ইসলামে কি কোনো নারী নবী ছিলো?

ইসলামে কি কোনো নারী নবী ছিলো?

অনেক জায়গায় আমরা দেখি হুজুররা ওয়াজ করেন, সেখানে নবীদের কিছু বৈশিষ্ট্য বলেন। নবীর বৈশিষ্টগুলোর মধ্যে অন্যতম একটি হলো, আল্লাহর তরফ থেকে ওহি আসে তাঁদের কাছে। মারিয়ামের কাছে যে আল্লাহর তরফ থেকে ওহি এসেছে, তাই মারিয়াম নবী ছিলেন! এমন উদ্ভট কিছু দাবী করে সাধারণ ধর্মপ্রাণ মুসলিমদের বিভ্রান্ত করে যাচ্ছে অনেকে।  এই দাবীর পক্ষে তারা বিভিন্ন আয়াতের রেফারেন্স দিয়ে থাকে।  পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তা'আলা বলেন,
(ইবরাহীমের) স্ত্রী দাঁড়িয়েছিল, সে হেসে ফেলল। তখন আমি তাকে ইসহাকের আর ইসহাকের পর ইয়া‘কূবের সুসংবাদ দিলাম। সে বলল, ‘হায়, কী আশ্চর্য! আমি সন্তান প্রসব করব, অথচ আমি বৃদ্ধা, আর এ আমার স্বামী, বৃদ্ধ? এটা তো অবশ্যই এক আশ্চর্যজনক ব্যাপার’! তারা বলল, ‘আল্লাহর সিদ্ধান্তে তুমি আশ্চর্য হচ্ছ? হে নবী পরিবার, তোমাদের উপর আল্লাহর রহমত ও তাঁর বরকত। নিশ্চয় তিনি প্রশংসিত সম্মানিত’। (( (11:71) Hud | (১১:৭১) হূদ-অনুবাদ/তাফসীর ))
 সূরা আলে ইমরানে আল্লাহ তা'আলা বলেন, 
সে বলল, ‘হে আমার রব, আমাকে দেন একটি নিদর্শন’। তিনি বললেন, ‘তোমার নিদর্শন হল, তুমি তিন দিন পর্যন্ত মানুষের সাথে ইশারা ছাড়া কথা বলবে না। আর তোমার রবকে অধিক স্মরণ কর এবং সকাল-সন্ধ্যা তার তাসবীহ পাঠ কর’। আর স্মরণ কর, যখন ফেরেশতারা বলল, ‘হে মারইয়াম, নিশ্চয় আল্লাহ তোমাকে মনোনীত করেছেন ও পবিত্র করেছেন এবং নির্বাচিত করেছেন তোমাকে বিশ্বজগতের নারীদের উপর’ । (( (3:41) Al-i-Imran | (৩:৪১) আলে-ইমরান-অনুবাদ/তাফসীর ))
আসলেই কি ইসলামে কি কোনো নারী নবী ছিলো? এর উত্তর জানতে হলে আমাদের নবী-রাসুল এবং ওহি সম্পর্কে পুরোপুরি ধারণা রাখতে হবে। 

নবী ও রাসুলের পার্থক্য  

নবী ও রাসুলের মধ্যে অন্যতম পার্থক্য হলো, একজন রাসুলের নিকট নতুন কোনো শরিয়ত আসে এবং তা তার কওমের নিকট পৌঁছে দেওয়ার জন্য নির্দেশ প্রধান করা হয়। আর একজন নবীর নিকট পূর্ববর্তী রাসুলের শরী’আত দিয়ে মুমিন সম্প্রাদয়ের নিকট প্রেরণ করা হয়। সুতরাং প্রত্যেক নবী ও রসূলের নিকটই অহী এসেছে। কিন্তু নবীকে পাঠানো হয়েছে মুমিন সম্প্রদায়ের প্রতি পূর্বের শরী‘আতসহ। যেমন বনী ইসরাঈলের নবীদের কথা উল্লেখ করা যেতে পারে। তাদের সকলকেই তাওরাতের শরী‘আত দিয়ে বনী ইসরাঈলদেরকে পরিচালনা করার আদেশ দেয়া হয়েছে। আর রসূলদেরকে পাঠানো হয়েছে কাফের সম্প্রদায়ের নিকট। তারা কাফেরদেরকে আল্লাহর তাওহীদের দিকে এবং তার ইবাদতের দিকে ডাকতেন।  শাইখ আল-ইসলাম ইবনে তাইমিয়া বলেছেন;  সঠিক দৃষ্টিভঙ্গি হল, রাসুল হলেন একজন কাফের সম্প্রদায়ের কাছে প্রেরিত এবং নবী হলেন সেই ব্যক্তি যাকে তার পূর্ববর্তী রসূলের শরী‘আত সহ মুমিন সম্প্রদায়ের কাছে প্রেরিত করা হয়েছে। তাদের শিক্ষা দেওয়া এবং তাদের মধ্যে বিচার করা।  যেমনটি আল্লাহ বলেন;  নিশ্চয় আমি তাওরাত নাযিল করেছি, তাতে ছিল হিদায়াত ও আলো, এর মাধ্যমে ইয়াহূদীদের জন্য ফয়সালা প্রদান করত অনুগত নবীগণ এবং রববানী ও ধর্মবিদগণ। কারণ তাদেরকে আল্লাহর কিতাবের রক্ষক করা হয়েছিল এবং তারা ছিল এর উপর সাক্ষী। সুতরাং তোমরা মানুষকে ভয় করো না, আমাকে ভয় কর এবং আমার আয়াতসমূহের বিনিময়ে সামান্য মূল্য ক্রয় করো না। আর যারা আল্লাহ যা নাযিল করেছেন, তার মাধ্যমে ফয়সালা করে না, তারাই কাফির। সূরা আল মায়েদা; ৫ঃ৪৪   সুতরাং নবী ও রাসুলের পার্থক্য হচ্ছে, রাসুল কে নতুন শরী;আতসহ প্রেরণ করা হয় এবং নবীকে পূর্বের রাসুলের শরী’আতের উপর প্রেরণ করা হয়। এবং নবী-রাসুল উভয়ের কাজ মানুষকে আল্লাহর দিকে ডাকা, বাণী পৌঁছে দিতে এবং মানুষের মধ্যে বিচার করতে। 

ওহী

ব্যবহারিক ভাবে ওহী দ্বারা ইসলামে আল্লাহ কর্তৃক নবি-রাসূলদের প্রতি প্রেরিত বার্তা বোঝানো হয়।  নিশ্চয় আমি তোমার নিকট ওহী পাঠিয়েছি, যেমন ওহী পাঠিয়েছি নূহ ও তার পরবর্তী নবীগণের নিকট এবং আমি ওহী পাঠিয়েছি ইবরাহীম, ইসমাঈল, ইসহাক, ইয়া‘কূব, তার বংশধরগণ, ঈসা, আইয়ূব, ইউনুস, হারূন ও সুলায়মানের নিকট এবং দাঊদকে প্রদান করেছি যাবূর। সূরা আন-নিসা; ৪ঃ১৬৩  ওহি দুই ধরনের, ১. পারিভাষিক ওহি ২. শাব্দিক ওহি।  আল্লাহ সুবহানাহুতায়ালা জিবরাইলের মাধ্যমে নবীদের কাছে যে ওহি প্রেরণ করেছেন, এটি হচ্ছে পারিভাষিক ওহি। এই ওহি যারা পেয়েছেন তাঁরা নবী। 

ইসলামে কি কোনো নারী নবী ছিলো? 

ইসলামে কোনো নারী নবী ছিলোনা সে বিষয়ে পবিত্র কুরআনে আল্লাহ সুবহানাহুওয়া তায়ালা স্পষ্টই জানিয়ে দিয়ছেন। তিনি পবিত্র কুরআনে স্পষ্টভাবে বলেন, আর তোমার পূর্বে আমি পুরুষই পাঠিয়েছিলাম, যাদের প্রতি আমি ওহী পাঠাতাম। সুতরাং তোমরা জ্ঞানীদেরকে জিজ্ঞাসা কর যদি তোমরা না জান। সূরা আনবিয়া; ২১ঃ৭  আর আমরা আপনার আগেও জনপদবাসীদের মধ্য থেকে পুরুষদেরকেই পাঠিয়েছিলাম, যাদের কাছে ওহী পাঠাতাম। সূরা ইউসুফ; ১২ঃ১০৯  এ আয়াতগুলো থেকে এটা সুস্পষ্ট যে, মহান আল্লাহ নবুওয়ত ও রিসালাতের জন্য শুধুমাত্র পুরুষদেরকেই মনোনীত করেছেন। নারীরা এটার যোগ্যতা রাখে না বলেই তাদের দেয়া হয়নি। সৃষ্টিগতভাবে এতবড় গুরু-দায়িত্ব নেয়ার যোগ্যতা তাদের নেই। নবুওয়তের প্রচার-প্রসারের জন্য যে নিরলস সংগ্রাম দরকার হয় তা নারীরা কখনো করতে পারে না। মারিয়াম (আঃ) এর কাছে ওহি এসেছে বলে তিনি নবী, এমন দাবী করা লোকেরা ওহির সংজ্ঞা সম্পর্কে অজ্ঞ। ওহি দুই ধরনের, ১. পারিভাষিক ওহি ২. শাব্দিক ওহি।  আল্লাহ সুবহানাহু তায়ালা জিবরাইলের মাধ্যমে নবীদের কাছে যে ওহি প্রেরণ করেছেন তা পারিভাষিক ওহি। এমন ওহি কোনো নারী পায়নি। মারিয়াম (আঃ) এর নিকট যে ওহি এসেছে তার শাব্দিক ওহি। এই ওহির কারণে যদি মারিয়াম (আঃ) নবী হয়ে যায় তাহলে তো মৌমাছিকেও নবী বলতে হবে।  কেননা পবিত্র কুরআনে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তালা বলেন,  আর তোমার রব মৌমাছিকে ইংগিতে জানিয়েছে যে, ‘তুমি পাহাড়ে ও গাছে এবং তারা যে গৃহ নির্মাণ করে তাতে নিবাস বানাও।’ [সূরা আন-নাহল; ১৬ঃ৬৮]    মৌমাছির কাছে আল্লাহ সুবহানাহুতায়ালা যে ওহি প্রেরণ করেছিলেন, সেটি জিবরাইল (আ.)-এর মাধ্যমে পাঠাননি অথবা আলাদা বিধিবিধান দিয়ে এটি পাঠাননি। আল্লাহতায়ালা মৌমাছির মনে একটি ভাবধারা দিয়ে তার কাছে একটি বার্তা দিয়েছেন। ঠিক সেভাবেই বার্তাটি আল্লাহ রাব্বুলআলামিন মারিয়ামকে দিয়েছেন। নবীদের কাছে যে ওহি এসেছে, সেটি সুনির্দিষ্ট, বিধিবিধান সংবলিত এবং সেটা ফেরেশতাদের মাধ্যমে এসেছে। কিন্তু মারিয়াম (আঃ) এর কাছে কোনো বিধিবিধান আসেনি, কোনো শরিয়া আসেনি।   নারী নবী আছে এমন দাবীর বিপক্ষে শাইখ উমর আল-আশকার (রহ:) বলেন,    আল্লাহ তায়ালা যে পরিপূর্ণতা দিয়েছেন তার আরেকটি দিক হলো, তিনি মানুষের মধ্য থেকে যত রসূল পাঠিয়েছেন তাদেরকে তিনি মনোনীত করেছেন। তিনি নারীদের মধ্য থেকে কোনো রসূল পাঠাননি। রেফারেন্সঃWhy Were There No Female Prophets or Messengers? - Islam Question & Answer (islamqa.info) এই বিশেষত্বটি সেই আয়াত দ্বারা নির্দেশিত যেখানে আল্লাহ বলেছেন "আর তোমার পূর্বে আমি পুরুষই পাঠিয়েছিলাম, যাদের প্রতি আমি ওহী পাঠাতাম। সুতরাং তোমরা জ্ঞানীদেরকে জিজ্ঞাসা কর যদি তোমরা না জান। সূরা আল-আম্বিয়া ২১ঃ৭   নবুওয়াত সম্পর্কে, কিছু আলেম - যেমন আবুল-হাসান আল-আশআরী, আল-কুরতুবি এবং ইবনে হাযম - মনে করেছিলেন যে কিছু মহিলা নবী ছিলেন! মরিয়ম বিনতে ইমরান সহ। তাদের প্রমাণ হল সেই আয়াত যেখানে বলা হয়েছে যে, আল্লাহ তায়ালা মূসার মায়ের কাছে ওহী পাঠিয়েছিলেন। যেমন;    আর স্মরণ কর, যখন ফেরেশতারা বলল, ‘হে মারইয়াম, নিশ্চয় আল্লাহ তোমাকে মনোনীত করেছেন ও পবিত্র করেছেন এবং নির্বাচিত করেছেন তোমাকে বিশ্বজগতের নারীদের উপর’। সূরা আলে ইমরান; ৩ঃ৪২    শাইখ উমর আল-আশকার (রহ:) বলেন, তারা যা বলে তা সঠিক মনে হয়না। পৃথিবীর প্রায় সকল স্কলারদের মত একই। কারণ,  মূসা (আঃ) ও আসিয়ার মা এই নারীদের কাছে আল্লাহ প্রেরিত ওহী স্বপ্নের আকারে ঘটেছিল। আমরা জানি যে স্বপ্ন ওহীর একটি অংশ এবং এটি নবী ছাড়া অন্য লোকেদের ক্ষেত্রেও ঘটতে পারে।    যেমন, হাদিসে এসেছে,  Abu Hurairah (May Allah be pleased with him) reported: The Prophet (ﷺ) said, "A man set out to visit a brother (in Faith) in another town and Allah sent an angel on his way. When the man met the angel, the latter asked him, "Where do you intend to go?" He said, "I intend to visit my brother in this town". The angel said, "Have you done any favor to him?" He said, "No, I have no desire except to visit him because I love him for the sake of Allah, the Exalted, and Glorious." Thereupon the angel said, "I am a messenger to you from Allah (to inform you) that Allah loves you as you love him (for His sake)". Riyad as-Salihin; Hadith no; 379 Riyad as-Salihin 379 - The Book of Miscellany - كتاب المقدمات - Sunnah.com - Sayings and Teachings of Prophet Muhammad (صلى الله عليه و سلم)   আযান দুইজন সাহাবীদের স্বপ্নে প্রকাশিত হয়েছিল। Why Were There No Female Prophets or Messengers? - Islam Question & Answer (islamqa.info)    যদি ফেরেশতাদের দ্বারা সম্বোধন করা প্রত্যেকেই একজন নবী হিসেবে বিবেচিত হতো তাহলে হাদিসে উল্লেখিত ব্যক্তি এবং সাহাবীরাও নবী হতেন। নারী নবী আছে এমন দাবী যারা করে তারা কি হাদিসে উল্লেখিত ব্যক্তিদেরও নবী বলবেন?    নারী নবী আছে এমন দাবী যারা করে থাকেন তারা তাদের দাবীর পক্ষে আরো একটু যুক্তি দিয়ে থাকে যে, কুরআনে বলা হয়েছে  ‘হে মারইয়াম, নিশ্চয় আল্লাহ তোমাকে মনোনীত করেছেন ও পবিত্র করেছেন এবং নির্বাচিত করেছেন তোমাকে বিশ্বজগতের নারীদের উপর’। সূরা আলে ইমরান; ৩ঃ৪২   যেহেতু কুরআনে বলা হয়েছে যে, আল্লাহ মারইয়াম (আঃ) কে মনোনিত করেছেন তাই তিনি নবী। কিন্তু এই যুক্তিটিও সঠিক নয়। কারণ, কুরআনে মারইয়াম ছাড়াও অন্য লোকদের মনোনীত করার ব্যপারে বলা হয়েছে।    যেমন;  অতঃপর আমি এ কিতাবটির উত্তরাধীকারী করেছি আমার বান্দাদের মধ্যে তাদেরকে, যাদেরকে আমি মনোনীত করেছি। তারপর তাদের কেউ কেউ নিজের প্রতি যুলমকারী এবং কেউ কেউ মধ্যপন্থা অবলম্বনকারী। আবার তাদের কেউ কেউ আল্লাহর অনুমতিসাপেক্ষে কল্যাণকর কাজে অগ্রগামী। এটাই হলো মহা অনুগ্রহ। সূরা ফাতির; ৩৫ঃ৩২   নিশ্চয়ই আল্লাহ আদম, নূহ ও ইবরাহীমের পরিবারকে এবং ইমরানের পরিবারকে সৃষ্টিজগতের উপর মনোনীত করেছেন। সূরা আলে ইমরান; ৩ঃ৩৩     আল্লাহ মারইয়াম কে মনোনীত করেছেন বলে যদি তিনি নবী হয়ে যায় তাহলে নূহ ও ইবরাহীম (আঃ) এর পরিবারের লোকেরাও নবী হয়ে যাবে। কিন্তু তাদের পরিবারের সকল সদস্য নবী ছিলোনা। তাই আল্লাহ কাউকে মনোনীত করলে সে নবী হয়ে যাবে এই দাবী পুরোপুরি মিথ্যা।    *  মরিয়মকে লালন-পালন এবং তার গুণাবলী বর্ণনা করার প্রেক্ষাপটে একজন সিদ্দিকা (সত্যবাদী) হিসাবে বর্ণনা করা হয়েছে।    মহান আল্লাহ বলেন, মারইয়াম পুত্র ‘ঈসা রসূল ছাড়া কিছুই ছিল না। তার পূর্বে আরো রসূল অতীত হয়ে গেছে, তার মা ছিল সত্যপন্থী মহিলা, তারা উভয়েই খাবার খেত; লক্ষ্য কর তাদের কাছে (সত্যের) নিদর্শনসমূহ কেমন সুস্পষ্টভাবে তুলে ধরছি আর এটাও লক্ষ্য কর যে, কীভাবে তারা (সত্য হতে) বিপরীত দিকে চলে যাচ্ছে। [আল-মায়েদাহ 5:75]   মারইয়াম (আঃ) যদি নবী হতেন তাহলে কুরআনে তার গুণাবলি বর্ণণা করার ক্ষত্রে কুরআনে নবী শব্দটি ব্যাবহার করতেন। কিন্তু নবী শব্দের পরিবর্তে কুরআনে সত্যবাদী শব্দটি ব্যাবহার করা হয়েছে।    * নবী এবং রাসুলদের শরী’আত থাকে। কারণ একজন নবী ও রাসুলের দায়িত্বের মধ্যে কোনো পার্থক্য নেই। রাসুলের উপর নতুন শরী’আত অবতীর্ণ হয় এবং নবীর কাছে পূর্বের রাসুলের শরী’আত অবতির্ণ হয়। কিন্তু নারী নবীর পক্ষে যারা বলেন এবং যাদেরকে নবী হিসবে উপস্থাপন করেন তাদের নিকট কোনো শরী’আত আসেনি।    নবী ও রাসুল তারা গোপনে এবং প্রকাশ্যে লোকদের সাথে দেখা করতে হয়, আল্লাহর বাণী সবার কাছে পোঁছে দিতে হয়, সারা দেশে ঘুরে বেড়ানো, মিথ্যাবাদীদের মোকাবিলা করা এবং তাদের বিরুদ্ধে প্রমাণ স্থাপন করা এবং তাদের সাথে বিতর্ক করা, সেনাবাহিনী প্রস্তুত করা এবং নেতৃত্ব দেওয়া, এবং যুদ্ধ করা ইত্যাদি দায়িত্ব নবীদের থাকে। কিন্তু মারইয়াম সহ যে কয়জন কে নবী বলে দাবী করা হয় তাদের কারোই উপরে উল্লেখিত দায়িত্ব ছিলোনা। তাই ইসলামে  নারী নবী ছিলো এমন দাবী যারা করে তাদের দাবীটা পুরোপুরি মিথ্যা এবং বানোয়াট।  যারা নারী নবীর পক্ষে কুরআনের কিছু আয়াতকে উপস্থাপন করে সেগুলো ত্রুটিযুক্ত। কারণ একজন নবী ও রাসুলের দায়িত্বের মধ্যে কোনো পার্থক্য নেই। রাসুলের উপর নতুন শরী’আত অবতীর্ণ হয় এবং নবীর কাছে পূর্বের রাসুলের শরী’আত অবতির্ণ হয়। কিন্তু নারী নবীর পক্ষে যারা বলেন এবং যাদেরকে নবী হিসবে উপস্থাপন করেন তাদের নিকট কোনো শরী’আত আসেনি।     নারী নবী হিসেবে যাদেরকে উপস্থাপন করা হয় তাদের কাছে ওহী এসেছে স্বপ্নের মাধ্যমে। কিন্তু স্বপ্নের মাধ্যমে ওহী আসলেই তাদেরকে নবী দাবী করা যায়না।    “হে মারইয়াম, নিশ্চয় আল্লাহ তোমাকে মনোনীত করেছেন ও পবিত্র করেছেন এবং নির্বাচিত করেছেন” কুরআনের এই আয়াতে অংশটুতে মারইয়াম (আঃ) মনোনিত এবং নির্বাচিত করা হয়েছে বলে অনেকে তাকে নবী দাবী করে। কিন্তু মনোনিত এবং নির্বাচিত করা শব্দগুলো কুরআনের অন্য জায়গায় নবী ব্যতিত অন্য লোকদের জন্যও ব্যাবহার করেন।    এছাড়াও হাদিসে পূর্ণতা শব্দ দিয়ে নবুওতের পূর্ণতা বুঝানো হয়নি বরং গুণাবলির পূর্ণতা বুঝানো হয়েছে এবং মারইয়াম (আঃ) কুরআনে নবী হিসবে নয়, সত্যবাদী হিসেব সম্বোধন করা হয়েছে। সুতরাং নারী নবীর পক্ষে যেসব প্রমাণ উপস্থাপন করা হয় তা সত্য নয়।   

আরো কিছু আপত্তি ও তার জবাব। 

আপত্তি-১  আল্লাহ ফেরেশতা ও মানুষের মধ্য থেকে রাসূল মনোনীত করেন। অবশ্যই আল্লাহ সর্বশ্রোতা সর্বদ্রষ্টা। সুরা-আল হজ্জ; ২২ঃ৭৫    এই আয়াত দেখিয়ে কিছু লোক দাবী করে আল্লাহ কুরআনে বলেছে মানুষের মধ্যে থেকে রাসূল মনোনীত করেন। যদি আল্লাহ কেবল পুরুষদে মধ্য থেকেই রাসূল নির্বাচন করতে তাহলে এখানে স্পষ্ট করে পুরুষ শব্দ ব্যাবহার না করে মানুষ শব্দটি কেন ব্যাবহার করা হয়েছে?  এর উত্তর হচ্ছে, পবিত্র কুরআনে আল্লাহ সুবহানাহুওয়া তায়ালা স্পষ্টই বলে দিয়েছেন যে তিনি হযরত মুহাম্মদ (সাঃ) এর যত নবী-রাসুল প্রেরণ করেছেন তারা সবাই পুরুষ ছিলো।    আর আমরা আপনার আগেও জনপদবাসীদের মধ্য থেকে পুরুষদেরকেই পাঠিয়েছিলাম, যাদের কাছে ওহী পাঠাতাম। সূরা ইউসুফ; ১২ঃ১০৯  যেহেতু, হযরত মুহাম্মদ (সাঃ) এর পরে আর কোনো নবী রাসুল আসবেনা সেহেতু নারী নবী থাকার কোনো সম্ভাবনা নেই।  যেহেতু আল্লাহ একটা জায়গায় স্পষ্ট করেই বলে দিয়েছেন যে নবী-রাসুলগণ সবাই পুরুষ তাই অন্য আয়তে মানুষ শব্দ ব্যাবহার করলেও সেখানে মানুষ দ্বারা পুরুষকেই বুঝানো হবে।  একটা থট এক্সপিরিমেন্টের মাধ্যমে বুঝার চেষ্টা করুন।  আপনার স্কুলের গণিত স্যার প্রথম ঘন্টার ক্লাসে এসে বলে গিয়েছে যে চতুর্থ ঘন্টার ক্লাস শেষে ক্লাসের সকল ছেলে যাতে ওনার রুমে আসে। তো তৃতীয় ঘন্টার ক্লাস শেষে স্যার স্টুডেন্টদের রিমাইন্ডার দেওয়ার জন্য আবারো ক্লাসে এসে বলে গেলেন যে, এই যে স্টুডেন্ট তোমরা চতুর্থ ঘন্টার ক্লাস শেষে কিন্তু আমার রুমে আসার কথা ছিলো! মনে আছে তো?  আচ্ছা বলুন তো, গণিত স্যার তৃতীয় ঘন্টার ক্লাসের সময় যখন স্টুডেন্টদের রিমাইন্ডার দিয়েছিলো তখন কি ছাত্র-ছাত্রী উভয়কেই বুঝিয়েছে নাকি শুধুমাত্র ছাত্রদের বুঝিয়েছে? অবশ্যই ছাত্রদের বুঝিয়েছে তাই তো! কিন্তু কেন? কারণ স্যার প্রথম ঘন্টার ক্লাসেই ছাত্রদের নির্দিষ্ট করে দিয়েছিল যে শুধু মাত্র ছাত্ররাই চতুর্থ ক্লাস শেষে ওনার রুমে আসবে।  ঠিক এই উহারণটি কুরআনের সাথে মিলিয়ে দেখুন। আল্লাহ কুরানের এক জায়গায় স্পষ্ট করে দিয়েছে যে, যত নবী-রাসুল এসেছে সবাই ছিলো পুরুষ। এখন অন্য জায়গায় যদি আল্লাহ নবী-রাসুলের ক্ষত্রে মানুষ শব্দটি ব্যাবহার করে, সেই মানুষ শব্দ দিয়ে তো অবশ্যই পুরুষ মানুষকেই বুঝানো হবে।   এবার আসুন ব্যাকরণগত দিক থেকে এই প্রশ্নের উত্তর দেওয়া যাক।  ব্যকরণগত দিক থেকে এই আয়াতে মানুষ শব্দ দ্বারা পুরুষকে বুঝানো হয়েছে।  এই আয়াতে نَّاسِ (মানুষ) শব্দটি একটি পুংলিঙ্গ বহুবচন বিশেষ্য শব্দ। [masculine plural noun] সুতরাং এখানে পুরষকেই বুঝানো হয়েছে।  The Quranic Arabic Corpus - Word by Word Grammar, Syntax and Morphology of the Holy Quran    এছাড়াও نَّاس (মানুষ) শব্দ দিয়ে শুধু মাত্র মানবজাতী বা মানুষকে বুঝানো হয়না। এই শব্দ দিয়ে পুরুষকেও বুঝানো হয়। পবিত্র কুরআনে এই শব্দটি আরো বিভিন্ন জায়গায় পুরষ অর্থে ব্যবহৃত  হয়েছে। যেমন; সূরা বাকারা; ২ঃ ২৪ The Quranic Arabic Corpus - Word by Word Grammar, Syntax and Morphology of the Holy Quran    সূরা আনফাল; ৮ঃ২৬ The Quranic Arabic Corpus - Word by Word Grammar, Syntax and Morphology of the Holy Quran  সূরা ইউসূফ; ১২ঃ৪০ The Quranic Arabic Corpus - Word by Word Grammar, Syntax and Morphology of the Holy Quran  সূরা ইব্রাহীম; ১৪ঃ৩৭ The Quranic Arabic Corpus - Word by Word Grammar, Syntax and Morphology of the Holy Quran  সূরা কাহাফ; ১৮ঃ৫৫ The Quranic Arabic Corpus - Word by Word Grammar, Syntax and Morphology of the Holy Quran  সূরা রুম; ৩০ঃ৩০ The Quranic Arabic Corpus - Word by Word Grammar, Syntax and Morphology of the Holy Quran  সূরা লুকমান; ৩১ঃ১৮ The Quranic Arabic Corpus - Word by Word Grammar, Syntax and Morphology of the Holy Quran সূরা ফাতির; ৩৫ঃ২৮ The Quranic Arabic Corpus - Word by Word Grammar, Syntax and Morphology of the Holy Quran  সূরা সাদ; ৩৮ঃ২৬ The Quranic Arabic Corpus - Word by Word Grammar, Syntax and Morphology of the Holy Quran  সূরা কামার; ৫৪ঃ২০ The Quranic Arabic Corpus - Word by Word Grammar, Syntax and Morphology of the Holy Quran সূরা নাস; ১১৪;৬ The Quranic Arabic Corpus - Word by Word Grammar, Syntax and Morphology of the Holy Quran  সুতরাং, ব্যাকরণগত দিক থেকেও এটা প্রমাণিত যে উক্ত আয়াতে মানুষ বলতে পুরুষকেই বুঝানো হয়েছে।    আরেকটি মজার বিষয় হচ্ছে আপত্তিকারীরা তাদের অভিযোগে এটাও উল্লেখ করেছে যে কোনো নারী রসূল নেই, তবে নবী রয়েছে। আর উক্ত আয়াতে কিন্তু কোনো নবীকে মনোনীত করার কথা বলা হয়নি, বরং রাসূলকে মনোনীত করার কথা বলা হয়েছে। সুতরাং এখানে নবীর কথা বলাই হয়নি, তাই তাদের অভিযোগেরও কোনো ভিত্তি নেই।    আপত্তি-২  আর তার স্ত্রী দাঁড়ানো ছিল, সে হেসে উঠল। অতঃপর আমি তাকে সুসংবাদ দিলাম ইসহাকের ও ইসহাকের পরে ইয়া‘কূবের। সে বলল, ‘হায়, কী আশ্চর্য! আমি সন্তান প্রসব করব, অথচ আমি বৃদ্ধা, আর এ আমার স্বামী, বৃদ্ধ? এটা তো অবশ্যই এক আশ্চর্যজনক ব্যাপার’!তারা বলল, ‘আল্লাহর সিদ্ধান্তে তুমি আশ্চর্য হচ্ছ? হে নবী পরিবার, তোমাদের উপর আল্লাহর রহমত ও তাঁর বরকত। নিশ্চয় তিনি প্রশংসিত সম্মানিত’। সূরা হুদ; ১১ঃ৭৩    সূরা হুদের এই তিনটা আয়াত দেখিয়ে কিছু লোক দাবী করে যে, এই আয়াত থেকে নারীর নবুয়ত প্রমাণিত হয়। কেননা, ইবরাহীম (আঃ)-এর স্ত্রীর নিকট ফেরেসতা এসে সন্তান লাভের বিষয়ে সুসংবাদ দিয়েছেন।    এর উত্তর হচ্ছে, শাইখ উমর আল-আশকার (রহঃ) এর জবাব থেকে আমরা ইতিমধ্যেই জেনেছি যে কারো কাছে ফেরেশতা আসলেই সে নবী হয়ে যায়না। এছাড়া, নবীদের উপর পূর্ববর্তী রাসূলের শরী’আত আসে। না ইবরাহীম (আঃ) এর স্ত্রীর নিকট কি কোনো শরী;আত অর্পণ করা হয়েছিলো! না তার দায়িত্ব ছিলো তার কওমের লোকের বিচার করা, আল্লাহর দিকে ডাকা, আল্লাহর বাণী পৌঁছে দেওয়া! তাহলে কি করে ইবরাহীম (আঃ) এর স্ত্রী নবী হতে পারে?    আপত্তি-৩  আপত্তিকারীরা বলছে নবুওয়ত আর রিসালাত নাকি এক নয়, আলাদা। তাদের এমন দাবীর কারণ হচ্ছে, তারা দাবী করে যে, নারী নবীদের কাছে রিসালাত আসেনি তবে নবুওয়াত এসেছে!    এর উত্তর হচ্ছে,  নবুওয়াত ও রিসালাত হচ্ছে, আল্লাহ এবং তার মনোনীত ব্যক্তির মধ্যে সম্পর্ক স্থাপনের মাধ্যম, যা ওহীর মাধ্যমে সংগঠিত হয়। নবী ও রাসূলগণ আল্লাহ পক্ষে থেকে ওহী পেয়ে তা সাধারণ মানুষের কাছে প্রচার করেন। রিসালতের মাধ্যমে আল্লাহ তা’আলা মানব জাতির জন্য কল্যাণকর সহজ সরল পথের সন্ধান দিয়ে থাকেন। আল্লাহ তা’আলার পক্ষ হতে তাঁর বিধানাবলি মানব জাতির নিকট পৌছে দেওয়ার মাধ্যমই হলো রিসালাত ও নবুওয়াত বলা হয়। আর এ দায়িত্ব সম্পন্নকরার জন্য যাঁকে মনোনীত করা হয় তিনি হচ্ছেন রাসূল বা নবী। সুতরাং নবী এবং রাসুল উভয়েই রিসালাত প্রাপ্ত। তাই নবুওয়ত ও রিসালাত এক নয় বলে যে আপত্তি করা হয়েছে তা মোটেও সঠিক নয়। 

Leave a Comment