নাস্তিকতা কি সহজাত? স্রষ্ট্রা; স্বতঃসিদ্ধ সত্য।
সহজাত বিশ্বাস (Intuitive Belief) বলতে বুঝায়, মানুষের ভেতরে জন্মগত ধারণা। অর্থাৎ, এ ধরনের বিশ্বাসগুলো কেউ আমাদের শিখিয়ে দেওয়ার প্রয়োজন হয় না। বরং, হৃদয়ের গভীর থেকে উৎসারিত চিন্তাভাবনা এবং বোধ বিবেচনা থেকে স্বয়ংক্রিয়ভাবে বুঝে নেওয়া হয়। সহজভাবে বলা যায়, এটি এমন একটি বিশ্বাস বা জ্ঞান যা কোনো বাহ্যিক প্রমাণ বা ব্যাখ্যার মাধ্যমে শেখানো হয় না, বরং তা মানুষের মধ্যে স্বাভাবিকভাবে উপস্থিত থাকে। যা কিছু আমরা স্বাভাবিকভাবেই স্বতঃসিদ্ধ সত্য বলে মনে করি । যে জ্ঞান বা ধারণা প্রমাণ বা ব্যাখ্যার বাইরে স্বতঃসিদ্ধ (self- evident) হয়, তা সহজাত বা সহজাত বিশ্বাসের অংশ। এর মানে, এর সঠিকতা এতটাই স্পষ্ট এবং সুস্পষ্ট যে এটি নির্দিষ্ট প্রমাণের বা ব্যাখ্যার প্রয়োজন অনুভব করে না। এটি প্রমাণ নিরপেক্ষ । (( SELF-EVIDENT definition and meaning | Collins English Dictionary ))
দার্শনিক হামজা জর্জিস এর মতে,
সর্বজনীন এবং জন্মগত বিষয়গুলো স্বতঃসিদ্ধ সত্য। (( Hamza Tzortzis,The Divine Reality: God, Islam & The Mirage of Atheism; Chapter: 4 ))
যে জীবনকে আমরা বাস্তব মনে করে প্রতিদিনের দিনপঞ্জি রচনা করি-ধূলিধূসরিত ইট-পাথরের যান্ত্রিক শহর কিংবা সাদামাটা, সহজ-সরল, নিখাদ গ্রামীণ জীবনে-সেই জীবন কি শুধুই একটি স্বপ্ন, নাকি তার আসলেই বাস্তব কোনো অস্তিত্ব রয়েছে? আপনি কি পুরোপুরি নিশ্চিত যে, আপনার জীবনটি কোনো স্বপ্নের মতো ব্যাপার নয়? কিংবা যদি প্রশ্ন করা হয়, আপনার অস্তিত্বের প্রমাণ কী? দর্শন সম্পর্কে যাদের টুকটাক পড়াশোনা রয়েছে তারা হয়ত চট করেই বলে উঠবে, এর উত্তর দার্শনিক রেনে দেকার্ত অনেক আগেই দিয়েছে। দেকার্তের সেই বিখ্যাত উক্তি, “I think therefor I am " অর্থাৎ, “আমি চিন্তা করি, সুতরাং আমি আছি।”
দেকার্তের দার্শনিক পদ্ধতি ছিল সংশয়ের পদ্ধতি। তিনি সার্বজনীন সত্য জ্ঞান আবিষ্কারের জন্য সব কিছুই সংশয় করতে শুরু করেছিলেন। কিন্তু এক পর্যায়ে তিনি লক্ষ্য করলেন, যেহেতু তিনি সংশয় করছেন, সেহেতু তাঁর অস্তিত্ব থাকতে হবে। কারণ যিনি সংশয় করছেন, তিনি তো অবশ্যই অস্তিত্বশীল। যদি তার অস্তিত্ব না থাকে, তাহলে কে এই সংশয় করছে? এভাবেই দেকার্ত তার অস্তিত্বকে প্রমাণ করেন। তবে, দেকার্তের এই বক্তব্যের নিশ্চয়তা কী? কেউ যদি আপত্তি করে বলেন, এমনও তো হতে পারে, আপনি কেবল দূরের কোনো অজানা গ্রহের একটি পাত্রে ভেসে বেড়ানো নিছক এক মস্তিষ্ক, এবং সেখান থেকে কলকাঠি নাড়িয়ে আপনার হৃদয়ে অনুভূতিগুলো তৈরি করছে কোনো এলিয়েন! আপনি কি নিশ্চিত যে আপনি এমন কোনো অজানা গ্রহের পাত্রে ভেসে থাকা মস্তিষ্ক নন? নিশ্চিতভাবে এই প্রশ্নের জবাব দেওয়া কখনোই সম্ভব নয়। বরং, আমাদের এই মহাজগত যে বাস্তবে অস্তিত্বশীল এহেন বিশ্বাসকে আমরা স্বতঃসিদ্ধ সত্য বা স্বজ্ঞাত (Intuitive) মনে করি। এর জন্য আমরা কোনো যুক্তি বা প্রমাণ খোঁজার প্রয়োজন অনুভব করি না; এটি এমন এক বিশ্বাস যা আমরা কোনো প্রকার প্রমাণ ছাড়া গ্রহণ করি। দর্শনের ভাষায়, এই ধরনের বিশ্বাসকে বলা হয় অভিজ্ঞতাপূর্ব জ্ঞান" (a priori knowledge). এই ধরনের বিশ্বাসকে Self evident truth বলেও অবহিত করা হয়।
নিউ ইয়র্ক বিশ্ববিদ্যালয়ের আলোচিত দার্শনিক (নাস্তিক) প্রফেসর ডেভিড শালমার্স বলেন,
আপনি প্রমাণ পাবেন না যে আমরা সিমুলেশনে নেই, কারণ আমরা যে কোনও প্রমাণ পাই তাও সিমুলেটেড হতে পারে। (( Are We Living in a Computer Simulation? - Scientific American ))
স্রষ্টার অস্তিত্ব, বহির্জগতের অস্তিত্ব, আমাদের চিন্তাজগতের অস্তিত্ব, আমাদের যুক্তির বৈধতা, এই বিষয়গুলো স্বতঃসিদ্ধ । আধুনিক দর্শনের জনক রেনে দেকার্তের এর মতে সকল জ্ঞানই এ সমস্ত ধারণা থেকে গাণিতিক অবরোহ (Through Mathematical Deduction) পদ্ধতিতে লাভ করা যায় এবং এই ধারণাগুলো স্বতঃসিদ্ধ। (( দর্শনের সমস্যাবলি; পৃষ্ঠা নং- ৫৭ ))
দেকার্ত বলেন, আমাদের অভিজ্ঞাতা থেকে প্রাপ্ত যে কোনো জ্ঞানকেই সন্দেহ করা যায়। ২+২=৪, ত্রিভুজের তিন কোণের সমষ্টি দু'সমকোণ এসব ধারণার বিপরীত ভাবাই যায় না। এই জ্ঞানগুলো অভিজ্ঞতালব্ধ নয়, সহজাত। এছাড়াও, অভিজ্ঞতায় অর্জিত জ্ঞানকে সন্দেহ করা যায় বা মতানৈক্য দেখা যায়। কেননা, অভিজ্ঞতায় অর্জন করা জ্ঞান একেক ব্যক্তির কাছে একেক রকম। স্থান কাল পরিবর্তনের সাথে এই জ্ঞানের পরিবর্তন হয়। কিন্তু এমন কিছু ‘চিন্তার মৌলিক নিয়ম' (Fundamental Laws of Thought) আমাদের মধ্যে রয়েছে যেগুলো অভিজ্ঞতালব্ধ নয় বরং অভিজ্ঞতাপূর্ব (Apriori).
সহজাত ধারণা সম্পর্কে দেকার্ত বলেন,
সহজাত ধারণা অনিবার্য। কারণ, সহজাত ধারণা ব্যতীত মানুষের জ্ঞান জগৎ অকল্পনীয় হয়ে পড়ে। ((সরদার ফজুলল করিম, দর্শনকোষ, ২২৪-২২৫ পৃষ্ঠা ))
যদি কেউ স্বতঃসিদ্ধ বিষয়গুলো অস্বীকার করে, তখন যুক্তিপ্রবণ মানুষ হিসেবে আপনার উচিত তাকে পালটা প্রশ্ন করা; “তুমি এই বিষয়গুলো অস্বীকার করতে চাইছো, তবে এর বিপক্ষে তোমার কাছে কী প্রমাণ আছে? ” ধরুন, কেউ যদি দাবি করে যে, আমাদের এই মহাবিশ্বের কোনো বাস্তব অস্তিত্ব নেই, যা কিছু ঘটছে তা শুধুই একটি স্বপ্ন বা মস্তিষ্কের বিভ্রম-অথবা যদি সে বলে, ‘২ + ২ = ৫!' তখন আপনি কি নিজেকে এ ধরনের অমূলক দাবির বিরুদ্ধে ২ + ২ = ৪, আপনার অস্তিত্ব, কিংবা মহাবিশ্বের অস্তিত্বকে প্রমাণ করার প্রয়াসে নিয়োজিত করবেন? নাকি আপনি তাকে প্রশ্ন করবেন, “তুমি কেন দাবি করছো যে এগুলো বাস্তবে নেই? তোমার কাছে এর বিপক্ষে কী কোনো যুক্তি বা প্রমাণ আছে?” একজন যুক্তিপ্রবণ মানুষ হিসেবে অবশ্যই তাকে পালটা প্রশ্ন ছুঁড়ে দিতে হবে। কারণ, আমাদের অস্তিত্ব, এই মহাবিশ্বের অস্তিত্ব, এবং ২ + ২ = ৪, এগুলোকে আমরা স্বতঃসিদ্ধ সত্য হিসেবে গ্রহণ করি। যে কোনো স্বতঃসিদ্ধ সত্যের সত্যতা নিয়ে কেউ যখন চ্যালেঞ্জ তোলে, তখন তার প্রমাণের দায়িত্ব সেই চ্যালেঞ্জকারী ব্যক্তির উপরই বর্তায়।
মুক্তমনা নাস্তিকরা প্রায়শই দাবি করে, ধর্ম কিংবা সৃষ্টিকর্তার প্রতি বিশ্বাসের উৎস হলো সমাজ, রাষ্ট্র, পরিবার বা সংস্কৃতি। তাদের মতে, সৃষ্টিকর্তা বা কোনো অতিপ্রাকৃতিক সত্তার অস্তিত্বের কোনো বাস্তব ভিত্তি নেই; এগুলো কেবল মানুষের কল্পনার ফসল। তারা যুক্তি দেয়, পরিবার, সমাজ, এবং রাষ্ট্র ছোটবেলা থেকেই আমাদের উপর এই বিশ্বাসগুলো চাপিয়ে দেয়, ফলে আমরা এগুলো সত্য বলে মেনে নেয়। তাদের এমন দাবির পেছনে একটি দর্শন কাজ করে-নাস্তিক্যবাদের মতে, মানুষের জ্ঞান কেবলমাত্র অভিজ্ঞতার মাধ্যমেই অর্জিত হয়। তারা মনে করে, মানুষের ভেতরে যদি কোনো সহজাত জ্ঞান বা অতিপ্রাকৃতিক উৎস থেকে আসা কোনো অন্তর্নিহিত জ্ঞান থাকত, তবে তা সৃষ্টিকর্তার অস্তিত্বকে নিশ্চিত করত । কিন্তু সত্য এটাই যে, নাস্তিকতা কখনো সহজাত বা অন্তর্নিহিত কোনো বিশ্বাস নয়। বরং ধর্মীয় বিশ্বাস এবং সৃষ্টিকর্তার প্রতি আস্থার অনুভূতিই মানুষের সহজাত। এই সহজাত জ্ঞানের শক্তিতেই নাস্তিক্যবাদের মতো অর্জিত এবং যুক্তিহীন ধারণাগুলোকে অপসারণ করা সম্ভব। সহজাত সত্যের আলোতেই নাস্তিক্যবাদের ভিত্তি ভেঙে পড়ে এবং তা ইতিহাসের আস্তাকুঁড়ে স্থান পায় ৷
কিন্তু, স্রষ্টার অস্তিত্বকে স্বতঃসিদ্ধ ও সহজাত প্রমাণ করার আগে কিছু গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন আমাদের সামনে উঠে আসে। যেমন: কেন নাস্তিকরা স্রষ্টার অস্তিত্বের জন্য প্রমাণ দাবি করে? স্রষ্টার অস্তিত্ব স্বীকার করার জন্য কি আদৌ কোনো প্রমাণের প্রয়োজন রয়েছে? প্রমাণের প্রয়োজনীয়তা আসলে কতটা যুক্তিগ্রাহ্য এবং তা কি মানবীয় বোধ-বুদ্ধি ও অভিজ্ঞতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ? এই প্রশ্নগুলোর উত্তর খুঁজে বের করলেই আমরা বুঝতে পারব, স্রষ্টার অস্তিত্ব আসলে এমন একটি বাস্তবতা, যা যুক্তি-প্রমাণের বাইরেও মানুষের হৃদয় ও চেতনার গভীরতর অংশে সহজাতভাবে বিরাজমান । নাস্তিকরা মূলত ‘বার্ডেন অফ প্রুফ' এর উপর ভিত্তি করে দাবি করে থাকে যে 'দাবি যার প্রমাণ তার'। তাই নাস্তিকদের যুক্তি হলো, স্রষ্টার অস্তিত্বের দাবি যেহেতু আস্তিকরা করেন, সেহেতু এই দাবির পক্ষে প্রমাণ উপস্থাপন করার দায়িত্বও তাদের। আপাতদৃষ্টিতে, নাস্তিকদের এই বক্তব্যটি যুক্তিযুক্ত বলে মনে হয়। ধরুন কোনো বিজ্ঞানী ঘোষণা করলেন যে তিনি এমন একটি যন্ত্র আবিষ্কার করেছেন যা মানুষকে আকাশে ওড়াতে সক্ষম। স্বাভাবিকভাবেই, তার দাবি বিশ্বাসযোগ্য হওয়ার জন্য তার উচিত সেই যন্ত্রটি উপস্থাপন করা বা তার কার্যকারিতা প্রদর্শন করা। কিন্তু যদি তিনি বলেন, “আপনি প্রমাণ করুন যে এমন কোনো যন্ত্র আমি বানাইনি,” তাহলে সেই দাবি যুক্তি এবং প্রমাণের মানদণ্ডে গ্রহণযোগ্য হবে না। কারণ প্রমাণের দায় তার উপর, যিনি দাবি করেছেন।
ঠিক একইভাবে, স্রষ্টার অস্তিত্ব নিয়ে আস্তিকদের দাবি করলে, সেই দাবিকে সমর্থন করার জন্য প্রমাণ দেওয়ার দায়ও আস্তিকদের। কিন্তু এখানে নাস্তিকরা আরও একটি যুক্তি সামনে আনেন: কেউ যদি দাবি করেন যে স্রষ্টা নেই, তাহলে সেই দাবিও একইভাবে প্রমাণ করতে হবে। সুতরাং, 'দাবি যার, প্রমাণের বোঝাও তার,' এই নীতির আলোকে স্রষ্টার অস্তিত্ব নিয়ে প্রমাণ চাওয়া কোনোভাবেই অযৌক্তিক নয়। কিন্তু প্রশ্ন হলো, দাবিকারীর উপর প্রমাণের বোঝা চাপিয়ে দেওয়া হয়? এর প্রধান কারণ সম্ভবত এই যে, কোনো দাবিকে তখনই ‘জ্ঞান' হিসেবে বিবেচনা করা যায়, যখন তার পক্ষে শক্তিশালী যুক্তি ও নির্ভরযোগ্য ন্যায্যতা উপস্থাপন করা হয় । সৃষ্টিকর্তার অস্তিত্ব নিয়ে আলোচনা করলেও একই নিয়ম প্রযোজ্য। যেহেতু স্রষ্টার অস্তিত্বের পক্ষে দাবি তোলেন আস্তিকরা, তাই এই দাবির যৌক্তিকতা প্রমাণের দায়িত্বও তাদের কাঁধে। যতক্ষণ তারা ন্যায্য ও নির্ভরযোগ্য যুক্তি উপস্থাপন করতে না পারবেন, ততক্ষণ তাদের দাবি জ্ঞান হিসেবে গণ্য হবে না।
দুটি মূল স্তম্ভে এই যুক্তি দাঁড়িয়ে আছে; ১. স্রষ্টায় বিশ্বাস তখনই ন্যায্য বা নিশ্চিত হতে পারে, যখন তার পক্ষে শক্তিশালী যুক্তি উপস্থিত হয়। ২. যদি স্রষ্টায় বিশ্বাসের পক্ষে কোনো ভালো যুক্তি না থাকে, তবে স্রষ্টার অস্তিত্বকে ন্যায্য বা নিশ্চিত বলে মেনে নেওয়া সম্ভব নয়।
এভাবে বার্ডেন অফ প্রুফ (প্রমাণের বোঝা) আস্তিকদের কাঁধেই থাকে এবং এটি একটি যুক্তিসংগত প্রত্যাশা। এই বিতর্কের সূচনাতেই আমি আস্তিক ও নাস্তিক উভয়ের প্রতি এক গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন উত্থাপন করতে চাই। এমন কি কোনো জ্ঞান নেই, যা আমরা কোনো যুক্তি বা প্রমাণ ছাড়াই বিশ্বাস করি? আমাদের সমস্ত বিশ্বাস কি কেবল যুক্তি দ্বারা প্রতিষ্ঠিত হয়? আমরা কি নিঃসন্দেহে বলতে পারি যে প্রতিটি ধারণাই যুক্তির উপর দাঁড়িয়ে আছে? আসুন, কিছু সাধারণ উদাহরণ বিবেচনা করি। আমরা স্বতঃসিদ্ধভাবে বিশ্বাস করি যে অন্য মানুষ আমাদের মতোই সচেতন, তারা নিছক যান্ত্রিক রোবট নয়। আবার, বাহ্যিক জগতের অস্তিত্বের বিষয়টিও আমরা এমনভাবে গ্রহণ করি, যেন এটি প্রশ্নাতীত সত্য। কেউই সচরাচর ভাবে না যে আমরা একটি ম্যাট্রিক্স সিমুলেশনের মধ্যে বাস করছি কিংবা নিছক স্বপ্ন দেখছি। এমনকি দূরের কোনো অজানা গ্রহে একটি পাত্রের মধ্যে ভেসে থাকা একটি মস্তিষ্ক হওয়ার সম্ভাবনার বিষয়টিও আমরা সহজে স্বীকার করি না। বরং, আমাদের অধিকাংশের কাছেই বাহ্যিক জগতের বাস্তবতা অতি স্বাভাবিক ও স্পষ্ট। আমরা আরও বিশ্বাস করি যে আমাদের যৌক্তিক চিন্তাশক্তির প্রক্রিয়াগুলি মহাবিশ্ব সম্পর্কে সত্য উপলব্ধি করতে সক্ষম। আমরা যদি আমাদের যৌক্তিক অনুষদগুলোকে ভ্রান্ত বলে ধরে নিই, তাহলে কোনো ধরনের সন্দেহ প্রকাশের সঠিকতা নিয়ে আমরা নিশ্চিত হতে পারবো না। কেননা, যৌক্তিক প্রক্রিয়া যদি ভ্রান্ত হয়, তবে সেটির মাধ্যমেই কি করে আমরা সত্য ও মিথ্যার পার্থক্য নির্ণয় করবো? সুতরাং, আমাদের যৌক্তিক অনুষদগুলোকে অবিভ্রান্ত ও গ্রহণযোগ্য মনে করাই একমাত্র সমাধান ।
এবার আসুন, অতীতের প্রসঙ্গে কথা বলি। ধরুন, আপনার এক ঘনিষ্ঠ বন্ধু হঠাৎ বললো যে আমাদের অতীত, অর্থাৎ গতকাল কী ঘটেছিল কিংবা স্কুলজীবনে কী করেছি, সেসব কিছুই কখনো বাস্তবে ঘটেনি। বরং, সেগুলো আমাদের মস্তিষ্কের একটি বিভ্রম মাত্র। তখন যদি সে আপনাকে জিজ্ঞেস করে, “তুমি কি অতীতের বাস্তবতায় বিশ্বাস করো?” – আপনি কি প্রমাণ করতে পারবেন যে অতীতের ঘটনাগুলো আসলেই বাস্তবে ঘটেছিল? সম্ভবত, কোনো যুক্তি দিয়েই তা প্রমাণ করা যাবে না। তবুও, আমরা বিশ্বাস করি যে অতীত বাস্তব এবং সেসব স্মৃতি আমাদের জীবনের অংশ। এরপর আসি গাণিতিক সত্যের বিষয়ে। ২ + ৩ = ৫ এই সমীকরণে আমাদের কোনো সংশয় নেই। কিন্তু এর পক্ষে কোনো যুক্তি দেওয়া যায় কি? আমরা এটি স্বতঃসিদ্ধ হিসেবেই গ্রহণ করি।
এখন, আস্তিকদের দাবি নিয়ে আলোচনা করা যাক। 'সৃষ্টিকর্তার অস্তিত্ব সম্পর্কে আস্তিকদের যে প্রস্তাবনা, তা জ্ঞান হতে পারে না যতক্ষণ পর্যন্ত এর পক্ষে শক্তিশালী যুক্তি উপস্থাপন করা না হয় এ ধরনের বক্তব্য নাস্তিকদের থেকে প্রায়ই শোনা যায়। কিন্তু উপরে উল্লিখিত বিশ্বাসের প্রকারগুলো, যেমন বাহ্যিক জগতের অস্তিত্ব, অতীতের বাস্তবতা, যৌক্তিক প্রক্রিয়ার অবিভ্রান্ততা এবং গাণিতিক সত্যতা এগুলোর পক্ষে কি সত্যিই কোনো প্রমাণ আছে? আমরা কি যুক্তি-প্রমাণের মাধ্যমে এসব বিশ্বাস গ্রহণ করি? অবশ্যই না। কারণ এগুলো এমন বিশ্বাস, যা যুক্তি ছাড়াই গ্রহণ করতে হয়। এগুলোকে বলা হয় স্বতঃসিদ্ধ বা স্ব-প্রমাণিত বিশ্বাস। স্বতঃসিদ্ধ বিশ্বাসগুলো কোনো প্রকার যুক্তি ছাড়াই আমাদের জ্ঞানের অংশ হয়ে যায়। এ কারণে আমরা নিশ্চিতভাবে জানি যে এসব বিষয়ে আমাদের ধারণা যথার্থ। তাই, এমন বিশ্বাসগুলোকেও জ্ঞান হিসেবে গ্রহণ করা হয়, যদিও এর পেছনে কোনো যুক্তি- প্ৰমাণ নেই ৷
অন্যদিকে, নাস্তিকরা দাবি করেন যে কোনো প্রস্তাব তখনই জ্ঞানে পরিণত হবে, যখন সেটি ন্যায়সংগত সত্য বিশ্বাস হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হবে। অর্থাৎ, যদি কোনো প্রস্তাব ন্যায়সংগত সত্য বিশ্বাস হয়, তবে সেটিকে সত্য বলে বিবেচনা করা হবে। কিন্তু, প্রশ্ন হচ্ছে, শুধুমাত্র ন্যায়সংগত সত্য বিশ্বাস হওয়াই কি কোনো প্রস্তাবকে সত্য বলে প্রমাণ করার জন্য যথেষ্ট? এই প্রশ্নের উত্তর জানতে আমাদের 'জ্ঞানের ত্রিপক্ষীয় বিশ্লেষণ' সম্পর্কে অবগত হতে হবে।
জ্ঞানের ত্রিপক্ষীয় বিশ্লেষণ
জ্ঞানের ত্রিপক্ষীয় বিশ্লেষণ জ্ঞানতত্ত্বের ঐতিহ্যগত দৃষ্টিভঙ্গি হল যে কোন প্রস্তাবকে তখনই জ্ঞান দাবি করা যেতে পারে যখন সেই প্রস্তাবটি বিশ্বাসের জন্য আমাদের কাছে পর্যাপ্ত ন্যায্যতা থাকে, অন্য কথায়, জ্ঞান হল ন্যায়সংগত-সত্য-বিশ্বাস (Justified Truth Belief)। (( James Ladzman; understanding philosophy of science; Page: 6 )) জ্ঞানের ত্রিপক্ষীয় বিশ্লেষণ অনুযায়ী, কোনো প্রস্তাবকে তখনই জ্ঞান বলা যায়, যখন তা তিনটি শর্ত পূরণ করে;
১. বিশ্বাস: প্রস্তাবটি বিশ্বাসযোগ্য হতে হবে।
২. সত্য: প্রস্তাবটি অবশ্যই সত্য হতে হবে।
৩. ন্যায়সংগততাঃ প্রস্তাবটি ন্যায়সংগত হওয়া জরুরি।
উদাহরণ হিসেবে, “করিম একজন ভালো ছেলে” এই প্রস্তাবটি ধরা যাক। যদি মিস্টার রহিম বিশ্বাস করেন যে করিম একজন ভালো ছেলে এবং তার এই বিশ্বাস যথাযথ প্রমাণের মাধ্যমে ন্যায়সংগত হয়, তবে এটি জ্ঞান হিসেবে বিবেচিত হবে। এখন অন্য একটি উদাহরণ ধরা যাক: আপনি বিশ্বাস করেন যে ইউরোপের সকল হাতির রং গোলাপি। কিন্তু, এই বিশ্বাস কি জ্ঞান হওয়ার জন্য যথেষ্ট? না, কারণ আপনার বিশ্বাসটি সত্য নয়। জ্ঞান হওয়ার জন্য শুধুমাত্র বিশ্বাস করলেই হবে না, সেটি সত্যও হতে হবে। জ্ঞানের ত্রিপক্ষীয় বিশ্লেষণ আমাদের এটাই বলে যে ন্যায়সংগত সত্য বিশ্বাসের অভাব থাকলে কোনো প্রস্তাব জ্ঞান হিসেবে গৃহীত হতে পারে না। তবে প্রশ্ন থেকে যায় কেবল সত্য হলেই কি জ্ঞান হওয়ার জন্য যথেষ্ট?
কেবল সত্যই কি জ্ঞান হওয়ার জন্য যথেষ্ট?
জ্ঞানের প্রচলিত ত্রিপক্ষীয় বিশ্লেষণ অনুযায়ী, কোনো প্রস্তাব জ্ঞান হতে হলে তিনটি শর্ত পূরণ করতে হবে-বিশ্বাস, সত্য এবং ন্যায্যতা। তবে এই ত্রিপক্ষীয় বিশ্লেষণকে চ্যালেঞ্জ করে এডমন্ড গেটিয়ার ১৯৬৩ সালে একটি যুগান্তকারী গবেষণাপত্র রচনা করেন। তিনি দেখান, ন্যায্যতা, সত্য এবং বিশ্বাস থাকা সত্ত্বেও কোনো প্রস্তাব সবসময় জ্ঞান হয় না।
দৃশ্যপট ১: একটি ভুল বিশ্বাস ও তার ফলাফল। ২০১৬ সালের মার্কিন প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের সময় অধিকাংশ মানুষ বিশ্বাস করেছিল যে হিলারি ক্লিনটন বিজয়ী হবেন। কিন্তু নির্বাচনের ফলাফলে দেখা গেল ডোনাল্ড ট্রাম্প বিজয়ী হয়েছেন। যাদের বিশ্বাস ছিল হিলারি জয়ী হবেন, তাদের এই বিশ্বাস জ্ঞান নয়, কারণ তা সত্য প্রমাণিত হয়নি এবং যথাযথ ন্যায্যতার অভাব ছিল। এর বিপরীতে, কিছু মানুষ প্রস্তাব করেছিল হিলারি পরাজিত হবেন, যা সত্য প্রমাণিত হলেও তা জ্ঞান হিসেবে গ্রহণযোগ্য নয়। কেন? কারণ তাদের বিশ্বাসটি স্রেফ কাকতালীয়ভাবে সত্য প্রমাণিত হয়েছে । বিশ্বাসের পক্ষে তাদের কোনো উপযুক্ত ন্যায্যতা ছিল না ।
দৃশ্যপট ২: একটি ন্যায্যতাপূর্ণ বিশ্বাস। এখন কল্পনা করুন, আপনি জানালার বাইরে বৃষ্টি হতে দেখছেন এবং এ কারণে আপনি বিশ্বাস করছেন যে বাইরে বৃষ্টি হচ্ছে। এখানে আপনার বিশ্বাস শুধু সত্যই নয়, এর পক্ষে ন্যায্যতাও রয়েছে। আপনার ন্যায্যতা এই যে জানালার বাহিরে আপনি দেখতে পাচ্ছেন বৃষ্টি হচ্ছে। এই ক্ষেত্রে আপনার বিশ্বাস জ্ঞানে রূপান্তরিত হয়েছে, কারণ এতে সত্য, বিশ্বাস এবং ন্যায্যতা একত্রে বিদ্যমান ।
ন্যায়সংগত সত্য বিশ্বাসই কি জ্ঞান হওয়ার জন্য যথেষ্ট?
‘ন্যায়সংগত-সত্য-বিশ্বাস' জ্ঞান হওয়ার জন্য যথেষ্ট নয়। 'Gettier Problem' দ্বারা এটি সহজেই ব্যাখ্যা করা যায়। গেটিয়ার সমস্যা, জ্ঞানতত্ত্বের ক্ষেত্রে, বর্ণনামূলক (( জ্ঞানতত্ত্বে বর্ণণামূলক জ্ঞান হলো এমন তথ্যে যা বর্ণণামূলক বাক্য ব্যবহার করে প্রকাশ করা যেতে পারে। একে তাত্ত্বিক জ্ঞান, ঘোষণামূলক জ্ঞান বা প্রস্তাবিত আন-ও বলা হয়।)) জ্ঞান বোঝার ক্ষেত্রে একটি যুগান্তকারী দার্শনিক সমস্যা। আমেরিকান দার্শনিক এডমন্ড গেটিয়ার জ্ঞানের দীর্ঘকাল ধরে থাকা 'ন্যায়সঙ্গত-সত্য-বিশ্বাস' (JTB) অ্যাকাউন্টকে চ্যালেঞ্জ করে। ন্যায়সঙ্গত-সত্য-বিশ্বাস অনুযায়ী যদি কোনো দাবি তিনটি শর্ত (ন্যায্যতা, সত্য এবং বিশ্বাস) পূরণ করতে পারে তবে সেই দাবিকে জ্ঞান বলে বিবেচনা করা হয়।
কিন্তু ১৯৬৩ সালে গেটিয়ার 'ইজ জাস্টিফাইড ট্রু বিলিফ নলেজ?' শিরোনামে একটি গবেষণাপত্রে দুটি উদাহরণের মাধ্যমে প্রমাণ করেন যে, ন্যায্যতা, সত্য এবং বিশ্বাস থাকার পরেও একটি দাবি মিথ্যা হতে পারে। (( IS JUSTIFIED TRUE BELIEF KNOWLEDGE?; By EDMUND L. GETTIE )) এইভাবে গেটিয়ার দাবি করেছেন যে, JTB অ্যাকাউন্টটি জ্ঞানের পর্যাপ্ত শর্তগুলি পূরণ করে না। অতএব, গেটিয়ার যুক্তি দিয়েছিলেন, আমরা 'জ্ঞান' বলতে কী বুঝি তা সঠিকভাবে বুঝার জন্য একটি ভিন্ন ধারণাগত বিশ্লেষণ প্রয়োজন। (JTB) অ্যাকাউন্ট এর বিপক্ষে গেটিয়ারের পালটা উদাহরণ নিন্মরুপ।
ধরা যাক, স্মিথ এবং জোন্স একটি চাকুরির জন্য আবেদন করেছেন। স্মিথের কাছে শক্তিশালী প্রমাণ রয়েছে যে, (D) জোন্স হলেন সেই ব্যক্তি যিনি কাজ পাবেন, এবং জোন্সের পকেটে দশটি মুদ্রা রয়েছে। (E) যার পকেটে দশটি মুদ্রা থাকবে তিনিই নির্বাচিত হবেন। স্মিথের প্রমাণটি হলো, হয়ত কোম্পানির প্রেসিডেন্ট তাকে আশ্বস্ত করেছিলেন যে, জোনস শেষ পর্যন্ত নির্বাচিত হবেন এবং স্মিথ দশ মিনিট আগে জোন্সের পকেটে দশটি মুদ্রা দেখছিলো। তাই স্মিথের বিশ্বাস রয়েছে যে, প্রস্তাব (D) & (E) সত্য। কিন্তু শেষ পর্যন্ত স্মিথ নিজেই চাকরিটি পেলেন, যদিও তার অজান্তে তার নিজের পকেটেও দশটি মুদ্রা ছিল। এক্ষেত্রে, প্রস্তাব (E) সত্য, কিন্তু (D) মিথ্যা । আমাদের এই উদাহরণে প্রস্তাব (E) সত্য। স্মিথ বিশ্বাস করে যে (E) সত্য। স্মিথের বিশ্বাস (E) ন্যায়সংগত। এখানে ন্যায়সঙ্গত-সত্য-বিশ্বাসের উপর ভিত্তি করে স্মিথের বিশ্বাস হলো, জোন্স চাকুরিটির জন্য নির্বাচিত হবেন। এ
কইভাবে এটাও সুস্পষ্ট যে, স্মিথের নিজের পকেটে থাকা কয়েনের ভিত্তিতেও (E) সত্য তা স্মিথ জানেন না। সে জোন্সের পকেটে থাকা কয়েনের গণনার উপর ভিত্তি করে জানে (E) সত্য, এবং এর উপর ভিত্তি করে স্মিথ মিথ্যাভাবে বিশ্বাস করেন যে জোন্স চাকুরির জন্য নির্বাচিত হবেন। কিন্তু সত্য হলো জোন্স নয়, স্মিথ নিজেই নির্বাচিত হয়েছেন। তাই আমরা দেখতে পাচ্ছি যে, ‘ন্যায়সঙ্গত-সত্য- বিশ্বাস' থাকার পরেও স্মিথের বিশ্বাসটি মিথ্যা প্রমাণিত হলো। সুতরাং, ‘Gatter Problem' এর মাধ্যমে আমরা বুঝতে পারি যে JTB (সত্য-বিশ্বাসের সাথে মিলিত ন্যায্যতা) জ্ঞানের শর্ত প্রণয়নের একটি পর্যাপ্ত উপায় নয়।
অনেকভাবে 'Gatter Problem' এর সমস্যা সমাধান করার চেষ্টা করা হয়েছে তবে প্রতিবারই তা ব্যর্থ হয়েছে। তাই 'proper functionalism' নামক থিসিস দাঁড় করানো হয় যার মাধ্যমে 'Gatter Problem' এর সমস্যা সমাধান করা । এই বিষয়ে জানতে হলে আমাদের ‘ওয়ারেন্ট' (Warrant) সম্পর্কে জানতে হবে। ইতোমধ্যে আমরা দেখেছি ন্যায্যতা জ্ঞানের শর্ত প্রণয়ন করতে ব্যর্থ। অতএব, আমরা ন্যায্যতা ব্যতীত অন্য একটি ধারণা সম্পর্কে কথা বলবো যা জ্ঞানের জন্য যথেষ্ট এবং এটিকে আমরা ‘ওয়ারেন্ট' হিসাবে উল্লেখ করি। তবে এর মানে এই না যে ন্যায্যতাকে আমরা একেবারেই বাদ দিয়ে দিচ্ছি।
ওয়ারেন্ট
‘ওয়ারেন্ট” বলতে বুঝানো হয় সেই বিশেষ বৈশিষ্ট যা সত্য বিশ্বাসকে জ্ঞানে পরিণত করে বা নিশ্চিত প্রমাণিত করে। অথবা এভাবেও বলা যেতে পারে যে, ওয়ারেন্ট হলো, যা জ্ঞান এবং নিছক সত্য বিশ্বাসের মধ্যে পার্থক্য করে। আমরা দেখেছি কেবল ন্যায্যতা আমাদের সত্য বিশ্বাসকে জ্ঞানে পরিণত করা বা নিশ্চিত প্রমাণ করার জন্য যথেষ্ট নয়। কিন্তু ‘ওয়ারেন্ট' আমাদের সত্য বিশ্বাস এবং জ্ঞানে পরিণত হওয়ার মধ্যে যে 'ফাঁক' (Gap) থাকে তা পূরণ করে। তাই ওয়ারেন্ট হল সত্যিকারের বিশ্বাস এবং জ্ঞানের মধ্যে 'শূন্যতা পূরণকারী' (gap filler), এবং ওয়ারেন্টের মাধ্যমে আমাদের সত্য বিশ্বাস নিশ্চিতভাবে জ্ঞানে পরিণত হয়।
যেমন, S বিশ্বাস করে P অস্তিত্বশীল। S এর বিশ্বাস (P অস্তিত্বশীল) ওয়ারেন্টেড বা নিশ্চিত । সুতরাং, P অস্তিত্বশীল। একটি বিশ্বাস তখনই 'ওয়ারেন্ট' হবে যদি এবং কেবল যদি;
- 1. It is produced by cognitive faculties functioning properly. (এটি জ্ঞানীয় অনুষদের দ্বারা উৎপাদিত হয় যা সঠিকভাবে কাজ করে) অর্থাৎ, আপনার জ্ঞানীয় অনুষদ-যেমন দৃষ্টিশক্তি, শ্রবণশক্তি, কিংবা অন্যান্য ইন্দ্রিয়-যথাযথভাবে কাজ করতে হবে। এগুলো যদি যথাযথভাবে কাজ না করে, তবে আপনার অর্জিত তথ্য বা বিশ্বাস প্রকৃত সত্য হিসেবে গণ্য হবে না। উদাহরণস্বরূপ, বিভ্রম বা ডিলিউশনের মতো মানসিক অবস্থার কারণে যদি আপনি কোনো কিছু অনুভব করেন বা প্রত্যক্ষ করেন, তাহলে সেই অভিজ্ঞতা জ্ঞান বা সত্যের মানদণ্ডে উত্তীর্ণ হবে না।তাই, জ্ঞানীয় অনুষদের নির্ভুলতা নিশ্চিত করা গুরুত্বপূর্ণ।
- 2. In a cognitive environment sufficiently similar to that for which the faculties were designed. (একটি জ্ঞানীয় পরিবেশে যার জন্য অনুষদগুলি ডিজাইন করা হয়েছিল তার অনুরূপ।) আমাদের জ্ঞানীয় অনুষদগুলো কার্যকর হতে হলে সেগুলোকে এমন একটি পরিবেশে কাজ করতে হবে, যা তাদের নকশার সাথে সঙ্গতিপূর্ণ। যেমন, একটি গাড়ির ক্ষেত্রে ধরুন—গাড়ির চারটি চাকা, ইঞ্জিন, এবং জ্বালানি তেলের মতো প্রয়োজনীয় উপাদান সবই সঠিকভাবে প্রস্তুত রয়েছে। কিন্তু আপনি যদি সেই গাড়িটিকে সাগরে চালানোর চেষ্টা করেন, তবে তা ব্যর্থ হবে। কারণ, গাড়ি স্থলপথে চলাচলের জন্য তৈরি, সাগরে নয়। ঠিক একইভাবে, আমাদের জ্ঞানীয় অনুষদগুলো যেমন দৃষ্টিশক্তি, শ্রবণশক্তি, চিন্তাশক্তি, ইত্যাদি এমন পরিবেশেই কার্যকর হবে যা তাদের উদ্দেশ্য বা নকশার সাথে খাপ খায়। যদি এই পরিবেশ অনুপযুক্ত হয়, তবে তারা সঠিকভাবে কাজ করতে পারবে না ।
- 3. Design plan aimed at the production of true beliefs. (জ্ঞানীয় অনুষদের পরিকল্পিত নকশার লক্ষ্য হবে সত্য বিশ্বাস উৎপাদন করা) আমাদের জ্ঞানীয় অনুষদ এবং পরিবেশের একটি পরিকল্পিত নকশা থাকতে হবে যার লক্ষ্য হবে সত্য বিশ্বাস অর্জন করা, অবশ্যই মিথ্যা বিশ্বাস অর্জন করা নয়। আপনার জ্ঞানীয় অনুষদগুলো কীভাবে কাজ করবে তার অবশ্যই একটা নকশা রয়েছে। একজন আস্তিকের জন্য অবশ্যই ডিজাইনটি স্রষ্টা করেছে এবং একজন নাস্তিকের জন্য তা প্রকৃতি করেছে।
- 4. Beliefs successfully being true. (বিশ্বাসটি সফলভাবে সত্য হবে) আমাদের বিশ্বাসটিকে সফলভাবে সত্যে পর্যন্ত পৌঁছাতে হবে। আমাদের বিশ্বাসে যদি উল্লিখিত ওয়ারেন্ট থাকে তাহলে বিশ্বাসটি অবশ্যই জ্ঞানে পরিণত হবে। কোনো কিছু ওয়ারেন্টেড হতে হলে আমাদের জ্ঞানীয় অনুষদ সঠিকভাবে কাজ করতে হবে। ধরুন, আপনি একটি বাগানে কাঠবিড়ালি দেখতে পাচ্ছেন। যদি এই দেখাটা বিভ্রম থেকে সৃষ্ট হয়, অর্থাৎ আপনার জ্ঞানীয় অনুষদ সঠিকভাবে কাজ না করে, তাহলে বাগানে কাঠবিড়ালি থাকার সত্যতা সত্ত্বেও আপনার এই বিশ্বাস জ্ঞানে পরিণত হবে না। কারণ বিভ্রম প্রমাণ করে যে, আপনার জ্ঞানীয় অনুষদ যথাযথ ছিল না।
সুতরাং, আপনার বিশ্বাস তখনই জ্ঞানে পরিণত হবে যখন একটা সত্য বিশ্বাসের সাথে ন্যায্যতা এবং ওয়ারেন্ট একই সাথে থাকবে। যখনই একটি বিশ্বাস একই সাথে 'সত্য বিশ্বাসের সাথে ন্যায্যতা এবং ওয়ারেন্ট' থাকবে তখনই বিশ্বাসটি জ্ঞানে 'সঠিক কার্যকারণবাদ' কার্যকারণবাদ' (proper functionalism) হিসেবে বিবেচিত হবে।
স্রষ্টা; সঠিক মৌলিক বিশ্বাস বা স্বতঃসিদ্ধ সত্য
আমরা বিভিন্ন প্রকার বিশ্বাস ধারণ করি। কিছু বিশ্বাস অন্য বিশ্বাসের উপর নির্ভরশীল, আবার কিছু বিশ্বাস স্বতঃস্ফূর্ত এবং তাৎক্ষণিক। যেমন, কলিং বেলের আওয়াজ শুনে 'কলিং বেল বেজেছে' এই বিশ্বাসটি হয় মৌলিক, যা সরাসরি ইন্দ্রিয় অনুভূতির ফল । এর উপর ভিত্তি করে 'বাইরে কেউ এসেছে' - এই বিশ্বাসটি আসে। যে বিশ্বাস অন্য কোনো বিশ্বাসের উপর নির্ভর করে না, তা মৌলিক বিশ্বাস। ইন্দ্রিয়প্রত্যক্ষ, স্বতঃসিদ্ধ জ্ঞান (A কখনো Not A হবে না, অথবা A একই সাথে A এবং B হবে না।), স্মৃতি (গত মাসে আমরা চট্টগ্রামে ভ্রমণ করেছিলাম), - এসব মৌলিক বিশ্বাসের উৎস। আমরা প্রমাণ করতে চাই যে স্রষ্টার অস্তিত্বের বিশ্বাসও মানব মনের এমনই একটি মৌলিক বিশ্বাস, শুধু মৌলিক নয়, বরং ওয়ারেন্টেড (warranted) এবং সঠিক আমরা এখানে ‘সঠিক কার্যকারণবাদ' এবং ‘মৌলিক বিশ্বাস' সম্পর্কে জেনেছি।
আমাদের এই বাস্তব জগতের অস্তিত্ব, আমাদের জ্ঞানীয় অনুষদ অভ্রান্ত, অতীতের অস্তিত্ব, ইত্যাদি বিশ্বাসগুলো যেমন মানব মনের মৌলিক বিশ্বাস তেমনি স্রষ্টার অস্তিত্বের বিশ্বাসটিও মৌলিক বিশ্বাস। ইসলামী জ্ঞানতত্ত্ব অনুযায়ী কীভাবে স্রষ্টার অস্তিত্বের বিশ্বাসটি মৌলিক বিশ্বাসে পরিণত হয় তার একটি জ্ঞানতাত্ত্বিক মডেল তৈরি করা যাক ।
- প্রেমিস-১ঃ আল্লাহ তা'আলা আমাদের সৃষ্টি করেছেন এবং আমাদের এমন কিছু জ্ঞানীয় অনুষদ দিয়েছেন যার মাধ্যমে আমরা তার সম্পর্কে জানতে পারবো এবং সত্য সম্পর্কে ও তার সৃষ্টি সম্পর্কে জানতে পারবো।
- প্রেমিস-২ঃ আল্লাহ তা'আলা প্রতিটা মানুষকে আল্লাহর প্রকৃতির (ফিতরা) উপর সৃষ্টি করেছেন যা আল্লাহকে চিনতে, জানতে, এবং তার উপাসনা করতে উদ্বুদ্ধ করে।
- প্রেমিস-৩ঃ মানুষের সত্য বিশ্বাস অর্জনের জন্য ফিতরা অন্যান্য জ্ঞানীয় অনুষদের সাথে মিলিত হয়ে কাজ করে। যেমন, মন/হৃদয় (ক্বালব) । ফিতরা এবং জ্ঞানীয় অনুষদের এই সংযুক্তির মাধ্যমেই দুনিয়ার মধ্যে থাকা স্রষ্টার নিদর্শন সমূহ দেখে আমরা আল্লাহ তাআলা সম্পর্কে সচেতন হয় ।
- প্রেমিস-৪ঃ সুতরাং, ক্বালব এবং ফিতরার সম্বলিত জ্ঞান এবং স্রষ্টার নিদর্শন সমূহ দেখে আমরা কোনো প্রকার যুক্তির সাহায্য ছাড়াই আল্লাহ ত’আলার অস্তিত্ব সম্পর্কে জানতে পারি। (( Who Shoulders the Burden of Proof? Reformed Epistemology & Properly-Basic Islamic Belief – Sapience Institute ))
জ্ঞানতত্ত্বের এই মডেলটি (ইবনে তাইমিয়ার সংস্কারকৃত জ্ঞানতত্ত্ব) 'সঠিক কার্যকারণবাদ' এর সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ। পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তা'আলা বলেন,
আর আল্লাহ তোমাদেরকে নির্গত করেছেন তোমাদের মাতৃগর্ভ হতে এমন অবস্থায় যে, তোমরা কিছুই জানতেনা, এবং তিনি তোমাদেরকে দিয়েছেন শ্রবণশক্তি, দৃষ্টিশক্তি এবং হৃদয়, যাতে তোমরা কৃতজ্ঞতা প্রকাশ কর। (( (16:78) An-Nahl | (১৬:৭৮) আন-নাহাল-অনুবাদ/তাফসীর ))
এই আয়াত অনুযায়ী মানুষকে আল্লাহ কোনো প্রকার পূর্ব জ্ঞান ছাড়াই দুনিয়াতে প্রেরণ করেছেন এবং মানুষকে কিছু জ্ঞানীয় অনুষদ দেওয়া হয়েছে যার মাধ্যমে তারা আল্লাহ সম্পর্কে জানতে পারবে এবং তার উপাসনা করবে। আল্লাহ তা'আলা প্রতিটি মানুষকে একটি নির্দিষ্ট প্রকৃতির (ফিতরা) উপর সৃষ্টি করেছেন যা আমাদেরকে আল্লাহ তা'আলার জ্ঞান সম্পর্কে জানতে ও তার অস্তিত্বকে স্বীকৃতি দেওয়ার দিকে প্ররোচিত করে। আল্লাহ তা'আলা প্রত্যেক মানুষকে একটি নির্দিষ্ট প্রকৃতির উপর সৃষ্টি করার বিষয়টি সহজাত বিশ্বাসকেই নির্দেশ করে। ইসলামে সহজাত বিশ্বাসের নাম ‘ফিতরা’। এই শব্দটি এসেছে ‘ফাতারা' থেকে। ধর্মতাত্ত্বিক দিক থেকে ফিতরা হলো মানুষের স্বাভাবিক বিশ্বাস বা জন্মগত বিশ্বাস। পবিত্র কুরআন ও হাদিসে ফিতরা সম্পর্কে বলা হয়েছে। আল্লাহ তা'আলা বলেছেন,
কাজেই দ্বীনের প্রতি তোমার মুখমণ্ডল নিবদ্ধ কর একনিষ্ঠভাবে। এটাই আল্লাহর প্রকৃতি, যে প্রকৃতি তিনি মানুষকে দিয়েছেন, আল্লাহর সৃষ্টি কার্যে কোন পরিবর্তন নেই, এটাই সুপ্রতিষ্ঠিত দ্বীন, কিন্তু অধিকাংশ মানুষ জানে না। (( (30:30) Ar-Rum | (৩০:৩০) আর-রুম-অনুবাদ/তাফসীর ))
আবু হুরায়রা (রাযিঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (ﷺ) ইরশাদ করেছেন, প্রতিটি নবজাতকই ফিতরাতের উপর জন্মলাভ করে। এরপর তার পিতামাতা তাকে ইয়াহুদী, নাসারা বা অগ্নিপূজারী রূপে গড়ে তোলে। যেমন, চতুষ্পদ পশু একটি পূর্ণাঙ্গ বাচ্চা জন্ম দেয়। তোমরা কি তাদের মধ্যে কোন (জন্মগত) কানকাটা দেখতে পাও? পরে আবু হুরায়রা (রাযিঃ) তিলাওয়াত করলেন فِطْرَةَ اللَّهِ الَّتِي فَطَرَ النَّاسَ عَلَيْهَا لاَ تَبْدِيلَ لِخَلْقِ اللَّهِ ذَلِكَ الدِّينُ الْقَيِّمُ আল্লাহর দেওয়া ফিতরাতের অনুসরণ কর, যে ফিতরাতের উপর তিনি মানুষ সৃষ্টি করেছেন......এটাই সুদৃঢ় ধর্ম। (সূরা রূমঃ ৩০)। (( সহীহ বুখারী - হাদীস নং - ১২৭৬ | মুসলিম বাংলা ))
এই আয়াত এবং হাদিসগুলো এটাই ইঙ্গিত প্রধান করে যে, সমস্ত মানুষ একটা প্রাকৃতিক অবস্থা নিয়েই জন্মগ্রহণ করে। আর প্রকৃতিই হলো ফিতরা বা সহজাত জ্ঞান। ইসলামি থিওলজিতে ফিতরাত নিয়ে স্কলারগণদের মধ্যে তিন রকমের মত পাওয়া যায়। ১. নিরপেক্ষ দৃষ্টিভঙ্গি ২. দ্বৈত দৃষ্টিকোণ ৩. ইতিবাচক দৃষ্টিকোণ ৷ ফিতরাতের ‘ইতিবাচক দৃষ্টিকোণ' ইসলামিক থিওলজিতে সবচেয়ে বেশি গ্রহণযোগ্য এবং আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামায়াতের অনুসারীরা এই মত নিয়েছে। ইবনে তাইমিয়া, ইবনে কাইয়ুম, আল-গাজ্জালী, ইমাম কুরতুবী, ইমাম নববী, ইসমাঈল আল ফারুকী, সৈয়দ নকীব আল-আত্তাস, এবং শাহ ওয়ালী উল্লাহ, ইবনে হাজম সহ এমন অনেক প্রখ্যাত স্কলার এই মত গ্রহণ করেছেন। (( The Rationality of Believing in God; Asadullah Ali al-Andalusi. Page: 8 ))
বিংশ শতাব্দীর প্রখ্যাত ইসলামি চিন্তাবিদ সাঈয়েদ আবুল আ'লা মওদুদী (রহ.) ফিতরাত সম্পর্কে বলেন,
যে মানুষ আল্লাহকে চেনেনা, যে তাকে অস্বীকার করে, যে আল্লাহ ছাড়া আর কাউকে পূজা করে এবং আল্লাহর কর্তৃত্বের ক্ষেত্রে অন্য কাউকে অংশীদার করে, স্বভাব প্রকৃতির (ফিতরাত) দিক দিয়ে সেও মুসলিম, কারণ তার জীবন মৃত্যু সব কিছুই আল্লাহর বিধানের অনুসারী।.....যে মাথাকে জোরপূর্বক আল্লাহ ছাড়া অপরের সামনে অবনত করছে, সেও জন্মগতভাবে মুসলিম, অজ্ঞতার বশে যে হৃদয় মধ্যে সে অপরের প্রতি সম্মান ও ভালোবাসা পোষণ করে তাও সহজাত প্রকৃতিতে মুসলিম। (( সাঈয়েদ আবুল আ'লা মওদুদী; ইসলাম পরিচিত, পৃষ্ঠা নং-৮ ))
ইসলামি ধর্মতাত্ত্বিক ইমাম গাযালি ফিতরা সম্পর্কে বলছেন,
ফিতরাহ হল একটি মাধ্যম যা মানুষ ঈশ্বরের অস্তিত্বের সত্যতা অর্জনের জন্য ব্যবহার করে। আল্লাহর ব্যাপারে জ্ঞানের বিষয়টি এমন যে এটা থাকে প্রত্যেক মানুষের চেতনার গভীরে। (( Hamza Tzortzis, The Divine Reality: God, Islam & The Mirage of Atheism; Page: 69 *Hamza Tzortzis; The Divine Reality: God, Islam & The Mirage of Atheism; Page: 69 ))
এছাড়া, বিখ্যাত মনীষী ইবনু তাইমিয়্যা ফিতরা সম্পর্কে বলেছেন,
সহজাত স্বভাবকে বা ফিতরাকে এমন কিছু হিসাবে বর্ণনা করেছেন যা ঈশ্বও তাঁর সৃষ্টির মধ্যে সৃষ্টি করেছেন যা ঈশ্বরের অন্তর্নিহিত জ্ঞান ধারণ করে: .একজন নিখুঁত স্রষ্টার অস্তিত্ব ফিতরা থেকে জানা যায়, এবং এই জ্ঞান অন্তর্নিহিত, প্রয়োজনীয় এবং সুস্পষ্ট” । (( Hamza Tzortzis; The Divine Reality: God, Islam & The Mirage of Atheism; Page: 69 )) তিনি আরো বলেন, একজন সৃষ্টিকর্তার স্বীকৃতি সকল মানুষের অন্তরে গাঁথা আছে, এটা তাদের সৃষ্টির আবশ্যিক শর্ত থেকে। (( Hamza Tzortzis; The Divine Reality: God, Islam & The Mirage of Atheism; Page: 64 ))
ইবনে তাইমিয়া মনে করেন, আল্লাহর অস্তিত্ব প্রমাণের জন্য এমন দীর্ঘ ও জটিল দর্শনগত পদ্ধতি ব্যবহার করার প্রয়োজন নেই। আল্লাহর অস্তিত্ব প্রমাণে প্রচলিত পদ্ধতির বিপরীতে তিনি একটি বিকল্প পদ্ধতি ব্যবহার করেন, যাকে তিনি নাম দিয়েছেন ‘আল্লাহর নিদর্শনসমূহের মাধ্যমে প্রমাণ' (ইস্তিদলাল বিল-আয়াত)। যার পরিণামকে তিনি 'তাৎক্ষণিক' বলে মনে করেন এটি একটি ফিতরাতের জ্ঞান যেখানে নিদর্শনসমূহ একজন স্রষ্টার অস্তিত্ব নির্দেশ করে। নিদর্শন (আয়াত) ধারণাটি ইবনে তাইমিয়ার মতে আল্লাহর অস্তিত্ব প্রমাণের ক্ষেত্রে ফিতরার সঙ্গে নিবিড়ভাবে সংযুক্ত। ইবনে তাইমিয়া এ বিষয়ে ব্যাখ্যা করতে গিয়ে লিখেছেন,
নিদর্শনসমূহ (আয়াত) দ্বারা আল্লাহর অস্তিত্ব প্রমাণ করা বাধ্যতামূলক। এটি কুরআনের পথ এবং তাঁর বান্দাদের ফিতরার অন্তর্ভুক্ত ” । তিনি আরো বলেন, প্রতিটি সৃষ্ট বস্তুই একপ্রকার নিদর্শন এবং সরাসরি স্রষ্টার প্রমাণ। (( Ibn Taymiyya on theistic signs and knowledge of God. Page: 3 ))
আমরা দেখতে পাই যে ইবনে তাইমিয়ার মতে, আল্লাহ সম্পর্কে জ্ঞানে পৌঁছানোর প্রকৃত পদ্ধতি হলো নিদর্শনের (signs) প্রতি মনোযোগ দেওয়া, যা তাঁর অস্তিত্ব এবং সুনির্দিষ্ট গুণাবলিকে নির্দেশ করে। এই নিদর্শনগুলো হতে পারে তিনি যা উল্লেখ করেছেন ‘আয়াত আল-আনফুস’ (নিজেদের মধ্যে থাকা নিদর্শন) (( আয়াত আল-আনফুস হলো সেই সমস্ত উপলব্ধি বা অভিজ্ঞতা যা একজন ব্যক্তি নিজের ভেতর অনুভব করে এবং তা আল্লাহর সৃষ্টিশীলতার ও তাঁর অস্তিত্বের প্রতি ইঙ্গিত দেয়। )) অথবা ‘আয়াত আল-আফাক' (দিগন্ত ও মহাবিশ্বের মধ্যে থাকা নিদর্শন)।
পরিষ্কারভাবে, ইবনে তাইমিয়ার মতে, এই জ্ঞান ফিতরাতের অংশ; যা একটি সঠিক ও প্রাকৃতিক জ্ঞানের (Cognition) ফল । তাই এই জ্ঞানকে মনে করা হয় সঠিক বোধগম্যতার ভিত্তিতে একজন মানুষের হৃদয়/মন (Qalb) এর মধ্যে প্রতিষ্ঠিত থাকা সঠিক জ্ঞান । যা (হৃদয়/মন) সমস্ত বোধগম্যতা বা জ্ঞানের কেন্দ্র এবং ফিতরার আসন। ফিতরা সমস্ত ক্ষমতাকে তাদের প্রকৃত পথে পরিচালিত করে। এ কারণে আল্লাহর নিদর্শন উপলব্ধির মাধ্যমে, “যখন ফিতরা অক্ষত থাকে, তখন হৃদয়/মন আল্লাহকে জানে, তাঁকে ভালোবাসে এবং কেবল তাঁরই ইবাদত করে”। (( Ibn Taymiyya on theistic signs and knowledge of God. Page: 4 ))
ইবনে তাইমিয়া মানুষের বেশ কিছু জ্ঞানীয় অনুষদকে স্বীকার করেছেন। যেমন, ইন্দ্রিয় উপলব্ধির অনুষদ, যুক্তি (আকল), এবং হৃদয়/মন (ক্বালব), ইত্যাদি। তবে তিনি ফিতরাকে অন্যান্য জ্ঞানীয় অনুষদের মতো স্বাধীন কোনো জ্ঞানীয় অনুষদ বলে মনে করেন না। ইবনে তাইমিয়ার মতে ফিতরা হৃদয় / মন (ক্বালব) এর মধ্যে অবস্থান করে। তিনি আরো বলেন,
আল্লাহ তাঁর বান্দাদের প্রাকৃতিক স্বভাবকে এমনভাবে গড়ে তুলেছেন যা সত্যতা বুঝতে ও তা জানার জন্য প্রস্তুত। যদি এই হৃদয়ের ভেতরে সত্যকে জানার এই প্রবণতা না থাকত, তবে না তর্ক-বিতর্ক সম্ভব হতো, না প্রমাণ উপস্থাপন, ভাষা বা আলোচনা।” তিনি আরও বলেন, “আল্লাহ শারীরিক দেহকে খাদ্য ও পানির মাধ্যমে পুষ্টি গ্রহণের জন্য উপযোগী করেছেন, এবং যদি এটি না থাকত, তবে দেহগুলোকে পুষ্টি জোগানো ও লালনপালন করা সম্ভব হতো না। ঠিক তেমনি, শারীরিক দেহে যেমন উপযুক্ত পুষ্টি ও অপুষ্টিকে পার্থক্য করার ক্ষমতা রয়েছে, তেমনই হৃদয়ের মধ্যে সত্য মিথ্যাকে পার্থক্য করার একটি ক্ষমতা রয়েছে। হৃদয়ে অবস্থানকারী সেই ক্ষমতা হলো ফিতরা।
এখন প্রশ্ন আসতে পারে হৃদয়/মন (ক্বালব) এর সাথে ফিতরার সম্পর্ক কি? নিচের চিত্রটি লক্ষ্য করুন।
হৃদয়/মন (ক্বালব) → ফিতরা → আস্তিক মৌলিক বিশ্বাস।
উপরের চিত্রটি দেখায় যে হৃদয় এবং ফিতরার মধ্যে জ্ঞানগত সম্পর্ক কীভাবে একটি মৌলিক পদ্ধতিতে আস্তিক বিশ্বাসের উৎপত্তি ঘটায়। ইবনে তাইমিয়া বলেন,
যদি এটি [ক্বলব] কে যে অবস্থায় তৈরি করা হয়েছিল সেখানে রেখে দেওয়া হয়, কোনো স্মরণ শূন্য এবং কোনো চিন্তামুক্ত থাকে, তাহলে তা অজ্ঞতামুক্ত জ্ঞান গ্রহণ করবে এবং স্পষ্ট সত্য দেখবে যাতে কোন সন্দেহ নেই। ফলে এটি তার পালনকর্তার প্রতি বিশ্বাস স্থাপন করবে এবং অনুতপ্ত হয়ে তাঁর দিকে ফিরে আসবে। তিনি আরও বলেন, “হৃদয় নিজেই সত্য (আল্লাহ) ছাড়া অন্য কিছু গ্রহণ করে না। যখন কিছুই এতে স্থাপন করা হয় না, এটি কেবল সেই জিনিসটিই গ্রহণ করে যার জন্য (আল্লাহকে জানা) এটি সৃষ্টি করা হয়েছে।” এর তাৎপর্য হলো হৃদয়/মন (ক্বালব) এর সঠিক কার্যকারণের মাধ্যমেই একজন মানুষ আল্লাহকে জানতে পারে। তিনি আরো বলেন, “যখন ফিতরা অক্ষত রাখা হয়, তখন হৃদয় ঈশ্বরকে জানে, তাঁকে ভালোবাসে এবং একমাত্র তাঁরই উপাসনা করে। (( An Islamic Account of Reformed Epistemology. Page: 13 ))
সুতরাং, হৃদয়/মন (ক্বালব) এর সঠিক কার্যকারণের মাধ্যমে আমরা সৃষ্টিকর্তা সম্পর্কে অবগত হতে পারি। অর্থাৎ, মানুষকে আল্লাহ তা'আলা যে প্রকৃতির উপর সৃষ্টি করেছেন সেই প্রকৃতিকে যদি দূষিত না করা হয় তবেই মানুষ সহজাতভাবে আল্লাহ তা’আলা সম্পর্কে জানতে পারবে এবং তার উপাসনা করবে। আমরা ইতোমধ্যে একটি হাদিস দেখেছি যেখানে রাসুল (সাঃ) সুস্পষ্টভাবেই বলেছেন, প্রত্যেক নবজাতকই ফিত্রাতের উপর জন্মলাভ করে। অতঃপর তার পিতামাতা তাকে ইয়াহূদী, নাসারা বা মাজূসী (অগ্নিপূজারী) রূপে গড়ে তোলে। তাই আল্লাহ তা’আলা মানুষকে যে নির্দিষ্ট ফিতরার উপর সৃষ্টি করেছেন তা যদি অক্ষত থাকে বা দূষিত না হয় তবে ফিতরা সঠিকভাবে কাজ করবে। এভাবে যখন ফিতরা সঠিকভাবে কাজ করে তখন হৃদয়/মন (ক্বালব) মৌলিক উপায়ে সৃষ্টিকর্তার জ্ঞান সম্পর্কে জানতে সক্ষম হবে। অতএব, ক্বলবের উপর ফিতরার স্বাভাবিক কর্মের মাধ্যমে মানুষ সৃষ্টিকর্তাকে জানতে সক্ষম হয়। তাই ইবনে তাইমিয়া আরো বলেন,
একজন স্রষ্টার প্রমাণ এবং তাঁর পূর্ণতা হলো সহজাত এবং অনিবার্য যার ফিতরা অক্ষত থাকে তার জন্য। (( An Islamic Account of Reformed Epistemology. Page: 13-14))
আমাদের ফিতরার মধ্যে বা হৃদয়/মন (ক্বালব) এর মধ্যে স্রষ্টার প্রতি যে মৌলিক বিশ্বাস তৈরি হয় তা আসে স্রষ্টার দেওয়া নিদর্শন থেকে। অর্থাৎ, দুনিয়ার মধ্যে আল্লাহ তা’আলার যত নিদর্শন রয়েছে তা দেখে তাৎক্ষণিক আমাদের মনের মধ্যে একজন সৃষ্টিকর্তার অস্তিত্ব সম্পর্কে মৌলিক বিশ্বাস তৈরি হয়। আল্লাহ তা’আলার নিদর্শনগুলো একজন সৃষ্টিকর্তার অস্তিত্বকেই নির্দেশ করে। এটাই হলো ফিতরা বা আল্লাহর প্রকৃতি যার উপর তিনি সকল মানুষকে সৃষ্টি করেছেন। আল্লাহ তা’আলা মানুষকে এমন এক ফিতরাতে উপর সৃষ্টি করেছেন যে ফিতরা তার নিদর্শন সমূহ দেখে সহজাতভাবেই তার সম্পর্কে অনুধাবন করে নেয়, তার সম্পর্কে জানতে পারে, তার উপাসনা করার জন্য আগ্রহ সৃষ্টি হয়।
তাই ইবনে তাইমিয়া দৃঢ়ভাবে বলেছেন যে,
নিদর্শনের (আয়াত) মাধ্যমে আল্লাহর অস্তিত্ব প্রমাণ করা আবশ্যিক। এটি কুরআনের পথ, এবং তাঁর বান্দাদের ফিতরায় অন্তর্নিহিত। তিনি আরো বলেন, প্রতিটি সৃষ্ট বস্তুই একপ্রকার নিদর্শন এবং সরাসরি স্রষ্টার প্রমাণ। (( Ibn Taymiyya on theistic signs and knowledge of God. Page: 3 ))
পবিত্র কুরআনের অনেক আয়াতে ‘নিদর্শন’ এর কথা উল্লেখ রয়েছে। প্রকৃতপক্ষে, কুরআন নিজেই একটি নিদর্শন দ্বারা গঠিত: কুরআনের প্রতিটি আয়াত এক একটি নিদর্শন। যেমন, পবিত্র কুরআনে মহান আল্লাহ তা’আলা বলেন,
আর তাঁর নিদর্শনসমূহের মধ্যে রয়েছে রাত ও দিন, সূর্য ও চাঁদ। তোমরা না সূর্যকে সিজদা করবে, না চাঁদকে। আর তোমরা আল্লাহকে সিজদা কর যিনি এগুলো সৃষ্টি করেছেন, যদি তোমরা কেবল মাত্র তাঁরই ইবাদাত কর। (( (41:37) Fussilat | (৪১:৩৭) হা-মীম আস-সাজদা (ফুসসিলাত)-অনুবাদ/তাফসীর ))
নিশ্চয় আসমানসমূহ ও যমীনের সৃষ্টি এবং রাত ও দিনের বিবর্তনের মধ্যে রয়েছে বিবেকসম্পন্নদের জন্য বহু নিদর্শন। (( (3:190) Al-i-Imran | (৩:১৯০) আলে-ইমরান-অনুবাদ/তাফসীর ))
নিশ্চয় আসমানসমূহ ও যমীনে মুমিনদের জন্য নিদর্শনাবলি রয়েছে। (( (45:3) Al-Jathiya | (৪৫:৩) আল-জাসিয়া-অনুবাদ/তাফসীর ))
সুতরাং, ফিতরা যখন দূষণ মুক্ত, অক্ষত, বা ফিতরার যে স্বাভাবিক অবস্থান তার উপরে মিথ্যার ছাপ না পরে (যেমনটা রাসুল (সাঃ) বলেছে, প্রত্যেক নবজাতকই ফিতরাতের উপর জন্মলাভ করে। অতঃপর তার পিতামাতা তাকে ইয়াহূদী, নাসারা বা মাজূসী (অগ্নিপূজারী) রূপে গড়ে তোলে।) তাহলে ফিতরা আমাদের জ্ঞানীয় অন্যান্য অনুষদগুলোর সাথে মিলিত হয়ে স্রষ্টার দেওয়া নিদর্শন থেকে স্রষ্টা সম্পর্কে একটি মৌলিক বিশ্বাস তৈরি করে।
'সঠিক কার্যকারণবাদ' এর সাথে ইবনে তাইমিয়ার জ্ঞানতত্ত্বের মডেলটির সামঞ্জস্য হওয়ার বিষয়ে কিছুটা আলোকপাত করা উচিত।
ইবনে তাইমিয়া বলেন,
সঠিকভাবে কাজ করা ফিতরার উপর ভিত্তি করে মানুষ সত্যের জ্ঞান এবং তার নিশ্চিতকরণ, এবং মিথ্যার স্বীকৃতি এবং তার প্রত্যাখ্যান করে”। (( Ibn Taymiyya, Taqi al-Din. al-Intisar li-ahl al-athar (naqd al-mantiq). (Mecca: Där 'alam al- Fawa'id, 2014), 49. )) অন্য জায়গায় ইবনে তাইমিয়া আরো বলেছেন যে, “ যখন সত্য কারো মনে প্রবেশ করে, তখন ফিতরা স্বাভাবিকভাবেই তা গ্রহণ করে... কিন্তু যখন এটি মিথ্যা হয়, তখন স্বাভাবিকভাবেই এটি থেকে মুখ ফিরিয়ে নেয়” । (( Ibid. 49. ))
সুতরাং, সঠিকভাবে কাজ করা ফিতরার সাথে আমাদের জ্ঞানীয় অনুষদের সংযোগ রয়েছে যা আমাদের বিশ্বাসকে ওয়ারেন্ট রাখার নিশ্চয়তা নেয়। আমরা 'সঠিক কার্যকারণবাদ' নিয়ে আলোচনায় দেখিয়েছি যে, আমাদের স্মৃতি-ভিত্তিক এবং ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য, বা অন্যান্য জ্ঞানীয় অনুষদের মাধ্যমে প্রাপ্ত বিশ্বাসগুলো তখনই জ্ঞানে পরিণত হবে যখন সেগুলো সঠিকভাবে কাজ করা জ্ঞানীয় অনুষদ থেকে উৎপাদিত হবে, একটি জ্ঞানীয় পরিবেশে যার জন্য অনুষদগুলি ডিজাইন করা হয়েছিল তার অনুরূপ, জ্ঞানীয় অনুষদের পরিকল্পিত নকশার লক্ষ্য হবে সত্য বিশ্বাস উৎপাদন করা, বিশ্বাসটি সফলভাবে সত্য হবে। একইভাবে তাইমিয়ান-ইসলামিক জ্ঞানতত্ত্বের মডেল অনুযায়ী, দুনিয়াতে বিভিন্ন নিদর্শনের মাধ্যমে স্রষ্টার প্রতি মৌলিক বিশ্বাস উদ্ভূত হয়, যা ফিতরার সাথে মিলিত হয়ে ক্বলবের সঠিক কার্যের ফলে উদ্ভূত হয়, এবং যা উপযুক্ত পরিবেশে সফলভাবে সত্য জ্ঞান অর্জন করার জন্য ঈশ্বরের দ্বারা পরিকল্পিত বা ডিজাইনকৃত।
অর্থাৎ, আল্লাহ তা'আলা আমাদের সৃষ্টি করেছেন একটি সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনার (Design Plan) ভিত্তিতে। এর লক্ষ্য হলো সত্য জ্ঞান অর্জন করা। এই সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা যা সত্য জ্ঞান অর্জন করতে সক্ষম। আর তা হলো ফিতরা। আল্লাহ তা'আলা দুনিয়াতে অসংখ্য নিদর্শন দিয়েছেন। ফিতরা যখন দূষণ মুক্ত, অক্ষত, বা ফিতরার যে স্বাভাবিক অবস্থা তার উপরে মিথ্যার ছাপ না পরে, তাহলে আল্লাহর দেওয়া নিদর্শন সমূহ দেখে আমাদের ফিতরা আমাদের জ্ঞানীয় অন্যান্য অনুষদগুলোর সাথে মিলিত হয়ে স্রষ্টার দেওয়া নিদর্শন থেকে স্রষ্টা সম্পর্কে একটি মৌলিক বিশ্বাস তৈরি করে।
সুতরাং, আমরা বলতে পারি যে, ফিতরাকে যে লক্ষ্যে ডিজাইন করা হয়েছে (সত্য জ্ঞান অর্জন) সেই অনুরূপ পরিবেশ (নিদর্শন) রয়েছে। একইভাবে 'সঠিক কার্যকারণবাদ' অনুযায়ী সত্য জ্ঞান পাওয়া জন্য আমাদের জ্ঞানীয় অনুষদগুলো সঠিকভাবে কাজ করতে হবে। একটি জ্ঞানীয় পরিবেশে যার জন্য অনুষদগুলি ডিজাইন করা হয়েছিল তার অনুরূপ হতে হবে। জ্ঞানীয় অনুষদের পরিকল্পিত নকশার লক্ষ্য হবে সত্য বিশ্বাস উৎপাদন করা। এরপর বিশ্বাসটি সফলভাবে সত্য হবে।
এভাবেই, আমাদের ইসলামিক জ্ঞানতাত্ত্বিক মডেল প্রদর্শন করতে পারে যে, কীভাবে ঈশ্বরের প্রতি বিশ্বাস সঠিক কার্যকারিতা অনুসারে একটি মৌলিক সত্য বিশ্বাস। সুতরাং, স্রষ্টার বিশ্বাস মানব মনের মৌলিক বা সহজাত বিশ্বাস যা ‘সঠিক কার্যকারণবাদ' এর সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ। ফলে স্রষ্টার বিশ্বাসটি ওয়ারেন্টেড। মৌলিক বা সহজাত বিশ্বাসগুলো স্বতঃসিদ্ধ সত্য বা নিশ্চিত বিশ্বাস । স্বতঃসিদ্ধ বা মানবমনের মৌলিক, সহজাত বিশ্বাসগুলোর সত্যতা প্রমাণ করার জন্যও কোনো ধরনের প্রমাণের প্রয়োজন হয় না, কোনো প্রমাণ বা যুক্তিরউপর নির্ভর করতে হয় না। এগুলো প্রমাণ নিরপেক্ষ যা স্বাধীনভাবে জ্ঞানে পরিণত হয়।
সহজাত বিশ্বাসের স্বপক্ষে বৈজ্ঞানিক প্রমাণ
একদল শিশুকে জনমানবহীন মরুদ্বীপে ফেলে দেওয়া হলে তারা কি স্রষ্টার ধারণা পোষণ করবে? কগনেটিভ বিজ্ঞানীদের মতে, শিশুরা জন্মগতভাবেই স্রষ্টার ধারণা নিয়ে আসে। তারা সহজাতভাবেই প্রকৃতিতে বুদ্ধিমত্তার ছাপ দেখতে পায়। শিশুরা জগতের অস্তিত্বের পেছনে এক সৃষ্টিশীল শক্তির ধারণা গড়ে তোলে। তাই স্রষ্টার ধারণা শুধুই পারিবারিক, সামাজিক, কিংবা রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থার ফল নয়। বরং এটি মানব মনের গভীরে নিহিত একটি মৌলিক সত্য। কাজেই নাস্তিকদের দাবি-যে সৃষ্টিকর্তার বিশ্বাস কেবল পারিপার্শ্বিক শিক্ষার ফল-একেবারেই ভিত্তিহীন।
University of Oxford এর Center for Anthropology and mind বিভাগের সিনিয়র রিসার্চার Dr. Justin Barrett দীর্ঘ ১০ বছর শিশুদের উপর বৈজ্ঞানিক গবেষণা করেছেন। তার গবেষণার উপর 'Born Believers : The Science of Children's Religious Belief' শিরোনামে একটি বই প্রকাশ করেছেন। বইটিতে তিনি ডেভেলপমেন্টাল সাইকোলজি, কগনিটিভ এনথ্রোপলোজি এবং কগনিটিভ সায়েন্স অব রিলিজিয়ন সহ বিভিন্ন গবেষণা থেকে প্রাপ্ত ফলাফল একত্রে করে আলোচনা করেছেন। তিনি মনে করেন শিশুরা জন্ম থেকেই স্বভাবজাত ধর্মে বিশ্বাসী । বইতে তিনি ব্যাখ্যা করেছেন যে, কীভাবে মানুষের মধ্যে স্বভাবতই ঐশ্বরিক শক্তির বিশ্বাস গড়ে উঠে। শিশুরা শক্তিশালী অভ্যন্তরীণ এবং বাহ্যিক শক্তির অস্তিত্ব অনুভব করে যিনি বুদ্ধিমান এজেন্ট এবং এমন শক্তিশালী নিয়ন্ত্রক যা সূর্যকে আলোকিত করে এবং রাতের পতন ঘটায়। (( Dr. Justine L. Barrett, Born Believers: The Science of ChildrenŌs Religious Belief; Chapter 6: Natural Religion. ))
এছাড়াও বিবিসি রেডিওতে দেওয়া সাক্ষাৎকারে তার গবেষণা সম্পর্কে Dr. Justin Barrett বলেন,
আপনি যদি কিছুসংখ্যক শিশুকে কোনো দ্বীপে রেখে আসেন আর তারা নিজেরাই বেড়ে উঠে আমি মনে করি তারা স্রষ্ট্রায় বিশ্বাস করবে। (( BBC - Today ))
একইভাবে অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের মনোবিজ্ঞানী Dr. Olivera Petrovich পিয়ার রিভিউ জার্নালে তার গবেষণার ফলাফলে জানান,
কিছুধৰ্মীয় বিশ্বাস যে সার্বজনীন হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। (যেমন, কোনো অতিপ্রাকৃতিক সত্তাকে বিশ্বজগতের স্রষ্টা হিসেবে মৌলিক বিশ্বাস), এর পক্ষে শক্তিশালী প্রমাণ ধর্মগ্রন্থের বাণীর চেয়ে বরং বৈজ্ঞানিক গবেষণা থেকেই বেশি বেরিয়ে আসছে বলেপ্রতীয়মান হচ্ছে। (( DOISerbia - Key psychological issues in the studz of religion - Petrović, Olivera (nb.rs) "Infants" have natural belief in God' (smh.com.au) ))
এছাড়াও অস্ট্রেলিয়ান একটি নিউজ জার্নালে প্রকাশিত প্রতিবেদনের উল্লেখ করা হয়, Dr. Olivera Petrovich বলেন,
স্রষ্টার বিশ্বাস শেখানো হয় না কিন্তু স্বাভাবিকভাবেই বিকশিত হয়। (( Infants 'have natural belief in God' ))
প্রফেসর রবার্ট ম্যাকাওলি, অক্সফোর্ড ইউনিভার্সিটি প্রেস থেকে তার প্রকাশিত, "Why Religion is Natural and Science in not” গ্রন্থে Dr. Olivera Petrovich এর সুরে কথা বলেছেন। (( (( Why Religion Is Natural and Science Is Not;, ROBERT N. McCAULEY; Oxford University Press. )) ইয়েল ইউনিভার্সিটির গবেষক পল ব্লুম জার্নাল অব ডেভেলপমেন্টাল সায়েন্স- এ প্রকাশিত এক পেপারে জানান,
বিগত বছরগুলোতে পরিচালিত কিছু বৈজ্ঞানিক গবেষণা জানাচ্ছে কিছু সার্বজনীন ধর্মীয় বিশ্বাস নিয়েই শিশুরা জন্মায়, যেমন; ঐশ্বরিক সত্তার অস্তিত্ব, মহাবিশ্বের ঐশ্বরিক সৃষ্টি, মনের অস্তিত্ব, পরকালের বিশ্বাস, ইত্যাদি। (( Paul bloom religion is natural journal of developmental science 10:1 p 147-151 ))
বোস্টন বিশ্ববিদ্যালয়ের (নাস্তিক) গবেষক ডেবোরাহ কেলেমেন ‘শিশুরা কি সহজাতভাবে আস্তিক?' এই শিরোনামে একটি প্রবন্ধ রের করেছেন। এবং সেখানে তিনি উল্লেখ করেছেন যে,
সম্প্রতি মননগত গবেষণায় দেখা যায় যে, ৫ বছরের দিকে শিশুরা বুঝতে শুরু করে প্রাকৃতিক বস্তুগুলো মানব সৃষ্ট নয়। ৬-১০ বছর বয়সী শিশুরা প্রকৃতির মাঝে একটা মহৎ উদ্দেশ্য খুঁজে পায়। এসব গবেষণা থেকে শিশুদের ব্যাখ্যামূলক মনোভাবকে সহজাত আস্তিক্যবাদ হিসেবে বলা যেতে পারে। (( Are children "intuitive theists"? Reasoning about purpose and design in nature - PubMed )) এছাড়াও ডেবোরাহ কেলেমেন বিভিন্ন গবেষণার ফলাফল থেকে সিদ্ধান্ত জানান যে, অতিপ্রাকৃতিক সত্তায় ধর্মীয় বিশ্বাস বাহ্যিক, সামাজিক উৎস থেকে নয় বরং, প্রাথমিকভাবে মানুষের ভেতর থেকেই উৎপত্তি হয়। এ বিশ্বাস মানব মনের মৌলিক উপকরণ। (( Patrick Mcnamara Ph.D, Wesley J. Wildman (etd.), Science and the World’s Religious; Vol. 02 (Persons and Groups), P.206,209 (Publisher ABC-CLIO, July 19,2012) ))
এলিনা জার্নেফেন্ট, কেটলিন এফ. ক্যানফিল্ড এবং ডেবোরাহ কেলেমেন সম্প্রতি একটি গবেষণা করেছে, “অবিশ্বাসীদের বিভক্ত চিন্তাধারা; বিভিন্ন জনগোষ্ঠীর নিধার্মিক প্রাপ্ত বয়স্কদের মাঝে প্রকৃতির উদ্দেশ্যমূলক সৃষ্টির ব্যাপারে সহজ বিশ্বাস” এই শিরোনামে । এই গবেষণা থেকে জানা যায়, প্রকৃতিকে পরিকল্পিত হিসেবেই দেখার একটা স্বাভাবিক প্রবণতা রয়েছে মানুষের। গবেষণার ফলাফলটি দেওয়া হয় তিনটি সমীক্ষার মাধ্যমে। প্রথম সমীক্ষাটি করা হয় ৩৫২ জন প্রাপ্ত বয়স্ক উত্তর-আমেরিকানদের ওপর। দ্বিতীয় সমীক্ষাটি করা হয় ১৯৪৮ জন উত্তর আমেরিকানদের উপর। এবং তৃতীয় সমীক্ষাটি করা হয় ১৫১ জন ফিনল্যান্ডের বসবাসরত মানুষের মধ্যে। সমীক্ষায় ধার্মিক এবং অধার্মিক দু-ধরণের লোকই অংশগ্রহণ করেছিলো। তাদেরকে কম্পিউটারের মাধ্যমে ১২০টি ছবি দেখানো হয়েছিল। এবং তাদের কাজ ছিল, ছবিতে যা দেখা যাচ্ছে তা কেউ উদ্দেশ্যমূলকভাবে সৃষ্টি করেছে কিনা তা নির্ধারণ করা। তাদের কাউকে ঝটপট উত্তর দিতে বলা হয়েছিল এবং কাউকে কিছুক্ষণ ভাবার সময় দেওয়া হয়েছিল । কিবোর্ডের মাধ্যমে হ্যাঁ অথবা না ফলাফল দিতে হতো তাদের। প্রত্যেকটি সমীক্ষা থেকেই প্রাপ্ত ফলাফল এই যে, 'নাস্তিকরাও সৃষ্টির মধ্যে একটা উদ্দেশ্য খুঁজে পায় । এই গবেষণা থেকে প্রমাণিত হয়, প্রকৃতিকে পরিকল্পিত হিসেবে দেখার একটা সহজাত প্রবণতা বা জন্মগত বিশ্বাস আমাদের মাঝে রয়েছে। (( The divided mind of a disbeliever: Intuitive beliefs about nature as purposefully created among different groups of non-religious adults - PubMed )) বার্মিংহাম বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ইউজিন নাগাসাওয়া তার বইতে উল্লেখ করেছেন,
সম্প্রতি কগনেটিভ সায়েন্স অব রিলিজিওন ফিল্ডের গবেষণা থেকে জানা যায় যে, মানুষ, বিশেষ করে শিশুরা সহজাতভাবে প্রকৃতিতে উদ্দেশ্য এবং বুদ্ধিমত্তা দেখতে পায়। সেখানে আরো উল্লেখ করা হয়, মনোবিজ্ঞানী ডোবোরাহ কেলেমেন আমেরিকায় কিছু বিদ্যালয়ের শিশুদের উপর গবেষণা করে জানায় যে, “শিশুরা সহজাতভাবেই টেলিওলজিক্যাল পরিপ্রেক্ষিতে প্রাকৃতিক বস্তুর সমূকে ব্যাখ্যা করে। (( The Existence of God: A Philosophical Introduction; Page: 57-58 ))
সেক্যুলার গবেষক এন্ড্রু নিউবার্গের মতে,
আমাদের মস্তিষ্ক যেভাবে সৃষ্টি করা হয়েছে তাতে মানুষের জন্য ধর্মীয় ও আধ্যাত্মিক অভিজ্ঞাতা লাভ খুবই সহজ একটি ব্যাপার, গবেষণার ফল নিঃসন্দেহে সেদিকেই ইঙ্গিত করেছে। (( I’m an atheist. So why can’t I shake God? - The Washington Post ))
অক্সফোর্ড ইউনিভার্সিটির প্রফেসর রজার ট্রিগ এর মতে,
ধর্মকে দমিয়ে রাখার প্রচেষ্টা ক্ষণস্থায়ী কারণ ধর্মবিশ্বাস মানবমনে গ্রথিত বলেই প্রতীয়মান হয়। (( Belief in God is part of human nature - Oxford study ))
নাস্তিক মনোবিজ্ঞানী প্যাসকেল বয়ার Nature জার্নালে প্রকাশিত পেপারে উল্লেখ করেছেন,
নাস্তিকতা হলো আমাদের সহজাত চেতনার (Natural Cognitive disposition) বিরুদ্ধে। (( Pascal Boyer, Bound to Believe? Nature, Vol. 455, P-1038 ))
উপরিউক্ত আলোচনার ভিত্তিতে এ সিদ্ধান্তে উপনীত হওয়া যায় যে, স্রষ্টার প্রতি বিশ্বাস মানব মনের সহজাত ও মৌলিক বিশ্বাস। মৌলিক বিশ্বাসের বৈশিষ্ট্য হচ্ছে, এগুলো স্বতঃসিদ্ধ এবং ওয়ারেন্টেড। এগুলোর সত্যতা প্রতিষ্ঠার জন্য কোনো বাহ্যিক প্রমাণ বা যুক্তি প্রয়োজন হয় না। যেহেতু মৌলিক বিশ্বাসগুলো স্বপ্ৰমাণিত, সেহেতু স্রষ্টার অস্তিত্বও প্রমাণ-নিরপেক্ষ এবং স্বতঃসিদ্ধ। অন্যদিকে, নাস্তিকতা কোনো সহজাত বা মৌলিক অবস্থান নয়; বরং এটি একটি অর্জিত এবং কৃত্রিম ধারণা। প্রাথমিকভাবে যেহেতু একজন স্রষ্টার মৌলিক ধারণার বিষয়টি সত্য, কাজেই সহজাত এবং মৌলিক বিশ্বাসকে কেউ চ্যালেঞ্জ করলে চ্যালেঞ্জকারীকে প্রমাণের ভার বহন করতে হয়। তাই স্রষ্টার অস্তিত্ব অস্বীকারকারী নাস্তিকদের প্রতি প্রাসঙ্গিক প্রশ্ন হলো: কী প্রমাণ তাদের কাছে রয়েছে যে, স্রষ্টার অস্তিত্ব নেই? যে কোনো স্বতঃসিদ্ধ সত্যকে চ্যালেঞ্জ করতে হলে চ্যালেঞ্জকারীকে যথাযথ যুক্তি ও প্রমাণ উপস্থাপন করতে হবে। সহজাত ও মৌলিক সত্যের বিপরীতে অবস্থান গ্রহণের জন্য এটি একটি ন্যূনতম শর্ত। সুতরাং, নাস্তিকদের পক্ষ থেকে স্রষ্টার অস্তিত্ব অস্বীকারের যুক্তি এবং প্রমাণ আবশ্যক।