্মাদ ﷺ, তাঁর পরিবার ও তাঁর নেক সাহাবিদের ওপর।
যুক্তিবিদ্যা শরিয়াহ-সংক্রান্ত বিদ্যার অন্তর্ভুক্ত; কারণ এটি শরিয়াহ বোঝার একটি মাধ্যম। বস্তুত, সত্য এবং বিভিন্ন বিষয়ের প্রমাণ ও দিকনির্দেশ যুক্তির মাধ্যমেই অনুধাবন করা হয়। ইবন আবিদীন (রহ.) বলেন:
“যুক্তিবিদ্যা হলো দলিল অনুসন্ধান, দলিলের শর্তাবলি এবং সংজ্ঞা ও সংজ্ঞার শর্তাবলি সম্পর্কে জ্ঞান। এই দুটিই ইসলামী কালামের অন্তর্ভুক্ত।”
(রদ্দুল মুহতার, ১/৪৩)ইমাম ইবন হাজর আল-হাইতামী (রহ.) যুক্তিবিদ্যার অবস্থান ও গুরুত্ব সম্পর্কে বলেন:
“শরিয়াহ-সংক্রান্ত জ্ঞান এবং তার সহায়ক বিদ্যাগুলোর অন্তর্ভুক্ত হলো যুক্তিবিদ্যা।”
(আল-মিনহাজ আল-কাওয়ীম, ১/৪৫)যেহেতু যুক্তিবিদ্যা উসূলুল ফিকহসহ শরিয়াহর অন্যান্য শাখা বুঝতে সহায়ক, তাই এটি অন্যান্য শরিয়াহ বিদ্যার মতোই ফরযে কিফায়া। অর্থাৎ মুসলিম উম্মাহর একটি শ্রেণির জন্য এটি আয়ত্ত করা আবশ্যক। কারণ ইসলাম সম্পর্কে উত্থাপিত সন্দেহ ও বিভ্রান্তি যুক্তিনির্ভর ও শাস্ত্রীয় পদ্ধতিতে খণ্ডন করা ফরযে কিফায়ার অন্তর্ভুক্ত।
(মুগনি আল-মুহতাজ, ৬/৯)তবে কোনো কোনো ক্ষেত্রে কোনো নির্দিষ্ট বিদ্যা অর্জন করা ব্যক্তিগত ফরয হয়ে যায়। যে ব্যক্তি ইমামত ও ইজতিহাদের যোগ্যতা ও সামর্থ্য রাখে, তার জন্য জ্ঞান অর্জন ফরযে আইন হয়ে যায়।
“যে ব্যক্তি ইমামত ও ইজতিহাদের সক্ষমতা রাখে, তার জন্য জ্ঞান অন্বেষণ অপরিহার্য।”
(মানহুল জালীল, ৩/১৩৮)যুক্তিবিদ্যার বই মূলত দুই প্রকার। এক প্রকার এমন, যেগুলো ভ্রান্ত দার্শনিক মতবাদ দ্বারা প্রভাবিত; আরেক প্রকার এমন, যেগুলো সে ধরনের প্রভাবমুক্ত। যুক্তিবিদ্যা সম্পর্কে যেসব ফিকহি মতামতে নিষেধাজ্ঞা পাওয়া যায়, তা মূলত সেইসব গ্রন্থের ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য, যেগুলো ভ্রান্ত আকিদা ও বাতিল দর্শনে পরিপূর্ণ—যাতে মানুষ গোমরাহিতে না পড়ে।
আর যেসব যুক্তিবিদ্যার গ্রন্থ মুসলিম আলেমগণ শিক্ষা ও পাঠদানের জন্য গ্রহণযোগ্য বলে স্বীকৃতি দিয়েছেন—যেগুলো ইসলামের আকিদার পরিপন্থী মতবাদে মিশ্রিত নয়—সেগুলো শেখা ও শেখানো জায়েয। এই কারণেই অধিকাংশ মুসলিম আলেম যুক্তিবিদ্যাকে হারাম বলেননি; কারণ এটি ভ্রান্ত দর্শন থেকে পরিশোধিত একটি শাস্ত্র।
ইবন আবিদীন (রহ.) বলেন:
“মুসলিম আলেমদের যুক্তিবিদ্যাকে নিষিদ্ধ করা বৈধ নয়—যে যুক্তিবিদ্যা ইসলামী মূলনীতি-সংক্রান্ত বিষয়াদি নিয়ে আলোচনা করে। ইমাম গাজ্জালী একে ‘বিদ্যার মানদণ্ড’ (মিয়্যারুল উলূম) নামে অভিহিত করেছেন, এবং এ বিষয়ে মুসলিম আলেমগণ বহু গ্রন্থ রচনা করেছেন।”
(রদ্দুল মুহতার, ১/৪৫)উপরোক্ত আলোচনার ভিত্তিতে বলা যায়, যুক্তিবিদ্যা এবং যুক্তিবিদ্যার বিষয়সমূহ অন্তর্ভুক্ত উসূলুল ফিকহ—উভয়ই শরিয়াহ-সংক্রান্ত বিদ্যার অংশ এবং ফরযে কিফায়ার অন্তর্ভুক্ত। তদুপরি, এ ধরনের জ্ঞানসমৃদ্ধ গ্রন্থসমূহের মর্যাদাও শরিয়াহ গ্রন্থসমূহের মতোই গণ্য হবে। আর আল্লাহই সর্বাধিক জ্ঞাত। (( Iftaa' Department - Is it permissible to learn Logic, and to teach the principles of jurisprudence that are influenced ... ))
যুক্তিবিদ্যা দ্বীনী শিক্ষার ক্ষেত্রে সহযোগী ও স্বতন্ত্র একটি বিষয়। যার মধ্যে বিভিন্ন বিষয়ের প্রকৃত বাস্তবতা, দলীলসমূহের বিভিন্ন দিক, শর্ত, সীমারেখা ইত্যাদি নিয়ে আলোচনা করা হয় (রদ্দুল মুখতার, ৪৩/১)। যুক্তিবিদ্যা যদি শরীআতের বিষয়াদি বুঝতে সহযোগী হয়, ইসলামী বিশ্বাসের বিপরীত বিশ্বাস না থাকে এবং বাতিল দলসমূহের বিভিন্ন সংশয় দূর করতে সক্ষম হয় তবে শরীআত শিক্ষার মতো তা শিক্ষা করাও উচিত (মুগনীউল মুহতাজ, ৬/৯)। তবে যুক্তিবিদ্যার যেসমস্ত বইয়ে দার্শনিকদের বিভিন্ন ভ্রান্ত বিশ্বাসের সংমিশ্রণ ঘটেছে সেসমস্ত বইয়ের শিক্ষা অর্জন থেকে নিজেকে দূরে থাকতে হবে ও জাতিকেও সতর্ক করতে হবে। (( প্রশ্ন (২৬) : যুক্তি শেখার জন্য বিভিন্ন যুক্তিবিদ্যার বই পড়া কি জায়েয?, Al-itisam - আগস্ট ২০২৩ - মাসিক আল-ইতিছাম ))
আল্লাহ তা'আলা পবিত্র কুরআনে বলেন,
তুমি কি সে ব্যক্তিকে দেখনি, যে ইবরাহীমের সাথে তার রবের ব্যাপারে বিতর্ক করেছে যে, আল্লাহ তাকে রাজত্ব দিয়েছেন? যখন ইবরাহীম বলল, ‘আমার রব তিনিই’ যিনি জীবন দান করেন এবং মৃত্যু ঘটান। সে বলল, আমিই জীবন দান করি এবং মৃত্যু ঘটাই। ইবরাহীম বলল, নিশ্চয় আল্লাহ পূর্বদিক থেকে সূর্য আনেন। অতএব তুমি তা পশ্চিম দিক থেকে আন। ফলে কাফির ব্যক্তি হতভম্ব হয়ে গেল। আর আল্লাহ যালিম সম্প্রদায়কে হিদায়াত দেন না। (( (2:258) Al-Baqara | (২:২৫৮) আল-বাকারা-অনুবাদ/তাফসীর ))এই আয়াতের ব্যাক্ষায় ইমাম আবু বকর আন নাসাফি রহ. লিখেন:
والآية تدل على إباحة التكلم في علم الكلام والمناظرة فيه، لأنه قال (أَلَمْ تَرَ إِلَى الذي حاج إبراهيم في ربه)، والمحاجة تكون بين اثنين، فدل على أن إبراهيم حاجه أيضا، ولو لم يكن مباحاً لما باشرها إبراهيم عليه السلام، لكون الأنبياء عليهم السلام معصومين عن ارتكاب الحرام، ولأنا أمرنا بدعاء الكفرة إلى الإيمان بالله وتوحيده، وإذا دعوناهم إلى ذلك لا بد أن يطلبوا من الدليل على ذلك وذا لا يكون إلا بعد المناظرة. আয়াতটি ইলমুল কালাম এবং মুনাযারা(বিতর্ক-ডিবেট) সম্পর্কে কথা বলার অনুমতি নির্দেশ করে। কারণ তিনি বলেছেন (আপনি কি তাকে দেখেননি যে ইব্রাহীমের সাথে তার রব সম্পর্কে বিতর্ক(বাহাস) করেছিল এবং তর্ক হয় দুই ব্যক্তির মধ্যে।....(ইলমুল কালাম) যদি জায়েয না হতো তবে ইবরাহীম (আঃ) এতে লিপ্ত হতেন না। কেননা নবী আ. গন তো হারাম কাজ থেকে মা'সুম! (( মাদারেকুত তানযিল ওয়া হাকায়েতুত তাওয়িল ১/২১৩) ))
বিভিন্ন সময় নানা বাতিল ফিরকার আপত্তি ও বিভ্রান্তির জবাব দিতে ইলমুল কালাম চর্চা অনেক ক্ষেত্রে অপরিহার্য হয়ে পড়ে। অন্যথায় জান্দাকা, (( জান্দাকা (زندقة): ইসলামের মৌলিক আকিদাকে ভেতরে ভেতরে অস্বীকার করা, কিন্তু বাহ্যিকভাবে মুসলিম সেজে থাকা। অর্থাৎ, প্রকাশ্যে ইসলাম মানার ভান করে গোপনে কুফরি বিশ্বাস পোষণ করা। একে বাংলায় বলা যায় ছদ্ম-কুফর বা গোপন নাস্তিকতা। )) ইলহাদ (( ইলহাদ (إلحاد): আল্লাহ, নবুয়ত, ওহি বা পরকালের মতো মৌলিক বিশ্বাসসমূহকে সরাসরি অস্বীকার করা বা সেগুলো থেকে বিচ্যুত হওয়া। প্রচলিত অর্থে এটি নাস্তিকতা বা ধর্মবিরোধী মতবাদকে বোঝায়। )) ও ইরতিদাদের (( ইরতিদাদ (ارتداد): ইচ্ছাকৃতভাবে ও জেনে-বুঝে ইসলাম ত্যাগ করা। অর্থাৎ, একজন মুসলমান ঈমান আনার পর কুফরের দিকে ফিরে যাওয়া। এটিই বাংলায় ধর্মত্যাগ নামে পরিচিত। )) প্রবণতা বৃদ্ধি পায়। সে কারণে নাকল (ওহি) ও আকলের (যুক্তি) সমন্বয়ে, সঠিক সীমা ও পদ্ধতি অনুসরণ করে ইলমুল কালামের মাধ্যমে আপত্তির জবাব দেওয়া প্রয়োজন হয়। তবে একই সঙ্গে আলেমগণ এ বিষয়েও সতর্ক করেছেন যে, দার্শনিকদের সীমাহীন ও নিষিদ্ধ কালাম চর্চা, যা ওহির অধীন না থেকে স্বাধীনভাবে দর্শনকে প্রাধান্য দেয়, তা থেকে সবাইকে বিরত থাকতে বলা হয়েছে।
ইমাম কারদারী রাহ. (মৃ. ৮২৭ হি.) লেখেন,ويجوز أن يراد بالكلام المنهي عنه كلام الحكماء لا كلام المشائخ. ইমামগণ যে কালাম নিষিদ্ধ করেছেন, সেটা হলো হুকামা তথা দার্শনিকদের কালাম; মাশায়েখের কালাম নয়। (( মানাকিবে ইমাম আবু হানিফা ১৩৯ ))মুহাদ্দিস ইমাম বায়হাকী রাহ. (মৃ. ৪২৮ হি.) বলেন,
إنما أراد الشافعي هذا كلام حفص وأمثاله من أهل البدع وهكذا مراده بكل ما حكي عنه في داغ الكلام وتم أهله ইমাম শাফেয়ী রাহ. থেকে কালামশাস্ত্র ও কালাম চর্চাকারীদের ব্যাপারে যত নিন্দা বর্ণিত আছে, এগুলো থেকে বিদআতপন্থীদের কালাম উদ্দেশ্য।' (( তাবয়ীনু কাযিবিল মুফতারি ইবন আসাকির ৬০২ ))হাম্বলি মাযহাবের ফকিহ ইমাম ইবন মুফলিহ হাম্বলি রহ. বলেন:
وَالصَّحِيحُ مِنَ الْمَذْهَبِ أَنَّ عِلْمَ الْكَلَامِ مَشرُوع مأمورٌ بِهِ، وَتَجُوزُ الْمُنَاظَرَةُ فِيهِ وَالْمُحَاجَةُ لِأَهْلِ البدع، وَوَضْعُ الْكُتُبِ فِي الرَّدَّ عَلَيْهِمْ، وَإِلَى ذَلِكَ ذَهَبَ أَئِمَّةُ التَّحْقِيقِ الْقَاضِي، وَالتَّمِيمِيُّ في جماعة الْمُحَقِّقِينَ... وَقَدْ صَنْفَ الإمام أحمد رحمه الله كتابا في الرد على الزَّنَادِقَةِ وَالْقَدَرِيَّةِ فِي مُتَشَابِهِ الْقُرْآنِ وَغَيْرِهِ، وَاحْتَجَّ فِيهِ بِدَلَائِلِ الْعُقُولِ ... وَمَا تَمَسَّكَ بِهِ الْأَوَّلُونَ مِنْ قَوْلِ أَحْمَدَ فَهُوَ مَنْسُوخٌ، قَالَ أَحْمَدُ فِي رِوَايَةِ حَنَيْلٍ: قَدْ كُنَّا تَأْمُرُ بِالسُّكُوتِ فَلَمَّا دُعِينَا إِلَى أَمْرٍ مَا كَانَ بُدَّ لَنَا أَنْ تَدْفَعَ ذَلِكَ، وَتَبَيِّنَ مِنْ أَمْرِهِ مَا يَنْفِي عَنْهُ مَا قَالُوهُ ثُمَّ اسْتَدَلْ لِذلِكَ بِقَوْلِهِ تَعَالَى: {وَجَادِهُمْ بِالَّتِي هِيَ أَحْسَنُ} [النحل: ١٢٥]. وَبِأَنَّهُ قَدْ ثَبَتَ عَنْ رُسُلِهِ الْجِدَالُ، وَلِأَنَّ بَعْضَ اخْتِلَافِهِمْ حَقٌّ، وَبَعْضَهُ بَاطِل وَلَا سَبِيلَ إلى التمييز بَيْنَهُمْ إِلَّا بِالنَّظَرِ فَعَلِمْت صحته. বিশুদ্ধ মাযহাব মতে 'ইলমুল কালাম' শেখা বৈধ ও অনুমোদিত। এটার সহায়তায় বিদআতপন্থীদের সঙ্গে মুনাযারা এবং তাদের খণ্ডন করা, তাদের বিরুদ্ধে গ্রন্থ লেখা জায়েয। এটাই (হাম্বলী মাযহাবের) মুহাক্কিক ইমামদের মত...। ইমাম আহমদ রাহ. তাঁর নিজের 'আর-রাদ্দু আলায় যানাদিকাহ' গ্রন্থে আকলী দলীলের মাধ্যমে তাদের খণ্ডন করেছেন। (কালামের বিরোধিতায় দেওয়া) তাঁর বক্তব্য যারা গ্রহণ করেছেন, তা রহিত হয়ে গেছে। কেননা তিনি বলেন, আমরা এ ব্যাপারে চুপ থাকতাম। কিন্তু যখন তারা এগুলোতে প্রবেশ করল, তখন তাদের খণ্ডন না করে উপায় ছিল না। (( আদাবুশ শারইয়্যাহ ১/২০৬-২০৭ ))ইবনে হামদান হাম্বলী রাহ. (মৃ. ৬৯৫ হি.) লেখেন,
وَعِلْمُ الكَلامِ الْمَذْمُومِ : هُوَ أَصُولُ الدِّينِ إِذَا تُكَلِّمَ فِيهِ بِالْمَعْقُولِ الْمَحْضِ، أَوِ الْمُخَالِفِ لِلْمَنقُولِ الصريح الصَّحِيح. فَإِنْ تُكَلِّمَ فِيهِ بِالنَّقْلِ فَقَدْ، أَوْ بِالنَّقْلِ وَالْعَقْلِ الْمُوَافِقِ لَهُ، فَهُوَ أُصُولُ الدِّينِ، وطريقة أهل السنة. নিন্দিত বা হারাম ইলমুল কালাম হলো সেটা, যা কেবল যুক্তির ওপর প্রতিষ্ঠিত অথবা যা সুস্পষ্ট সহীহ নকল তথা কুরআন-সুন্নাহর বিপরীত।কিন্তু যেটা শুধু কুরআন-সুন্নাহ বার এর সমর্থনে আকলের সমন্বয়ে গঠিত সেটা উসুলুদ দ্বীন এবং আহলে সুন্নাতের মানহাজ। (( সিফাতুল মুফতি ওয়াল মুস্তাফতি ২২৫-২২৬ ))মুজাজ্জাজ নাঈম রচিত মুক্তচিন্তা ও ইসলাম বইতে উল্লেখ করেন, (( মুক্তচিন্তা ও ইসলাম; মুজাজ্জাজ নাঈম; পৃষ্ঠা ৩৮ - ৩৯ ))
যুক্তিবিদ্যা যদি জায়েজ হতো, তাহলে কেন অনেক স্কলার এটিকে হারাম বলেছেন?
আমরা ইতোমধ্যেই উপরে বর্ণিত রেফারেন্সগুলোতে দেখেছি যে, স্কলারগণ যুক্তিবিদ্যা বা কালামের মধ্যে কিছু অংশকে হারাম ঘোষণা করেছেন। তবে এটি সব ধরনের যুক্তিবিদ্যার জন্য নয়, বরং তাদের নিষেধাজ্ঞা সেই ধরনের কালাম বা যুক্তিবিদ্যার উপর প্রযোজ্য যা:
-
সীমাহীন ও অনিয়ন্ত্রিত যুক্তিবিদ্যাঃ শাস্ত্রীয় সীমা ও শরীয়াহর দিকনির্দেশনা উপেক্ষা করে, শুধুমাত্র আকল বা দর্শনের উপর নির্ভর করে।
-
ওহীর উপর অযথা প্রাধান্য দেয় এমন যুক্তিবিদ্যাঃ যেসব কালাম কেবল দার্শনিকদের মতবাদ বা বাতিল দর্শনের সংমিশ্রণ দ্বারা গঠিত এবং কুরআন ও সুন্নাহর স্পষ্ট বিধানকে অগ্রাহ্য করে।
-
ভ্রান্ত দল বা বিদআতীদের উদ্দেশ্য করে এমন যুক্তিবিদ্যাঃ মূল উদ্দেশ্য হলো সাধারণ মুসলিমদের বিপথগামী করা বা বিভ্রান্ত করা।
উপরোক্ত রেফারেন্স যেমন, ইমাম কারদারী, বায়হাকী, ইবন হামদান এবং হাম্বলী মুহাক্কিকদের গ্রন্থ থেকে দেখা যায়, তারা বাধ্য করেছেন যে সাধারণ মুসলমানদের ও শিক্ষার্থীকে এমন কালাম থেকে দূরে থাকতে হবে, কিন্তু একইসঙ্গে শুদ্ধ ও শরীয়াহ সম্মত যুক্তিবিদ্যা শেখা এবং তা ব্যবহার করা জায়েজ ও ফরযে কিফায়া। অর্থাৎ, হারাম হিসেবে ঘোষিত যুক্তিবিদ্যা হলো সীমাহীন, দর্শন-অধিকৃত বা শরীয়াহ-বিরোধী অংশ, আর সকল যুক্তিবিদ্যা হারাম নয়। যেগুলো ইসলামী শাস্ত্র ও আকলের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ, সেগুলো শেখা ও শিক্ষাদান অনুমোদিত এবং দরকারি।
মাওলানা সাঈদ আহমদ এর লিখিত কুরআন সুন্নাহর আলোকে ঈমান আকিদা গ্রন্থে এই প্রশ্নের জবাবে বলা হয়েছে, (( কুরআন সুন্নাহর আলোকে ঈমান আকিদা ; পৃষ্ঠাঃ ২৮-৩০ ))









মাওলানা সাঈদ আহমদ রচিত “কুরআন সুন্নাহর আলোকে ঈমান ও আকিদা” গ্রন্থে 'ইসলামে যুক্তি ও দর্শন চর্চা হারাম' এমন দাবিকে কেন্দ্র করে নাস্তিকদের যাবতীয় মিথ্যাচার দলিলভিত্তিকভাবে খণ্ডন করা হয়েছে। সেখানে কুরআন, সুন্নাহ ও সালাফে সালেহিনের বক্তব্যের আলোকে স্পষ্ট করা হয়েছে যে, ইসলামে যুক্তি ও দর্শন চর্চা নিজে নিজে হারাম নয়। বরং নিষেধাজ্ঞা এসেছে সেই যুক্তি ও দর্শনের বিরুদ্ধে, যা ওহির অধীন না থেকে স্বেচ্ছাচারীভাবে আকলকে প্রাধান্য দেয়, অথবা ভ্রান্ত দার্শনিক মতবাদকে ইসলামী আকিদার ওপর চাপিয়ে দিতে চায়। অতএব, উপরোক্ত দলিলসমূহ ও আলেমদের সুস্পষ্ট ব্যাখ্যার পর এ কথা বলার আর কোনো সুযোগ নেই যে ইসলামে যুক্তি বা দর্শন চর্চা সম্পূর্ণরূপে হারাম। বরং কুরআন–সুন্নাহর আলোকে পরিচালিত, সীমাবদ্ধ ও উদ্দেশ্যপূর্ণ যুক্তি চর্চা ইসলামে গ্রহণযোগ্য ও প্রয়োজনীয়।


